Showing posts with label পৌরা‌নিক কা‌হিনী. Show all posts
Showing posts with label পৌরা‌নিক কা‌হিনী. Show all posts

Friday, October 5, 2018

ড্রাগনকাহিনী : যেভাবে মানবসভ্যতায় আগমন ঘটেছিলো আগুনমুখো ড্রাগনদের।

আমাদের শৈশবের স্মৃতিগুলোকে অল্প যে ক’টি জিনিস অতিরিক্ত মাত্রায় রাঙিয়ে তুলতে পেরেছিলো, রুপকথার গল্প সেগুলোর মাঝে অন্যতম। আমাদের এই উপমহাদেশীয় রুপকথার গল্প দিয়ে শুরু হয় সেই যাত্রা, যেখানে মিশে থাকে ভূত-প্রেত-দৈত্য-দানো-শাকচুন্নির মতো কাল্পনিক চরিত্রগুলোর সাথে রাজপুত্রের যুদ্ধজয়, থাকে সাধারণ কোনো মানুষের অসাধারণ বুদ্ধির জোরে সেসব প্রেতাত্মার হাত থেকে বেঁচে যাবার বুদ্ধিদীপ্ত কাহিনী প্রভৃতি।
টিভি সিরিয়ালে দেখা ড্রাগন।
একটু বড় হলে, এবং সেই সাথে আগ্রহ টিকে থাকলে, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের নানা রুপকথার বইও পড়া শুরু করে অনেকে। তখন চীনা, জাপানী, মিশরীয়, গ্রিক, রোমান, নর্স, রুশী, আফ্রিকান রুপকথার বইতে ভরে যেতে থাকে আমাদের বইয়ের তাক, ডানা মেলতে থাকে আমাদের কল্পনার প্রজাপতি, রঙিন থেকে রঙিনতর হয়ে উঠতে থাকে আমাদের শৈশব-কৈশোর।
ঠাকুমার ঝুলি রাঙিয়ে তুলেছিল আমাদের অনেকের শৈশবকেই।

বিদেশী রুপকথাগুলোর যেসব প্রাণী আমাদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে, ড্রাগন নিঃসন্দেহে এর মাঝে শীর্ষস্থানীয়। কী এক বিচিত্র রকমের শক্তিশালী প্রাণী। বিশাল তার দেহ, যা দেখলেই পিলে চমকে যায়, যার ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায় বিশাল একটি এলাকা। আছে বিশাল দুটি ডানা, যার ঝাপ্টায় ভেঙে পড়ে বাড়িঘর, মারা পড়ে অগণিত মানুষ। লেজে থাকে বড় বড় কাটা, যার একটি ধাক্কা নিমিষে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয় তার সাথে লড়াই করতে আসা মানুষগুলোকে। আছে সারা গায়ে পুরু চামড়া ও আঁশের আস্তরণ, যার সামনে অচল হয়ে পড়ে প্রচলিত প্রায় সব অস্ত্র, অসহায় হয়ে পড়ে শত শত দক্ষ যোদ্ধাও। নিঃশ্বাসে যার বের হয় কালো ধোঁয়া, যে ধোঁয়া মনকেও ভয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

আর আছে মুখ থেকে বের হওয়া লেলিহান আগুনের শিখা, চরম ক্রোধের মুহূর্তে যার নিঃসরণ পাল্টে দিতে পারে গোটা যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি, পুরো রণাঙ্গনকে পরিণত করতে পারে নরকেরই ছোটখাট একটি অগ্নিকুণ্ডে। ড্রাগন এমনই ভয়ানক এক প্রাণী। তবে মানবজাতির সৌভাগ্য, যে প্রাণীকে তারা এত ভয়াবহ রুপে সাজিয়েছে, সেই প্রাণী কেবল তাদের কল্পনাতেই থেকে গেছে। বাস্তবে সে আসলে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারতো, তা বোধহয় না বললেও চলে!
শিল্পীর কল্পনায় ফুটে ওঠা ড্রাগন।
একেক সংস্কৃতিতে এই ড্রাগন এসেছে একেক রুপ নিয়ে। কোথাও বেশ সদাশয়, কোথাও আবার বেশ ভয়াবহ এক প্রাণী হিসেবে। তবে উভয়ক্ষেত্রেই তাকে হত্যা করা ছিলো বেশ দুরূহ একটি ব্যাপার। এটা সেই এলাকার ভৌগলিক অবস্থানের উপরও নির্ভর করতো। প্রাচ্যের সংস্কৃতিতে ড্রাগনদেরকে দেখা যায় বেশ জ্ঞানী এক সত্ত্বা হিসেবে, সমুদ্র ও পানির উপর যাদের রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। এর পাশাপাশি ড্রাগনকে সাধারণ মানুষের প্রতি বেশ দয়ালু হিসেবে দেখার রীতিও দেখা যায় এখানে, যাদের প্রভাবে দূর হয়ে যায় যাবতীয় অপপ্রভাব।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে আবার ড্রাগন এসেছে পুরোপুরি বিপরীত রুপে। এখানে সে বিশালদেহী, ভয়ানক এক প্রাণী, যে কি না হত্যা, ধ্বংসেই মত্ত থাকে সারাদিন। তার বাস এমন দুর্গম, অন্ধকারাচ্ছন্ন, বিপজ্জনক স্থানে, যেখানে যেতে মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। তবে এই ড্রাগনরা একটি কাজ করতো। তারা ছিলো বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির পাহারাদার।
শিংওয়ালা ড্রাগন।
প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য, যে সংস্কৃতির কথাই বলা হোক না কেন, উভয়ক্ষেত্রেই মধ্যযুগের আগপর্যন্ত ড্রাগনের কোনো ডানা গজায়নি! অর্থাৎ, তখন পর্যন্ত গল্পকারেরা ড্রাগনের ডানা জুড়ে দেননি। এই সময়কাল থেকে পাশ্চাত্যের ড্রাগনগুলোকে ডানাওয়ালা হতে দেখা যায়, অন্যদিকে প্রাচ্যের ড্রাগনগুলো আগের মতোই থেকে যায়, অর্থাৎ ডানাবিহীন।
ড্রাগন নিয়ে উপকথারও কমতি নেই। বিশালাকায় এই প্রাণীটির রক্তের কথাই ধরা যাক না। বিভিন্ন উপকথায় এসেছে, কেউ যদি ড্রাগনের রক্তে ডুবানো ছুরি বা তলোয়ার দিয়ে কাউকে আঘাত করে, তবে আহত ব্যক্তির ক্ষত কখনোই সারবে না। এটা তো গেলো ড্রাগনের রক্তের খারাপ দিক। আবার এর ভালো দিকও আছে। এই রক্ত নাকি একজন মানুষকে ভবিষ্যতে দেখার ক্ষমতাও দিতে পারতো। প্রাচ্যের ড্রাগনগুলো আবার ইচ্ছেমতো তাদের আকার পরিবর্তন করতে পারতো, এমনকি চাইলে ধারণ করতে পারতো মানুষের আকৃতিও!
গেম অফ থ্রোন্স টিভি সিরিজের একটি পর্বে ড্রাগনের আক্রমণে পুড়ে ছারখার শত্রুশিবির।
কালে কালে গল্পকারদের হাতে পড়ে ড্রাগন যে কোথা থেকে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, উপরের লেখা পড়ে তার কিছুটা হয়তো অনুমান করা যায়। এই সিরিজের পরবর্তী পর্বগুলোতে এই সম্পর্কে আরো আলোকপাত করা হবে। কিন্তু, একেবারেই কাল্পনিক একটি প্রাণী বিশ্বব্যাপী মানুষের মনে জায়গা করে নিলো কীভাবে- কখনো কি এই প্রশ্নটি আপনার মনে উঁকি দিয়েছে? ড্রাগনের নানা কাহিনী গল্পের বইয়ে পড়ে, কিংবা হাল আমলে অত্যন্ত জনপ্রিয় গেম অফ থ্রোন্স টিভি সিরিজে ডেনেরিস টার্গারিয়েন ‘ড্রাকারিস’ বলামাত্র আগুনের লেলিহান শিখায় সবকিছু ছারখার করে দেয়া ড্রাগন প্রকৃতপক্ষে কোথা থেকে আসলো, সেই প্রশ্ন কি আপনাদের মনের জানালায় কখনো টোকা দিয়ে যায়নি?
দেরি না করে চলুন তাহলে ড্রাগন নিয়ে শুরু হওয়া আমাদের এই উপকথাভিত্তিক সিরিজের প্রথম পর্বে সেই ইতিহাসেরই অনুসন্ধান করে আসা যাক।

কীভাবে মানবসমাজে আগমন ঘটলো ড্রাগনদের?

