Showing posts with label প্রযু‌ক্তি. Show all posts
Showing posts with label প্রযু‌ক্তি. Show all posts

Wednesday, January 2, 2019

ডিপফেক টেকনোলজি : মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে দেওয়া এক অভিশপ্ত প্রযুক্তি।

একটি দৃশ্য কল্পনা করুন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হুট করে একটি সংবাদ সম্মেলন ডেকে বসলেন। সেখানে তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের কটাক্ষ করে খুবই খারাপ একটা কথা বললেন। টিভি ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে দ্রুত তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লো। এমন বর্ণবাদী মন্তব্যের জন্য সমগ্র আমেরিকার জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তারা অবিলম্বে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ চায়। সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে পড়েছে। জায়গায় জায়গায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সকল কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে রয়েছে।

অপরদিকে হোয়াইট হাউসে থাকা সকল কর্মচারীর মাথায় হাত। এমন কোনো সংবাদ সম্মেলন তো ডাকাই হয়নি। তাদের প্রেসিডেন্টও তো কোথাও এমন বক্তব্য দেননি। কিন্তু যে ভিডিওটি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটি প্রেসিডেন্ট নিজেই। একই চেহারা, একই গলার স্বর। এমনকি ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডেও অবিকল প্রেসিডেন্টের অফিস। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা অনেক চেষ্টা করেও এই ভিডিও যে নকল তা প্রমাণ করতে পারছে না। অপরদিকে বাইরে পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ হতে চলেছে।

এবার আরেকটি দৃশ্য কল্পনা করুন। অন্যান্য দিনগুলোর মতোই স্বাভাবিকভাবে আপনার দিন কাটছিল। হঠাৎ কাছের একজন মানুষ ইন্টারনেটে আপনাকে একটি ভিডিও পাঠায়। ভিডিওটি চালু করার পর আপনি রীতিমতো আকাশ থেকে পড়লেন। এটি একটি অশ্লীল ভিডিও এবং ভিডিওর মানুষটি আপনি নিজেই। আপনার কাছে এটা একেবারে স্পষ্ট যে, এমন কোনো ভিডিওতেই আপনি নেই। কিন্তু ভিডিওর মানুষটি দেখতে অবিকল আপনার মতো। চোখ, নাক, হাসি, গলার স্বর হুবহু এক। এখন মানুষ কি আপনার কথা বিশ্বাস করতে চাইবে? আপনার আপনজনেরাই বা কীভাবে এর ব্যাখা করবে? খুব দ্রুত এই আপত্তিকর ভিডিও চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবার ও সমাজে আপনি মুখ দেখাতে পারছেন না। অথচ এখানে আপনার কোনো দোষই নেই।

ফটোশপ ও  অন্যান্য কিছু সফটওয়্যার আসার পর থেকে ইচ্ছামতো ও নিখুঁতভাবে নকল ছবি তৈরি করা যায়। তবে নকল ভিডিও বানানো অতটা সহজ ছিল না। ছবিতে একজনের মাথা কেটে অন্য জায়গায় বসানো যতটা সহজ, ভিডিওর ক্ষেত্রে তা ততটা সহজ নয়। কারণ মানুষের গলার আওয়াজ, অভিব্যক্তি, তাকানোর ধরন ইত্যাদি হুবহু নকল করা যেত না। এটি অসম্ভব ছিল একটি নতুন প্রযুক্তি আসার আগ পর্যন্ত।

ফটোশপ ব্যবহার করে নকল ছবি বানানো গেলেও নকল ভিডিও তৈরি করতে উচ্চমানের প্রযুক্তি দরকার।
নকল ভিডিও বানানোর এই প্রযুক্তির নাম ডিপফেক বা ডিপফেক টেকনোলজি। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেকোনো মানুষের হুবহু নকল ভিডিও বানানো সম্ভব। মেশিন লার্নিংয়ের প্রয়োগ ঘটানোর মাধ্যমে দিন দিন এই অভিশপ্ত প্রযুক্তিটি আরো নিখুঁতভাবে নকল ভিডিও তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে।


ডিপফেক আসলে কীভাবে কাজ করে?

ডিপফেক বলতে নকল ভিডিও বা অডিওকে বোঝায়। আপাতদৃষ্টিতে তা দেখতে আসল মনে হলেও তা মোটেই আসল নয়। ডিপফেক নামটির মাঝেই এর সংজ্ঞা নিহিত রয়েছে। ডিপ মানে গভীর এবং ফেক মানে নকল। অর্থাৎ ডিপফেক বলতে এমন কিছুকে বোঝায় যা খুবই গভীরভাবে নকল করা হয়েছে। মেশিন লার্নিং হলো ডিপফেক ভিডিও বানানোর প্রধান অস্ত্র। মেশিন লার্নিংয়ের একটি কৌশলের নাম "জেনারেল অ্যাডভারসেরিয়াল নেটওয়ার্ক" (GAN)। এর মাধ্যমে প্রথমে একজন ব্যক্তির বিভিন্ন অভিব্যক্তির হাজারখানেক ছবি সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই ছবিগুলো মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়া করে তার মুখের সব ধরনের অভিব্যক্তির একটি সিমুলেশন তৈরি করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্তরোত্তর উন্নতির ফলে ব্যক্তির গলার আওয়াজও হুবুহু নকল করা সম্ভব। এসব ভিডিও ও অডিও নানাভাবে প্রক্রিয়া করে এমন একটি নকল ভিডিও তৈরি করা হয় যা খালি চোখে শনাক্ত করা অনেক কঠিন।
মুখমন্ডলের বিভিন্ন অভিব্যক্তি ধারণ করে মেশিন লার্নিং দিয়ে নকল ভিডিও বানানো হয়।
আমাদের দৃষ্টিসীমার পর্যায়কাল ০.১ সেকেন্ড। অর্থাৎ ১০০ মিলি সেকেন্ডের কম সময়ে ঘটে যাওয়া কোনো দৃশ্য আমাদের চোখে বাঁধবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা ভিডিওগুলোতে নানা ধরনের রূপান্তর ঘটে এর থেকেও কম সময়ে। তাই খালি চোখের পক্ষে আসল-নকলের যাচাই করা সম্ভব হয় না।

