Friday, October 5, 2018

ড্রাগনকাহিনী : যেভাবে মানবসভ্যতায় আগমন ঘটেছিলো আগুনমুখো ড্রাগনদের।

AD
আমাদের শৈশবের স্মৃতিগুলোকে অল্প যে ক’টি জিনিস অতিরিক্ত মাত্রায় রাঙিয়ে তুলতে পেরেছিলো, রুপকথার গল্প সেগুলোর মাঝে অন্যতম। আমাদের এই উপমহাদেশীয় রুপকথার গল্প দিয়ে শুরু হয় সেই যাত্রা, যেখানে মিশে থাকে ভূত-প্রেত-দৈত্য-দানো-শাকচুন্নির মতো কাল্পনিক চরিত্রগুলোর সাথে রাজপুত্রের যুদ্ধজয়, থাকে সাধারণ কোনো মানুষের অসাধারণ বুদ্ধির জোরে সেসব প্রেতাত্মার হাত থেকে বেঁচে যাবার বুদ্ধিদীপ্ত কাহিনী প্রভৃতি।
টিভি সিরিয়ালে দেখা ড্রাগন।
একটু বড় হলে, এবং সেই সাথে আগ্রহ টিকে থাকলে, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের নানা রুপকথার বইও পড়া শুরু করে অনেকে। তখন চীনা, জাপানী, মিশরীয়, গ্রিক, রোমান, নর্স, রুশী, আফ্রিকান রুপকথার বইতে ভরে যেতে থাকে আমাদের বইয়ের তাক, ডানা মেলতে থাকে আমাদের কল্পনার প্রজাপতি, রঙিন থেকে রঙিনতর হয়ে উঠতে থাকে আমাদের শৈশব-কৈশোর।
ঠাকুমার ঝুলি রাঙিয়ে তুলেছিল আমাদের অনেকের শৈশবকেই।

বিদেশী রুপকথাগুলোর যেসব প্রাণী আমাদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে, ড্রাগন নিঃসন্দেহে এর মাঝে শীর্ষস্থানীয়। কী এক বিচিত্র রকমের শক্তিশালী প্রাণী। বিশাল তার দেহ, যা দেখলেই পিলে চমকে যায়, যার ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায় বিশাল একটি এলাকা। আছে বিশাল দুটি ডানা, যার ঝাপ্টায় ভেঙে পড়ে বাড়িঘর, মারা পড়ে অগণিত মানুষ। লেজে থাকে বড় বড় কাটা, যার একটি ধাক্কা নিমিষে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয় তার সাথে লড়াই করতে আসা মানুষগুলোকে। আছে সারা গায়ে পুরু চামড়া ও আঁশের আস্তরণ, যার সামনে অচল হয়ে পড়ে প্রচলিত প্রায় সব অস্ত্র, অসহায় হয়ে পড়ে শত শত দক্ষ যোদ্ধাও। নিঃশ্বাসে যার বের হয় কালো ধোঁয়া, যে ধোঁয়া মনকেও ভয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

আর আছে মুখ থেকে বের হওয়া লেলিহান আগুনের শিখা, চরম ক্রোধের মুহূর্তে যার নিঃসরণ পাল্টে দিতে পারে গোটা যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি, পুরো রণাঙ্গনকে পরিণত করতে পারে নরকেরই ছোটখাট একটি অগ্নিকুণ্ডে। ড্রাগন এমনই ভয়ানক এক প্রাণী। তবে মানবজাতির সৌভাগ্য, যে প্রাণীকে তারা এত ভয়াবহ রুপে সাজিয়েছে, সেই প্রাণী কেবল তাদের কল্পনাতেই থেকে গেছে। বাস্তবে সে আসলে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারতো, তা বোধহয় না বললেও চলে!
শিল্পীর কল্পনায় ফুটে ওঠা ড্রাগন।
একেক সংস্কৃতিতে এই ড্রাগন এসেছে একেক রুপ নিয়ে। কোথাও বেশ সদাশয়, কোথাও আবার বেশ ভয়াবহ এক প্রাণী হিসেবে। তবে উভয়ক্ষেত্রেই তাকে হত্যা করা ছিলো বেশ দুরূহ একটি ব্যাপার। এটা সেই এলাকার ভৌগলিক অবস্থানের উপরও নির্ভর করতো। প্রাচ্যের সংস্কৃতিতে ড্রাগনদেরকে দেখা যায় বেশ জ্ঞানী এক সত্ত্বা হিসেবে, সমুদ্র ও পানির উপর যাদের রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। এর পাশাপাশি ড্রাগনকে সাধারণ মানুষের প্রতি বেশ দয়ালু হিসেবে দেখার রীতিও দেখা যায় এখানে, যাদের প্রভাবে দূর হয়ে যায় যাবতীয় অপপ্রভাব।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে আবার ড্রাগন এসেছে পুরোপুরি বিপরীত রুপে। এখানে সে বিশালদেহী, ভয়ানক এক প্রাণী, যে কি না হত্যা, ধ্বংসেই মত্ত থাকে সারাদিন। তার বাস এমন দুর্গম, অন্ধকারাচ্ছন্ন, বিপজ্জনক স্থানে, যেখানে যেতে মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। তবে এই ড্রাগনরা একটি কাজ করতো। তারা ছিলো বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির পাহারাদার।
শিংওয়ালা ড্রাগন।
প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য, যে সংস্কৃতির কথাই বলা হোক না কেন, উভয়ক্ষেত্রেই মধ্যযুগের আগপর্যন্ত ড্রাগনের কোনো ডানা গজায়নি! অর্থাৎ, তখন পর্যন্ত গল্পকারেরা ড্রাগনের ডানা জুড়ে দেননি। এই সময়কাল থেকে পাশ্চাত্যের ড্রাগনগুলোকে ডানাওয়ালা হতে দেখা যায়, অন্যদিকে প্রাচ্যের ড্রাগনগুলো আগের মতোই থেকে যায়, অর্থাৎ ডানাবিহীন।
ড্রাগন নিয়ে উপকথারও কমতি নেই। বিশালাকায় এই প্রাণীটির রক্তের কথাই ধরা যাক না। বিভিন্ন উপকথায় এসেছে, কেউ যদি ড্রাগনের রক্তে ডুবানো ছুরি বা তলোয়ার দিয়ে কাউকে আঘাত করে, তবে আহত ব্যক্তির ক্ষত কখনোই সারবে না। এটা তো গেলো ড্রাগনের রক্তের খারাপ দিক। আবার এর ভালো দিকও আছে। এই রক্ত নাকি একজন মানুষকে ভবিষ্যতে দেখার ক্ষমতাও দিতে পারতো। প্রাচ্যের ড্রাগনগুলো আবার ইচ্ছেমতো তাদের আকার পরিবর্তন করতে পারতো, এমনকি চাইলে ধারণ করতে পারতো মানুষের আকৃতিও!
গেম অফ থ্রোন্স টিভি সিরিজের একটি পর্বে ড্রাগনের আক্রমণে পুড়ে ছারখার শত্রুশিবির।
কালে কালে গল্পকারদের হাতে পড়ে ড্রাগন যে কোথা থেকে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, উপরের লেখা পড়ে তার কিছুটা হয়তো অনুমান করা যায়। এই সিরিজের পরবর্তী পর্বগুলোতে এই সম্পর্কে আরো আলোকপাত করা হবে। কিন্তু, একেবারেই কাল্পনিক একটি প্রাণী বিশ্বব্যাপী মানুষের মনে জায়গা করে নিলো কীভাবে- কখনো কি এই প্রশ্নটি আপনার মনে উঁকি দিয়েছে? ড্রাগনের নানা কাহিনী গল্পের বইয়ে পড়ে, কিংবা হাল আমলে অত্যন্ত জনপ্রিয় গেম অফ থ্রোন্স টিভি সিরিজে ডেনেরিস টার্গারিয়েন ‘ড্রাকারিস’ বলামাত্র আগুনের লেলিহান শিখায় সবকিছু ছারখার করে দেয়া ড্রাগন প্রকৃতপক্ষে কোথা থেকে আসলো, সেই প্রশ্ন কি আপনাদের মনের জানালায় কখনো টোকা দিয়ে যায়নি?
দেরি না করে চলুন তাহলে ড্রাগন নিয়ে শুরু হওয়া আমাদের এই উপকথাভিত্তিক সিরিজের প্রথম পর্বে সেই ইতিহাসেরই অনুসন্ধান করে আসা যাক।

