Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts

Friday, October 5, 2018

ড্রাগনকাহিনী : যেভাবে মানবসভ্যতায় আগমন ঘটেছিলো আগুনমুখো ড্রাগনদের।

আমাদের শৈশবের স্মৃতিগুলোকে অল্প যে ক’টি জিনিস অতিরিক্ত মাত্রায় রাঙিয়ে তুলতে পেরেছিলো, রুপকথার গল্প সেগুলোর মাঝে অন্যতম। আমাদের এই উপমহাদেশীয় রুপকথার গল্প দিয়ে শুরু হয় সেই যাত্রা, যেখানে মিশে থাকে ভূত-প্রেত-দৈত্য-দানো-শাকচুন্নির মতো কাল্পনিক চরিত্রগুলোর সাথে রাজপুত্রের যুদ্ধজয়, থাকে সাধারণ কোনো মানুষের অসাধারণ বুদ্ধির জোরে সেসব প্রেতাত্মার হাত থেকে বেঁচে যাবার বুদ্ধিদীপ্ত কাহিনী প্রভৃতি।
টিভি সিরিয়ালে দেখা ড্রাগন।
একটু বড় হলে, এবং সেই সাথে আগ্রহ টিকে থাকলে, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের নানা রুপকথার বইও পড়া শুরু করে অনেকে। তখন চীনা, জাপানী, মিশরীয়, গ্রিক, রোমান, নর্স, রুশী, আফ্রিকান রুপকথার বইতে ভরে যেতে থাকে আমাদের বইয়ের তাক, ডানা মেলতে থাকে আমাদের কল্পনার প্রজাপতি, রঙিন থেকে রঙিনতর হয়ে উঠতে থাকে আমাদের শৈশব-কৈশোর।
ঠাকুমার ঝুলি রাঙিয়ে তুলেছিল আমাদের অনেকের শৈশবকেই।

বিদেশী রুপকথাগুলোর যেসব প্রাণী আমাদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে, ড্রাগন নিঃসন্দেহে এর মাঝে শীর্ষস্থানীয়। কী এক বিচিত্র রকমের শক্তিশালী প্রাণী। বিশাল তার দেহ, যা দেখলেই পিলে চমকে যায়, যার ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায় বিশাল একটি এলাকা। আছে বিশাল দুটি ডানা, যার ঝাপ্টায় ভেঙে পড়ে বাড়িঘর, মারা পড়ে অগণিত মানুষ। লেজে থাকে বড় বড় কাটা, যার একটি ধাক্কা নিমিষে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয় তার সাথে লড়াই করতে আসা মানুষগুলোকে। আছে সারা গায়ে পুরু চামড়া ও আঁশের আস্তরণ, যার সামনে অচল হয়ে পড়ে প্রচলিত প্রায় সব অস্ত্র, অসহায় হয়ে পড়ে শত শত দক্ষ যোদ্ধাও। নিঃশ্বাসে যার বের হয় কালো ধোঁয়া, যে ধোঁয়া মনকেও ভয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

আর আছে মুখ থেকে বের হওয়া লেলিহান আগুনের শিখা, চরম ক্রোধের মুহূর্তে যার নিঃসরণ পাল্টে দিতে পারে গোটা যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি, পুরো রণাঙ্গনকে পরিণত করতে পারে নরকেরই ছোটখাট একটি অগ্নিকুণ্ডে। ড্রাগন এমনই ভয়ানক এক প্রাণী। তবে মানবজাতির সৌভাগ্য, যে প্রাণীকে তারা এত ভয়াবহ রুপে সাজিয়েছে, সেই প্রাণী কেবল তাদের কল্পনাতেই থেকে গেছে। বাস্তবে সে আসলে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারতো, তা বোধহয় না বললেও চলে!
শিল্পীর কল্পনায় ফুটে ওঠা ড্রাগন।
একেক সংস্কৃতিতে এই ড্রাগন এসেছে একেক রুপ নিয়ে। কোথাও বেশ সদাশয়, কোথাও আবার বেশ ভয়াবহ এক প্রাণী হিসেবে। তবে উভয়ক্ষেত্রেই তাকে হত্যা করা ছিলো বেশ দুরূহ একটি ব্যাপার। এটা সেই এলাকার ভৌগলিক অবস্থানের উপরও নির্ভর করতো। প্রাচ্যের সংস্কৃতিতে ড্রাগনদেরকে দেখা যায় বেশ জ্ঞানী এক সত্ত্বা হিসেবে, সমুদ্র ও পানির উপর যাদের রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। এর পাশাপাশি ড্রাগনকে সাধারণ মানুষের প্রতি বেশ দয়ালু হিসেবে দেখার রীতিও দেখা যায় এখানে, যাদের প্রভাবে দূর হয়ে যায় যাবতীয় অপপ্রভাব।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে আবার ড্রাগন এসেছে পুরোপুরি বিপরীত রুপে। এখানে সে বিশালদেহী, ভয়ানক এক প্রাণী, যে কি না হত্যা, ধ্বংসেই মত্ত থাকে সারাদিন। তার বাস এমন দুর্গম, অন্ধকারাচ্ছন্ন, বিপজ্জনক স্থানে, যেখানে যেতে মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। তবে এই ড্রাগনরা একটি কাজ করতো। তারা ছিলো বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির পাহারাদার।
শিংওয়ালা ড্রাগন।
প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য, যে সংস্কৃতির কথাই বলা হোক না কেন, উভয়ক্ষেত্রেই মধ্যযুগের আগপর্যন্ত ড্রাগনের কোনো ডানা গজায়নি! অর্থাৎ, তখন পর্যন্ত গল্পকারেরা ড্রাগনের ডানা জুড়ে দেননি। এই সময়কাল থেকে পাশ্চাত্যের ড্রাগনগুলোকে ডানাওয়ালা হতে দেখা যায়, অন্যদিকে প্রাচ্যের ড্রাগনগুলো আগের মতোই থেকে যায়, অর্থাৎ ডানাবিহীন।
ড্রাগন নিয়ে উপকথারও কমতি নেই। বিশালাকায় এই প্রাণীটির রক্তের কথাই ধরা যাক না। বিভিন্ন উপকথায় এসেছে, কেউ যদি ড্রাগনের রক্তে ডুবানো ছুরি বা তলোয়ার দিয়ে কাউকে আঘাত করে, তবে আহত ব্যক্তির ক্ষত কখনোই সারবে না। এটা তো গেলো ড্রাগনের রক্তের খারাপ দিক। আবার এর ভালো দিকও আছে। এই রক্ত নাকি একজন মানুষকে ভবিষ্যতে দেখার ক্ষমতাও দিতে পারতো। প্রাচ্যের ড্রাগনগুলো আবার ইচ্ছেমতো তাদের আকার পরিবর্তন করতে পারতো, এমনকি চাইলে ধারণ করতে পারতো মানুষের আকৃতিও!
গেম অফ থ্রোন্স টিভি সিরিজের একটি পর্বে ড্রাগনের আক্রমণে পুড়ে ছারখার শত্রুশিবির।
কালে কালে গল্পকারদের হাতে পড়ে ড্রাগন যে কোথা থেকে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, উপরের লেখা পড়ে তার কিছুটা হয়তো অনুমান করা যায়। এই সিরিজের পরবর্তী পর্বগুলোতে এই সম্পর্কে আরো আলোকপাত করা হবে। কিন্তু, একেবারেই কাল্পনিক একটি প্রাণী বিশ্বব্যাপী মানুষের মনে জায়গা করে নিলো কীভাবে- কখনো কি এই প্রশ্নটি আপনার মনে উঁকি দিয়েছে? ড্রাগনের নানা কাহিনী গল্পের বইয়ে পড়ে, কিংবা হাল আমলে অত্যন্ত জনপ্রিয় গেম অফ থ্রোন্স টিভি সিরিজে ডেনেরিস টার্গারিয়েন ‘ড্রাকারিস’ বলামাত্র আগুনের লেলিহান শিখায় সবকিছু ছারখার করে দেয়া ড্রাগন প্রকৃতপক্ষে কোথা থেকে আসলো, সেই প্রশ্ন কি আপনাদের মনের জানালায় কখনো টোকা দিয়ে যায়নি?
দেরি না করে চলুন তাহলে ড্রাগন নিয়ে শুরু হওয়া আমাদের এই উপকথাভিত্তিক সিরিজের প্রথম পর্বে সেই ইতিহাসেরই অনুসন্ধান করে আসা যাক।

কীভাবে মানবসমাজে আগমন ঘটলো ড্রাগনদের?