ডিপফেক টেকনোলজি দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন সেলিব্রিটিরা। এর কারণ তাদের নানা ভিডিও, ছবি ইত্যাদি ইন্টারনেটে বেশি সহজলভ্য। একজন অভিনেতার চেহারার বিভিন্ন ধরনের অভিব্যক্তি ইন্টারনেটে পাওয়া সবচেয়ে সহজ। তাই তারাই প্রথমে এই ক্ষতিকর প্রযুক্তির শিকার হয়।

ডিপফেক কতটা বিপজ্জনক? 

আধুনিক যুগ ইন্টারনেটের যুগ। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। একটা খবর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যত দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছায়, অন্য কোনো মাধ্যম দ্বারা তা সম্ভব না। তাই বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য এটি একটি উৎকৃষ্ট জায়গা। কোনো রকম সত্যতা যাচাই করা ছাড়াই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গুজব সংবাদ দ্রুত মানুষের মুখে মুখে পৌঁছে যায়। মানুষের চিন্তাধারাকে নিয়ন্ত্রণ করার এর থেকে সহজ পন্থা আর নেই। আর এখানেই ডিপফেক টেকনোলজির জয়জয়কার।

ইন্টারনেটের বদৌলতে এখন মিথ্যা তথ্য খুব দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

ডিপফেক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর মার্কো রুবিও এই টেকনোলজিকে পারমাণবিক অস্ত্রের সমতুল্য হিসেবে দাবী করেছেন। তিনি বলেছেন-
“তোমরা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিতে চাও, তাহলে আগে তোমাদের দশটা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার লাগতো, পারমাণবিক অস্ত্র লাগতো, লং রেঞ্জের মিসাইল লাগতো। কিন্তু আজ তোমাদের কেবল আমাদের ইন্টারনেট ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে হবে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করতে হবে, বৈদ্যুতিক গ্রিডের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু শুধু যে জিনিসটা করলেই হয়ে যায়, তা হলো তোমাদের একেবারে বাস্তবসম্মত নকল ভিডিও তৈরি করার ক্ষমতা থাকতে হবে। যেটা আমাদের নির্বাচনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি করবে। দেশকে এক চরম সঙ্কটের মুখে ঠেলে দেবে।“
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ফ্রান্সেসকো মার্কোনি বলেছেন-
“পরবর্তী প্রজন্মের যত গুজব সংবাদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত হবে।“

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসল ও নকলের মাঝে সব ভেদাভেদ দূর করে দিতে সক্ষম।
এভাবে সামাজিক, রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রে এটি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। একটি সুখী দম্পতির মধ্যকার ভালোবাসা ও বিশ্বাস নিমেষে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে এই প্রযুক্তি। সৃষ্টি করতে পারে রাজনৈতিক অরাজকতা। কোনটি আসল আর কোনটি নকল তা নিয়ে এক বিশাল দ্বন্দ্ব দেখা দিবে মানুষের মনে। আর আপত্তিকর ভিডিও ছড়ানোর আশঙ্কা তো রয়েছেই।


কিছু বাস্তব উদাহরণঃ

রাজনৈতিক ঘটনা দিয়েই শুরু করা যাক। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সবাই চেনেন। নিজের নানা কুখ্যাত বক্তব্যের জন্য এমনিতেই তিনি অনেক জনপ্রিয়। ২০১৮ সালের মে মাসে তার একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে তিনি বেলজিয়ামের নাগরিকদের সেই দেশের জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু নিয়ে উপদেশ দিয়েছেন। এই ভিডিওতে তার মুখের ভাষা ছিল খুব খারাপ। বেলজিয়ান জনগণ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন আচরণ সহজভাবে নেয়নি। তারা টুইটারে প্রেসিডেন্ট ও আমেরিকা নিয়ে অনেক কটু কথা বলতে থাকে। এভাবে এক বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পরে জানতে পারা যায় যে, এটি একটি বেলজিয়ান রাজনৈতিক দলের কাজ। তারা একটি প্রোডাকশন স্টুডিওর সাহায্য নিয়ে এই নকল ভিডিও তৈরি করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করা, যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে বেলজিয়ান সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়।