কীভাবে মানবসমাজে আগমন ঘটলো ড্রাগনদের?

প্রশ্নটি রাখা হয়েছে একেবারে সরাসরি, তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এর সরাসরি কোনো উত্তর নেই। শত-সহস্র বছর আগে থেকে বিভিন্ন উপকথায় ড্রাগনদের উপস্থিতির কথা জানা যায়। আর কীভাবে সেগুলোতে এই প্রাণীগুলো স্থান করে নিলো, এর পেছনে গবেষকগণ দিয়েছেন নানা রকম যুক্তি। এখন একে একে আমরা সেগুলোই জানার চেষ্টা করবো

(১) কুমিরঃ

কুমিরের কথা বলতে গেলে এখানে দু’প্রজাতির কুমির নিয়ে আলাপ করতে হবে।
ফ্লোরিডার সেইন্ট অগাস্টিন ক্রোকোডাইল ফার্মের একটি নোনাপানির কুমির।
প্রথমেই আসবে সল্টওয়াটার ক্রোকোডাইল, তথা নোনাপানির কুমিরের নাম, যা একইসাথে এস্টুয়ারাইন ক্রোকোডাইল, ইন্দো-প্যাসিফিক ক্রোকোডাইল, মেরিন ক্রোকোডাইল, সী ক্রোকোডাইল প্রভৃতি নামে পরিচিত। বর্তমান বিশ্বের বুকে বিচরণ করে বেড়ানো সরিসৃপদের মাঝে এই নোনাপানির কুমিরই সর্ববৃহৎ। এরপরেই আসবে নাইল ক্রোকোডাইল, তথা নীলনদের কুমিরদের নাম। এই কুমিরগুলো আফ্রিকার সর্ববৃহৎ মিঠাপানীর শিকারী প্রাণী। এছাড়া দৈর্ঘ্যের দিক থেকে নোনাপানির কুমিরের ঠিক পরেই রয়েছে এর অবস্থান।
দক্ষিণ আফ্রিকার লা বনহুর ক্রোকোডাইল ফার্মের কিছু নীলনদের কুমির।
নোনাপানির কুমিরগুলো ভারতের পূর্ব উপকূল থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলে দেখা যায়। নীলনদের কুমিরগুলোকে সাব-সাহারান আফ্রিকার নদী, হ্রদ ও অন্যান্য জলাভূমিগুলোতে দেখা যায় এখন। তবে আগেকার দিনে তাদের বিস্তার আরো অনেক জায়গা জুড়েই ছিলো। ইতিহাস বলে, নীলনদের এই কুমিরগুলোকে এককালে ভূমধ্যসাগরের উত্তরাঞ্চলেও দেখা যেত। অর্থাৎ দক্ষিণ ইতালি, গ্রিস ও স্পেনের অধিবাসীদের মাঝে মাঝেই মুখোমুখি হতে হতো জলের এই দানবদের সাথে।
কুমিরের সাথে মিল রেখে চিত্রিত কাল্পনিক ড্রাগন।
২০ ফুট পর্যন্ত লম্বা এই নীলনদের কুমিরেরা তাদের শরীরের মধ্যভাগ একেবারে ভূমি থেকে তুলে দাঁড়াতে সক্ষম, যা সাধারণত হাই ওয়াক (High Walk) নামে পরিচিত। নোনাপানির কুমিররা তো আরো এককাঠি সরেস। লম্বায় মাঝে মাঝে ২৩ ফুট ছুঁয়ে ফেলা এই প্রাণীগুলো শিকারকে ধরতে কখনো কখনো তো পানি থেকেই উপরের দিকে লাফিয়ে ওঠে। এখান থেকেই ধারণা করা হয়, নীলনদের কুমিরদের এই আচরণই হয়তো আস্তে আস্তে গল্পকারদের এমন ড্রাগন চরিত্র তৈরিতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, যা তার পেছনের পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে শত্রুকে খতম করে দেয়।

(২) ডায়নোসরঃ

এবার আসা যাক ডায়নোসরদের কাছে। ড্রাগনদের অস্তিত্ব না থাকুক, বিশালাকায় ডায়নোসররা যে এককালে সত্যি সত্যিই এই ধরনীর বুকে বিচরণ করে বেড়িয়েছে, তা তো আজ সবাই জানে। অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদই মনে করেন, প্রাচীনকালে মানুষজন যখন ডায়নোসরদের বিশাল বিশাল সব ফসিল খুঁজে পেত, তখন থেকেই মানুষের মনে ধীরে ধীরে ড্রাগনের উপকথা জন্ম নিতে থাকে।
শিল্পীর কল্পনায় যখন পৃথিবীর বুকে বিচরণ করতো ডায়নোসররা।
উদাহরণস্বরুপ, ক্বিজিয়াংলং ডায়নোসরের কথা বলা যায়। ৪৯ ফুট, অর্থাৎ প্রায় পাঁচতলা ভবনের সমান উঁচু এই ডায়নোসরটির প্রজাতি আজ থেকে প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াতো। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে চীনের হেবা গ্রামের কৃষক চাই চ্যাংমিং সর্বপ্রথম এর একটি কশেরুকা খুঁজে পান। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে নিকটবর্তী ক্বিজিয়াং জেলার একটি কনস্ট্রাকশন সাইটে ডায়নোসরটির ফসিলের বেশ বড় একটি সংগ্রহ আবিষ্কৃত হয়।
আজকের দিনে জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবার বদৌলতে আমরা হয়তো দেখেই বলে দিতে পারছি, এটা অমুক প্রজাতির ডায়নোসরের ফসিল। কিন্তু একটু শত-হাজার বছর আগেকার মানুষগুলোর কথা ভাবুন। তাদের কাছে তো আর আজকের দিনের মতো জ্ঞান, প্রযুক্তির কিছুই ছিলো না। ফলে অতিকায় সেসব ফসিলের সন্ধান তারা যখন পেতো, তখন তারা ড্রাগনের মতো অতিকায় কোনো প্রাণীর কথা যে কল্পনা করবে, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কারণ ইতিহাস বলে, খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক থেকেই চীনে ডায়নোসরের ফসিল নিয়ে গবেষণা চলছে।