প্রশ্নটি রাখা হয়েছে একেবারে সরাসরি, তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এর সরাসরি কোনো উত্তর নেই। শত-সহস্র বছর আগে থেকে বিভিন্ন উপকথায় ড্রাগনদের উপস্থিতির কথা জানা যায়। আর কীভাবে সেগুলোতে এই প্রাণীগুলো স্থান করে নিলো, এর পেছনে গবেষকগণ দিয়েছেন নানা রকম যুক্তি। এখন একে একে আমরা সেগুলোই জানার চেষ্টা করবো

(১) কুমিরঃ

কুমিরের কথা বলতে গেলে এখানে দু’প্রজাতির কুমির নিয়ে আলাপ করতে হবে।
ফ্লোরিডার সেইন্ট অগাস্টিন ক্রোকোডাইল ফার্মের একটি নোনাপানির কুমির।
প্রথমেই আসবে সল্টওয়াটার ক্রোকোডাইল, তথা নোনাপানির কুমিরের নাম, যা একইসাথে এস্টুয়ারাইন ক্রোকোডাইল, ইন্দো-প্যাসিফিক ক্রোকোডাইল, মেরিন ক্রোকোডাইল, সী ক্রোকোডাইল প্রভৃতি নামে পরিচিত। বর্তমান বিশ্বের বুকে বিচরণ করে বেড়ানো সরিসৃপদের মাঝে এই নোনাপানির কুমিরই সর্ববৃহৎ। এরপরেই আসবে নাইল ক্রোকোডাইল, তথা নীলনদের কুমিরদের নাম। এই কুমিরগুলো আফ্রিকার সর্ববৃহৎ মিঠাপানীর শিকারী প্রাণী। এছাড়া দৈর্ঘ্যের দিক থেকে নোনাপানির কুমিরের ঠিক পরেই রয়েছে এর অবস্থান।
দক্ষিণ আফ্রিকার লা বনহুর ক্রোকোডাইল ফার্মের কিছু নীলনদের কুমির।
নোনাপানির কুমিরগুলো ভারতের পূর্ব উপকূল থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলে দেখা যায়। নীলনদের কুমিরগুলোকে সাব-সাহারান আফ্রিকার নদী, হ্রদ ও অন্যান্য জলাভূমিগুলোতে দেখা যায় এখন। তবে আগেকার দিনে তাদের বিস্তার আরো অনেক জায়গা জুড়েই ছিলো। ইতিহাস বলে, নীলনদের এই কুমিরগুলোকে এককালে ভূমধ্যসাগরের উত্তরাঞ্চলেও দেখা যেত। অর্থাৎ দক্ষিণ ইতালি, গ্রিস ও স্পেনের অধিবাসীদের মাঝে মাঝেই মুখোমুখি হতে হতো জলের এই দানবদের সাথে।
কুমিরের সাথে মিল রেখে চিত্রিত কাল্পনিক ড্রাগন।
২০ ফুট পর্যন্ত লম্বা এই নীলনদের কুমিরেরা তাদের শরীরের মধ্যভাগ একেবারে ভূমি থেকে তুলে দাঁড়াতে সক্ষম, যা সাধারণত হাই ওয়াক (High Walk) নামে পরিচিত। নোনাপানির কুমিররা তো আরো এককাঠি সরেস। লম্বায় মাঝে মাঝে ২৩ ফুট ছুঁয়ে ফেলা এই প্রাণীগুলো শিকারকে ধরতে কখনো কখনো তো পানি থেকেই উপরের দিকে লাফিয়ে ওঠে। এখান থেকেই ধারণা করা হয়, নীলনদের কুমিরদের এই আচরণই হয়তো আস্তে আস্তে গল্পকারদের এমন ড্রাগন চরিত্র তৈরিতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, যা তার পেছনের পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে শত্রুকে খতম করে দেয়।

(২) ডায়নোসরঃ

এবার আসা যাক ডায়নোসরদের কাছে। ড্রাগনদের অস্তিত্ব না থাকুক, বিশালাকায় ডায়নোসররা যে এককালে সত্যি সত্যিই এই ধরনীর বুকে বিচরণ করে বেড়িয়েছে, তা তো আজ সবাই জানে। অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদই মনে করেন, প্রাচীনকালে মানুষজন যখন ডায়নোসরদের বিশাল বিশাল সব ফসিল খুঁজে পেত, তখন থেকেই মানুষের মনে ধীরে ধীরে ড্রাগনের উপকথা জন্ম নিতে থাকে।
শিল্পীর কল্পনায় যখন পৃথিবীর বুকে বিচরণ করতো ডায়নোসররা।
উদাহরণস্বরুপ, ক্বিজিয়াংলং ডায়নোসরের কথা বলা যায়। ৪৯ ফুট, অর্থাৎ প্রায় পাঁচতলা ভবনের সমান উঁচু এই ডায়নোসরটির প্রজাতি আজ থেকে প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াতো। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে চীনের হেবা গ্রামের কৃষক চাই চ্যাংমিং সর্বপ্রথম এর একটি কশেরুকা খুঁজে পান। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে নিকটবর্তী ক্বিজিয়াং জেলার একটি কনস্ট্রাকশন সাইটে ডায়নোসরটির ফসিলের বেশ বড় একটি সংগ্রহ আবিষ্কৃত হয়।
আজকের দিনে জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবার বদৌলতে আমরা হয়তো দেখেই বলে দিতে পারছি, এটা অমুক প্রজাতির ডায়নোসরের ফসিল। কিন্তু একটু শত-হাজার বছর আগেকার মানুষগুলোর কথা ভাবুন। তাদের কাছে তো আর আজকের দিনের মতো জ্ঞান, প্রযুক্তির কিছুই ছিলো না। ফলে অতিকায় সেসব ফসিলের সন্ধান তারা যখন পেতো, তখন তারা ড্রাগনের মতো অতিকায় কোনো প্রাণীর কথা যে কল্পনা করবে, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কারণ ইতিহাস বলে, খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক থেকেই চীনে ডায়নোসরের ফসিল নিয়ে গবেষণা চলছে।

(৩) তিমিঃ

নীল তিমি।
বৃহদাকার প্রাণীদের কথা আসবে, আর সেখানে তিমি অনুপস্থিত থাকবে, সেটা কী করে সম্ভব? কেউ কেউ তাই মনে করেন, তিমির মতো বৃহদাকার প্রাণীদের সন্ধান পাওয়াটাও হয়তো ডায়নোসরের উপকথা গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। প্রাচীনকালে মানুষজন যখন তিমির অস্থির সন্ধান পেতো, তখন এই প্রাণীটি সম্বন্ধে তাদের জানার সুযোগ ছিলো খুবই সীমিত। ফলে একদিকে সীমিত জ্ঞান, অপরদিকে বিশালাকার অস্থি- এই দুইয়ে মিলে মানুষের মনে তিমি সম্পর্কে ভয়ঙ্কর এক শিকারী প্রাণীর প্রতিচ্ছবি গড়ে তুলেছিল, যা থেকেও ড্রাগনের উৎপত্তি হতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।


(৪) গোয়ানাঃ


অস্ট্রেলিয়ান প্রাণী গোয়ানা।
অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে প্রায় ২৫ প্রজাতির গোয়ানার বসবাস, যেগুলো মনিটর লিজার্ড নামেও পরিচিত। বড়সড় শিকারী এই প্রাণীগুলোর রয়েছে ধারালো দাঁত ও থাবা। সেই সাথে স্থানীয় উপকথাগুলোতেও এদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। শুধু তা-ই নয়, বছরখানেক আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, তাদের দেহে বিষও উৎপন্ন হয়, যা আক্রান্ত প্রাণীর দেহে পরবর্তী সময়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। এসব থেকে ধারণা করা হয়, অন্তত অস্ট্রেলিয়ায় ড্রাগনের উপকথা জন্মের পেছনে প্রত্যক্ষ প্রভাব রেখেছে এই গোয়ানা।


(৫) মানবমনঃ


মানুষের বহুমাত্রিক কল্পনা।
দিনশেষে অবশ্য সন্দেহের তীর যদি মানুষের দিকেই তাক করা হয়, সেটাও বোধহয় খুব বেশি অযৌক্তিক হবে না, অন্তত ‘An Instinct for Dragons’ বইয়ের লেখক, নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড ই. জোন্স সেটাই মনে করেন। তার মতে, বিবর্তন মানুষের মনে শিকারী প্রাণী সম্পর্কে একটি সহজাত ভয়ের প্রবৃত্তি সৃষ্টি করে রেখেছে। তার হাইপোথিসিস অনুসারে, অজগর, শিকারী পাখিসহ বড় বড় শিকারী প্রাণীদের সম্পর্কে ভীতি দেখা যায় হোমিনিডদের বেলায়। সেই ভীতি মানুষের মন থেকে সঞ্চারিত হয়েছে বিভিন্ন উপকথায়, আর এর মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে আজকের ড্রাগনেরা।
ড্রাগনের আগমন নিয়ে আপনার অভিমত কী? উপরে বর্ণিত ৫টি কারণের মাঝে কোনটিকে আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়, এবং কেন? একটু সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করবেন কি?