একটি বেলজিয়ান রাজনৈতিক দল তাদের টুইটার পেজে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নকল ভিডিও পোস্ট করে।
এরকম আরো অনেক ঘটনা রয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কথাই ধরুন। তার একটি নকল ভিডিও রয়েছে যাতে তিনি সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গালি দিয়েছেন। আগে থেকে বলে না দিলে এই ভিডিও যে আসল না নকল, তা কেউ আঁচ করতে পারবে না। তাহলে একটু চিন্তা করে দেখুন, এই প্রযুক্তি কোনো রাজনৈতিক অরাজকতা সৃষ্টি করতে কত বড় ভূমিকা রাখতে পারে।


উপরে বারাক ওবামার যে ভিডিওটি দেখানো হয়েছে তা আসলে চলচ্চিত্র পরিচালক জর্ডান পিলি ও বাজফিড ওয়েবসাইটের সম্মিলিত প্রয়াসে বের করা হয়। এই ভিডিওর মাধ্যমে তারা ডিপফেক টেকনোলজির খারাপ দিক সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।
মিডিয়া জগতে ডিপফেকের ব্যবহার অহঃরহ লেগেই আছে। সেলিব্রিটিদের আপত্তিকর ভিডিওর কথা তো আগেই বলা হয়েছে। চলচ্চিত্রেও এর ব্যবহার থেমে নেই। ইন্টারনেটে একসময় অভিনেতা নিকোলাস কেইজকে নিয়ে বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন বিখ্যাত সিনেমার বিভিন্ন চরিত্রে আসল অভিনেতার জায়গায় তার মুখ বসিয়ে ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই মাথা কেটে বসানো ভিডিওগুলো ছিল অনেক নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত।

ম্যান অফ স্টিল সিনেমায় অভিনেত্রী এমি এডামসের মুখের উপর নিকোলাস কেইজের মুখ বসানো হয়েছে।
'স্টার ওয়্যারস' খ্যাত অভিনেত্রী ক্যারি ফিশারকে অনেকেই চিনে থাকবেন। ২০১৬ সালে এই চলচ্চিত্র সিরিজেরই একটি প্রিকুয়েল “রৌগ ওয়ান” মুক্তি পায়। এই সিনেমার এক দৃশ্যে সিরিজের জনপ্রিয় চরিত্র প্রিন্সেস লিয়ার যুবতী সময়ের কিছু দৃশ্য প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ক্যারি ফিশার তখন ষাট বছরে পা দিয়েছেন। তাই তার কম বয়সী সংস্করণ তৈরি করতে এই ডিপফেক প্রযুক্তির আশ্রয় নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, সিনেমা মুক্তির একই মাসে ২৭শে ডিসেম্বর এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী মৃত্যুবরণ করেন।


প্রযুক্তিবিদরা বিভিন্ন নকল শনাক্তকরণ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন।

ডিপফেক ভিডিও শনাক্ত করার জন্য ইতোমধ্যেই গবেষকরা উঠে পড়ে লেগেছেন। বিশেষভাবে বলতে হবে প্রফেসর হ্যানি ফরিদের কথা। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের এই প্রফেসর প্রায় বিশ বছর ধরে ডিজিটাল জালিয়াতি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি এসব নকল ভিডিও শনাক্তকরণের জন্য নানা নতুন কৌশলের উদ্ভাবন করে চলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এই পথে সাফল্যও অর্জন করেছেন। কথা বলার সময় মানুষের মুখমন্ডলে রক্তপ্রবাহের তারতম্য ঘটে। এটি মেশিন লার্নিং দিয়ে শনাক্ত করা যায় না। তিনি বর্তমানে এ ব্যাপারটি নিয়ে কাজ করছেন। তবে তিনি নিজে এখনো আশঙ্কামুক্ত নন। তার মতে, ডিপফেকের বিরুদ্ধে এসব ফরেনসিক টেকনোলজি বের করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। আর ডিপফেক টেকনোলজি প্রতিনিয়ত হালনাগাদ হচ্ছে। তাই এর শনাক্তকরণ পদ্ধতিগুলো গোপন রাখা জরুরী। দিন শেষে এগুলো ফাঁস হয়ে গেলে নকলবাজরা তা কাজে লাগাবে। এলগোরিদমে তাদের সামান্য পরিবর্তন পুরো বছরের শ্রম বৃথা করে দিতে পারে।

হ্যানি ফরিদ ২০ বছর ধরে ডিজিটাল জালিয়াতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।
ইন্টারনেটের মাধ্যমের নানা গুজব ছড়ানো এখন নিত্যদিনের ব্যাপার। কোনটি সত্য ও কোনটি মিথ্যা তা নিয়ে জনগণ আগে থেকেই অনেক বিভ্রান্ত। তাই এমন অভিশপ্ত প্রযুক্তি যেন আরো শক্তিশালী হয়ে না ওঠে এবং দ্রুত এর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, সেজন্য প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকদের এগিয়ে আসতে হবে। ইতোমধ্যেই ফেসবুক এসব ডিপফেক ভিডিও শনাক্তকরণের জন্য কাজ করছে। অন্যান্য বিভিন্ন কোম্পানিও এ ব্যাপারে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে।

Saturday, November 25, 2017

অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের আসক্তিতে যে ৫টি ক্ষতি হতে পারে!