(৩) তিমিঃ

নীল তিমি।
বৃহদাকার প্রাণীদের কথা আসবে, আর সেখানে তিমি অনুপস্থিত থাকবে, সেটা কী করে সম্ভব? কেউ কেউ তাই মনে করেন, তিমির মতো বৃহদাকার প্রাণীদের সন্ধান পাওয়াটাও হয়তো ডায়নোসরের উপকথা গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। প্রাচীনকালে মানুষজন যখন তিমির অস্থির সন্ধান পেতো, তখন এই প্রাণীটি সম্বন্ধে তাদের জানার সুযোগ ছিলো খুবই সীমিত। ফলে একদিকে সীমিত জ্ঞান, অপরদিকে বিশালাকার অস্থি- এই দুইয়ে মিলে মানুষের মনে তিমি সম্পর্কে ভয়ঙ্কর এক শিকারী প্রাণীর প্রতিচ্ছবি গড়ে তুলেছিল, যা থেকেও ড্রাগনের উৎপত্তি হতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।


(৪) গোয়ানাঃ


অস্ট্রেলিয়ান প্রাণী গোয়ানা।
অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে প্রায় ২৫ প্রজাতির গোয়ানার বসবাস, যেগুলো মনিটর লিজার্ড নামেও পরিচিত। বড়সড় শিকারী এই প্রাণীগুলোর রয়েছে ধারালো দাঁত ও থাবা। সেই সাথে স্থানীয় উপকথাগুলোতেও এদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। শুধু তা-ই নয়, বছরখানেক আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, তাদের দেহে বিষও উৎপন্ন হয়, যা আক্রান্ত প্রাণীর দেহে পরবর্তী সময়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। এসব থেকে ধারণা করা হয়, অন্তত অস্ট্রেলিয়ায় ড্রাগনের উপকথা জন্মের পেছনে প্রত্যক্ষ প্রভাব রেখেছে এই গোয়ানা।


(৫) মানবমনঃ


মানুষের বহুমাত্রিক কল্পনা।
দিনশেষে অবশ্য সন্দেহের তীর যদি মানুষের দিকেই তাক করা হয়, সেটাও বোধহয় খুব বেশি অযৌক্তিক হবে না, অন্তত ‘An Instinct for Dragons’ বইয়ের লেখক, নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড ই. জোন্স সেটাই মনে করেন। তার মতে, বিবর্তন মানুষের মনে শিকারী প্রাণী সম্পর্কে একটি সহজাত ভয়ের প্রবৃত্তি সৃষ্টি করে রেখেছে। তার হাইপোথিসিস অনুসারে, অজগর, শিকারী পাখিসহ বড় বড় শিকারী প্রাণীদের সম্পর্কে ভীতি দেখা যায় হোমিনিডদের বেলায়। সেই ভীতি মানুষের মন থেকে সঞ্চারিত হয়েছে বিভিন্ন উপকথায়, আর এর মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে আজকের ড্রাগনেরা।
ড্রাগনের আগমন নিয়ে আপনার অভিমত কী? উপরে বর্ণিত ৫টি কারণের মাঝে কোনটিকে আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়, এবং কেন? একটু সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করবেন কি?

ড্রাগনদের নিয়ে সিরিজের পরবর্তী পর্বে আবারও দেখা হবে আপনাদের সাথে। ততদিন পর্যন্ত… ড্রাকারিস…

Wednesday, August 8, 2018

কী হতো যদি নাৎসি বাহিনীর কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হতো?

AD
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর অন্যতম প্রধান ভুল ছিল হঠাৎ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করা, যার ফলে ইস্টার্ন ফ্রন্টে নাৎসিদের করুণ পরাজয়ের পাশাপাশি যুদ্ধের মোড়ও ঘুরে গিয়েছিল। সোভিয়েত রাজধানী পর্যন্ত নাৎসিদের হাত পৌঁছে গেলে হয়তো পশ্চিম ইউরোপে নাৎসিদের আধিপত্য আরো শক্তিশালী হতো, কিংবা হয়তো পার্ল হারবারও আক্রমণ করা হতো না।
'দ্য আনটোল্ড স্টোরি অফ ডি-ডে'-এর রচয়িতা প্রফেসর মার্ক মিলনার।
হিটলার যদি মস্কো নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো তবে কী হতে পারতো, তা নিয়েই এক সাক্ষাৎকারে আলোচনা করেছেন নিউ ব্রান্সউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের যুদ্ধ ও সমাজ বিভাগের পরিচালক প্রফেসর মার্ক মিলনার। দ্য ব্যাটল অফ দ্য আটলান্টিক বইটির জন্য ২০০৪ সালে সেরা সামরিক ইতিহাস রচনাকারী হিসেবে সিপি স্টেসি অ্যাওয়ার্ড পাওয়া এই অধ্যাপক সাম্প্রতিক সময়ে নরম্যান্ডির ঘটনা নিয়ে দ্য আনটোল্ড স্টোরি অফ ডি-ডে বইটি রচনা করেছেন। তার মুখ থেকেই শুনে নেওয়া যাক এই ‘কী হতো’ ঘটনাটি।

কী হতো যদি অপারেশন বারবারোসায় হিটলার মস্কো দখল করে ফেলতে পারতো?

হিটলার, অবশ্যই ভেবেছিল যে মাত্র ছয় থেকে দশ সপ্তাহের মধ্যেই পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নের দখল নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে এটি পুরোটাই ছিল অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফসল। তাছাড়া জার্মান গুপ্তচররাও সোভিয়েত রিজার্ভ বাহিনীর আসল সংখ্যাসহ আরো নানা বিষয়েই অজ্ঞ ছিল। যা-ই হোক, অলৌকিকভাবে নাৎসিরা যদি সোভিয়েত ইউনিয়নের দখল নিতে পারতো, তবে ঘটনাটি হয়তো অনেকটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো হতো, যেখানে জার্মানরা ইস্টার্ন ফ্রন্টে জয়লাভ করেছিল।

বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে রুশ জারের পতনের পর বলশেভিকরা জার্মানির সাথে শান্তিচুক্তি করে, এবং জার্মানরা পশ্চিম ফ্রন্টে মনোনিবেশ করে। যদি হিটলার মস্কোর উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারতো, তবে এরকমই কিছু হতো আর এরপরের ঘটনা যেকোনো কিছুই হতে পারতো।

তো সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর পূর্ণ দখল আনতে জার্মানির তখন কী করা উচিৎ ছিল? 