প্রশ্নটি রাখা হয়েছে একেবারে সরাসরি, তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এর সরাসরি কোনো উত্তর নেই। শত-সহস্র বছর আগে থেকে বিভিন্ন উপকথায় ড্রাগনদের উপস্থিতির কথা জানা যায়। আর কীভাবে সেগুলোতে এই প্রাণীগুলো স্থান করে নিলো, এর পেছনে গবেষকগণ দিয়েছেন নানা রকম যুক্তি। এখন একে একে আমরা সেগুলোই জানার চেষ্টা করবো

(১) কুমিরঃ

কুমিরের কথা বলতে গেলে এখানে দু’প্রজাতির কুমির নিয়ে আলাপ করতে হবে।
ফ্লোরিডার সেইন্ট অগাস্টিন ক্রোকোডাইল ফার্মের একটি নোনাপানির কুমির।
প্রথমেই আসবে সল্টওয়াটার ক্রোকোডাইল, তথা নোনাপানির কুমিরের নাম, যা একইসাথে এস্টুয়ারাইন ক্রোকোডাইল, ইন্দো-প্যাসিফিক ক্রোকোডাইল, মেরিন ক্রোকোডাইল, সী ক্রোকোডাইল প্রভৃতি নামে পরিচিত। বর্তমান বিশ্বের বুকে বিচরণ করে বেড়ানো সরিসৃপদের মাঝে এই নোনাপানির কুমিরই সর্ববৃহৎ। এরপরেই আসবে নাইল ক্রোকোডাইল, তথা নীলনদের কুমিরদের নাম। এই কুমিরগুলো আফ্রিকার সর্ববৃহৎ মিঠাপানীর শিকারী প্রাণী। এছাড়া দৈর্ঘ্যের দিক থেকে নোনাপানির কুমিরের ঠিক পরেই রয়েছে এর অবস্থান।
দক্ষিণ আফ্রিকার লা বনহুর ক্রোকোডাইল ফার্মের কিছু নীলনদের কুমির।
নোনাপানির কুমিরগুলো ভারতের পূর্ব উপকূল থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলে দেখা যায়। নীলনদের কুমিরগুলোকে সাব-সাহারান আফ্রিকার নদী, হ্রদ ও অন্যান্য জলাভূমিগুলোতে দেখা যায় এখন। তবে আগেকার দিনে তাদের বিস্তার আরো অনেক জায়গা জুড়েই ছিলো। ইতিহাস বলে, নীলনদের এই কুমিরগুলোকে এককালে ভূমধ্যসাগরের উত্তরাঞ্চলেও দেখা যেত। অর্থাৎ দক্ষিণ ইতালি, গ্রিস ও স্পেনের অধিবাসীদের মাঝে মাঝেই মুখোমুখি হতে হতো জলের এই দানবদের সাথে।
কুমিরের সাথে মিল রেখে চিত্রিত কাল্পনিক ড্রাগন।
২০ ফুট পর্যন্ত লম্বা এই নীলনদের কুমিরেরা তাদের শরীরের মধ্যভাগ একেবারে ভূমি থেকে তুলে দাঁড়াতে সক্ষম, যা সাধারণত হাই ওয়াক (High Walk) নামে পরিচিত। নোনাপানির কুমিররা তো আরো এককাঠি সরেস। লম্বায় মাঝে মাঝে ২৩ ফুট ছুঁয়ে ফেলা এই প্রাণীগুলো শিকারকে ধরতে কখনো কখনো তো পানি থেকেই উপরের দিকে লাফিয়ে ওঠে। এখান থেকেই ধারণা করা হয়, নীলনদের কুমিরদের এই আচরণই হয়তো আস্তে আস্তে গল্পকারদের এমন ড্রাগন চরিত্র তৈরিতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, যা তার পেছনের পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে শত্রুকে খতম করে দেয়।

(২) ডায়নোসরঃ

এবার আসা যাক ডায়নোসরদের কাছে। ড্রাগনদের অস্তিত্ব না থাকুক, বিশালাকায় ডায়নোসররা যে এককালে সত্যি সত্যিই এই ধরনীর বুকে বিচরণ করে বেড়িয়েছে, তা তো আজ সবাই জানে। অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদই মনে করেন, প্রাচীনকালে মানুষজন যখন ডায়নোসরদের বিশাল বিশাল সব ফসিল খুঁজে পেত, তখন থেকেই মানুষের মনে ধীরে ধীরে ড্রাগনের উপকথা জন্ম নিতে থাকে।
শিল্পীর কল্পনায় যখন পৃথিবীর বুকে বিচরণ করতো ডায়নোসররা।
উদাহরণস্বরুপ, ক্বিজিয়াংলং ডায়নোসরের কথা বলা যায়। ৪৯ ফুট, অর্থাৎ প্রায় পাঁচতলা ভবনের সমান উঁচু এই ডায়নোসরটির প্রজাতি আজ থেকে প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াতো। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে চীনের হেবা গ্রামের কৃষক চাই চ্যাংমিং সর্বপ্রথম এর একটি কশেরুকা খুঁজে পান। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে নিকটবর্তী ক্বিজিয়াং জেলার একটি কনস্ট্রাকশন সাইটে ডায়নোসরটির ফসিলের বেশ বড় একটি সংগ্রহ আবিষ্কৃত হয়।
আজকের দিনে জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবার বদৌলতে আমরা হয়তো দেখেই বলে দিতে পারছি, এটা অমুক প্রজাতির ডায়নোসরের ফসিল। কিন্তু একটু শত-হাজার বছর আগেকার মানুষগুলোর কথা ভাবুন। তাদের কাছে তো আর আজকের দিনের মতো জ্ঞান, প্রযুক্তির কিছুই ছিলো না। ফলে অতিকায় সেসব ফসিলের সন্ধান তারা যখন পেতো, তখন তারা ড্রাগনের মতো অতিকায় কোনো প্রাণীর কথা যে কল্পনা করবে, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কারণ ইতিহাস বলে, খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক থেকেই চীনে ডায়নোসরের ফসিল নিয়ে গবেষণা চলছে।

(৩) তিমিঃ

নীল তিমি।
বৃহদাকার প্রাণীদের কথা আসবে, আর সেখানে তিমি অনুপস্থিত থাকবে, সেটা কী করে সম্ভব? কেউ কেউ তাই মনে করেন, তিমির মতো বৃহদাকার প্রাণীদের সন্ধান পাওয়াটাও হয়তো ডায়নোসরের উপকথা গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। প্রাচীনকালে মানুষজন যখন তিমির অস্থির সন্ধান পেতো, তখন এই প্রাণীটি সম্বন্ধে তাদের জানার সুযোগ ছিলো খুবই সীমিত। ফলে একদিকে সীমিত জ্ঞান, অপরদিকে বিশালাকার অস্থি- এই দুইয়ে মিলে মানুষের মনে তিমি সম্পর্কে ভয়ঙ্কর এক শিকারী প্রাণীর প্রতিচ্ছবি গড়ে তুলেছিল, যা থেকেও ড্রাগনের উৎপত্তি হতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।


(৪) গোয়ানাঃ


অস্ট্রেলিয়ান প্রাণী গোয়ানা।
অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে প্রায় ২৫ প্রজাতির গোয়ানার বসবাস, যেগুলো মনিটর লিজার্ড নামেও পরিচিত। বড়সড় শিকারী এই প্রাণীগুলোর রয়েছে ধারালো দাঁত ও থাবা। সেই সাথে স্থানীয় উপকথাগুলোতেও এদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। শুধু তা-ই নয়, বছরখানেক আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, তাদের দেহে বিষও উৎপন্ন হয়, যা আক্রান্ত প্রাণীর দেহে পরবর্তী সময়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। এসব থেকে ধারণা করা হয়, অন্তত অস্ট্রেলিয়ায় ড্রাগনের উপকথা জন্মের পেছনে প্রত্যক্ষ প্রভাব রেখেছে এই গোয়ানা।


(৫) মানবমনঃ


মানুষের বহুমাত্রিক কল্পনা।
দিনশেষে অবশ্য সন্দেহের তীর যদি মানুষের দিকেই তাক করা হয়, সেটাও বোধহয় খুব বেশি অযৌক্তিক হবে না, অন্তত ‘An Instinct for Dragons’ বইয়ের লেখক, নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড ই. জোন্স সেটাই মনে করেন। তার মতে, বিবর্তন মানুষের মনে শিকারী প্রাণী সম্পর্কে একটি সহজাত ভয়ের প্রবৃত্তি সৃষ্টি করে রেখেছে। তার হাইপোথিসিস অনুসারে, অজগর, শিকারী পাখিসহ বড় বড় শিকারী প্রাণীদের সম্পর্কে ভীতি দেখা যায় হোমিনিডদের বেলায়। সেই ভীতি মানুষের মন থেকে সঞ্চারিত হয়েছে বিভিন্ন উপকথায়, আর এর মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে আজকের ড্রাগনেরা।
ড্রাগনের আগমন নিয়ে আপনার অভিমত কী? উপরে বর্ণিত ৫টি কারণের মাঝে কোনটিকে আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়, এবং কেন? একটু সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করবেন কি?

ড্রাগনদের নিয়ে সিরিজের পরবর্তী পর্বে আবারও দেখা হবে আপনাদের সাথে। ততদিন পর্যন্ত… ড্রাকারিস…

Monday, January 8, 2018

হাজারো কল্পনার আটলান্টিস শহর: রহস্যের শুরু কখন থেকে?

এই বিশ্বের মানুষের কাছে আজও এক রহস্যময় নগরীর নাম আটলান্টিস। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এখনো শহরটির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। শহরটির অস্তিত্ব ছিল, নাকি তা শুধুই কবির কল্পনা- তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর। এই নগরকে নিয়ে লেখা হয়েছে কত গল্প-কবিতা-উপন্যাস! বিজ্ঞানী ও গবেষকদের দল এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই অজানা শহরটিকে। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত সমাধান না হওয়া যত রহস্য আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো এই আটলান্টিস।

কীভাবে জন্ম নিলো আটলান্টিস উপাখ্যানঃ

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর লেখা থেকেই প্রথম জানা যায় আটলান্টিস শহরের কথা। 'টিমেউস''ক্রিটিয়াস' নামে প্লেটোর দুটি ‘ডায়ালগ এ আটলান্টিসের উল্লেখ পাওয়া যায়। ৩৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ দার্শনিক প্লেটো তার শিষ্যদের নিখুঁতভাবে এই নগরটির কথা বলে গেছেন।
গ্রিক দার্শনিক প্লেটো।
প্লেটো তার লেখায় জানিয়েছেন যে, আটলান্টিসের কথা প্রথম জানতে পারেন গ্রিক মহাজ্ঞানী সোলোন। মহাজ্ঞানী সোলোন তথ্যটি আবার মিশরীয় এক ধর্মযাজকের কাছ থেকে পান। মিশর থেকে ফিরে এসে সোলোন তার এক আত্মীয় ড্রপাইডসের কাছে আটলান্টিসের গল্পটি বলেন। পরম্পরায় গল্পটি ড্রপাইডস তার সন্তান, তার প্রপৌত্র ক্রিটিয়াস গল্পটি প্লেটোর কাছে ব্যক্ত করেন।

আটলান্টিস নামকরণের কারণঃ

সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন।
অনেকে মনে করে থাকেন, আটলান্টিক মহাসাগরের কাছে অবস্থিত হওয়ায় নগরটির নামকরণ হয়েছিল আটলান্টিস। প্লেটোর বর্ণনা অনুযায়ী, সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন ছিলেন আটলান্টিসের রাজা। তার স্ত্রী ক্লিওটার ছিলেন খুব সুন্দরী। দ্বীপের ঠিক মাঝখানে পাহাড়ের মাথায় স্ত্রীর জন্য এক অপরূপ প্রাসাদ তৈরি করেন পোসাইডন। তাদের ছিল পাঁচ জোড়া যমজ সন্তান। সমুদ্র দেবতা তার দশ সন্তানকে দ্বীপের বিভিন্ন অংশ শাসনের ভার দিলেন। তার বড় যমজ সন্তানের একজন এটলাসকে দ্বীপের একটি অংশের শাসনের ভার দিলেন। তার নামানুসারে দ্বীপের সেই অংশের নাম হয় আটলান্টিস। পরে এটলাস পুরো দ্বীপ এবং সমুদ্রের চারপাশের অঞ্চল নিজের অধিকারে নিয়ে নেন। এরপরেই পুরো দ্বীপের নাম তার নামে হয়ে যায় আটলান্টিস।

প্লেটোর বর্ণনায় কেমন ছিল আটলান্টিস?