সব কিছুরই আছে ভালমন্দ। যে স্মার্টফোন ছাড়া আমাদের এক মুহূর্তও চলে না, তার বেলায়ও কথাটা সত্য। এই স্মার্টফোন যেমন ভাল বন্ধু হতে পারে, তেমনই মারাত্মক ক্ষতিও করতে পারে। অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো কী─

(১) শ্রবণ শক্তি কমতে পারেঃ



স্মার্টফোন কান থেকে দূরে রেখে তো আর ব্যবহার করা যায় না। ফলে বেশি সময় কানে ফোন রেখে কথা বললে সমস্যা তৈরি হয়। তুলনায় হেডফোন ব্যবহার করা ভাল। আবার হেডফোন ব্যবহার করে খুব জোরে গান শুনলে কানের ভিতরের কোষে তার প্রভাব পড়ে এবং মস্তিষ্কেও সমস্যা হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, বধির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

(২) অস্থি-সন্ধির ক্ষতিঃ



অতিরিক্ত সময় ধরে মেসেজ টাইপ করা হলে আঙুলের জয়েন্টগুলোতে ব্যথা হতে পারে এবং অবস্থা বেশি খারাপ হলে আর্থরাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেকে কাজের সময় কাঁধ ও কানের মাঝে ফোন রাখেন। অতিরিক্ত ঝুঁকে বসে দীর্ঘ সময় ধরে মেসেজ পাঠান। এ সবই শরীরে বিভিন্ন অস্থি-সন্ধির ক্ষতি করে। পাকাপাকি ক্ষতি হতে পারে শিরদাঁড়ায়।

(৩) নিদ্রাহীনতাঃ



স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ডেস্কটপের অতিরিক্ত ব্যবহার ও অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখার ফলে সবচে বেশি দেখা দেয় ঘুমের সমস্যা বা নিদ্রাহীনতা। যারা ঘুমাতে যাওয়ার আগে এ ধরনের প্রযুক্তিপণ্য অতিমাত্রায় ব্যবহার করেন তাদের শরীরে মেলাটোনিনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যার কারণ প্রযুক্তিপণ্য থেকে নির্গত উজ্জ্বল আলো। এক পর্যায়ে ঘুমের মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয় এবং স্লিপ ডিজঅর্ডারের ঝুঁকি তৈরি হয়।

(৪) চোখের জ্যোতি কমতে পারেঃ



খবরের কাগজ বা বই পড়ার ক্ষেত্রে সাধারণত চোখ থেকে গড়ে ৪০ সেন্টিমিটার দূরত্ব থাকে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা সাধারণত চোখ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্ব রেখে তা ব্যবহার করেন। অনেকের ক্ষেত্রে এ দূরত্ব মাত্র ১৮ সেন্টিমিটার। এতে করে মায়োপিয়া বা ক্ষীণ দৃষ্টির সমস্যা দেখা দিতে পারে।

(৫) ঘনত্ব কমে শুক্রাণুরঃ


গবেষকেরা জানান, মুঠোফোন থেকে হাই ফ্রিকোয়েন্সির ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন নির্গত হয়। এই ক্ষতিকর তরঙ্গের সঙ্গে মস্তিষ্কে ক্যানসারের যোগসূত্র থাকতে পারে। এ ছাড়া শরীরের অন্য কোষকলা এই ক্ষতিকর তরঙ্গের প্রভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে পুরুষের প্রজননতন্ত্রেরও। গবেষকেদের দাবি, মুঠোফোন থেকে নির্গত ক্ষতিকর তরঙ্গ শুক্রাণুর ওপর প্রভাব ফেলে এবং শুক্রাণুর ঘনত্ব কমিয়ে দিতে পারে।

Saturday, October 7, 2017

চীনের প্রথম মহাকাশ ষ্টেশন পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে যাচ্ছে কয়েক মাসের মধ্যে।

প্রায় দশ টন ওজনের চৈনিক মহাকাশ স্টেশন টিয়াংগং-১ পৃথিবীর দিকে এর অবনমনের গতি ত্বরান্বিত করেছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পৃথিবীতে আছড়ে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও পৃথিবীর চারদিকে পাক খেতে খেতে নামতে নামতে বায়ুমন্ডলের সাথে সংঘর্ষে ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের এই স্টেশনের অধিকাংশই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে তবে প্রায় ১০০ কেজি ওজনের একটুকরো অবশেষ টিকে গিয়ে পৃথিবী পৃষ্ঠে পৌঁছাবে এবং এটি ঠিক কোথায় এসে আঘাত করবে তা কেউ জানে না।
চীনের প্রথম আন্তর্জাতিক মহাকাশ ষ্টেশন টিয়াংগং-১।
২০১১ সালে চীনের একটি মহাকাশকেন্দ্র উৎক্ষেপন করা হয় এবং এতে পরবর্তিতে তিনটি মহাকাশ অভিযান পরিচালনা করা হয় যার মাধ্যমে মহাশূন্যে অভিযাত্রা করেন চীনের প্রথম নারী নভোচারী লিউ ইয়াং এবং ওয়াং ইয়াপিং। স্টেশনের নামের অর্থ হলো ‘স্বর্গীয় প্রাসাদ’। এটি ২০২৩ সালে পরিকল্পিত বড়সড় মহাকাশকেন্দ্র উৎক্ষেপনের আগে একটি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপন হিসেবে দেখা হয়েছে।
পৃথিবীতে কিভাবে আছড়ে পড়তে পারে টিয়াংগং-১, তার কাল্পনিক চিত্র।
এটিকে কখনোই স্থায়ী করার চিন্তা করা হয় নি এবং ২০১৬ সালে চীনের সরকার এর সমাপ্তির সময় হয়ে এসেছে বলে ঘোষনা করে। চীনের কর্মকর্তাগণ স্বীকার করেন তাঁরা এর উপর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলেছেন এবং এটি পাক খেতে খেতে পৃথিবীর কাছাকাছি চলে আসছে। সংশ্লিষ্টরা অনুমান করছেন এই স্টেশনটি অক্টোবর ২০১৭ হতে এপ্রিল ২০১৮ সালের মধ্যে কোনো এক সময় পৃথিবী পৃষ্ঠে এসে পৌঁছাবে। উল্লেখ্য কার্যক্ষম অবস্থায় এর উচ্চতা ছিলো ৩৭০ কিলোমিটার। পৃথিবী এবং মহাশূন্যের মাঝে যে সীমারেখা, সেই কারমান রেখার অবস্থান পৃথিবী পৃষ্ঠ হতে ১০০ কিলোমিটার উচ্চতায়।