সোভিয়েতের উপর পূর্ণ জয়লাভ করাটাই আসলে বেশ একটু বিতর্কের ব্যাপার। মূল কথাটা হচ্ছে, মস্কোর ভূমিকাটা কী হতো? আরএইচএস স্টোলফি তার হিটলার’স পাঞ্জারস ইস্ট বইতে মতামত দিয়েছেন, অপারেশন বারবারোসাই ছিল পুরো বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা। তার মতে, ১৯৪১-এর আগস্টে জার্মানি যদি ইউক্রেনের দিকে গিয়ে লেনিনগ্রাদ অবরোধ করে, পরবর্তীতে মস্কো আক্রমণ করার পরিকল্পনার পরিবর্তে সরাসরি মস্কোতে আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করতো তবে হয়তো সোভিয়েতের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারতো। তো মূল প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে, “সোভিয়েত শাসকদের পতন ঘটাতে আসলে কী প্রয়োজন ছিল?”
জার্মানি ১৯১৭-১৮ সালে যা করেছিল, তখন ছিল সরকার পরিবর্তনের সময়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি মস্কোর ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি, তারা শুধুমাত্র কিয়েভ আর রিগার দখল নিয়েছিল, এবং এটুকুই প্রয়োজন ছিল জারের রাশিয়ার পতন ঘটাতে। বলশেভিকরাও ঝামেলা এড়াতে জার্মানির চুক্তি মেনে নিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সোভিয়েত শাসন সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্টালিন জনগণের উপর যেরকম প্রভাব ফেলতে পেরেছিল, জার দ্বিতীয় নিকোলাসের তেমন কিছু ছিল না। তাছাড়া, লেনিনগ্রাদে নাৎসিদের নৃশংসতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, নির্দয় স্টালিনের পতন দেখতে চাওয়া জনগণও বুঝতে পেরেছিল নাৎসিদের চেয়ে স্তালিনই মন্দের ভালো।
সরাসরি মস্কো আক্রমণ করলেও কি জার্মানি সোভিয়েতের পতন ঘটাতে পারতো?
আমার নিজস্ব মতামত হচ্ছে যে, নাৎসিরা কোনোভাবেই ১৯৪১ শেষ হওয়ার আগে মস্কো দখল করতে পারতো না। যদি নিতোও, তবুও ঠাণ্ডার সুযোগ নেওয়া সোভিয়েত প্রতি-আক্রমণে তা পুনরায় হাতছাড়া হয়ে যেত, যেমনটা হয়েছিল স্তালিনগ্রাদে ১৯৪২-৪৩ এ। এরপরেও কথা থেকে যায়, মস্কোর পতন মানেই রাশিয়ার পতন নয় যেমনটা হয়েছিল নেপোলিয়নের ক্ষেত্রে। নাৎসিরা যদি মস্কো দখল করে নিতোও, তবুও সোভিয়েতদের দেশে সীমিত রসদ নিয়ে টিকতে পারতো না। সোভিয়েত রিজার্ভ বাহিনীর আকার, সোভিয়েতদের মৃত্যুকঠিন প্রত্যয় আর তাদের বিশাল মানচিত্রটার কথাই ভাবুন।

অক্ষশক্তির কাছে রাশিয়ার পতন ঘটতে দেখলে মিত্রবাহিনী কী প্রতিক্রিয়া দেখাতো বলে আপনি মনে করেন?

এর অনেককিছুই নির্ভর করে এটি কোন সময়ে হচ্ছে, এবং ঐ সময়ে পৃথিবীতে আর কী কী ঘটছে। খেয়াল করে দেখুন, নাৎসিদের ঐ পরাজয়ের পরপরই কিন্তু জাপান পার্ল হারবার আক্রমণ করে, এবং আমেরিকানরা পুরোপুরিভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যদিও তারা ব্রিটিশদেরকে সাহায্য করে যাচ্ছিলো, কিন্তু ঐ আকস্মিক আক্রমণের কারণেই কিন্তু তারা পুরোদমে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর তখনই জার্মানি আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সুতরাং মস্কোর পতন হলেও জার্মানিকে ব্রিটেন আর আমেরিকার সাথে যুদ্ধ করতে হতো।
সাইবেরিয়ায় আক্রমণ না করে পার্ল হারবারে আক্রমণ করাই হয়তো অক্ষশক্তির অন্যতম বড় ভুল ছিল।
তবে একে অন্যভাবেও কল্পনা করা যায়, যেখানে আমেরিকাকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখা যেত। কল্পনা করুন, জাপান পার্ল হারবার আক্রমণ না করে সাইবেরিয়ার দিকে নজর দিলো। এদিকে একদিকে যেমন সোভিয়েতের পতন দ্রুত ঘটতো, অন্যদিকে আমেরিকাকেও যুদ্ধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যেত। সোভিয়েতরা সাইবেরিয়া থেকে তখনই সৈন্য সরিয়ে নিয়েছিলো, যখন তারা নিশ্চিত হয়েছিল যে সাইবেরিয়া দিয়ে জাপানের আক্রমণ করার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর সাইবেরিয়ায় রাখা সৈন্য দিয়েই পরবর্তীতে তারা পূর্ব ইউরোপে জার্মানির বিরুদ্ধে পুরোটা শক্তি কাজে লাগাতে পেরেছিল। রাশিয়ার পতন হলে এবং আমেরিকা যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়লে, ব্রিটেনের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই নিরাশাজনক হয়ে পড়তো।
এরকম পরিস্থিতিতে জার্মানি ব্রিটেনকে হয়তো একঘরে করে ফেলতে পারতো। মনে করে দেখুন, নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ করেছিল ইউরোপে ব্রিটেনের শেষ মিত্রকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য, যাতে করে ব্রিটিশরা যুদ্ধ করার আর কোনো উপায় না খুঁজে পেতে পারে। সুতরাং, এরকম একটা পরিস্থিতি কল্পনাই করা যায়, যেখানে হিটলার পুরো মহাদেশ দখল করে নিয়েছে, যেখানে শেষ বাধা একমাত্র ব্রিটেন। ইউ-বোট আর লুতওয়াফে বোম্বারগুলোর বিরতিহীন আক্রমণে ব্রিটেন হয়তো শেষমেশ সাদা পতাকা ওড়াতে বাধ্য হতো।

যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধক্ষেত্রে নামার পরেও কি অপারেশন বারবারোসার জয় প্রভাব রাখতো?