প্লেটোর লেখা থেকে জানা যায়, আটলান্টিস ছিল এক স্বর্গোদ্যান। তা ছিল এক ‘সব পেয়েছি’র দেশ। অত্যন্ত উর্বর ছিল সেখানকার মাটি, সেখানে রকমারি ফসল ফলাতো কৃষকরা। আর তাতে ফলতো নানা ফলমূল, শাকসবজি। প্রচুর পরিমাণে ফসল ফলতো বলে নগরীতে কোনো অভাব ছিল না। মনমাতানো গন্ধে ভরা রং-বেরঙের সুন্দর ফুলে ভরে থাকতো সবুজ এই রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। পাহাড়, সমুদ্র আর অরণ্যে ঘেরা অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই রাজ্যে সোনা, রূপো, তামা  ইত্যাদি খনিজ সম্পদেরও কোনো অভাব ছিল না। সেচ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত উন্নত। দিগন্ত ‍বিস্তৃত ফসলের মাঠ পেরিয়ে নীলচে পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল কৃষকদের বাড়ি।
কবির কল্পনায় আটলান্টিস শহর।
আটলান্টিস নগর ঘিরে ছিল সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ, বন্দর, মন্দির। সোনা ও রূপার কারুকার্যে ভরা সুন্দর সুন্দর অট্টালিকা। আর ছিল এক সমুদ্র দেবতার মূর্তি। রাজধানীটি ছিল এক সবুজে ঘেরা পাহাড়ের চূড়ায়। সেই পাহাড়ের চারিদিক ঘিরে ছিল বেশ কয়েকটি পরিখা। পরিখাগুলো আবার পরস্পরের সাথে খাল দিয়ে যুক্ত ছিল। বাইরের পরিখাটি খাল দিয়ে যুক্ত ছিল সমুদ্রের সাথে। সমুদ্রপথে বিভিন্ন দেশ ও রাজ্যের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য এ খালগুলো ব্যবহার করা হতো।
নগরীর বাড়িগুলোতে ছিল আধুনিক সব ব্যবস্থা। দামি ধাতুর কাজ করা পাথরের দেওয়াল, বিশাল বিশাল সব সোনার মূর্তি, গরম আর ঠাণ্ডা জলের ঝরণা, আরো সব নানা মজার জিনিস। এই উন্নত রাজ্যে ছিল এক সুগঠিত বিশাল সেনাবাহিনী। প্লেটোর অনবদ্য বর্ণনায় শহরটি আশ্চর্যভাবে যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। এ থেকে অনুমান করা যায়, আটলান্টিসের লোকজনের মধ্যে কেউ কেউ দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, স্থপতিও ছিলেন।
কল্পনার মানচিত্রে আটলান্টিস নগর।
কিন্তু অনেক গবেষকই এ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, প্লেটো যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার সময়েরও নয় হাজার বছর আগে প্রস্তর যুগের শুরুর দিকে এরকম উন্নত বুদ্ধিদীপ্ত নৌশক্তিসম্পন্ন সভ্যতা পৃথিবীর বুকে গড়ে ওঠা সত্যিই অকল্পনীয়।

কীভাবে বিলুপ্ত হলো এই নগরী?

প্লেটোর বর্ণনানুযায়ী, যিশু খ্রিস্টের জন্মের ১,৫০০ বছর আগে এই নগরীর বিলুপ্তি ঘটে। এ নগরের ধ্বংস হওয়া নিয়ে প্লেটো বলেছেন, পোসাইডন তার দশ ছেলেকে দেশটির একেক অংশ শাসনের ভার দেন। এমনিতে বেশ শান্তিই ছিল। কিন্তু ক্রমশই দশজনের মধ্যে বিরোধ বাড়তে লাগল। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের রাজ্যের সীমা বাড়াতে চাইল। আটলান্টিসের নির্মল আকাশে লোভ আর হিংসার ছায়া পড়ল। স্বর্গের জিউস তখন ঠিক করলেন, এদের শিক্ষা দিতে হবে। সেজন্যই দেবতাদের ডেকে তড়িঘড়ি করে এক সভার আয়োজন করলেন তিনি। প্লেটো ঠিক এখানটায় তার গল্প শেষ করে দিলেন। তারপর আর কী হলো তা আর জানা গেল না। কিন্তু অনেকে এই গল্পের পরিসমাপ্তি টানেন এই বলে যে, স্বর্গের দেবতা জিউসের রোষানলে পড়ে এই নগরী ধ্বংস হয়ে যায়।
স্বর্গের দেবতা জিউস।
কিন্তু পরবর্তীতে অনেক গবেষকই আটলান্টিসের ধ্বংস হওয়া নিয়ে নানা মত রেখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রিক পুরাতাত্ত্বিক অ্যাঞ্জেলোস গ্যালানোপুলোসের অভিমত। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষে তার তত্ত্বটি প্রকাশ পেলে চমকে গিয়েছিলেন সবাই। তিনি বললেন, ১,৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ এক ভয়ানক আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছিল ভূমধ্যসাগরের সান্তোরিনি দ্বীপে। আগ্নেয়গিরির হঠাৎ জেগে ওঠা ও তার দরুণ এক ভয়াবহ ভূমিকম্প ও প্রবল জলোচ্ছাসের সৃষ্টি হয় পুরো নগর জুড়ে। ফলে এক রাতের মধ্যে আটলান্টিক মহাসাগরের নীচে তলিয়ে যায় এই শহর। আর সেই সাথে মুছে যায় এক উন্নত সভ্যতার যত চিহ্ন।
আটলান্টিসের ধ্বংসের পিছনে প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রধান কারণ বলে অনেকে মনে করেন।
টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া সমুদ্র গবেষক রবার্ট বালার্ডের মতে, আটলান্টিসের এই ধ্বংসের তথ্যটি সঠিক হতে পারে। কারণ, ইতিহাসের এই সময়টায় বড় ধরনের বন্যা এবং আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের তথ্য পাওয়া গেছে।

কোথায় ছিল আটলান্টিস?

আটলান্টিস নগরটি কোথায় ছিল তা নিয়ে জল্পনার কোনো শেষ নেই। আটলান্টিসের খোঁজে অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর অনুসন্ধান চলেছে এবং এখনো চলছে। তবে এখনো এর প্রকৃত অবস্থান কোথায় ছিল তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানকে হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু তার পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ তারা তুলে ধরতে পারেননি। অনেকের বিশ্বাস, গ্রিক দ্বীপ ক্রিটের কাছাকাছি ছিল আটলান্টিস।
অনেকের ধারণা, সমুদ্রের নিচে কোথাও এখনো রয়েছে সেই কল্পনার নগরী।
তবে কোনো কোনো গবেষকের মতে, গ্রিসের সান্তোরিনি শহরটিই হচ্ছে অ্যাটলান্টিস। আবার কারো মতে, বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার কাছে, কারো ভাবনায় আফ্রিকায়ও নাকি থাকতে পারে আটলান্টিস। কারো কারো মতে, আটলান্টিস গ্রিক পুরাণের শহর টান্টালিসও হতে পারে। কারণ হিসাবে শোনা যায়, জিউস রেগে গিয়ে বজ্রপাত করেন টান্টালিসের উপরেও। আবার ফ্লোরিডার উপকূলে বিমিনি দ্বীপের পাশে দিয়ে হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিসের একটি পথের অস্তিত্ব রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
আটলান্টিক মহাসাগরের নীচে হারিয়ে গেছে সেই স্বপ্নের নগর।
তবে প্লেটোর দেয়া তথ্যমতে, আটলান্টিক মহাসাগর থেকে উৎপত্তি হওয়া একটি দ্বীপই হচ্ছে আটলান্টিস। বলা হয়ে থাকে, হারকিউলিস পিলার নামে এক ছোট দ্বীপের অস্তিত্ব ছিল তার পাশে। বর্তমানে তা জিব্রাল্টার প্রণালী হিসেবে পরিচিত। তাই অনেকে মনে করে থাকেন, জিব্রাল্টার প্রণালীর কাছাকাছি কোথাও ছিল আটলান্টিস শহরটি।
১৯৬৮ সালে এগার ক্যাচি তার বই ‘On Atlantis’ এ উল্লেখ করেন, মিশরের নীলনদ এবং স্ফিংস এর মূর্তির মাঝে হল অব রেকর্ডস যেখানে আবিষ্কৃত হয়েছে, সেখানেই পাওয়া যেতে পারে আটলান্টিসের ধ্বংসাবশেষ।
স্পেনের ডোনা ন্যাশনাল পার্কের সোয়াম ফরেস্টের নীচে আটলান্টিসের খোঁজ পাওয়া যাবে বলে ধারণা করছেন প্রত্নতত্ত্ববিদ রিচার্ড ফ্রেউন্ড ও তার দল।
২০১১ সালে হাটফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ রিচার্ড ফ্রেউন্ড ও তার দল কয়েকটি শহরের সন্ধান পান যেখানে আটলান্টিস নগরটি ছিল বলে মনে করা হয়। স্পেনের এক শহর কাদিজের উত্তরে ডোনা ন্যাশনাল পার্কের সোয়াম্প ফরেস্টের নীচে এই শহরগুলো খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে আটলান্টিসের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে কোনো গবেষকই এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি।

আটলান্টিস কল্পনা নাকি সত্যি?