Friday, September 15, 2017

কাতারে ২০২২ বিশ্বকাপের দৃষ্টিনন্দন ফুটবল স্টেডিয়ামগুলো।

২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হবে কাতারে। আর সেই বিশ্বকাপকে সামনে রেখে কাতার তৈরি করছে একাধিক দৃষ্টিনন্দন নতুন স্টেডিয়াম। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, স্টেডিয়ামগুলো একইসাথে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিরও সর্বোত্তম ব্যবহার করবে। সেগুলো হবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, শূন্যভাগ কার্বন নিঃসরণকারী এবং পরিবেশ বান্ধব। অধিকাংশ স্টেডিয়ামের অংশবিশেষ তৈরি হবে স্থানান্তরযোগ্যভাবে, যেন বিশ্বকাপ শেষে সেগুলো বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে স্থানান্তর করে আরো ২২টি স্টেডিয়াম তৈরি করা সম্ভব হয়। চলুন দেখে নেওয়া যাক ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে নির্মিতব্য কাতারের দৃষ্টিনন্দন স্টেডিয়ামগুলো।

লুসাইল স্টেডিয়ামঃ

লুসাইল স্টেডিয়াম হবে কাতার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম। এর অবস্থান হবে রাজধানী দোহা থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে নবনির্মিত লুসাইল সিটিতে এবং ধারণ ক্ষমতা হবে প্রায় ৮৬,০০০।
লুসাইল স্টেডিয়াম।
এই স্টেডিয়ামেই ২০২২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী এবং সমাপনী খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আছে। বৃত্তাকার স্টেডিয়ামটির চারপাশে কৃত্রিম জলাধারথাকবে। জলাধারের বাইরে অবস্থিত ছয়টি পার্কিং এরিয়ার সাথে স্টেডিয়ামটি সেতু দ্বারা সংযুক্ত থাকবে।
লুসাইল স্টেডিয়াম।
এর গোলাকার ছাদের অংশবিশেষ সম্পূর্ণ ঢেকে এটিকে ইনডোর স্টেডিয়ামে পরিণত করা, অথবা সম্পূর্ণ খুলে উন্মুক্ত আকাশের দৃশ্য উপভোগ করা সম্ভব হবে। স্টেডিয়ামটির নির্মাণকাজ মাত্র শুরু হয়েছে। ২০২১ সালে এর উদ্বোধন করা হতে পারে।

আল-বাইত স্টেডিয়ামঃ

আরবি বাইত শব্দটির অর্থ বাড়ি। কাতারের আল-খোর শহরে নির্মাণাধীন আল-বাইত নামক এই স্টেডিয়ামটি দেখতে হবে বিশাল এক তাঁবুর মতো, যে ধরনের তাঁবু কাতার এবং অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রে বেদুইন আরবদের বাড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আল-বাইত স্টেডিয়াম।
স্টেডিয়ামটির ধারণক্ষমতা হবে প্রায় ৬০,০০০ এবং এতে সেমি-ফাইনাল পর্যন্ত একাধিক খেলার আয়োজন করা হবে। স্টেডিয়ামটি বর্তমানে নির্মাণাধীন আছে এবং ২০১৯ সালে এটি উদ্বোধনকরার পরিকল্পনা আছে। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর সত্যিকার তাঁবুর মতোই এর অংশবিশেষ স্থানান্তর করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হবে। এর উপরের সারির আসনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হবে, যেগুলোকে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে।
আল-বাইত স্টেডিয়াম।
বিশ্বকাপ শেষে অন্য আরও কয়েকটি স্টেডিয়ামের মতো আল-বাইত স্টেডিয়ামের অংশবিশেষও উপরের সারির আসনগুলো স্থানান্তর করে উন্নয়নশীল আরব দেশগুলোতে নিয়ে সেখানকার স্টেডিয়ামে স্থাপন করা হবে। তখন এটি ৬০,০০০ আসনের পরিবর্তে ৩২,০০০ আসন বিশিষ্ট স্টেডিয়ামে রূপান্তরিত হবে।