ধরে নেই, জাপানের পার্ল হারবার আক্রমণের পরও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছে, আমেরিকাও সম্পূর্ণভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতিটা অনেকটাই ১৯১৮ সালের মতো, যেখানে জার্মানরা ইস্টার্ন ফ্রন্টে জয়লাভ করেছে, এবং ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে পুরোপুরি মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু তারপরও তারা ব্যর্থ হয়েছিল যখন মার্কিন সৈন্যরা হানা দেওয়া শুরু করলো। ১৯৪২-৪৩ সালেও কী হতে পারে সেটা বেশ আগ্রহোদ্দীপক বিষয়। সোভিয়েতের পতন ঘটলেও ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে মিত্রবাহিনী নাৎসিদেরকে কি হারাতে পারতো?
এ নিয়ে বেশ বড় ধরনের বিতর্ক রয়েছে। একদিকে রয়েছে নরম্যান ডেভিসের (ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ) মতো ব্যক্তিরা, যারা মনে করেন যুদ্ধের বেশিরভাগটাই নির্ভরশীল ছিল ইস্টার্ন ফ্রন্টের ফলাফলের উপর, ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের যুদ্ধ ছিল নিছকই ছেলেখেলা ইস্টার্ন ফ্রন্টের তুলনায়। এবং যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর জয় নয় বরং সোভিয়েত ইউনিয়নের জয়ই বেশি প্রভাব রেখেছিল।
সম্পূর্ণ ইউরোপের দখল নিতে পারলেও জার্মানিকে হারতে হতো পারমাণবিক বোমার আঘাতে।
অন্যদিকে ফিলিপস ও’ব্রায়েনসহ (মার্কিন ইতিহাসবিদ) অন্যান্যদের মতে, সোভিয়েতের পতন ঘটলেও নাৎসিদেরকে হারানো মিত্রবাহিনীর জন্য খুব একটা কঠিন হতো না। আমার নিজস্ব মতামত এই দুই মতের মাঝামাঝি। ইস্টার্ন ফ্রন্টে নাৎসিরা জয়লাভ করলে পুরো ইউরোপকে তারা একটি শক্তিশালী দুর্গের মতো বানিয়ে রাখতো, যার ফলে মিত্রবাহিনীর আক্রমণগুলো নস্যাৎ হয়ে যেত।    
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ফ্রান্সে কোনো পদাতিক বাহিনী না থাকা মিত্রবাহিনীর জন্য বেশ বড় একটা বাধা ছিল। এ অবস্থায় হয়তো চ্যানেল আর ভূমধ্যসাগর দিয়ে আক্রমণই ছিল মিত্রবাহিনীর একমাত্র ভরসা। ও’ব্রায়েনের যুক্তির একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো, তিনি মনে করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেশিরভাগটাই হলো আকাশযুদ্ধ। এবং ১৯৪২-৪৩ এর সময়ে মিত্রবাহিনী আকাশপথে নাৎসিদেরকে পরাস্ত করে জার্মানিতে বোমাবর্ষন করা শুরু করেছিলো। এ অবস্থায় নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে গ্র্যাউন্ড ওয়্যারে নামতে মিত্রবাহিনীর কয়েক বছর লেগে যেত, কিন্তু আকাশপথে তারা ক্রমেই যুদ্ধ চালিয়ে যেত। বোম্বারের আক্রমণে জার্মান শহরগুলো ধ্বংস হলেও বাস্তবে জার্মানরা কিন্তু তখনো পুরো ইউরোপ নিয়ন্ত্রণ করছে।
অবশেষে ১৯৪৫ সালে মার্কিনদের হাতে পারমাণবিক বোমা আসার পর জার্মানদের অবস্থাও হয়তো জাপানীদের মতো হতো। বার্লিন, মিউনিখের পরিণতিও হয়তো হিরোশিমা আর নাগাসাকির মতো হতো। তবে জাপানীদের তুলনায় অনেক বেশি এলাকা আর সম্পদ থাকায় নাৎসিদেরকে সম্পূর্ণভাবে গুড়িয়ে দিতে আরো বেশি বোমার প্রয়োজন হতো মিত্রবাহিনীর।

Monday, January 8, 2018

হাজারো কল্পনার আটলান্টিস শহর: রহস্যের শুরু কখন থেকে?

AD
এই বিশ্বের মানুষের কাছে আজও এক রহস্যময় নগরীর নাম আটলান্টিস। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এখনো শহরটির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। শহরটির অস্তিত্ব ছিল, নাকি তা শুধুই কবির কল্পনা- তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর। এই নগরকে নিয়ে লেখা হয়েছে কত গল্প-কবিতা-উপন্যাস! বিজ্ঞানী ও গবেষকদের দল এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই অজানা শহরটিকে। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত সমাধান না হওয়া যত রহস্য আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো এই আটলান্টিস।

কীভাবে জন্ম নিলো আটলান্টিস উপাখ্যানঃ

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর লেখা থেকেই প্রথম জানা যায় আটলান্টিস শহরের কথা। 'টিমেউস''ক্রিটিয়াস' নামে প্লেটোর দুটি ‘ডায়ালগ এ আটলান্টিসের উল্লেখ পাওয়া যায়। ৩৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ দার্শনিক প্লেটো তার শিষ্যদের নিখুঁতভাবে এই নগরটির কথা বলে গেছেন।
গ্রিক দার্শনিক প্লেটো।
প্লেটো তার লেখায় জানিয়েছেন যে, আটলান্টিসের কথা প্রথম জানতে পারেন গ্রিক মহাজ্ঞানী সোলোন। মহাজ্ঞানী সোলোন তথ্যটি আবার মিশরীয় এক ধর্মযাজকের কাছ থেকে পান। মিশর থেকে ফিরে এসে সোলোন তার এক আত্মীয় ড্রপাইডসের কাছে আটলান্টিসের গল্পটি বলেন। পরম্পরায় গল্পটি ড্রপাইডস তার সন্তান, তার প্রপৌত্র ক্রিটিয়াস গল্পটি প্লেটোর কাছে ব্যক্ত করেন।

আটলান্টিস নামকরণের কারণঃ

সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন।
অনেকে মনে করে থাকেন, আটলান্টিক মহাসাগরের কাছে অবস্থিত হওয়ায় নগরটির নামকরণ হয়েছিল আটলান্টিস। প্লেটোর বর্ণনা অনুযায়ী, সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন ছিলেন আটলান্টিসের রাজা। তার স্ত্রী ক্লিওটার ছিলেন খুব সুন্দরী। দ্বীপের ঠিক মাঝখানে পাহাড়ের মাথায় স্ত্রীর জন্য এক অপরূপ প্রাসাদ তৈরি করেন পোসাইডন। তাদের ছিল পাঁচ জোড়া যমজ সন্তান। সমুদ্র দেবতা তার দশ সন্তানকে দ্বীপের বিভিন্ন অংশ শাসনের ভার দিলেন। তার বড় যমজ সন্তানের একজন এটলাসকে দ্বীপের একটি অংশের শাসনের ভার দিলেন। তার নামানুসারে দ্বীপের সেই অংশের নাম হয় আটলান্টিস। পরে এটলাস পুরো দ্বীপ এবং সমুদ্রের চারপাশের অঞ্চল নিজের অধিকারে নিয়ে নেন। এরপরেই পুরো দ্বীপের নাম তার নামে হয়ে যায় আটলান্টিস।

প্লেটোর বর্ণনায় কেমন ছিল আটলান্টিস?