আটলান্টিস নিয়ে প্লেটোর এই কাহিনী কোনো পৌরাণিক কল্পকাহিনী অনুপ্রাণিত কিনা তার ব্যাপারে ইতিহাসবিদরা এখনো একমত হতে পারেননি। তবে ক্রিটিয়াস দাবি করেছিলেন যে, মহাজ্ঞানী সোলোনের কাছ থেকে তিনি এই গল্পটি জানতে পারেন। সোলোন ছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের এথেন্সের বিখ্যাত নীতিনির্ধারক। অনেক পণ্ডিত মনে করেন, তিনি যখন মিশরে যান, সেখানে প্রাচীন কিছু পুঁথি থেকে এথেন্স এবং আটলান্টিস সম্পর্কে জানতে পারেন।
শিল্পীর তুলিতে আঁকা আটলান্টিস নগরী।
তবে আরেক পক্ষ মনে করেন, প্লেটো প্রাচীন কিছু যুদ্ধের কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আটলান্টিসের এই কাহিনীটি রচনা করেন। অনেকেই মনে করেন, আটলান্টিস প্লেটোর কল্পনায় বোনা এক নগর সভ্যতা, যা তিনিই সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তার ধ্বংস করেছেন। তবে, পৃথিবীর অধিকাংশ সংস্কৃতিতেই ‘হারানো সভ্যতার’ উপকথা প্রচলিত রয়েছে। তাই অনেক পণ্ডিতই এসব উপকথার ভিত্তি রয়েছে বলে মনে করেন। তাই কিছু গবেষক আটলান্টিসের বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। আর তাই আটলান্টিস নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

Thursday, August 24, 2017

কাবিল ও হাবিলের করুণ কাহিনী!

কাবিল ও হাবিল নামে দুই ভাইয়ের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের ইতিহাস অনুসারে কাবিল ও হাবিলের মাধ্যমেই প্রথম কুরবানি শুরু হয়।[1] তাদের মধ্য থেকেই পৃথিবীতে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে এবং তাদের মাধ্যমেই মৃতদেহ কবর দেবার নিয়ম চালু হয়।[2] জুমার নামাজের আগে কিংবা কুরবানির ঈদের নামাজের আগে বিশেষ আলোচনায় কুরবানির ইতিহাস সম্বন্ধে আলোকপাত করতে গিয়ে ইমাম সাহেবরা প্রায় সময়ই কাবিল ও হাবিলের ঘটনার উল্লেখ করেন। খ্রিস্টধর্মে তাদেরকে কেইন ও এবেল নামে ডাকা হয়।[3] কাবিল ও হাবিলের ঘটনা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে উল্লেখ করতে হবে তাদের পিতা হযরত আদম (আ:) ও মাতা বিবি হাওয়া (আ:) এর কথা।

হযরত আদম (আ:) ও বিবি হাওয়া (আ:) উভয়ে জান্নাতের সুসজ্জিত বাগানে বসবাস করছিলেন। কিন্তু তাদের পিছু লাগলো ‘ইবলিস’ নামে এক পাপিষ্ঠ শয়তান। ইবলিস চাইলো তারা যেন সুখের জান্নাতে থাকতে না পারে। যতটা না সুখের জান্নাত থেকে বিতাড়িত করার ইচ্ছে ছিল ইবলিসের, তারচেয়েও বেশি ইচ্ছে ছিল তারা যেন আল্লাহর দেয়া আদেশ অমান্য করে তাঁকে নাখোশ করে। আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:)-কে আল্লাহ একটি বিশেষ গাছের ফল খাওয়ার ব্যাপারে নিষেধ করেছিলেন। ইবলিস বেছে বেছে ঐ বিশেষ ফলটিকেই টার্গেট করলো। দুজনকে প্ররোচিত করে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ঐ গাছের ফল খাইয়ে দিলো। আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:) দৃশ্যত পাপ করে বসলেন। জান্নাতে পাপের স্থান নেই, তাই শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিলেন। বলা হলো, পৃথিবীতে ভালো কাজ করে নিজেদের মার্জনা করতে পারলে তারা আবারো জান্নাতে ফিরে যেতে পারবেন।

কিন্তু অশান্তি তারপরও রয়ে গেল, কারণ পৃথিবীতেও অস্তিত্ব বিরাজমান সেই পাপিষ্ঠ শয়তান ইবলিসের। ইবলিস শয়তান তার শেষ চাওয়া হিসেবে আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষ কয়েকটি ক্ষমতা চেয়ে নিয়েছিল। অভিশপ্ত হবার আগে ইবলিস আল্লাহর অনেক ইবাদত করেছিল। এই ইবাদতের প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তাকে তার চাহিদা অনুসারে এই ক্ষমতাগুলো প্রদান করেছিলেন। প্রাপ্ত ক্ষমতাগুলোর মধ্যে একটি হলো, যেকোনো সময় বিশ্বের যেকোনো স্থানে সে অবস্থান করতে পারবে।[4] সে হিসেবে আদম-হাওয়ার পৃথিবীতে চলে আসা তার জন্য তেমন কঠিন কিছু নয়।

যা-ই হোক, পৃথিবীতে আগমনের পর হযরত আদম (আ:) ও বিবি হাওয়া (আ:) এর সন্তান জন্ম হতে লাগলো। ধীরে ধীরে মানুষ বাড়তে লাগলো পৃথিবীতে। কিন্তু এখানে দৃশ্যত একটি সীমাবদ্ধতা থেকে গেল। আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:) যেহেতু পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবী, তাই তাদের পরের প্রজন্মে যত সন্তানের জন্ম হবে তারা সকলেই হবে ভাই-বোন। ইসলামী নিয়ম অনুসারে, ভাই বোনের মাঝে কখনো বিয়ে হয় না। সে হিসেবে এটিই হতো পৃথিবীর শেষ মানব প্রজন্ম। এরপর মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতো। কিন্তু এখানে তো পুরো মানবজাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন, তাই বিশেষ একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে এর সমাধান করা হলো। বিবি হাওয়ার গর্ভে তখন সন্তান জন্ম নিতো জোড়ায় জোড়ায়। প্রতি জোড়ায় একজন ছেলে আর একজন মেয়ে জন্ম হতো। একই জোড়ার ছেলে ও মেয়েরা পরস্পর বিয়ে করতে পারবে না। বিয়ে করতে হলে ভিন্ন জোড়ার কাউকে করতে হবে। কাবিল ও হাবিল ছিল ভিন্ন জোড়ার, তাই তাদের ব্যাপারটি স্বাভাবিক নিয়মেই সমাধান হয়ে যায়। একজন আরেকজনের জোড়ার মেয়েকে বিয়ে করবে।

কিন্তু এখানে একটি সমস্যা দেখা দেয়। হাবিলের জোড়ার মেয়েটি তেমন সুন্দরী ছিল না। সেই তুলনায় কাবিলের জোড়ার মেয়েটি ছিল অনেক বেশি সুন্দরী। নিয়ম অনুসারে হাবিল অধিক সুন্দরী মেয়েটিকে পায় আর কাবিল পায় কম সুন্দরী মেয়েটিকে। কিন্তু কাবিল বেঁকে বসে, সে হাবিলের জোড়ার মেয়েটিকে বিয়ে করবে না। যেভাবেই হোক, নিজের জোড়ার সুন্দরী মেয়েটিকেই বিয়ে করবে।
শিল্পীর তুলিতে আকা একটি কাক অপর একটি কাককে হত্যা করছে।
এমতাবস্থায় পিতা হযরত আদম (আ:) একটি মীমাংসা করলেন। তাদের দুজনকে আল্লাহর নামে কুরবানি দিতে বললেন। যার কুরবানি আল্লাহ গ্রহণ করবেন, তার ইচ্ছাই জয়ী হবে। কার কুরবানি গৃহীত হলো আর কার কুরবানি গৃহীত হলো না, তা কীভাবে বোঝা যায়? তখনকার কুরবানি এখনকার কুরবানির মতো ছিল না। সে সময়ে কোনো জিনিস কুরবানি দিলে আসমান থেকে আগুন এসে ঐ জিনিসকে পুড়িয়ে দিতো। কুরবানির বস্তুকে ভূমি থেকে উপরে কোনো স্থানে উপস্থাপন করা হতো। আকাশ থেকে আগুন এসে যদি বস্তুকে পুড়িয়ে দিতো, তাহলে বোঝা যেতো আল্লাহ কর্তৃক কুরবানী গৃহীত হয়েছে।

পিতা আদম (আ:) এর দেওয়া মীমাংসা অনুসারে তারা উভয়েই কুরবানির বস্তু উপস্থাপন করলো আল্লাহর কাছে। হাবিল একটি সুস্থ ও মোটাতাজা দুম্বা উৎসর্গ করলো আর কাবিল তার কিছু সবজি ও শস্য উৎসর্গ করলো। তখন সবজি ও শস্যও কুরবানির জন্য উৎসর্গ করা যেতো। কোনো কোনো উৎস থেকে জানা যায়, হাবিল উৎসর্গ করেছিল উৎকৃষ্ট মানের দুম্বা আর কাবিলের শস্য ছিল নিকৃষ্ট মানের।[5][6] আল্লাহ হাবিলের কুরবানিকেই কবুল করলেন। উপর থেকে আগুন দিয়ে দুম্বাটিকে পুড়িয়ে নিলেন, কিন্তু কাবিলের শস্যকে কিছুই করলেন না। সে হিসেবে বিয়ের নিয়ম আগের মতোই রইলো, হাবিল বিয়ে করবে কাবিলের জোড়ায় জন্ম নেয়া মেয়েটিকে।