ড্রাগনদের নিয়ে সিরিজের পরবর্তী পর্বে আবারও দেখা হবে আপনাদের সাথে। ততদিন পর্যন্ত… ড্রাকারিস…

Wednesday, August 8, 2018

কী হতো যদি নাৎসি বাহিনীর কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হতো?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর অন্যতম প্রধান ভুল ছিল হঠাৎ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করা, যার ফলে ইস্টার্ন ফ্রন্টে নাৎসিদের করুণ পরাজয়ের পাশাপাশি যুদ্ধের মোড়ও ঘুরে গিয়েছিল। সোভিয়েত রাজধানী পর্যন্ত নাৎসিদের হাত পৌঁছে গেলে হয়তো পশ্চিম ইউরোপে নাৎসিদের আধিপত্য আরো শক্তিশালী হতো, কিংবা হয়তো পার্ল হারবারও আক্রমণ করা হতো না।
'দ্য আনটোল্ড স্টোরি অফ ডি-ডে'-এর রচয়িতা প্রফেসর মার্ক মিলনার।
হিটলার যদি মস্কো নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো তবে কী হতে পারতো, তা নিয়েই এক সাক্ষাৎকারে আলোচনা করেছেন নিউ ব্রান্সউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের যুদ্ধ ও সমাজ বিভাগের পরিচালক প্রফেসর মার্ক মিলনার। দ্য ব্যাটল অফ দ্য আটলান্টিক বইটির জন্য ২০০৪ সালে সেরা সামরিক ইতিহাস রচনাকারী হিসেবে সিপি স্টেসি অ্যাওয়ার্ড পাওয়া এই অধ্যাপক সাম্প্রতিক সময়ে নরম্যান্ডির ঘটনা নিয়ে দ্য আনটোল্ড স্টোরি অফ ডি-ডে বইটি রচনা করেছেন। তার মুখ থেকেই শুনে নেওয়া যাক এই ‘কী হতো’ ঘটনাটি।

কী হতো যদি অপারেশন বারবারোসায় হিটলার মস্কো দখল করে ফেলতে পারতো?

হিটলার, অবশ্যই ভেবেছিল যে মাত্র ছয় থেকে দশ সপ্তাহের মধ্যেই পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নের দখল নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে এটি পুরোটাই ছিল অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফসল। তাছাড়া জার্মান গুপ্তচররাও সোভিয়েত রিজার্ভ বাহিনীর আসল সংখ্যাসহ আরো নানা বিষয়েই অজ্ঞ ছিল। যা-ই হোক, অলৌকিকভাবে নাৎসিরা যদি সোভিয়েত ইউনিয়নের দখল নিতে পারতো, তবে ঘটনাটি হয়তো অনেকটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো হতো, যেখানে জার্মানরা ইস্টার্ন ফ্রন্টে জয়লাভ করেছিল।

বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে রুশ জারের পতনের পর বলশেভিকরা জার্মানির সাথে শান্তিচুক্তি করে, এবং জার্মানরা পশ্চিম ফ্রন্টে মনোনিবেশ করে। যদি হিটলার মস্কোর উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারতো, তবে এরকমই কিছু হতো আর এরপরের ঘটনা যেকোনো কিছুই হতে পারতো।

তো সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর পূর্ণ দখল আনতে জার্মানির তখন কী করা উচিৎ ছিল? 

সোভিয়েতের উপর পূর্ণ জয়লাভ করাটাই আসলে বেশ একটু বিতর্কের ব্যাপার। মূল কথাটা হচ্ছে, মস্কোর ভূমিকাটা কী হতো? আরএইচএস স্টোলফি তার হিটলার’স পাঞ্জারস ইস্ট বইতে মতামত দিয়েছেন, অপারেশন বারবারোসাই ছিল পুরো বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা। তার মতে, ১৯৪১-এর আগস্টে জার্মানি যদি ইউক্রেনের দিকে গিয়ে লেনিনগ্রাদ অবরোধ করে, পরবর্তীতে মস্কো আক্রমণ করার পরিকল্পনার পরিবর্তে সরাসরি মস্কোতে আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করতো তবে হয়তো সোভিয়েতের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারতো। তো মূল প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে, “সোভিয়েত শাসকদের পতন ঘটাতে আসলে কী প্রয়োজন ছিল?”
জার্মানি ১৯১৭-১৮ সালে যা করেছিল, তখন ছিল সরকার পরিবর্তনের সময়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি মস্কোর ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি, তারা শুধুমাত্র কিয়েভ আর রিগার দখল নিয়েছিল, এবং এটুকুই প্রয়োজন ছিল জারের রাশিয়ার পতন ঘটাতে। বলশেভিকরাও ঝামেলা এড়াতে জার্মানির চুক্তি মেনে নিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সোভিয়েত শাসন সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্টালিন জনগণের উপর যেরকম প্রভাব ফেলতে পেরেছিল, জার দ্বিতীয় নিকোলাসের তেমন কিছু ছিল না। তাছাড়া, লেনিনগ্রাদে নাৎসিদের নৃশংসতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, নির্দয় স্টালিনের পতন দেখতে চাওয়া জনগণও বুঝতে পেরেছিল নাৎসিদের চেয়ে স্তালিনই মন্দের ভালো।
সরাসরি মস্কো আক্রমণ করলেও কি জার্মানি সোভিয়েতের পতন ঘটাতে পারতো?
আমার নিজস্ব মতামত হচ্ছে যে, নাৎসিরা কোনোভাবেই ১৯৪১ শেষ হওয়ার আগে মস্কো দখল করতে পারতো না। যদি নিতোও, তবুও ঠাণ্ডার সুযোগ নেওয়া সোভিয়েত প্রতি-আক্রমণে তা পুনরায় হাতছাড়া হয়ে যেত, যেমনটা হয়েছিল স্তালিনগ্রাদে ১৯৪২-৪৩ এ। এরপরেও কথা থেকে যায়, মস্কোর পতন মানেই রাশিয়ার পতন নয় যেমনটা হয়েছিল নেপোলিয়নের ক্ষেত্রে। নাৎসিরা যদি মস্কো দখল করে নিতোও, তবুও সোভিয়েতদের দেশে সীমিত রসদ নিয়ে টিকতে পারতো না। সোভিয়েত রিজার্ভ বাহিনীর আকার, সোভিয়েতদের মৃত্যুকঠিন প্রত্যয় আর তাদের বিশাল মানচিত্রটার কথাই ভাবুন।

অক্ষশক্তির কাছে রাশিয়ার পতন ঘটতে দেখলে মিত্রবাহিনী কী প্রতিক্রিয়া দেখাতো বলে আপনি মনে করেন?

এর অনেককিছুই নির্ভর করে এটি কোন সময়ে হচ্ছে, এবং ঐ সময়ে পৃথিবীতে আর কী কী ঘটছে। খেয়াল করে দেখুন, নাৎসিদের ঐ পরাজয়ের পরপরই কিন্তু জাপান পার্ল হারবার আক্রমণ করে, এবং আমেরিকানরা পুরোপুরিভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যদিও তারা ব্রিটিশদেরকে সাহায্য করে যাচ্ছিলো, কিন্তু ঐ আকস্মিক আক্রমণের কারণেই কিন্তু তারা পুরোদমে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর তখনই জার্মানি আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সুতরাং মস্কোর পতন হলেও জার্মানিকে ব্রিটেন আর আমেরিকার সাথে যুদ্ধ করতে হতো।
সাইবেরিয়ায় আক্রমণ না করে পার্ল হারবারে আক্রমণ করাই হয়তো অক্ষশক্তির অন্যতম বড় ভুল ছিল।
তবে একে অন্যভাবেও কল্পনা করা যায়, যেখানে আমেরিকাকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখা যেত। কল্পনা করুন, জাপান পার্ল হারবার আক্রমণ না করে সাইবেরিয়ার দিকে নজর দিলো। এদিকে একদিকে যেমন সোভিয়েতের পতন দ্রুত ঘটতো, অন্যদিকে আমেরিকাকেও যুদ্ধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যেত। সোভিয়েতরা সাইবেরিয়া থেকে তখনই সৈন্য সরিয়ে নিয়েছিলো, যখন তারা নিশ্চিত হয়েছিল যে সাইবেরিয়া দিয়ে জাপানের আক্রমণ করার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর সাইবেরিয়ায় রাখা সৈন্য দিয়েই পরবর্তীতে তারা পূর্ব ইউরোপে জার্মানির বিরুদ্ধে পুরোটা শক্তি কাজে লাগাতে পেরেছিল। রাশিয়ার পতন হলে এবং আমেরিকা যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়লে, ব্রিটেনের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই নিরাশাজনক হয়ে পড়তো।
এরকম পরিস্থিতিতে জার্মানি ব্রিটেনকে হয়তো একঘরে করে ফেলতে পারতো। মনে করে দেখুন, নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ করেছিল ইউরোপে ব্রিটেনের শেষ মিত্রকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য, যাতে করে ব্রিটিশরা যুদ্ধ করার আর কোনো উপায় না খুঁজে পেতে পারে। সুতরাং, এরকম একটা পরিস্থিতি কল্পনাই করা যায়, যেখানে হিটলার পুরো মহাদেশ দখল করে নিয়েছে, যেখানে শেষ বাধা একমাত্র ব্রিটেন। ইউ-বোট আর লুতওয়াফে বোম্বারগুলোর বিরতিহীন আক্রমণে ব্রিটেন হয়তো শেষমেশ সাদা পতাকা ওড়াতে বাধ্য হতো।

যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধক্ষেত্রে নামার পরেও কি অপারেশন বারবারোসার জয় প্রভাব রাখতো?

ধরে নেই, জাপানের পার্ল হারবার আক্রমণের পরও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছে, আমেরিকাও সম্পূর্ণভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতিটা অনেকটাই ১৯১৮ সালের মতো, যেখানে জার্মানরা ইস্টার্ন ফ্রন্টে জয়লাভ করেছে, এবং ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে পুরোপুরি মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু তারপরও তারা ব্যর্থ হয়েছিল যখন মার্কিন সৈন্যরা হানা দেওয়া শুরু করলো। ১৯৪২-৪৩ সালেও কী হতে পারে সেটা বেশ আগ্রহোদ্দীপক বিষয়। সোভিয়েতের পতন ঘটলেও ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে মিত্রবাহিনী নাৎসিদেরকে কি হারাতে পারতো?
এ নিয়ে বেশ বড় ধরনের বিতর্ক রয়েছে। একদিকে রয়েছে নরম্যান ডেভিসের (ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ) মতো ব্যক্তিরা, যারা মনে করেন যুদ্ধের বেশিরভাগটাই নির্ভরশীল ছিল ইস্টার্ন ফ্রন্টের ফলাফলের উপর, ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের যুদ্ধ ছিল নিছকই ছেলেখেলা ইস্টার্ন ফ্রন্টের তুলনায়। এবং যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর জয় নয় বরং সোভিয়েত ইউনিয়নের জয়ই বেশি প্রভাব রেখেছিল।
সম্পূর্ণ ইউরোপের দখল নিতে পারলেও জার্মানিকে হারতে হতো পারমাণবিক বোমার আঘাতে।
অন্যদিকে ফিলিপস ও’ব্রায়েনসহ (মার্কিন ইতিহাসবিদ) অন্যান্যদের মতে, সোভিয়েতের পতন ঘটলেও নাৎসিদেরকে হারানো মিত্রবাহিনীর জন্য খুব একটা কঠিন হতো না। আমার নিজস্ব মতামত এই দুই মতের মাঝামাঝি। ইস্টার্ন ফ্রন্টে নাৎসিরা জয়লাভ করলে পুরো ইউরোপকে তারা একটি শক্তিশালী দুর্গের মতো বানিয়ে রাখতো, যার ফলে মিত্রবাহিনীর আক্রমণগুলো নস্যাৎ হয়ে যেত।    
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ফ্রান্সে কোনো পদাতিক বাহিনী না থাকা মিত্রবাহিনীর জন্য বেশ বড় একটা বাধা ছিল। এ অবস্থায় হয়তো চ্যানেল আর ভূমধ্যসাগর দিয়ে আক্রমণই ছিল মিত্রবাহিনীর একমাত্র ভরসা। ও’ব্রায়েনের যুক্তির একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো, তিনি মনে করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেশিরভাগটাই হলো আকাশযুদ্ধ। এবং ১৯৪২-৪৩ এর সময়ে মিত্রবাহিনী আকাশপথে নাৎসিদেরকে পরাস্ত করে জার্মানিতে বোমাবর্ষন করা শুরু করেছিলো। এ অবস্থায় নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে গ্র্যাউন্ড ওয়্যারে নামতে মিত্রবাহিনীর কয়েক বছর লেগে যেত, কিন্তু আকাশপথে তারা ক্রমেই যুদ্ধ চালিয়ে যেত। বোম্বারের আক্রমণে জার্মান শহরগুলো ধ্বংস হলেও বাস্তবে জার্মানরা কিন্তু তখনো পুরো ইউরোপ নিয়ন্ত্রণ করছে।
অবশেষে ১৯৪৫ সালে মার্কিনদের হাতে পারমাণবিক বোমা আসার পর জার্মানদের অবস্থাও হয়তো জাপানীদের মতো হতো। বার্লিন, মিউনিখের পরিণতিও হয়তো হিরোশিমা আর নাগাসাকির মতো হতো। তবে জাপানীদের তুলনায় অনেক বেশি এলাকা আর সম্পদ থাকায় নাৎসিদেরকে সম্পূর্ণভাবে গুড়িয়ে দিতে আরো বেশি বোমার প্রয়োজন হতো মিত্রবাহিনীর।

Thursday, August 24, 2017

কাবিল ও হাবিলের করুণ কাহিনী!

কাবিল ও হাবিল নামে দুই ভাইয়ের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের ইতিহাস অনুসারে কাবিল ও হাবিলের মাধ্যমেই প্রথম কুরবানি শুরু হয়।[1] তাদের মধ্য থেকেই পৃথিবীতে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে এবং তাদের মাধ্যমেই মৃতদেহ কবর দেবার নিয়ম চালু হয়।[2] জুমার নামাজের আগে কিংবা কুরবানির ঈদের নামাজের আগে বিশেষ আলোচনায় কুরবানির ইতিহাস সম্বন্ধে আলোকপাত করতে গিয়ে ইমাম সাহেবরা প্রায় সময়ই কাবিল ও হাবিলের ঘটনার উল্লেখ করেন। খ্রিস্টধর্মে তাদেরকে কেইন ও এবেল নামে ডাকা হয়।[3] কাবিল ও হাবিলের ঘটনা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে উল্লেখ করতে হবে তাদের পিতা হযরত আদম (আ:) ও মাতা বিবি হাওয়া (আ:) এর কথা।

হযরত আদম (আ:) ও বিবি হাওয়া (আ:) উভয়ে জান্নাতের সুসজ্জিত বাগানে বসবাস করছিলেন। কিন্তু তাদের পিছু লাগলো ‘ইবলিস’ নামে এক পাপিষ্ঠ শয়তান। ইবলিস চাইলো তারা যেন সুখের জান্নাতে থাকতে না পারে। যতটা না সুখের জান্নাত থেকে বিতাড়িত করার ইচ্ছে ছিল ইবলিসের, তারচেয়েও বেশি ইচ্ছে ছিল তারা যেন আল্লাহর দেয়া আদেশ অমান্য করে তাঁকে নাখোশ করে। আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:)-কে আল্লাহ একটি বিশেষ গাছের ফল খাওয়ার ব্যাপারে নিষেধ করেছিলেন। ইবলিস বেছে বেছে ঐ বিশেষ ফলটিকেই টার্গেট করলো। দুজনকে প্ররোচিত করে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ঐ গাছের ফল খাইয়ে দিলো। আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:) দৃশ্যত পাপ করে বসলেন। জান্নাতে পাপের স্থান নেই, তাই শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিলেন। বলা হলো, পৃথিবীতে ভালো কাজ করে নিজেদের মার্জনা করতে পারলে তারা আবারো জান্নাতে ফিরে যেতে পারবেন।

কিন্তু অশান্তি তারপরও রয়ে গেল, কারণ পৃথিবীতেও অস্তিত্ব বিরাজমান সেই পাপিষ্ঠ শয়তান ইবলিসের। ইবলিস শয়তান তার শেষ চাওয়া হিসেবে আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষ কয়েকটি ক্ষমতা চেয়ে নিয়েছিল। অভিশপ্ত হবার আগে ইবলিস আল্লাহর অনেক ইবাদত করেছিল। এই ইবাদতের প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তাকে তার চাহিদা অনুসারে এই ক্ষমতাগুলো প্রদান করেছিলেন। প্রাপ্ত ক্ষমতাগুলোর মধ্যে একটি হলো, যেকোনো সময় বিশ্বের যেকোনো স্থানে সে অবস্থান করতে পারবে।[4] সে হিসেবে আদম-হাওয়ার পৃথিবীতে চলে আসা তার জন্য তেমন কঠিন কিছু নয়।