প্লেটোর লেখা থেকে জানা যায়, আটলান্টিস ছিল এক স্বর্গোদ্যান। তা ছিল এক ‘সব পেয়েছি’র দেশ। অত্যন্ত উর্বর ছিল সেখানকার মাটি, সেখানে রকমারি ফসল ফলাতো কৃষকরা। আর তাতে ফলতো নানা ফলমূল, শাকসবজি। প্রচুর পরিমাণে ফসল ফলতো বলে নগরীতে কোনো অভাব ছিল না। মনমাতানো গন্ধে ভরা রং-বেরঙের সুন্দর ফুলে ভরে থাকতো সবুজ এই রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। পাহাড়, সমুদ্র আর অরণ্যে ঘেরা অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই রাজ্যে সোনা, রূপো, তামা  ইত্যাদি খনিজ সম্পদেরও কোনো অভাব ছিল না। সেচ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত উন্নত। দিগন্ত ‍বিস্তৃত ফসলের মাঠ পেরিয়ে নীলচে পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল কৃষকদের বাড়ি।
কবির কল্পনায় আটলান্টিস শহর।
আটলান্টিস নগর ঘিরে ছিল সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ, বন্দর, মন্দির। সোনা ও রূপার কারুকার্যে ভরা সুন্দর সুন্দর অট্টালিকা। আর ছিল এক সমুদ্র দেবতার মূর্তি। রাজধানীটি ছিল এক সবুজে ঘেরা পাহাড়ের চূড়ায়। সেই পাহাড়ের চারিদিক ঘিরে ছিল বেশ কয়েকটি পরিখা। পরিখাগুলো আবার পরস্পরের সাথে খাল দিয়ে যুক্ত ছিল। বাইরের পরিখাটি খাল দিয়ে যুক্ত ছিল সমুদ্রের সাথে। সমুদ্রপথে বিভিন্ন দেশ ও রাজ্যের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য এ খালগুলো ব্যবহার করা হতো।
নগরীর বাড়িগুলোতে ছিল আধুনিক সব ব্যবস্থা। দামি ধাতুর কাজ করা পাথরের দেওয়াল, বিশাল বিশাল সব সোনার মূর্তি, গরম আর ঠাণ্ডা জলের ঝরণা, আরো সব নানা মজার জিনিস। এই উন্নত রাজ্যে ছিল এক সুগঠিত বিশাল সেনাবাহিনী। প্লেটোর অনবদ্য বর্ণনায় শহরটি আশ্চর্যভাবে যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। এ থেকে অনুমান করা যায়, আটলান্টিসের লোকজনের মধ্যে কেউ কেউ দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, স্থপতিও ছিলেন।
কল্পনার মানচিত্রে আটলান্টিস নগর।
কিন্তু অনেক গবেষকই এ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, প্লেটো যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার সময়েরও নয় হাজার বছর আগে প্রস্তর যুগের শুরুর দিকে এরকম উন্নত বুদ্ধিদীপ্ত নৌশক্তিসম্পন্ন সভ্যতা পৃথিবীর বুকে গড়ে ওঠা সত্যিই অকল্পনীয়।

কীভাবে বিলুপ্ত হলো এই নগরী?

প্লেটোর বর্ণনানুযায়ী, যিশু খ্রিস্টের জন্মের ১,৫০০ বছর আগে এই নগরীর বিলুপ্তি ঘটে। এ নগরের ধ্বংস হওয়া নিয়ে প্লেটো বলেছেন, পোসাইডন তার দশ ছেলেকে দেশটির একেক অংশ শাসনের ভার দেন। এমনিতে বেশ শান্তিই ছিল। কিন্তু ক্রমশই দশজনের মধ্যে বিরোধ বাড়তে লাগল। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের রাজ্যের সীমা বাড়াতে চাইল। আটলান্টিসের নির্মল আকাশে লোভ আর হিংসার ছায়া পড়ল। স্বর্গের জিউস তখন ঠিক করলেন, এদের শিক্ষা দিতে হবে। সেজন্যই দেবতাদের ডেকে তড়িঘড়ি করে এক সভার আয়োজন করলেন তিনি। প্লেটো ঠিক এখানটায় তার গল্প শেষ করে দিলেন। তারপর আর কী হলো তা আর জানা গেল না। কিন্তু অনেকে এই গল্পের পরিসমাপ্তি টানেন এই বলে যে, স্বর্গের দেবতা জিউসের রোষানলে পড়ে এই নগরী ধ্বংস হয়ে যায়।
স্বর্গের দেবতা জিউস।
কিন্তু পরবর্তীতে অনেক গবেষকই আটলান্টিসের ধ্বংস হওয়া নিয়ে নানা মত রেখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রিক পুরাতাত্ত্বিক অ্যাঞ্জেলোস গ্যালানোপুলোসের অভিমত। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষে তার তত্ত্বটি প্রকাশ পেলে চমকে গিয়েছিলেন সবাই। তিনি বললেন, ১,৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ এক ভয়ানক আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছিল ভূমধ্যসাগরের সান্তোরিনি দ্বীপে। আগ্নেয়গিরির হঠাৎ জেগে ওঠা ও তার দরুণ এক ভয়াবহ ভূমিকম্প ও প্রবল জলোচ্ছাসের সৃষ্টি হয় পুরো নগর জুড়ে। ফলে এক রাতের মধ্যে আটলান্টিক মহাসাগরের নীচে তলিয়ে যায় এই শহর। আর সেই সাথে মুছে যায় এক উন্নত সভ্যতার যত চিহ্ন।
আটলান্টিসের ধ্বংসের পিছনে প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রধান কারণ বলে অনেকে মনে করেন।
টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া সমুদ্র গবেষক রবার্ট বালার্ডের মতে, আটলান্টিসের এই ধ্বংসের তথ্যটি সঠিক হতে পারে। কারণ, ইতিহাসের এই সময়টায় বড় ধরনের বন্যা এবং আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের তথ্য পাওয়া গেছে।

কোথায় ছিল আটলান্টিস?

আটলান্টিস নগরটি কোথায় ছিল তা নিয়ে জল্পনার কোনো শেষ নেই। আটলান্টিসের খোঁজে অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর অনুসন্ধান চলেছে এবং এখনো চলছে। তবে এখনো এর প্রকৃত অবস্থান কোথায় ছিল তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানকে হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু তার পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ তারা তুলে ধরতে পারেননি। অনেকের বিশ্বাস, গ্রিক দ্বীপ ক্রিটের কাছাকাছি ছিল আটলান্টিস।
অনেকের ধারণা, সমুদ্রের নিচে কোথাও এখনো রয়েছে সেই কল্পনার নগরী।
তবে কোনো কোনো গবেষকের মতে, গ্রিসের সান্তোরিনি শহরটিই হচ্ছে অ্যাটলান্টিস। আবার কারো মতে, বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার কাছে, কারো ভাবনায় আফ্রিকায়ও নাকি থাকতে পারে আটলান্টিস। কারো কারো মতে, আটলান্টিস গ্রিক পুরাণের শহর টান্টালিসও হতে পারে। কারণ হিসাবে শোনা যায়, জিউস রেগে গিয়ে বজ্রপাত করেন টান্টালিসের উপরেও। আবার ফ্লোরিডার উপকূলে বিমিনি দ্বীপের পাশে দিয়ে হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিসের একটি পথের অস্তিত্ব রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
আটলান্টিক মহাসাগরের নীচে হারিয়ে গেছে সেই স্বপ্নের নগর।
তবে প্লেটোর দেয়া তথ্যমতে, আটলান্টিক মহাসাগর থেকে উৎপত্তি হওয়া একটি দ্বীপই হচ্ছে আটলান্টিস। বলা হয়ে থাকে, হারকিউলিস পিলার নামে এক ছোট দ্বীপের অস্তিত্ব ছিল তার পাশে। বর্তমানে তা জিব্রাল্টার প্রণালী হিসেবে পরিচিত। তাই অনেকে মনে করে থাকেন, জিব্রাল্টার প্রণালীর কাছাকাছি কোথাও ছিল আটলান্টিস শহরটি।
১৯৬৮ সালে এগার ক্যাচি তার বই ‘On Atlantis’ এ উল্লেখ করেন, মিশরের নীলনদ এবং স্ফিংস এর মূর্তির মাঝে হল অব রেকর্ডস যেখানে আবিষ্কৃত হয়েছে, সেখানেই পাওয়া যেতে পারে আটলান্টিসের ধ্বংসাবশেষ।
স্পেনের ডোনা ন্যাশনাল পার্কের সোয়াম ফরেস্টের নীচে আটলান্টিসের খোঁজ পাওয়া যাবে বলে ধারণা করছেন প্রত্নতত্ত্ববিদ রিচার্ড ফ্রেউন্ড ও তার দল।
২০১১ সালে হাটফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ রিচার্ড ফ্রেউন্ড ও তার দল কয়েকটি শহরের সন্ধান পান যেখানে আটলান্টিস নগরটি ছিল বলে মনে করা হয়। স্পেনের এক শহর কাদিজের উত্তরে ডোনা ন্যাশনাল পার্কের সোয়াম্প ফরেস্টের নীচে এই শহরগুলো খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে আটলান্টিসের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে কোনো গবেষকই এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি।