কিন্তু কাবিল এই অপমান সহ্য করতে পারলো না। সে ভাবলো, হাবিলের জন্য তার কুরবানি আল্লাহ গ্রহণ করেননি। কুরবানিতে প্রত্যাখ্যাত হওয়াতে এবং স্ত্রী হিসেবে কাঙ্ক্ষিত মেয়েকে না পাওয়াতে সে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে গেল। ক্রোধের বশে হাবিলকে সে বললো, তোর ইচ্ছা কোনোভাবেই আমি পূরণ হতে দেবো না। প্রয়োজনে তোকে হত্যা করবো, যেন তুই আমার জোড়ার মেয়েটিকে বিয়ে করতে না পারিস।[7] কোনো কোনো উৎস থেকে জানা যায়, তাকে এমন সর্বনাশা ভাবনার উস্কানি দিয়েছিল সেই পাপিষ্ঠ ইবলিস শয়তান।[8]

কাবিলের এমন আচরণে হাবিল অনেক সুন্দর উত্তর দিয়েছিল। সে বলেছিল, আল্লাহ তাদের কুরবানিই কবুল করেন যার উদ্দেশ্য সৎ।[9] আর তুমি আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আমার গায়ে আঘাত করলেও, আমি তোমাকে কিছু করবো না। কারণ আমি আমার প্রতিপালককে ভয় করি।[10] কিন্তু এই কথায় কাবিলের উদ্দেশ্যের কোনো পরিবর্তন হলো না। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে সে হত্যা করলো তার আপন ভাইকে।[11] এরপরই কাবিলের মন গলে যায় এবং অনুভব করে- আহারে, কত বড় ভুল করে ফেললো সে! নিজের ভাইকে নিজ হাতে মেরে ফেললো, এর চেয়ে বড় ধৃষ্টতা আর কী হতে পারে! ভেতরে ভেতরে সে অনেক অনুতপ্ত হলো এবং নিজের অপকর্ম কীভাবে ঢাকবে, তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লো। তখনো মৃতদেহ সৎকারের ব্যাপারে কোনো নিয়ম তৈরি হয়নি, কারণ এর আগে কোনো মানুষের মৃত্যু ঘটেনি।

মৃত দেহটিকে নিয়ে কী করবে এ নিয়ে যখন সে চিন্তায় মগ্ন তখন দেখলো, একটি কাক তার ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে একটি গর্ত করলো। তারপর সেই গর্তে একটি মৃত কাককে টেনে এনে কবর দিয়ে দিলো।[12] এটি দেখে কাবিল ভাবলো, তাকেও হয়তো এভাবে কবর দিতে বলা হচ্ছে। তাই একটি গর্ত করে সে তার ভাইকে কবর দিয়ে দিলো। ইসলামের ইতিহাস অনুসারে এটিই ছিল মানবজাতির প্রথম কবর। কোনো কোনো উৎস থেকে জানা যায়, কাক দুটি ছিল ফেরেশতা এবং এদেরকে আল্লাহই পাঠিয়েছিলেন, যেন এদের দেখে কাবিল শিখতে পারে।[13]
ইসলামি চিত্রশিল্পীর তুলিতে কাকের কবর দেবার ঘটনা।
অনেকে দাবি করে থাকেন, হাবিলের কবর এখনো দেখা যায় এবং এটি সিরিয়ার দামেস্কে অবস্থিত।[14] দামেস্কের উত্তরে একটি স্থান আছে, যা মাকতালে হাবিল বা হাবিলের হত্যাস্থল নামে পরিচিত। এ প্রসঙ্গে হাফিজ ইবনে আসাকির একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন তার একটি বইয়ে। তিনি উল্লেখ করেন,
আহমদ ইবনে কাসির একবার রাসুল (সা:)-কে স্বপ্নে দেখেছিলেন। রাসুলের (সা:) পাশে হাবিলও ছিল। এক প্রশ্নের জবাবে হাবিল তখন কসম করে বললো, এটিই আমার হত্যাস্থল। তখন রাসুল (সা:) হাবিলের দাবিকে সত্য বলে সমর্থন করলেন।[15]
তবে এটি শুধুই স্বপ্ন বলে ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে একে গ্রহণযোগ্য বলে ধরা হয় না।
অনেকে বিশ্বাস করেন এটি আদমপুত্র হাবিলের কবর।
কুরআন শরীফে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত বলা নেই। এমনকি তাদের দুজনের নামও উল্লেখ নেই। শুধু ‘আদমের দুই পুত্র’ নামে তাদের কথা উল্লেখ আছে। তবে তৌরাত গ্রন্থ ও কিছু হাদিসে তাদের ঘটনার বিস্তারিত বলা আছে।[16] ইবনে কাসিরের লেখা ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’তে এই ঘটনার সুন্দর বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে।

ইসলামের দৃষ্টিকোণে কাবিল ও হাবিলের ঘটনার তাৎপর্য অনেক। কাবিল ও হাবিলের ঘটনা উল্লেখের পরপরই কুরআনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়াত আছে। সেখানে উল্লেখ আছে,
কেউ কাউকে হত্যা করলে, সে যেন সমস্ত মানবজাতিকেই হত্যা করলো। আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে, সে যেন সমস্ত মানবজাতিকেই রক্ষা করলো।[17]
এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস আছে। রাসুল (সা:) বলেছেন,
পৃথিবীতে যখনই অন্যায়ভাবে কোনো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, তখন পাপের একটি অংশ অবশ্যই আদমের প্রথম পুত্র কাবিলের উপর পড়ে। কেননা সে-ই প্রথম ব্যক্তি, যে অন্যায় হত্যাকাণ্ডের সূচনা করে।[18]


তথ্যসূত্র ও নোটঃ
  • [1] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ২৭। সংস্কৃতি হিসেবে কোরবানির প্রচলন শুরু হয় হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর সময় থেকে, কিন্তু প্রথম কোরবানির ঘটনা ঘটে হযরত আদম (আ:) এর সময়কালে কাবিল ও হাবিলের মাধ্যমে।
  • [2] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩১
  • [3] Holy Bible, Genesis 4
  • [4] আল কুরআন, সূরা হিজর, আয়াত ৩৬-৩৮।
  • [5] আল-কোরআনে বর্ণিত পঁচিশজন নবী ও রাসুলের জীবনী, মুফতী মুহাম্মদ শফী, সোলেমানিয়া বুক হাউস, ২০১২, পৃষ্ঠা ৬৫
  • [6] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড (বাংলা অনুবাদ), হাফিজ ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা ২১৭
  • [7] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ২৭
  • [8] কোরআনের গল্প, বন্দে আলী মিয়া, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ২০১৪, পৃষ্ঠা ১৫
  • [9] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ২৭
  • [10] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ২৮।
  • [11] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩০।
  • [12] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড (বাংলা অনুবাদ), হাফিজ ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জুন ২০০৭
  • [13] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩১।
  • [14] islamiclandmarks.com/syria/tomb-of-habil
  • [15] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড (বাংলা অনুবাদ), হাফিজ ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা ২১৯
  • [16] আল-কোরআনে বর্ণিত পঁচিশজন নবী ও রাসুলের জীবনী, মুফতী মুহাম্মদ শফী, সোলেমানিয়া বুক হাউস, ২০১২, পৃষ্ঠা ৬৬
  • [17] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩২।
  • [18] আল বিদায়া ওয়ান নিয়াহা সূত্রে মুসনাদে আহমদ।

Tuesday, July 25, 2017

লিলিথ: ইহুদী পুরাণের এক ‘ভয়ংকর সৌন্দর্য’ !!

‘লিলিথ’ নামটির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় এক ধরণের সারল্য, অসাধারণ মাধুর্য। শুনলেই কোনো স্নিগ্ধ ষোড়শীর মুখ ফুটে ওঠে মনে। কিন্তু এই নামটি যে চরিত্রের সাথে জড়িত, সে কি আসলেই পরিচিত তার সারল্যের জন্য? নাকি চরিত্রটিতে আছে সম্পূর্ণ বিপরীত কোনো বৈশিষ্ট্য?