যা-ই হোক, পৃথিবীতে আগমনের পর হযরত আদম (আ:) ও বিবি হাওয়া (আ:) এর সন্তান জন্ম হতে লাগলো। ধীরে ধীরে মানুষ বাড়তে লাগলো পৃথিবীতে। কিন্তু এখানে দৃশ্যত একটি সীমাবদ্ধতা থেকে গেল। আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:) যেহেতু পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবী, তাই তাদের পরের প্রজন্মে যত সন্তানের জন্ম হবে তারা সকলেই হবে ভাই-বোন। ইসলামী নিয়ম অনুসারে, ভাই বোনের মাঝে কখনো বিয়ে হয় না। সে হিসেবে এটিই হতো পৃথিবীর শেষ মানব প্রজন্ম। এরপর মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতো। কিন্তু এখানে তো পুরো মানবজাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন, তাই বিশেষ একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে এর সমাধান করা হলো। বিবি হাওয়ার গর্ভে তখন সন্তান জন্ম নিতো জোড়ায় জোড়ায়। প্রতি জোড়ায় একজন ছেলে আর একজন মেয়ে জন্ম হতো। একই জোড়ার ছেলে ও মেয়েরা পরস্পর বিয়ে করতে পারবে না। বিয়ে করতে হলে ভিন্ন জোড়ার কাউকে করতে হবে। কাবিল ও হাবিল ছিল ভিন্ন জোড়ার, তাই তাদের ব্যাপারটি স্বাভাবিক নিয়মেই সমাধান হয়ে যায়। একজন আরেকজনের জোড়ার মেয়েকে বিয়ে করবে।

কিন্তু এখানে একটি সমস্যা দেখা দেয়। হাবিলের জোড়ার মেয়েটি তেমন সুন্দরী ছিল না। সেই তুলনায় কাবিলের জোড়ার মেয়েটি ছিল অনেক বেশি সুন্দরী। নিয়ম অনুসারে হাবিল অধিক সুন্দরী মেয়েটিকে পায় আর কাবিল পায় কম সুন্দরী মেয়েটিকে। কিন্তু কাবিল বেঁকে বসে, সে হাবিলের জোড়ার মেয়েটিকে বিয়ে করবে না। যেভাবেই হোক, নিজের জোড়ার সুন্দরী মেয়েটিকেই বিয়ে করবে।
শিল্পীর তুলিতে আকা একটি কাক অপর একটি কাককে হত্যা করছে।
এমতাবস্থায় পিতা হযরত আদম (আ:) একটি মীমাংসা করলেন। তাদের দুজনকে আল্লাহর নামে কুরবানি দিতে বললেন। যার কুরবানি আল্লাহ গ্রহণ করবেন, তার ইচ্ছাই জয়ী হবে। কার কুরবানি গৃহীত হলো আর কার কুরবানি গৃহীত হলো না, তা কীভাবে বোঝা যায়? তখনকার কুরবানি এখনকার কুরবানির মতো ছিল না। সে সময়ে কোনো জিনিস কুরবানি দিলে আসমান থেকে আগুন এসে ঐ জিনিসকে পুড়িয়ে দিতো। কুরবানির বস্তুকে ভূমি থেকে উপরে কোনো স্থানে উপস্থাপন করা হতো। আকাশ থেকে আগুন এসে যদি বস্তুকে পুড়িয়ে দিতো, তাহলে বোঝা যেতো আল্লাহ কর্তৃক কুরবানী গৃহীত হয়েছে।

পিতা আদম (আ:) এর দেওয়া মীমাংসা অনুসারে তারা উভয়েই কুরবানির বস্তু উপস্থাপন করলো আল্লাহর কাছে। হাবিল একটি সুস্থ ও মোটাতাজা দুম্বা উৎসর্গ করলো আর কাবিল তার কিছু সবজি ও শস্য উৎসর্গ করলো। তখন সবজি ও শস্যও কুরবানির জন্য উৎসর্গ করা যেতো। কোনো কোনো উৎস থেকে জানা যায়, হাবিল উৎসর্গ করেছিল উৎকৃষ্ট মানের দুম্বা আর কাবিলের শস্য ছিল নিকৃষ্ট মানের।[5][6] আল্লাহ হাবিলের কুরবানিকেই কবুল করলেন। উপর থেকে আগুন দিয়ে দুম্বাটিকে পুড়িয়ে নিলেন, কিন্তু কাবিলের শস্যকে কিছুই করলেন না। সে হিসেবে বিয়ের নিয়ম আগের মতোই রইলো, হাবিল বিয়ে করবে কাবিলের জোড়ায় জন্ম নেয়া মেয়েটিকে।

কিন্তু কাবিল এই অপমান সহ্য করতে পারলো না। সে ভাবলো, হাবিলের জন্য তার কুরবানি আল্লাহ গ্রহণ করেননি। কুরবানিতে প্রত্যাখ্যাত হওয়াতে এবং স্ত্রী হিসেবে কাঙ্ক্ষিত মেয়েকে না পাওয়াতে সে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে গেল। ক্রোধের বশে হাবিলকে সে বললো, তোর ইচ্ছা কোনোভাবেই আমি পূরণ হতে দেবো না। প্রয়োজনে তোকে হত্যা করবো, যেন তুই আমার জোড়ার মেয়েটিকে বিয়ে করতে না পারিস।[7] কোনো কোনো উৎস থেকে জানা যায়, তাকে এমন সর্বনাশা ভাবনার উস্কানি দিয়েছিল সেই পাপিষ্ঠ ইবলিস শয়তান।[8]

কাবিলের এমন আচরণে হাবিল অনেক সুন্দর উত্তর দিয়েছিল। সে বলেছিল, আল্লাহ তাদের কুরবানিই কবুল করেন যার উদ্দেশ্য সৎ।[9] আর তুমি আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আমার গায়ে আঘাত করলেও, আমি তোমাকে কিছু করবো না। কারণ আমি আমার প্রতিপালককে ভয় করি।[10] কিন্তু এই কথায় কাবিলের উদ্দেশ্যের কোনো পরিবর্তন হলো না। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে সে হত্যা করলো তার আপন ভাইকে।[11] এরপরই কাবিলের মন গলে যায় এবং অনুভব করে- আহারে, কত বড় ভুল করে ফেললো সে! নিজের ভাইকে নিজ হাতে মেরে ফেললো, এর চেয়ে বড় ধৃষ্টতা আর কী হতে পারে! ভেতরে ভেতরে সে অনেক অনুতপ্ত হলো এবং নিজের অপকর্ম কীভাবে ঢাকবে, তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লো। তখনো মৃতদেহ সৎকারের ব্যাপারে কোনো নিয়ম তৈরি হয়নি, কারণ এর আগে কোনো মানুষের মৃত্যু ঘটেনি।

মৃত দেহটিকে নিয়ে কী করবে এ নিয়ে যখন সে চিন্তায় মগ্ন তখন দেখলো, একটি কাক তার ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে একটি গর্ত করলো। তারপর সেই গর্তে একটি মৃত কাককে টেনে এনে কবর দিয়ে দিলো।[12] এটি দেখে কাবিল ভাবলো, তাকেও হয়তো এভাবে কবর দিতে বলা হচ্ছে। তাই একটি গর্ত করে সে তার ভাইকে কবর দিয়ে দিলো। ইসলামের ইতিহাস অনুসারে এটিই ছিল মানবজাতির প্রথম কবর। কোনো কোনো উৎস থেকে জানা যায়, কাক দুটি ছিল ফেরেশতা এবং এদেরকে আল্লাহই পাঠিয়েছিলেন, যেন এদের দেখে কাবিল শিখতে পারে।[13]
ইসলামি চিত্রশিল্পীর তুলিতে কাকের কবর দেবার ঘটনা।
অনেকে দাবি করে থাকেন, হাবিলের কবর এখনো দেখা যায় এবং এটি সিরিয়ার দামেস্কে অবস্থিত।[14] দামেস্কের উত্তরে একটি স্থান আছে, যা মাকতালে হাবিল বা হাবিলের হত্যাস্থল নামে পরিচিত। এ প্রসঙ্গে হাফিজ ইবনে আসাকির একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন তার একটি বইয়ে। তিনি উল্লেখ করেন,
আহমদ ইবনে কাসির একবার রাসুল (সা:)-কে স্বপ্নে দেখেছিলেন। রাসুলের (সা:) পাশে হাবিলও ছিল। এক প্রশ্নের জবাবে হাবিল তখন কসম করে বললো, এটিই আমার হত্যাস্থল। তখন রাসুল (সা:) হাবিলের দাবিকে সত্য বলে সমর্থন করলেন।[15]
তবে এটি শুধুই স্বপ্ন বলে ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে একে গ্রহণযোগ্য বলে ধরা হয় না।
অনেকে বিশ্বাস করেন এটি আদমপুত্র হাবিলের কবর।
কুরআন শরীফে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত বলা নেই। এমনকি তাদের দুজনের নামও উল্লেখ নেই। শুধু ‘আদমের দুই পুত্র’ নামে তাদের কথা উল্লেখ আছে। তবে তৌরাত গ্রন্থ ও কিছু হাদিসে তাদের ঘটনার বিস্তারিত বলা আছে।[16] ইবনে কাসিরের লেখা ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’তে এই ঘটনার সুন্দর বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে।