আটলান্টিস কল্পনা নাকি সত্যি?

আটলান্টিস নিয়ে প্লেটোর এই কাহিনী কোনো পৌরাণিক কল্পকাহিনী অনুপ্রাণিত কিনা তার ব্যাপারে ইতিহাসবিদরা এখনো একমত হতে পারেননি। তবে ক্রিটিয়াস দাবি করেছিলেন যে, মহাজ্ঞানী সোলোনের কাছ থেকে তিনি এই গল্পটি জানতে পারেন। সোলোন ছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের এথেন্সের বিখ্যাত নীতিনির্ধারক। অনেক পণ্ডিত মনে করেন, তিনি যখন মিশরে যান, সেখানে প্রাচীন কিছু পুঁথি থেকে এথেন্স এবং আটলান্টিস সম্পর্কে জানতে পারেন।
শিল্পীর তুলিতে আঁকা আটলান্টিস নগরী।
তবে আরেক পক্ষ মনে করেন, প্লেটো প্রাচীন কিছু যুদ্ধের কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আটলান্টিসের এই কাহিনীটি রচনা করেন। অনেকেই মনে করেন, আটলান্টিস প্লেটোর কল্পনায় বোনা এক নগর সভ্যতা, যা তিনিই সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তার ধ্বংস করেছেন। তবে, পৃথিবীর অধিকাংশ সংস্কৃতিতেই ‘হারানো সভ্যতার’ উপকথা প্রচলিত রয়েছে। তাই অনেক পণ্ডিতই এসব উপকথার ভিত্তি রয়েছে বলে মনে করেন। তাই কিছু গবেষক আটলান্টিসের বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। আর তাই আটলান্টিস নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

Saturday, November 25, 2017

অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের আসক্তিতে যে ৫টি ক্ষতি হতে পারে!

AD
সব কিছুরই আছে ভালমন্দ। যে স্মার্টফোন ছাড়া আমাদের এক মুহূর্তও চলে না, তার বেলায়ও কথাটা সত্য। এই স্মার্টফোন যেমন ভাল বন্ধু হতে পারে, তেমনই মারাত্মক ক্ষতিও করতে পারে। অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো কী─

(১) শ্রবণ শক্তি কমতে পারেঃ



স্মার্টফোন কান থেকে দূরে রেখে তো আর ব্যবহার করা যায় না। ফলে বেশি সময় কানে ফোন রেখে কথা বললে সমস্যা তৈরি হয়। তুলনায় হেডফোন ব্যবহার করা ভাল। আবার হেডফোন ব্যবহার করে খুব জোরে গান শুনলে কানের ভিতরের কোষে তার প্রভাব পড়ে এবং মস্তিষ্কেও সমস্যা হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, বধির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

(২) অস্থি-সন্ধির ক্ষতিঃ



অতিরিক্ত সময় ধরে মেসেজ টাইপ করা হলে আঙুলের জয়েন্টগুলোতে ব্যথা হতে পারে এবং অবস্থা বেশি খারাপ হলে আর্থরাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেকে কাজের সময় কাঁধ ও কানের মাঝে ফোন রাখেন। অতিরিক্ত ঝুঁকে বসে দীর্ঘ সময় ধরে মেসেজ পাঠান। এ সবই শরীরে বিভিন্ন অস্থি-সন্ধির ক্ষতি করে। পাকাপাকি ক্ষতি হতে পারে শিরদাঁড়ায়।

(৩) নিদ্রাহীনতাঃ



স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ডেস্কটপের অতিরিক্ত ব্যবহার ও অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখার ফলে সবচে বেশি দেখা দেয় ঘুমের সমস্যা বা নিদ্রাহীনতা। যারা ঘুমাতে যাওয়ার আগে এ ধরনের প্রযুক্তিপণ্য অতিমাত্রায় ব্যবহার করেন তাদের শরীরে মেলাটোনিনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যার কারণ প্রযুক্তিপণ্য থেকে নির্গত উজ্জ্বল আলো। এক পর্যায়ে ঘুমের মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয় এবং স্লিপ ডিজঅর্ডারের ঝুঁকি তৈরি হয়।

(৪) চোখের জ্যোতি কমতে পারেঃ



খবরের কাগজ বা বই পড়ার ক্ষেত্রে সাধারণত চোখ থেকে গড়ে ৪০ সেন্টিমিটার দূরত্ব থাকে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা সাধারণত চোখ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্ব রেখে তা ব্যবহার করেন। অনেকের ক্ষেত্রে এ দূরত্ব মাত্র ১৮ সেন্টিমিটার। এতে করে মায়োপিয়া বা ক্ষীণ দৃষ্টির সমস্যা দেখা দিতে পারে।

(৫) ঘনত্ব কমে শুক্রাণুরঃ


গবেষকেরা জানান, মুঠোফোন থেকে হাই ফ্রিকোয়েন্সির ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন নির্গত হয়। এই ক্ষতিকর তরঙ্গের সঙ্গে মস্তিষ্কে ক্যানসারের যোগসূত্র থাকতে পারে। এ ছাড়া শরীরের অন্য কোষকলা এই ক্ষতিকর তরঙ্গের প্রভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে পুরুষের প্রজননতন্ত্রেরও। গবেষকেদের দাবি, মুঠোফোন থেকে নির্গত ক্ষতিকর তরঙ্গ শুক্রাণুর ওপর প্রভাব ফেলে এবং শুক্রাণুর ঘনত্ব কমিয়ে দিতে পারে।

Sunday, October 15, 2017

দুনিয়া কাঁপিয়ে দেয়া ৯টি ছবি!