লিলিথের কথাঃ

লিলিথকে পাওয়া যায় ইহুদী মিথলজিতে। ইহুদী মিথলজির বিখ্যাত চরিত্র এই লিলিথ। বিখ্যাত না বলে সম্ভবত ‘কুখ্যাত’ বললেই বেশি মানায়। লিলিথ চরিত্রটি অঙ্কুরিত হয় মূলত ৩য় থেকে ৫ম শতাব্দীর মাঝামাঝিতে, ব্যবিলনীয় তালমুদ বা পুরাণে। শব্দটির প্রচলিত অর্থ রাত্রি হলেও পুরাণের লিলিথ চরিত্রকে দেখানো হয় অন্ধকারের পিশাচ রূপে, যার বিচরণ ছিল রাতের অন্ধকারে। সে ছিল অসচ্চরিত্রের অধিকারিণী, যার কাজ নবজাতক শিশু চুরি করে নিয়ে যাওয়া।
শিল্পীর তুলিতে ফুটিয়ে তোলা লিলিথ, যার হাত থেকে এক শিশুকে রক্ষা করছে এডাম।
ব্যবিলনীয় গ্রন্থে এমনও বলা আছে যে-
"কোনো পুরুষ যদি একা রাতে ঘুমায়, তাহলে সে লিলিথের ফাঁদে পড়তে পারে!"
বলা হতো পুরুষের সাথে মিলিত হবার মাধ্যমে লিলিথ আরো শয়তানের জন্ম দেয়, কেননা লিলিথকে কল্পনা করা হয় অনিয়ন্ত্রিত যৌনতার প্রতীক হিসেবে। সিরিয়ায় একটি প্রস্তর খন্ড পাওয়া যায় যাতে লেখা ছিল-
O flyer in a dark chamber, go away at once, O Lili!
অর্থাৎ লিলিথকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে,
হে লিলি, হে অন্ধকারের উড়ন্ত প্রতীক, চিরদিনের জন্যে চলে যাও!
এতেই বোঝা যায় কতটা ভয়ানক চরিত্র হিসেবে কল্পনা করা হত লিলিথকে। এমনকি নবজাত শিশুদের গলায় বেধে দেওয়া হত তাবিজ যাতে তারা মুক্ত থাকতে পারে লিলিথের কবল থেকে।
ব্যবিলনীয় সভ্যতায় কল্পিত লিলিথ।
কিন্তু এটিই কি লিলিথের প্রকৃত পরিচয়'জেনেসিস রাব্বাহ' যাতে বুক অফ জেনেসিসের  অনেক জটিল তত্ত্বের বোধগম্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তাতে এই লিলিথকে দেখানো হয়েছে এডামের প্রথম স্ত্রী রূপে! শুনতে অদ্ভুত লাগে, তাই না? বরাবর ইভকে আমরা এডামের সাথে কল্পনা করে এসেছি, সেখানে এডামের ‘প্রথম স্ত্রী’ ব্যাপারটা ধাক্কা দেয়ার মতোই! তত্ত্বের সূত্রপাত ইহুদী ধর্মের প্রথম ধর্মগ্রন্থ যাতে বর্ণিত হয়েছে মানবজাতি ও পৃথিবীর সৃষ্টি উপাখ্যান, সেই বুক অফ জেনেসিসের একটি লাইন থেকে। বুক অফ জেনেসিসে ইংগিত দেয়া হয় পুরুষ ও নারীর একই সময়ে সৃষ্টিকে। যাতে বলা হয় (1:27)
So God created man in his own image,  in the image of God created he him, male and female created he them.
অর্থাৎ নর ও নারীর একইসাথে সৃষ্টির বিষয়টি ইহুদী ধর্মে স্বীকৃত। আবার ২:২২ এ এসে দেয়া হচ্ছে এডামের পাঁজরের হাড় থেকে ইভের সৃষ্টির বর্ণনা।

তাহলে সহজেই ধরে নেয়া যায় কোনো কারণে সেই প্রথম সঙ্গিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এডাম। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে গেলে জেনেসিস রাব্বাহতে পাওয়া যায় অসাধারণ এক ঘটনা। জেনেসিস রাব্বাহতে বর্ণিত একটি মিদ্রাশে পাওয়া যায় এডাম-লিলিথের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও পরিণতির উপাখ্যান। পরবর্তীতে ৯ম-১০ম শতাব্দীর দিকে ‘এলফাবেট অফ বেন সিরা’-তে মূলত লেখা হয় লিলিথের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হবার করুণ উপাখ্যান।
কার্ল পোয়েলাথ এর কল্পনায় লিলিথ।
এডামকে সৃষ্টির পর ঈশ্বর তার একাকীত্ব দূর করার কথা ভাবলেন। সঙ্গিনী হিসেবে সৃষ্টি করলেন লিলিথকে। লিলিথ বুদ্ধিদীপ্ত, আত্মসম্মানবোধে পরিপূর্ণ এক নারী, সৃষ্টির প্রথম নারী। তার জন্ম সেই মাটি থেকেই, যা থেকে এডামের জন্ম। যার কারণে পরবর্তীতে লিলিথ মেনে নিতে চায় নি এডামের আধিপত্য। নিজেকে সে দাবী করেছে এডামের সমকক্ষ, যা তৈরী করে এডামের মনে লিলিথের প্রতি বিরুদ্ধ চিন্তা।

মিদ্রাশ অনুযায়ী, সৃষ্টির পরপরই লিলিথের সাথে এডামের দ্বন্দ্ব শুরু হয় মূলত সঙ্গমের সময়। নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবী করা এডাম লিলিথকে বোঝাতে চায় তার জায়গা উপরে নয়, নীচে। লিলিথ তা মানতে অস্বীকার করে। যে শ্রেষ্ঠতার দাবী এডাম করে আসছে, তা সে উড়িয়ে দেয় এক নিমেষে। তার পক্ষে সে যুক্তিও স্থাপন করে। যেহেতু একই মাটি থেকে একই উপায়ে তাদের তৈরী করা হয়েছে, সেহেতু এডাম নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবী করতে পারে না। পারে না তার উপর কর্তৃত্ব করতে। এতসব মতভেদ দেখে স্বর্গে থাকার ইচ্ছা চলে যায় লিলিথের। স্বেচ্ছায় স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নামে লিলিথ!
মর্ত্যের পথে লিলিথ।
লিলিথের ব্যবহারে নাখোশ এডাম যায় স্রষ্টার কাছে, অভিযোগ করে লিলিথের বিরুদ্ধে। এমন সঙ্গিনী তাকে কেন দেওয়া হলো যে তার কথা শোনে না? যে পালিয়ে গেল তাকে ছেড়ে? লিলিথের উপর বিরক্ত স্রষ্টা তার তিন ফেরেশতা পাঠায় লিলিথকে খুঁজে বের করতে। এই তিন ফেরেশতা হলো ‘সেনয়’‘সেনসেনয়’ এবং ‘সেমানগেলফ’। [যাদের নাম পরবর্তীতে তাবিজে লিখে বাঁধা হত নবজাত শিশুদের গলায়, কল্পিত লিলিথের কবল থেকে তাদের রক্ষা করতে।] ফেরেশতারা স্রষ্টার বার্তা নিয়ে যায় লিলিথের জন্য। যদি সে ফিরে আসে এবং মেনে নেয় এডামের কর্তৃত্ব, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যদি সে প্রত্যাখ্যান করে, তাকে সম্মুখীন হতে হবে শাস্তির। প্রতিদিন তাকে প্রত্যক্ষ করতে হবে তার ১০০ সন্তানের মৃত্যু!
লিলিথ এর সিম্বল বা চিহ্ন যাতে যাদুশক্তি আছে বলে মনে করা হয়।
ফেরেশতারা লিলিথকে মিশরের এক সমুদ্র তীরে খুঁজে পায়। তাদের সাথে ফিরে যেতে বলে তাকে। কিন্তু লিলিথ বলে সে আর ফিরে যাবে না। এরপর তাকে শোনানো হয় ফিরে না যাওয়ার শাস্তি। লিলিথ বলে,
My friends, I know God only created me to weaken infants when they are eight days old. From the day a child is born until the eighth day, I have dominion over the child, and from the eighth day onward I have no dominion over him if he is a boy, but if a girl, I rule over her twelve days.”
(আমি জানি ঈশ্বর আমাকে তৈরী করেছেন কেবলই নবজাতকের প্রতি দূর্বল করার জন্য। তাও আমার অধিকার বজায় থাকবে কেবল আটদিন যদি শিশুপুত্র হয় আর কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে তা বারোদিন।)

লিলিথের বিশ্বাস ছিল ঈশ্বর এডামের পক্ষ নেবেন, যেহেতু লিলিথকে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন এডামকে সঙ্গ দেয়ার জন্য। শাস্তি মাথা পেতে নিয়ে স্বর্গ ত্যাগ করে লিলিথ, হয়ে যায় অভিশপ্ত!

সাহিত্যে লিলিথঃ

ইহুদী মিথলজিতে লিলিথকে যেভাবেই প্রকাশ করা হোক না কেন, সাহিত্যিকদের চোখে লিলিথ বরাবরই এক আকর্ষণীয়া নারী চরিত্রেই প্রতীয়মান হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শিল্পীর কল্পনা থেকে আঁকা লিলিথ দেখলেই তা বোঝা যায়। এমনকি লিলিথের উপাখ্যান নিয়ে রচিত হয়েছে সনেট! দান্তে গ্যাব্রিয়েল রোসেতি নামক এক ব্রিটিশ কবি ও চিত্রশিল্পী নিজের কল্পনা থেকে এঁকেছেন লিলিথকে, সেই সাথে ‘লিলিথ’ নামে এক সনেটে বর্ণনা করেছেন তার কল্পনার লিলিথকে-
Of Adam’s first wife, Lilith, it is told
(The witch he loved before the gift of Eve.)
That, ere the snake’s, her sweet tongue could deceive, And her enchanted hair was the first gold.
দান্তে গ্যাব্রিয়েল রোসেতির লেডি লিলিথ।
ইহুদী মিথলজিতে লিলিথকে একদিক থেকে যেমন দেখানো হয়েছে অন্ধকারের প্রতিরূপ হিসাবে, আরেক দিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তার এক বিদ্রোহী রূপ। স্বর্গের সুখ ছেড়ে আসা এক নির্বোধ নারী, কিংবা নিজের অধিকারের জন্যে একাকী লড়ে যাওয়া এক দৃঢ়চেতা চরিত্র। সবই নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির উপর। ইহুদী সাহিত্যিক রুথ ফেল্ডম্যানের ‘Lilith’ সবচেয়ে সুন্দর করে নিজের রূপটি প্রকাশ করেছে-
“Half of me is beautiful, But you were never sure which half.”

Sunday, April 17, 2016

প্রাচীন মিশরের দেব-দেবীদের ইতিকথা!