ইসলামের দৃষ্টিকোণে কাবিল ও হাবিলের ঘটনার তাৎপর্য অনেক। কাবিল ও হাবিলের ঘটনা উল্লেখের পরপরই কুরআনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়াত আছে। সেখানে উল্লেখ আছে,
কেউ কাউকে হত্যা করলে, সে যেন সমস্ত মানবজাতিকেই হত্যা করলো। আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে, সে যেন সমস্ত মানবজাতিকেই রক্ষা করলো।[17]
এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস আছে। রাসুল (সা:) বলেছেন,
পৃথিবীতে যখনই অন্যায়ভাবে কোনো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, তখন পাপের একটি অংশ অবশ্যই আদমের প্রথম পুত্র কাবিলের উপর পড়ে। কেননা সে-ই প্রথম ব্যক্তি, যে অন্যায় হত্যাকাণ্ডের সূচনা করে।[18]


তথ্যসূত্র ও নোটঃ
  • [1] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ২৭। সংস্কৃতি হিসেবে কোরবানির প্রচলন শুরু হয় হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর সময় থেকে, কিন্তু প্রথম কোরবানির ঘটনা ঘটে হযরত আদম (আ:) এর সময়কালে কাবিল ও হাবিলের মাধ্যমে।
  • [2] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩১
  • [3] Holy Bible, Genesis 4
  • [4] আল কুরআন, সূরা হিজর, আয়াত ৩৬-৩৮।
  • [5] আল-কোরআনে বর্ণিত পঁচিশজন নবী ও রাসুলের জীবনী, মুফতী মুহাম্মদ শফী, সোলেমানিয়া বুক হাউস, ২০১২, পৃষ্ঠা ৬৫
  • [6] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড (বাংলা অনুবাদ), হাফিজ ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা ২১৭
  • [7] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ২৭
  • [8] কোরআনের গল্প, বন্দে আলী মিয়া, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ২০১৪, পৃষ্ঠা ১৫
  • [9] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ২৭
  • [10] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ২৮।
  • [11] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩০।
  • [12] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড (বাংলা অনুবাদ), হাফিজ ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জুন ২০০৭
  • [13] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩১।
  • [14] islamiclandmarks.com/syria/tomb-of-habil
  • [15] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড (বাংলা অনুবাদ), হাফিজ ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা ২১৯
  • [16] আল-কোরআনে বর্ণিত পঁচিশজন নবী ও রাসুলের জীবনী, মুফতী মুহাম্মদ শফী, সোলেমানিয়া বুক হাউস, ২০১২, পৃষ্ঠা ৬৬
  • [17] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩২।
  • [18] আল বিদায়া ওয়ান নিয়াহা সূত্রে মুসনাদে আহমদ।

Tuesday, July 25, 2017

লিলিথ: ইহুদী পুরাণের এক ‘ভয়ংকর সৌন্দর্য’ !!

‘লিলিথ’ নামটির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় এক ধরণের সারল্য, অসাধারণ মাধুর্য। শুনলেই কোনো স্নিগ্ধ ষোড়শীর মুখ ফুটে ওঠে মনে। কিন্তু এই নামটি যে চরিত্রের সাথে জড়িত, সে কি আসলেই পরিচিত তার সারল্যের জন্য? নাকি চরিত্রটিতে আছে সম্পূর্ণ বিপরীত কোনো বৈশিষ্ট্য?

লিলিথের কথাঃ

লিলিথকে পাওয়া যায় ইহুদী মিথলজিতে। ইহুদী মিথলজির বিখ্যাত চরিত্র এই লিলিথ। বিখ্যাত না বলে সম্ভবত ‘কুখ্যাত’ বললেই বেশি মানায়। লিলিথ চরিত্রটি অঙ্কুরিত হয় মূলত ৩য় থেকে ৫ম শতাব্দীর মাঝামাঝিতে, ব্যবিলনীয় তালমুদ বা পুরাণে। শব্দটির প্রচলিত অর্থ রাত্রি হলেও পুরাণের লিলিথ চরিত্রকে দেখানো হয় অন্ধকারের পিশাচ রূপে, যার বিচরণ ছিল রাতের অন্ধকারে। সে ছিল অসচ্চরিত্রের অধিকারিণী, যার কাজ নবজাতক শিশু চুরি করে নিয়ে যাওয়া।
শিল্পীর তুলিতে ফুটিয়ে তোলা লিলিথ, যার হাত থেকে এক শিশুকে রক্ষা করছে এডাম।
ব্যবিলনীয় গ্রন্থে এমনও বলা আছে যে-
"কোনো পুরুষ যদি একা রাতে ঘুমায়, তাহলে সে লিলিথের ফাঁদে পড়তে পারে!"
বলা হতো পুরুষের সাথে মিলিত হবার মাধ্যমে লিলিথ আরো শয়তানের জন্ম দেয়, কেননা লিলিথকে কল্পনা করা হয় অনিয়ন্ত্রিত যৌনতার প্রতীক হিসেবে। সিরিয়ায় একটি প্রস্তর খন্ড পাওয়া যায় যাতে লেখা ছিল-
O flyer in a dark chamber, go away at once, O Lili!
অর্থাৎ লিলিথকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে,
হে লিলি, হে অন্ধকারের উড়ন্ত প্রতীক, চিরদিনের জন্যে চলে যাও!
এতেই বোঝা যায় কতটা ভয়ানক চরিত্র হিসেবে কল্পনা করা হত লিলিথকে। এমনকি নবজাত শিশুদের গলায় বেধে দেওয়া হত তাবিজ যাতে তারা মুক্ত থাকতে পারে লিলিথের কবল থেকে।
ব্যবিলনীয় সভ্যতায় কল্পিত লিলিথ।
কিন্তু এটিই কি লিলিথের প্রকৃত পরিচয়'জেনেসিস রাব্বাহ' যাতে বুক অফ জেনেসিসের  অনেক জটিল তত্ত্বের বোধগম্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তাতে এই লিলিথকে দেখানো হয়েছে এডামের প্রথম স্ত্রী রূপে! শুনতে অদ্ভুত লাগে, তাই না? বরাবর ইভকে আমরা এডামের সাথে কল্পনা করে এসেছি, সেখানে এডামের ‘প্রথম স্ত্রী’ ব্যাপারটা ধাক্কা দেয়ার মতোই! তত্ত্বের সূত্রপাত ইহুদী ধর্মের প্রথম ধর্মগ্রন্থ যাতে বর্ণিত হয়েছে মানবজাতি ও পৃথিবীর সৃষ্টি উপাখ্যান, সেই বুক অফ জেনেসিসের একটি লাইন থেকে। বুক অফ জেনেসিসে ইংগিত দেয়া হয় পুরুষ ও নারীর একই সময়ে সৃষ্টিকে। যাতে বলা হয় (1:27)
So God created man in his own image,  in the image of God created he him, male and female created he them.
অর্থাৎ নর ও নারীর একইসাথে সৃষ্টির বিষয়টি ইহুদী ধর্মে স্বীকৃত। আবার ২:২২ এ এসে দেয়া হচ্ছে এডামের পাঁজরের হাড় থেকে ইভের সৃষ্টির বর্ণনা।