আল-রায়ান স্টেডিয়ামঃ

কাতারের আল-রায়ানে অবস্থিত আহমেদ বিন আলি স্টেডিয়ামটি মূলত স্থানীয় অত্যন্ত জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাব আল-রায়ান স্পোর্টস ক্লাবের স্টেডিয়াম। এই স্টেডিয়ামটিকেই পুনঃসংস্কার করে আল-রায়ান স্টেডিয়াম নামে বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত করা হবে। এর ধারণ ক্ষমতা হবে প্রায় ৪৪,৭৪০। এই স্টেডিয়ামটিও বর্তমানে নির্মাণাধীন আছে এবং ২০২১ সালে এটি উদ্বোধন করার পরিকল্পনা আছে।
আল-রায়ান স্টেডিয়াম।
স্টেডিয়ামটির বাইরের আবরণটি একটি সুবিশাল ত্রিমাত্রিক গোলাকার পর্দা হিসেবে কাজ করবে, যা বিজ্ঞাপন সহ বিভিন্ন দৃশ্য প্রক্ষেপণ করবে। এর নকশা এবং প্রক্ষেপিত দৃশ্যাবলির মধ্য দিয়ে ফুটে উঠবে পরিবারের গুরুত্ব, মরুভূমির সৌন্দর্য, স্থানীয় উদ্ভিদ এবং প্রাণীকুলের বৈচিত্র্য, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ইত্যাদি।

আল-থুমামা স্টেডিয়ামঃ

আল-থুমামা স্টেডিয়ামটির ডিজাইন কাতারের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় পরিচয়ের একটি নিদর্শন। এটি দেখতে বিশাল একটি টুপির মতো, যাকে স্থানীয় ভাষায় গাফিয়া বলা হয়। হাতে বোনা এ ধরনের টুপি শুধু কাতার না, প্রায় সবগুলো উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রের পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আল-থুমামা স্টেডিয়াম।
গাফিয়া নামক এ টুপিগুলো মাথায় পরিধান করা তিনটি বস্ত্রাংশের মূল ভিত্তি। এই টুপির উপরে পরা হয় এক টুকরো কাপড়, যাকে বলা হয় গুত্রা। তার উপরে থাকে কালো রংয়ের দড়ি সদৃশ আগাল, যা গাফিয়ার উপরে গুত্রাকে বেঁধে রাখে।
আল-থুমামা স্টেডিয়াম।
থুমামা স্টেডিয়ামটির অবস্থান হবে রাজধানী দোহার সমুদ্রতীরের প্রমোদোদ্যান থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে। এর ধারণক্ষমতা হবে প্রায় ৪০,০০০ এবং এতে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত একাধিক ম্যাচের আয়োজন করা হবে। অতি সম্প্রতি এর পরিকল্পনা সম্পন্ন হয়েছে এবং শীঘ্রই এর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা আছে।

খালিফা ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামঃ

১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্টেডিয়ামটি কাতারের সবচেয়ে পুরানো স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে একটি। শুরু থেকেই এটি কাতারের ক্রীড়াজগতের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে এসেছে। এই স্টেডিয়ামে বিভিন্ন সময় এশিয়ান গেমস, গাল‌ফ কাপ, এএফসি এশিয়ান কাপ সহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খেলাধুলোর আয়োজন করা হয়েছে। এটি মূলত দোহা স্পোর্স্টস সিটির একটি অংশ। এর নামকরণ করা হয়েছিল কাতারের সাবেক আমির খালিফা বিন হামাদ আল থানির নামানুসারে।
খালিফা ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়াম।
সম্প্রতি বিশ্বকাপ ২০২২কে সামনে রেখে স্টেডিয়ামটিকে নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। আগে থেকেই এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় নকশার দ্বৈত খিলান। সংস্কারের পরও খিলান দুটি আগের মতোই আছে, তবে তাদের নিচে বাড়তি যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ পথ জুড়ে প্রশস্ত শামিয়ানা। নতুন করে সংস্করণ সম্পন্ন করার পর গত মে মাসে আমির কাপের চূড়ান্ত ম্যাচ আয়োজনের মধ্য দিয়ে কাতারের আল-রায়ানে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটির উদ্বোধন করা হয়।  বর্তমানে এর ধারণক্ষমতা প্রায় ৬৮,০০০।

আল-ওয়াকরাহ স্টেডিয়ামঃ

অত্যন্ত সৃজনশীল, উচ্চাকাঙ্খী এবং নান্দনিক ডিজাইনের এই স্টেডিয়ামটি ইরাকি-আমেরিকান স্থপতি জাহা হাদিদের অসাধারণ একটি সৃষ্টি।

আল-ওয়াকরাহ স্টেডিয়াম।
বক্রতার রাণী হিসেবে খ্যাত জাহা হাদিদ তার এই নকশাতেও তার ঢেউ খেলানো বক্রতলের অনন্য স্থাপত্যশৈলীর স্বাক্ষর রেখেছেন। আরব উপসাগরের বুকে ঢেউয়ের স্রোতে ভেসে চলার সময় স্থানীয় ‘দাউ’ নৌকার ফুলে ওঠা পালের আকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই জাহা হাদিদ এই স্টেডিয়ামটির নকশা করেছেন।
আল-ওয়াকরাহ স্টেডিয়াম।
এই স্টেডিয়ামটির ধারণক্ষমতা প্রায় ৪০,০০০। এখানেও কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ম্যাচের আয়োজন করা হবে। বর্তমানে নির্মাণাধীন এই স্টেডিয়ামটি ২০১৯ সালে উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা আছে।