AD
বলা হয়ে থাকে, একটি ছবিতে যা প্রকাশ করা যায় তা হাজার লাইন লিখেও করা যায় না। কিছু ছবি মানুষকে হাসায়, কিছু বিষণ্ণ করে, কিছু হয়তো আতঙ্কগ্রস্তও করে। কিন্তু এরকম কিছু ছবি আছে যা মন ছুঁয়ে যায়, কাঁদতে বাধ্য করে একজন মানুষকে। আপনার হৃদয়কে কিছুটা নাড়া দিবে হয়ত মাত্র এই কয়েকটা ছবি। চলুন দেখে নেয়া যাক ছবিগুলো।


(১) ভূপালের গ্যাস ট্রাজেডিঃ

ছবি-১
১৯৮৪ সালে ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভূপালে একটি কীটনাশক তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণ ঘটলে বিষাক্ত মিথাইল আইসোসায়ানাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৫ লাখ ৫৮ হাজার ১২৫ জন মানুষ আহত হন এবং নিহত হন প্রায় ১৫ হাজারের মত মানুষ। ফটোসাংবাদিক পাবলো বার্থোলোমিউ দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ ছবিটি তারই তোলা যা দুর্ঘটনায় নিহত শিশুটিকে মাটিতে সমাহিত করার আগ মূহুর্তে তোলা হয়।

(২) রানা প্লাজায় ধসঃ

ছবি-২
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলে সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনায় মুহূর্তেই মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে শোক এবং উৎকণ্ঠা। ধ্বংসস্তূপ থেকে আহত-নিহত মানুষদের বের করে আনার পুরো প্রক্রিয়াটা চলেছে দিনের পর দিন। আর তার মাঝে দিয়ে আমরা সবাই একটু একটু করে উপলব্ধি করেছি নিদারুণ সেই বিভীষিকা। ব্যাপারটি এতই গুরুতর যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের মানুষের কাছে এর সংবাদ চলে যায়, সেই সাথে এই ধ্বংসস্তূপ থেকে তোলা বিভিন্ন ছবি। যেমন, তাসলিমা আখতারের তোলা প্রচ্ছদের এই ছবিটি। দুইজন মানুষের পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে বেঁচে থাকার যে ভীষণ আকুতি উঠে এসেছে এই ছবিতে, শত বলেও তা ব্যাখ্যা করা যাবে না। কি করে মৃত্যু হলো তাদের? তারা কি একজন আরেকজনকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন? কেমন ছিলো তাদের জীবন, তাদের স্বপ্ন? না জানি কী ভীষণ ভালোবাসায় মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে পরস্পরকে আঁকড়ে ধরেছিলেন তারা! পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখনো আলোচিত হয়ে যাচ্ছে মর্মস্পর্শী এই নিদারুণ করুন ছবিটি।

(৩) ক্যান্সারে আক্রান্ত ছোট্ট মেয়েটিঃ

ছবি-৩
এ ছবিটি একটি ছোট মেয়ের, যে কিনা ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিল। কেমোথেরাপির কারণে তার মাথার চুল সব পড়ে যায়। আয়নাতে কি মেয়েটি তার মনের ইচ্ছাটুকুই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছিল? মেয়েটি এখনো বেঁচে আছে কিনা আমাদের জানা নেই।

(৪) মানুষ মানুষের জন্যঃ

ছবি-৪
উগান্ডাতে ১৯৮০ সালে চলছিল প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ। অনাহারের শিকার এক শিশুর হাত পরম মমতায় ধরে রেখেছেন দাতব্য সংস্থার একজন কর্মী। মর্মস্পর্শী এ ছবিটি তুলেছেন মাইক ওয়েলস।

(৫) প্রিয় শিক্ষকের জন্য বেদনার সুরঃ

ছবি-৫
ডিয়েগো ফ্র্যাজাও টোরকোয়াটো নামে ১২ বছরের এই ব্রাজিলিয়ান ছেলেটি তার প্রিয় শিক্ষকের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে ভায়োলিন বাজাচ্ছে, চোখে বেয়ে ঝরে পড়ছে তীব্র কষ্টের অশ্রু। সেই শিক্ষক ছোট এ ছেলেটিকে সঙ্গীতের সাহায্যে দারিদ্র ও সংঘাত থেকে মুক্তি পেতে সহযোগিতা করেছিলেন।

(৬) ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে পড়ন্ত মানুষঃ

ছবি-৬
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলায় বিধ্বস্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার। পুরো ভবনে আগুন ধরে গেলে অনেকেই নিচে ঝাঁপ দেন জীবন বাঁচানোর আশায়। সেরকমই এক হতভাগ্য ব্যক্তির ছবি তুলেন এপি’র আলোকচিত্রশিল্পী রিচার্ড ড্রিউ। বলাই বাহুল্য যে মানুষটি বাঁচাতে পারেন নি নিজের জীবন।

(৭) থাইল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যাঃ

ছবি-৭
থাইল্যান্ডের নির্বাসিত স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল থামম কিটিকাচর্নের দেশে ফিরে আসার কথা শুনে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠে পুরো থাইল্যান্ড। থামাসাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভরত ছাত্রদের উপর গণহত্যা চালানো হয় ১৯৭৬ সালের ৬ অক্টোবর। বহু ছাত্রকে গুলি করে, পিটিয়ে বা আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। সেরকমই একটি ঘটনার ছবি তুলেছেন নীল ইউলেভিচ, যেটা ১৯৭৭ সালে পুলিৎজার প্রাইজ পায়।

(৮) সুদানের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ১৯১৩ঃ

ছবি-৮
বিশ্ববিখ্যাত ও একইসাথে প্রবল সমালোচিত এ ছবিটি ১৯৯৩ সালে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আর এর মাধ্যমেই আলোতে আসেন আলোকচিত্রশিল্পী কেভিন কার্টার। সুদানের দুর্ভিক্ষের সময় তোলা এ ছবিটি ১৯৯৪ সালে জিতে নেয় পুলিৎজার পুরস্কার। এতে দেখা যায়, দুর্ভিক্ষে খেতে না পেয়ে জীর্ণ-শীর্ণ একটি শিশু মাটিতে মূমুর্ষ অবস্থায় পড়ে আছে, আর খুব কাছেই একটি শকুন বসে আছে। যেন কখন শিশুটি মারা যাবে ও এটা শিশুটিকে খেয়ে ফেলতে পারবে তারই অপেক্ষা। ছবিটি ভয়াবহ বিতর্ক তৈরি করে। কথা উঠে যে, ছবি তুলে শিশুটিকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টা কেভিন করেছিলেন কি না? কেভিনের নিজেরও মনে হতে শুরু করে যে, তিনি হয়তো চাইলে শিশুটিকে বাঁচাতে পারতেন। তীব্র মানসিক যন্ত্রণা থেকে ১৯৯৪ সালে তিনি আত্মহত্যা করেন। যদিও শিশুটি সেসময় মারা যায় নি, আরো বেশ কিছুদিন বেঁচে ছিল। নিয়ং কং নামের ছবির ছেলেটি মারা যায় ২০০৭ সালে।

(৯) যখন সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়ঃ

ছবি-৯
১৯৮৫ সালে কলম্বিয়াতে আরমেরো নামে ছোট গ্রামের পাশেই নেভাদো দেল রুইজ নামে আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। পুরো গ্রামের উপর এর প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ। এতে ব্যপক ভূমিধ্বসের সৃষ্টি হয়। অমায়রা স্যানচেজ নামে ১৩ বছরের এই মেয়েটি একটি বিধ্বস্ত ভবনের নিচে আটকা পড়ে। উদ্ধারকর্মীদের সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে টানা ৬০ ঘণ্টা আটকে থাকার পর সে মারা যায়।