তাহলে সহজেই ধরে নেয়া যায় কোনো কারণে সেই প্রথম সঙ্গিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এডাম। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে গেলে জেনেসিস রাব্বাহতে পাওয়া যায় অসাধারণ এক ঘটনা। জেনেসিস রাব্বাহতে বর্ণিত একটি মিদ্রাশে পাওয়া যায় এডাম-লিলিথের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও পরিণতির উপাখ্যান। পরবর্তীতে ৯ম-১০ম শতাব্দীর দিকে ‘এলফাবেট অফ বেন সিরা’-তে মূলত লেখা হয় লিলিথের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হবার করুণ উপাখ্যান।
কার্ল পোয়েলাথ এর কল্পনায় লিলিথ।
এডামকে সৃষ্টির পর ঈশ্বর তার একাকীত্ব দূর করার কথা ভাবলেন। সঙ্গিনী হিসেবে সৃষ্টি করলেন লিলিথকে। লিলিথ বুদ্ধিদীপ্ত, আত্মসম্মানবোধে পরিপূর্ণ এক নারী, সৃষ্টির প্রথম নারী। তার জন্ম সেই মাটি থেকেই, যা থেকে এডামের জন্ম। যার কারণে পরবর্তীতে লিলিথ মেনে নিতে চায় নি এডামের আধিপত্য। নিজেকে সে দাবী করেছে এডামের সমকক্ষ, যা তৈরী করে এডামের মনে লিলিথের প্রতি বিরুদ্ধ চিন্তা।

মিদ্রাশ অনুযায়ী, সৃষ্টির পরপরই লিলিথের সাথে এডামের দ্বন্দ্ব শুরু হয় মূলত সঙ্গমের সময়। নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবী করা এডাম লিলিথকে বোঝাতে চায় তার জায়গা উপরে নয়, নীচে। লিলিথ তা মানতে অস্বীকার করে। যে শ্রেষ্ঠতার দাবী এডাম করে আসছে, তা সে উড়িয়ে দেয় এক নিমেষে। তার পক্ষে সে যুক্তিও স্থাপন করে। যেহেতু একই মাটি থেকে একই উপায়ে তাদের তৈরী করা হয়েছে, সেহেতু এডাম নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবী করতে পারে না। পারে না তার উপর কর্তৃত্ব করতে। এতসব মতভেদ দেখে স্বর্গে থাকার ইচ্ছা চলে যায় লিলিথের। স্বেচ্ছায় স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নামে লিলিথ!
মর্ত্যের পথে লিলিথ।
লিলিথের ব্যবহারে নাখোশ এডাম যায় স্রষ্টার কাছে, অভিযোগ করে লিলিথের বিরুদ্ধে। এমন সঙ্গিনী তাকে কেন দেওয়া হলো যে তার কথা শোনে না? যে পালিয়ে গেল তাকে ছেড়ে? লিলিথের উপর বিরক্ত স্রষ্টা তার তিন ফেরেশতা পাঠায় লিলিথকে খুঁজে বের করতে। এই তিন ফেরেশতা হলো ‘সেনয়’‘সেনসেনয়’ এবং ‘সেমানগেলফ’। [যাদের নাম পরবর্তীতে তাবিজে লিখে বাঁধা হত নবজাত শিশুদের গলায়, কল্পিত লিলিথের কবল থেকে তাদের রক্ষা করতে।] ফেরেশতারা স্রষ্টার বার্তা নিয়ে যায় লিলিথের জন্য। যদি সে ফিরে আসে এবং মেনে নেয় এডামের কর্তৃত্ব, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যদি সে প্রত্যাখ্যান করে, তাকে সম্মুখীন হতে হবে শাস্তির। প্রতিদিন তাকে প্রত্যক্ষ করতে হবে তার ১০০ সন্তানের মৃত্যু!
লিলিথ এর সিম্বল বা চিহ্ন যাতে যাদুশক্তি আছে বলে মনে করা হয়।
ফেরেশতারা লিলিথকে মিশরের এক সমুদ্র তীরে খুঁজে পায়। তাদের সাথে ফিরে যেতে বলে তাকে। কিন্তু লিলিথ বলে সে আর ফিরে যাবে না। এরপর তাকে শোনানো হয় ফিরে না যাওয়ার শাস্তি। লিলিথ বলে,
My friends, I know God only created me to weaken infants when they are eight days old. From the day a child is born until the eighth day, I have dominion over the child, and from the eighth day onward I have no dominion over him if he is a boy, but if a girl, I rule over her twelve days.”
(আমি জানি ঈশ্বর আমাকে তৈরী করেছেন কেবলই নবজাতকের প্রতি দূর্বল করার জন্য। তাও আমার অধিকার বজায় থাকবে কেবল আটদিন যদি শিশুপুত্র হয় আর কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে তা বারোদিন।)

লিলিথের বিশ্বাস ছিল ঈশ্বর এডামের পক্ষ নেবেন, যেহেতু লিলিথকে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন এডামকে সঙ্গ দেয়ার জন্য। শাস্তি মাথা পেতে নিয়ে স্বর্গ ত্যাগ করে লিলিথ, হয়ে যায় অভিশপ্ত!

সাহিত্যে লিলিথঃ

ইহুদী মিথলজিতে লিলিথকে যেভাবেই প্রকাশ করা হোক না কেন, সাহিত্যিকদের চোখে লিলিথ বরাবরই এক আকর্ষণীয়া নারী চরিত্রেই প্রতীয়মান হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শিল্পীর কল্পনা থেকে আঁকা লিলিথ দেখলেই তা বোঝা যায়। এমনকি লিলিথের উপাখ্যান নিয়ে রচিত হয়েছে সনেট! দান্তে গ্যাব্রিয়েল রোসেতি নামক এক ব্রিটিশ কবি ও চিত্রশিল্পী নিজের কল্পনা থেকে এঁকেছেন লিলিথকে, সেই সাথে ‘লিলিথ’ নামে এক সনেটে বর্ণনা করেছেন তার কল্পনার লিলিথকে-
Of Adam’s first wife, Lilith, it is told
(The witch he loved before the gift of Eve.)
That, ere the snake’s, her sweet tongue could deceive, And her enchanted hair was the first gold.
দান্তে গ্যাব্রিয়েল রোসেতির লেডি লিলিথ।
ইহুদী মিথলজিতে লিলিথকে একদিক থেকে যেমন দেখানো হয়েছে অন্ধকারের প্রতিরূপ হিসাবে, আরেক দিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তার এক বিদ্রোহী রূপ। স্বর্গের সুখ ছেড়ে আসা এক নির্বোধ নারী, কিংবা নিজের অধিকারের জন্যে একাকী লড়ে যাওয়া এক দৃঢ়চেতা চরিত্র। সবই নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির উপর। ইহুদী সাহিত্যিক রুথ ফেল্ডম্যানের ‘Lilith’ সবচেয়ে সুন্দর করে নিজের রূপটি প্রকাশ করেছে-
“Half of me is beautiful, But you were never sure which half.”

Tuesday, July 18, 2017

যে গান মৃত্যু ডেকে আনে!

মন ভালো হোক কিংবা খারাপ, আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যেকোনো সময়ে গান ছাড়া যাদের চলেই না। জ্যামে বসে অলস সময় কাটাতেই হোক কিংবা জিমে গিয়ে প্রচণ্ড শারীরিক কসরত করার মুহূর্তেই হোক, গান আমাদের চিরসঙ্গী। মানুষের অনুভূতির সাথে মিশে গিয়ে একমাত্র গানই পারে চোখের পলকে মনের যত ক্লান্তি সব দূর করে দিতে। কিন্তু সেই গানই যদি হয় মৃত্যুর কারণ তবে কেমন হবে একবার ভাবুন তো!
ইউটিউবে গ্লুমি সানডে গানের কভার চিত্র।
বলছিলাম ‘গ্লুমি সানডে‘ গানটির কথা। প্রায় শতাধিক জীবন কেড়ে নেয়া এই গানটি বেশ সাড়া জাগানো ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে। এমনকি গানটির রচয়িতা স্বয়ং শিকার হয়েছেন রহস্যজনক মৃত্যুর। তাই তো গ্লুমি সানডের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হাঙ্গেরির সুইসাইড সং’
গ্লুমি সানডের অপর নাম হাঙ্গেরির সুইসাইড সং।
গানটি নিয়ে আর কিছু বলার আগে দেখে আসা যাক কি ছিল সেই গানের কথায়
"Sunday is gloomy, my hours are slumberless
Dearest the shadows I live with are numberless
Little white flowers will never awaken you
Not where the black coach of sorrow has taken you
Angels have no thought of ever returning you
Would they be angry if I thought of joining you?