কাতার ফাউন্ডেশন স্টেডিয়ামঃ

কাতার ফাউন্ডেশন স্টেডিয়মটি এডুকেশন সিটি স্টেডিয়াম নামেও পরিচিত। কারণ এটি নির্মাণ করা হচ্ছে কাতারের এডুকেশন সিটিতে, যেখানে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাকেন্দ্র অবস্থিত। স্টেডিয়ামটির জটিল জ্যামিতিক নকশা একই সাথে ঐতিহাসিক ইসলামিক স্থাপত্য এবং আধুনিত প্রযুক্তির অপূর্ব সমন্বয়। এর বহির্ভাগে থাকবে ত্রিভুজ এবং হীরকাকৃতির জটিল জ্যামিতিক নকশা, যার রং সূর্যের স্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হবে।
কাতার ফাউন্ডেশন স্টেডিয়াম।
বিশ্বকাপ আয়োজন শেষ হওয়ার পর এই স্টেডিয়ামটির ধারণ ক্ষমতাও ৪০,০০০ থেকে কমিয়ে ২৫,০০০-এ নিয়ে আসা হবে। অতিরিক্ত ১৫,০০০ আসন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দান করা হবে, যেন সেসব দেশেও উপযুক্ত স্টেডিয়াম তৈরির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ক্রীড়ানুরাগ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়। বর্তমানে নির্মাণাধীন এই স্টেডিয়ামটি ২০১৯ সালেউদ্বোধন করা হতে পারে।

আল-গাফারা স্টেডিয়ামঃ

কাতারের আল-রায়ানে অবস্থিত থানি বিন জাসেম স্টেডিয়ামটি স্থানীয়ভাবে আল-গাফারা ফুটবল টিমের ব্যবহৃত একটি স্টেডিয়াম। ২০০৩ সালে এএফসি এশিয়ান কাপের আয়োজনের মধ্য দিয়ে এর উদ্বোধন করা হয়। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ উপলক্ষে একে পুনঃসংস্কার করে আল-গাফারা স্টেডিয়াম হিসেবে উন্মোচন করার পরিকল্পনা আছে।
আল-গাফারা স্টেডিয়াম।
পরিকল্পনানুযায়ী এর বহির্ভাগের নকশার রং হবে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্যায়ের জন্য নির্বাচিত দেশগুলোর পতাকার রং সমূহের সমষ্টি। এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন ফুটবল প্রিয় দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করা হবে, তেমনি দেশগুলোর মধ্যকার বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক সম্মানও স্বীকৃতি পাবে। বর্তমানে এর ধারণ ক্ষমতা ২৫,০০০ হলেও বিশ্বকাপ উপলক্ষে এটিকে ৪৫,০০০ আসনে উন্নীত করা হবে। নতুন সংযোজিত আসনগুলো হবে স্থানান্তরযোগ্য, যেগুলো পরবর্তীতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দান করা হবে।

উম্ম সালাল স্টেডিয়ামঃ

কাতারের উম্ম সালাল শহরে একই নামের এই স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করা হবে। শহরটির অবস্থান কাতারের দক্ষিণ-পূর্বে, রাজধানী দোহা থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে।
উম্ম-সালাল স্টেডিয়াম।
এর আসন সংখ্যা হবে আনুমানিক ৪৫,০০০। নকশা করা হয়েছে নিকটবর্তী একটি ঐতিহাসিক দুর্গ অবলম্বনে।
উম্ম-সালাল স্টেডিয়াম।
বিশ্বকাপের পর স্টেডিয়ামটি উম্ম সালাল এফসি স্পোর্টিং ক্লাবের নিজস্ব স্টেডিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

দোহা পোর্ট স্টেডিয়ামঃ

কাতারের রাজধানী দোহায় নির্মিতব্য এই স্টেডিয়ামটির ধারণক্ষমতা হবে ৪৫,০০০। এর অবস্থান হবে সমুদ্রের বুকে একটি কৃত্রিম দ্বীপের উপর। এটি নির্মাণ করা হবে সম্পূর্ণ মডুলার পদ্ধতিতে।
দোহা পোর্ট স্টেডিয়াম।
অর্থাৎ ফ্যাক্টরিতে পূর্ব থেকে প্রস্তুতকৃত অংশগুলো স্থানান্তর করে সেগুলোকে জুড়ে দিয়ে সম্পূর্ণ স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করা হবে। বিশ্বকাপের পর সম্পূর্ণ স্টেডিয়ামটিকে আবার খুলে ফেলে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হবে।

আল-শামাল স্টেডিয়ামঃ

কাতারের আল-শামাল শহরে এই স্টেডিয়ামটি নির্মিত হওয়ার কথা আছে। এর ধারণ ক্ষমতা হবে প্রায় ৪৫,০০০।
আল-শামাল স্টেডিয়াম।
স্টেডিয়ামটির নকশা করা হয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিখ্যাত মাছ ধরার নৌকা ‘দাউ’র গঠন অবলম্বনে। স্টেডিয়ামটিকে পাশ থেকে দেখলেই মনে হবে এটি বুঝি তীরে দাঁড়িয়ে আছে ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায়।
আল-শামাল স্টেডিয়াম।
এই স্টেডিয়ামটিরও উপরের সারির আসনগুলো স্থানান্তরযোগ্য হবে এবং বিশ্বকাপের পর সেগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দান করে দেওয়া হবে।

Monday, July 17, 2017

এলিয়েনের আধুনিক উপকথা!