প্রাচীন পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের জানার আগ্রহের কোনো কমতি নেই। তারা কী করতো, কীভাবে চলাফেরা করতো, তাদের খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিলো, নানা রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি কেমন ছিলো ইত্যাদি নানান বিষয় প্রায় সময়ই আমাদের মাথায় ঘোরাফেরা করে।
পাথরের দেয়ালে খোদাইকৃত প্রাচীন মিশরের বিভিন্ন দেব দেবীর প্রতিকৃতি।
ইতোপূর্বে এ সম্পর্কিত লেখা বিভিন্ন লেখার ধারাবাহিকতায় আজ আমরা পরিচিত হবো প্রাচীন মিশরের নানা দেব-দেবী সম্পর্কে। আদি যুগের মানুষেরা কোন রূপে তাদের কল্পনা করতো, কোন কাজে কোন দেব-দেবীর আরাধনা করতো, আর সেই সাথে কেমনই বা ছিলো সেই দেব-দেবীর নিজেদের গল্প সেই বিষয়গুলোই তুলে ধরা হয়েছে আজকের পুরো লেখা জুড়ে।


ন্যুটঃ

ন্যুট ছিলেন আকাশ ও তারাদের দেবী। তার বিশাল দেহ ভূ-পৃষ্ঠের উপরে একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে মানবজাতিকে রক্ষা করে বলে বিশ্বাস করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। প্রতিদিন রাতে তিনি সৌর দেবতা রা-কে খেয়ে ফেলতেন এবং প্রতিদিন সকালে তাকে আবার নতুন করে তিনি জন্ম দিতেন!

শুঃ

শু ছিলেন শুষ্ক বাতাসের দেবতা। তাকে সাধারণত মাথায় পালক শোভিত একটি মুকুটসহ দেখা যায়। তার কাজ ছিলো মূলত ন্যুটের দেহকে উপরে তুলে রেখে আকাশ ও মাটিকে পৃথক রাখা!

ন্যুট, শু ও গেব।

গেবঃ

গেব ছিলেন পৃথিবীর দেবতা। তিনি ছিলেন একইসাথে আকাশের দেবী ন্যুটের ভাই ও স্বামী। প্রাচীনকালে মিশরীয়রা মনে করতো যে, পৃথিবীতে যতো ভূমিকম্প হয়, সেগুলো আসলে গেবের হাসির কারণে হয়ে থাকে!

আমুনঃ

আমুন
এককালে মিশরীয়দের কাছে বেশ ক্ষমতাশালী দেবতা বলে পরিচিত ছিলেন আমুন। এমনকি মিশরের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, এককালে তাকে ‘দেবতাদের রাজা’ বলেও মনে করা হতো। কখনো কখনো সূর্য দেবতা রা’র সাথে মিলিত হয়ে তিনি ‘আমুন-রা’ নাম ধারণ করতেন।

আনুবিসঃ

আনুবিস
মানুষের মতো দেহ ও শেয়ালের মতো মাথাবিশিষ্ট আনুবিসকে ভাবা হতো মৃত্যুর দেবতা। প্রাচীন মিশরে প্রায়ই শেয়ালদের দেখা যেত কবরস্থান থেকে মৃতদেহ তুলে খাচ্ছে। এখান থেকেই আনুবিসের শেয়ালের মতো মাথার ধারণাটি এসেছে বলে ধারণা করা হয়। প্রাচীন মিশরীয় রাজাদের দেহ মমিকরণের সাথে যুক্ত পুরোহিতরাও আনুবিসের অনুকরণে মুখোশ পরতেন।

বাস্টেটঃ

বাস্টেট
বাস্ট, বাস্টেট, উবাস্টি ও পাস্খ নামে পরিচিত ছিলেন এ দেবী। তাকে বিভিন্ন জিনিসের সংরক্ষক মনে করা হতো দেখে তার রুপও ছিলো বিভিন্ন। প্রথমদিকে বাস্টেটকে ভাবা হতো মিশরের নিচু এলাকাগুলোর রক্ষাকর্ত্রী দেবী। এজন্য তখন তাকে সিংহীর রুপে দেখা যেত। পরবর্তীতে তাকে নিরাপত্তা ও আশীর্বাদের দেবী এবং নারী-শিশু- বিড়ালের রক্ষাকর্ত্রী মনে করা হতো। সেই সাথে সূর্যোদয়, সঙ্গীত, নৃত্য, আনন্দ, পরিবার, উর্বরতা ও জন্মের দেবীও ধরা হতো তাকে। কখনো কখনো বাস্টেটকে বিড়াল রুপেও দেখা গিয়েছে।

বেসঃ

বেস
গর্ভবতী নারী, সদ্য জন্ম নেয়া শিশু ও পরিবারের রক্ষক হিসেবে দেখা হতো কিম্ভূতকিমাকার বামন এ দেবতাকে। তিনি গায়ে সিংহের চামড়া জড়িয়ে রাখতেন। কোনো শিশুর জন্মের সময় তিনি সারা রুমে ঝুমঝুমি বাজিয়ে নেচে নেচে অশুভ আত্মাকে দূরে রাখতেন বলে বিশ্বাস করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। আর যখন কোনো বাচ্চাকে কোনো কারণ ছাড়াই হাসতে দেখা যেতো, তখন তারা ভাবতো যে রুমের কোথাও বসে বেস হয়তো বাচ্চাটিকে ভেংচি কাটছে!

হাপিঃ

হাপি
নীলনদের সৃষ্ট বার্ষিক প্লাবনের দেবতা হিসেবে দেখা হতো হাপিকে। বিশালাকার পেট ও স্তনবিশিষ্ট এ দেবতার মাথায় থাকতো বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ।

হাথরঃ

হাথর
সৌরদেবতা রা’র কন্যা হাথরকে দেখা হতো নারী, সৌন্দর্য, ভালোবাসা, আনন্দ ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক দেবী হিসেবে। গরু, নারীদেহ কিন্তু কানটি গরুর কিংবা নারীদেহ কিন্তু গরুর শিং মাথায় জড়িয়ে রাখা- এ তিন রুপেই দেখা যেত হাথরকে।

হোরাসঃ

হোরাস
ওসাইরিস ও আইসিসের পুত্র হোরাসকে দেখা যেত বাজপাখি কিংবা মানুষের দেহ ও বাজপাখির মাথার সংমিশ্রিত এক রুপে। হোরাসকে আকাশের দেবতা ভাবতো প্রাচীন মিশরীয়রা।

আইসিসঃ
আইসিস
প্রাচীন মিশরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক দেবী ছিলেন আইসিস। তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাদুকর মনে করতো মিশরীয়রা। তাই জাদুর দেবী হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন সর্বত্র। জীবন দানকারী, আরোগ্য প্রদানকারী এবং রাজাদের প্রতিরক্ষক হিসেবে দেখা হতো আইসিসকে। কখনো নিজের মাথায় একটি সিংহাসন নিয়ে, আবার কখনো পুত্র হোরাসকে স্তন্যদানরত অবস্থায় দেখা যেতো আইসিসকে।

খেপ্রেঃ

খেপ্রে
খেপ্রে, খেপ্রি, খেপ্রা, খেপেরা ইত্যাদি নানা নামে পরিচিত এ দেবতাকে মিশরীয়রা গুবরে পোকাদের দেবতা বলে ভাবতো। গুবরে পোকাদের বিভিন্ন প্রাণীর মল গড়িয়ে নিয়ে যেতে দেখে প্রাচীন মিশরীয়রা ভাবতো যে, খেপ্রে হয়তো সূর্যকে তার কক্ষপথে স্থাপন করে এসেছেন!

খ্নুমঃ

খ্নুম
ভেড়ার মাথাওয়ালা খ্নুম বা খ্নেমু নামে পরিচিত এ দেবতাকে মিশরীয়রা নীল নদের উৎসের দেবতার মর্যাদা দিয়েছিলো। একই সাথে তাকে জলপ্রপাত, উর্বরতা ও সৃষ্টির দেবতা ভাবা হতো। তার কাছে থাকা কুমোরের চাকাতেই তিনি নীলনদের তীরের মাটি থেকে প্রথম মানুষ তৈরি করেছিলেন বলে এককালে বিশ্বাস করতো মিশরীয়রা।

খোন্সুঃ

খোন্সু
আমুন ও মুতের ছেলে খোন্সুকে খোন্স, খেন্সু, খুন্স ইত্যাদি বিভিন্ন নামেও ডাকা হতো। প্রাচীন মিশরে তাকে চাঁদ, চাঁদের আলো ও সময়ের দেবতা হিসেবে গণ্য করা হতো।

মা’আতঃ

মা’আত
আইন-কানুন, নীতি-নৈতিকতা ও বিচার ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির দেবী হিসেবে ভাবা হতো মা’আতকে। উটপাখির পালক মাথায় জড়ানো অবস্থাতেই তাকে চিত্রায়িত হতে দেখা গেছে।

ম্যুটঃ

ম্যুট
সৌরদেবতা রা’র কন্যা ম্যুটকে শকুনদের দেবী হিসেবে কল্পনা করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। দীর্ঘাকায় এ দেবীর পরনে থাকতো উজ্জ্বল রঙয়ের পোষাক, মুকুটে শোভা পেত শকুন।

নেফিথিসঃ

নেফিথিস
অনেক ক্ষমতার অধিকারী দেবীকে নেফিথিসকে প্রাচীন মিশরীয়রা ‘চমৎকার দেবী’ বলেও সম্বোধন করতো। তবে সময়ে সময়ে চমৎকার এ দেবী ভয়ংকরও হয়ে উঠতে পারতেন। রাজার শত্রুদেরকে তিনি তার নিঃশ্বাস দিয়ে শেষ করে দিতে পারেন বলে বিশ্বাস করতো মিশরীয়রা। তাই তাকে রাজাদের প্রতিরক্ষক বলা হতো। মৃত্যু, ক্ষয় ও অন্ধকারের এ দেবীর জাদুবিদ্যায় ছিলো অসাধারণ পারদর্শীতা ও অদ্ভুত আরোগ্য প্রদানের ক্ষমতা।

ওসাইরিসঃ
ওসাইরিস
প্রাচীন মিশরের দেবতাদের মাঝে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান দখল করে আছেন ওসাইরিস। মিশরের প্রথম রাজা হিসেবে চিত্রায়িত এ দেবতাকে তারা ভাবতো শস্যের দেবতা হিসেবে। ফারাওয়ের ক্ষমতা দখলের লড়াই নিয়ে নিজ ভাই সেথের কাছে খুন হন ওসাইরিস। পরে অবশ্য ওসাইরিসের ছেলে হোরাস সেথকে পরাজিত করে ফারাও হয়েছিলেন। মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো যে, স্ত্রী আইসিস তাকে পুনরায় জীবিত করেছিলেন। এরপর তিনি পাতালপুরিতে চলে যান শাসক হিসেবে এবং মৃতদের বিচার করতে!