Gloomy Sunday

Gloomy is Sunday, with shadows I spend it all
My heart and I have decided to end it all
Soon there’ll be candles and prayers that are sad I know
Let them not weep let them know that I’m glad to go
Death is no dream for in death I’m caressing you
With the last breath of my soul I’ll be blessing you

Gloomy Sunday

Dreaming, I was only dreaming
I wake and I find you asleep in the deep of my heart, here
Darling, I hope that my dream never haunted you
My heart is telling you how much I wanted you

Gloomy Sunday"

গ্লুমি সানডের রচয়িতা 'রেজসো সেরেস'।
১৯৩২ সালে প্যারিসে বসে গ্লুমি সানডে গানটি লিখেছিলেন হাঙ্গেরিয়ান পিয়ানোবাদক এবং সঙ্গীত রচয়িতা রেজসো সেরেস। কারো কারো মতে জায়গাটি প্যারিস নয়, বুদাপেস্টও হতে পারে। ৩৪ বছর বয়সী সেরেস তখন একটুখানি সাফল্যের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন। গান নয়, মূলত কবিতা হিসেবেই প্রথম রচিত হয় গ্লুমি সানডে। পিয়ানোর সি-মাইনর মেলোডির সাথে কম্পোজিশন করা হয় কবিতাটির।

গানটি কে এবং কেন লিখেছিলেন তা নিয়ে আজ অবধি জল কম ঘোলা হয়নি। রেজসো সেরেসকে যদিও গানটির রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তা সত্ত্বেও গানটির পেছনের কাহিনী হিসেবে একাধিক মতভেদ রয়েছে। সবচেয়ে প্রচলিত মত অনুযায়ী জানা যায়, মামলা-মোকদ্দমার ফেরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন সেরেস। তাকে স্বান্তনা দিতে একটি কবিতা লিখে পাঠান ছোটবেলার বন্ধু লাজলো জেভার। সেই কবিতাটি সেরেসের অন্তর ছুঁয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে পিয়ানোর সাহায্যে সুর দিয়ে এটিকে গানে রুপান্তরিত করেন সেরেস। অন্য একটি মত অনুযায়ী, সেরেসের হাত দিয়েই রচিত হয় গ্লুমি সানডে।

অপর একটি ব্যাখ্যা মতে, প্রেমিকা সেরেসকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তিনি এতটাই বিষণ্ণ হয়ে পড়েন যে সুর করে ফেলেন গ্লুমি সানডের মতো মন খারাপ করা গান। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীর বর্ণনা এবং তার অন্তিম পরিণতি কি হতে পারে সেই চিন্তা-ভাবনারই প্রতিফলন এই গানটি। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। হাঙ্গেরিতেও চলছিল চরম অর্থনৈতিক মন্দা আর ফ্যাসিবাদ। সব মিলিয়ে দুর্বিষহ দিন কাটছিল সেরেসের। সেরেস তার অন্তরের সমস্ত বেদনা একত্রিত করে ঢেলে দিয়েছিলেন এই গানটির প্রতিটি সুরে। আর সে কারণেই অচিরেই তার বিষণ্ণতা ছুঁয়ে গিয়েছিল গীতিকার লাজলো জাভোরকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা।
গানটিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে বেশ কিছু মিথও । বলা হয়, সুন্দরী এক নারী গানটি প্লেয়ারে চালিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। আবার এক ব্যবসায়ীর পকেট থেকে সুইসাইড নোট হিসেবেও পাওয়া যায় গ্লুমি সানডে। হাঙ্গেরির দুই কিশোরী এই গান গাইতে গাইতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নদীতে এমন কথাও শোনা যায়। কেউ দেখেনি, কেউ শোনেনি অথচ এই মিথগুলো দিব্যি প্রচলিত রয়েছে মানুষের মুখে মুখে।
আরেকটি একটি উল্লেখযোগ্য মত হলো গ্লুমি সানডে গানটি শুনে আত্মহত্যা করা ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন স্বয়ং জাভোরের প্রেমিকাও। মতান্তরে জাভোরের প্রেমিকা তার সুইসাইড নোটে মাত্র দুইটি শব্দ লিখে গিয়েছিলেন- ‘গ্লুমি সানডে’। কাজেই সেরেসের মতো জাভোরও ছিলেন একাকী। সুতরাং দুজন দুজনের মনের কথা বুঝে ফেলেছিলেন এক নিমিষেই। এবার তাদের প্রয়োজন ছিল একটি সুরেলা কণ্ঠের। সেই অভাব পূরণ করতে ১৯৩৫ সালে এগিয়ে আসেন পল কালমার। গানটির কথার সারমর্ম ছিল অনেকটা এমন- গায়ক তার প্রেমিকার মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল হয়ে আত্মহত্যা করতে চান যাতে অন্তত মৃত্যুর পরে হলেও তাদের দুজনের আত্মা একত্রিত হতে পারে। বর্তমানে গানটির যে সংস্করণ সর্বত্র শোনা যায় তা ১৯৪১ সালে বিলি হলিডে রেকর্ড করেন।
বিলি হলিডে।
১৯৩৬ সালে হাঙ্গেরিয়ান এই গানটিকে ইংলিশে রেকর্ড করেন হল ক্যাম্প যেখানে কথাগুলো অনুবাদ করতে সহায়তা করেন স্যাম এম লিউইস। লিউইসের লেখা গানটি এবার সরাসরি প্ররোচিত করে আত্মহত্যার পথে। ধীরে ধীরে গানটির নামই হয়ে গেল হাঙ্গেরিয়ার আত্মঘাতী গান। যথাযথ প্রমাণসহ অসংখ্য ব্যক্তির আত্মহত্যার খবরে নড়েচড়ে বসেন সবাই।

‘৩০ এর দশকে পাওয়া খবর অনুযায়ী এই গানটির জের ধরে আমেরিকা ও হাঙ্গেরিতে আত্মহত্যা করেন ১৯ জন, মতান্তরে সংখ্যাটি ২০০ বলেও শোনা যায়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো আত্মহত্যাকারীদের সবার সুইসাইড নোটেই পাওয়া গেছে গ্লুমি সানডের লিরিক্স। জনমত প্রচলিত আছে, এই গানটি বারবার শুনতে শুনতে শ্রোতাদের মধ্যে জীবনের প্রতি এক ধরণের বিতৃষ্ণা চলে আসে এবং সেখান থেকেই তারা বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। ২ জন তো গানটি শুনতে শুনতে গুলি করে নিজেদের মাথার খুলিই উড়িয়ে দিয়েছেন! এরপরও কি গানটি যে অভিশপ্ত তা মানতে কারো কোনো আপত্তি থাকতে পারে?

শ্রোতাদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় হাঙ্গেরিতে গানটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অথচ হাঙ্গেরি কিন্তু এমনিতেও আত্মহত্যার হারের দিক থেকে বিশ্বের প্রথম সারির একটি দেশ। প্রতি বছর লাখে প্রায় ৪৬ জন মানুষ সেখানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তারপরও অভিশপ্ত গান হিসেবে স্বীকৃতি পায় গ্লুমি সানডে। পরবর্তীতে ৪০ এর দশকে বিবিসি ও গানটির লিরিক শোনানো বন্ধ করে শুধুমাত্র ইন্সট্রুমেন্টাল বাজানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ভাষ্যমতে, আত্মহত্যার প্ররোচনা না থাকলেও এই গানটি কাউকে যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। কাজেই বিলি হলিডের গ্লুমি সানডে সংস্করণটি সব জায়গা থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়। ২০০২ সালে এসে গানটির উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে রেডিও চ্যানেলগুলো।

পত্রিকায় সেরেসের আত্মহত্যার খবর।
গানটির প্রভাবেই কিনা কে জানে, গ্লুমি সানডে রচনার ৩৫ বছর পরে গানটি গাইতে গাইতে সেরেস তার চার তলা অ্যাপার্টমেন্টের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন ১৯৬৮ সালে। কেন একটি মাত্র গান এত বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ালো তা আজও এক রহস্য। তবুও গানটিকে ঘিরে সবার কৌতূহলের যেন কোনো শেষ নেই। এলভিস কোস্টেলো, সারাহ ম্যাকল্যাচলান, হেথার নোভা প্রমুখ সংগীত শিল্পী সাম্প্রতিক সময়ে গ্লুমি সানডের নতুন নতুন সংস্করণ রেকর্ড করেছেন।
রলফ সুবলের চলচ্চিত্র ‘গ্লুমি সানডে’।
গ্লুমি সানডে গানটিকে ভিত্তি করে ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচার এবং একটি ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী নিয়ে একই নামে ১৯৯৯ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন পরিচালক রলফ সুবল। এখানে তিনি ইতিহাস এবং ফিকশনের মধ্যে একটি সমন্বয় ঘটিয়েছেন।

তবে গান শুনুন আর চলচ্চিত্রই দেখুন, আত্মহত্যার পথে না হাঁটার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। কারণ আত্মহত্যা কখনোই কোনো পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে না। বেঁচে থেকে কঠিন সব সমস্যার মোকাবেলা করে দিন শেষে বিজয়ীর হাসি হাসতে পারাই তো প্রকৃত বীরের কাজ।