প্তাহঃ

প্তাহ
প্তাহকে স্থাপত্যশিল্পের দেবতা হিসেবে কল্পনা করতো মিশরীয়রা। তারা ভাবতো যে, নিজের কল্পনা ও মুখ নিঃসৃত শব্দের সাহায্যেই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন প্তাহ! মমিবেশী এ দেবতার হাত দুটো বের হয়ে থাকতো ব্যান্ডেজের ভেতর থেকে। সেই হাত দিয়ে ধরা থাকতো একটি লাঠি।

রাঃ

রা, রে ইত্যাদি নানা নামে পরিচিত এ দেবতা ছিলেন মিশরীয় মিথলজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক দেবতা। মূলত সৌরদেবতা থাকলেও তার ক্ষমতা ছিলো অনেক। মানুষের মতো দেহ ও বাজপাখির মতো মাথাধারী রা’র মাথায় থাকতো সৌর চাকতি।

রা
প্রতিদিন সকালে পূর্বদিকে তার জন্ম হতো ও রাতে পশ্চিমে ঘটতো মৃত্যু। দিনের বেলায় সৌর নৌকায় চড়ে তিনি ঘুরে বেড়াতেন পুরো আকাশ জুড়ে। আর রাতের বেলায় পাতালপুরিতে গিয়ে শায়েস্তা করে আসতেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের। অন্যান্য দেবতাদের উপর তার ক্ষমতা এততাই বিস্তৃত ছিলো যে, তিনি মাঝে মাঝেই তাদের ক্ষমতা আত্মীকরণ করতে পারতেন। এভাবেই আমুন-রা (আমুন ও রা), মন্টু-রা (মন্টু ও রা), রা-হোরাখ্তি (রা ও হোরাস) নামগুলো এসেছিলো রা’র জন্য।

সবেকঃ

সবেক
কুমিরের মতো মাথা ও বাকিটুকু মানবদেহের অধিকারী সবেককে কুমিরদের দেবতা মনে করা হতো এককালে।

সেথঃ

সেথ
গেব ও ন্যুটের ছেলে সেথকে সেত, সেতেখ, সুতি ও সুতেখ নামেও ডাকতো প্রাচীন মিশরীয়রা। মরুভূমি, বজ্রপাত ও অকল্যাণের দেবতা হিসেবে ভাবা হতো সেথকে। তার মাথায় থাকা পশুটি আসলে কী সে সম্পর্কে জানা যায় নি। কখনো কখনো আবার জলহস্তী, শূকর কিংবা গাধার রুপেও দেখানো হয়েছে সেথকে।

টেফনাটঃ

টেফনাট
সিংহীর মাথা ও মানুষের শরীরধারী টেফনাট ছিলেন শু-এর স্ত্রী। তাকে পানি ও উর্বরতার দেবী হিসেবে ভাবা হতো।

ঠথঃ

ঠথ
লেখালেখি কিংবা গণনায় ব্যস্ত হিসেবে চিত্রায়িত ঠথ ছিলেন জ্ঞানের দেবতা। মানবদেহ ও আইবিস পাখির মাথাবিশিষ্ট ঠথের হাতে লেখালেখির জন্য সবসময় কলম ও বোর্ড থাকতোই!

ওয়াজ-ওয়েরঃ

আংশিক পুরুষ ও আংশিক নারী হিসেবে চিত্রায়িত এ দেবতাকে উর্বরতার দেবতা বলে ভাবতো মিশরীয়রা। কখনো কখনো তাকে গর্ভবতী হিসেবেও দেখানো হয়েছে!

তাওয়ারেতঃ

তাওয়ারেত
দেবী তাওয়ারেত ছিলেন জলহস্তীর মতো দেখতে। যেহেতু মা জলহস্তী তার বাচ্চাদের রক্ষা করতে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে (এটা তো দুনিয়ার যেকোনো মা-ই করবে!), তাই গর্ভবতী মায়েরা নিজেদের গর্ভের সন্তানকে রক্ষার জন্য তাওয়ারেতের মন্ত্রপূত কবচ পরতেন।

ওয়াজেতঃ

গোখরা সাপের মতো করে চিত্রায়িৎ এ দেবীকে মিশরের নিচু অঞ্চলের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বলে এককালে মনে করতো মিশরের অধিবাসীরা।

সপদুঃ

তিনি ছিলেন একজন যুদ্ধের দেবতা।

সেশাতঃ
সেশাত
কখনো ঠথের কন্যা আবার কখনো ঠথের স্ত্রী হিসেবে দেখানো হতো দেবী সেশাতকে! তাকে লেখালেখি, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও স্থাপত্যবিদ্যার দেবী মনে করা হতো।

ক্বেতেশঃ
ক্বেতেশ
সিরিয়া থেকে মিশরীয় মিথলজিতে ঢুকে পড়া দেবী ক্বেতেশকে দেখা হতো উর্বরতার প্রতীক হিসেবে।

সার্কেতঃ

সার্কেত
সার্কেতকে এককালে মিশরের অধিবাসীরা ভাবতো বিচ্ছুদের দেবী হিসেবে। তিনি যেমন খারাপ লোকদের গায়ে বিচ্ছুর হুল ফুটিয়ে দিতেন, তেমনি ভালো লোকেরা বিচ্ছু বা সাপের বিষে আক্রান্ত হলে তাদের রক্ষার ব্যবস্থাও করতেন!

রায়েত-তাওয়িঃ

তাকে বলা যেতে পারে সৌরদেবতা রা-এর সঙ্গিনী।

সেকারঃ

সেকারকে বলা হতো বাজপাখিদের দেবতা।

ক্বেবুইঃ

উত্তর দিক থেকে প্রবাহিত বাতাস নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা ছিলেন ক্বেবুই!

সেখমেতঃ

সেখমেত
আগুন ও যুদ্ধের দেবী বলে পরিচিত সেখমেতের মাথাটি ছিলো সিংহীর এবং দেহটি ছিলো একজন নারীর। তার নিঃশ্বাসের ফলেই মরুভূমি সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশ্বাস করতো মিশরের লোকজন!

পাখেতঃ

পাখেত নামে এ দেবীর মাঝে একই সাথে স্নেহ ও আক্রোশকে খুঁজে পেত মিশরের অধিবাসীরা। কারণ তিনি ছিলেন একইসাথে মায়ের মতো স্নেহময়ী ও যুদ্ধের মতো ধ্বংসাত্মক বিষয় দুটোর দেবী।

নেখবেতঃ


শকুনের মতো দেখতে এ দেবী ছিলেন মিশরের উঁচু এলাকা, শিশুর নিরাপদ জন্ম ও ফারাওদের রক্ষার কাজে নিয়োজিত।

মেন্হিতঃ

সিংহ ও যুদ্ধের দেবী ছিলেন মেন্হিত।

কুকঃ

নারী ও পুরুষ উভয়ের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কুককে দেখা হতো অন্ধকার জগতের সাথে সম্পৃক্ত এক সত্ত্বা হিসেবে। তাকে কেক, কেকু প্রভৃতি নামেও ডাকা হতো।

মাফদেতঃ
মাফদেত
মিশরীয় উপকথার একেবারে শুরুর দিকে খোঁজ মিলে মাফদেতের। বিড়াল বা বেজির ন্যায় চিত্রায়িত এ দেবী সাপ ও বিচ্ছুদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করবে বলে বিশ্বাস করতো মিশরীয়রা।

কেবেচেতঃ

দেবতা আনুবিসের কন্যা কেবেচেতকে প্রাচীন মিশরীয়রা ক্বেবেহেত, কেবহুত, কেবেহুত, ক্বেবেহুত ও কাবেচেত নামেও ডাকতো। তিনি ছিলেন সজীবতা ও বিশুদ্ধতার দেবী।

মাহেসঃ

সিংহের ন্যায় মস্তকধারী মাহেস ছিলেন প্তাহের ছেলে। তাকে যুদ্ধের দেবতা হিসেবে মান্য করতো লোকজন।

হেকেতঃ

ব্যাঙের আকৃতিধারী দেবী হেকেত ছিলেন জীবন ও উর্বরতার প্রতীক।

গেঞ্জেন ওয়েরঃ

রাজহাসের মতো দেখতে এ দেবতাকে আসলে কোন কাজ নিয়ন্ত্রণের ভার দিয়েছিলো তার অনুসারীরা তা জানা যায় নি! তবে প্রাচীন মিশরের বিভিন্ন চিত্রকর্মে প্রায়ই দেখা মেলে তার।

বাবিঃ

বাবা, বাবি প্রভৃতি নামে পরিচিত এ স্বত্ত্বা ছিলেন বেবুনদের দেবতা। বেবুনদের সাথে মানুষের চারিত্রিক কিছু বিষয়ের মিল দেখে তখন মানুষ ভাবতো যে, বেবুনেরা বুঝি তাদের মৃত পূর্বপুরুষ!

আপেপঃ
আপেপ
সাপের মতো দেখতে এ দেবতা আপেপ, আপেপি, অ্যাপোফিস ইত্যাদি নামে পরিচিত। তাকে অন্ধকার জগত ও বিশৃঙ্খলার সাথে সম্পৃক্ত বলে মনে করতো মিশরীয়রা।

আমুনেতঃ
আমুনেত
দেবতাদের রাজা হিসেবে খ্যাত আমুনের স্ত্রীর নাম ছিলো আমুনেত। অন্যান্য আরো দেবীর মতো তাকেও সৃষ্টির দেবী বলে বিশ্বাস করতো প্রাচীন মিশরীয়রা।

আন্হুরঃ
আনহুর
‘আন্হুর’ শব্দের অর্থ ‘আকাশ বহনকারী’। নাম শুনেই তার কাজের ধরণ সম্পর্কে অনুমান করা যায়। আন্হুর ছিলেন একইসাথে আকাশ ও যুদ্ধের দেবতা।