পৃথিবীর গণ্ডি পেরিয়ে মহাবিশ্বের কোনো গ্রহে কি আমাদের মতো প্রাণের অস্তিত্ব আছে? এই প্রশ্নটি বেশ আধুনিক। প্রাচীনকালের মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি পৃথিবীর বাইরে প্রাণ থাকতে পারে। তখন বিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটেনি তেমন। কিন্তু আশেপাশে রহস্যময় ঘটনা ঠিকই ঘটতো। সেসব ঘটনাকে তারা নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যাও দিতো। সেই ব্যাখ্যাগুলো পরবর্তীতে ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে উপকথা বা পৌরাণিক কাহিনী হিসেবে স্থান করে নিয়েছিল মানুষের মাঝে। যতদূর জানা যায়, বহির্বিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে কোনো প্রাচীন উপকথা বা পুরাণ নেই। না থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ পৃথিবীর বাইরেও যে পৃথিবীর চেয়ে কোটি কোটি গুণ বেশি বড় একটি জগত আছে এটি সম্বন্ধে জানতোই না মানুষ। ভাবনাতেই আসেনি পৃথিবীর সমান বা তার চেয়ে বড় কোনো গ্রহের অস্তিত্ব আছে আকাশে।

আকাশকে তারা শুধুমাত্র তারা দিয়ে আঁকা বর্ণীল চাদর বলেই মনে করেছে। যেহেতু তাদের কল্পনা কিংবা বাস্তবতায় পৃথিবী ব্যতীত কোনো গ্রহের অস্তিত্ব ছিল না, তাই সেসব গ্রহে বিদ্যমান প্রাণ নিয়ে কোনো উপকথা বা পৌরাণিক গল্পও তৈরি হয়নি।
পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে এমনটা কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না একসময়।
১৫০০ সালের পরে মানুষ অনুধাবন করতে পেরেছিল পৃথিবীকে আমরা যেভাবে দেখি এটি আসলে তা না। আমরা হয়তো চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি সূর্য পৃথিবীর পূর্ব দিক থেকে উঠছে আর পশ্চিম দিকে অস্ত যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিকার বাস্তবতা হচ্ছে পৃথিবী নিজে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। যার অর্থ হচ্ছে পৃথিবীর চেয়েও বড় জিনিসের অস্তিত্ব আছে। বড় ও ভারী জিনিসকে কেন্দ্র করেই ছোট ও হালকা জিনিসগুলো আবর্তন করে। সূর্য যেহেতু তার শক্তি দিয়ে পৃথিবীকে ঘোরাচ্ছে, তার মানে অবশ্যই সূর্যের ভর পৃথিবীর চেয়ে বড়। সীমাহীন এলাকাব্যাপী একটি গ্রহের চেয়েও বড় কিছুর অস্তিত্ব আছে এমনটা ভাবা তখনকার সময়ের জন্য আসলেই বৈপ্লবিক ছিল।


তখন পর্যন্ত সূর্য ও সূর্যের পরিবারের কিছু গ্রহ সম্বন্ধে জানা গিয়েছিল। কিন্তু সৌরজগতের বাইরেও যে অনেক অনেক নক্ষত্র আছে এবং কল্পনাতীত বিশাল গ্যালাক্সি আছে তা জানতে জানতে মানবজাতিকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। খুব বেশি দিন হয়নি, মানুষ তখনো বিশ্বাস করতো উপরের দিক সবসময়ই উপরে। পরবর্তীতে আবিষ্কার হলো পৃথিবী গোল। পৃথিবীর যে অংশটা আমাদের জন্য উপরে, একই অংশ হতে পারে অন্য কারো জন্য নীচে। আমরা বাংলাদেশীরা যদি নীচের দিক থেকে কোনো কিছু নির্দেশ করি সেটা হয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপরের দিক। মানুষ মনে করতো উপরের আকাশলোকে দেবতারা বসবাস করে, কিন্তু আদতে উপর বলতে কিছু নেই। আকাশ বলতে যে গম্বুজের মতো তারায় শোভিত দেয়াল দেখি, সেটাও আসলে কোনো দেয়াল নয়। দেখে মনে হয় তারাগুলো খুবই কাছাকাছি ঘেঁষে ঘেঁষে লেগে আছে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে এক তারা থেকে আরেক তারার মাঝে বিলিয়ন বিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্ব বিদ্যমান।

গম্বুজসদৃশ তারকাখচিত আকাশটি আসলে কোনো ‘আকাশ’ নয়।
পৃথিবীর স্বাভাবিক প্রাণের বাইরে বায়ুতে বা শূন্যে ভেসে বেড়ানো অদ্ভুত ধরনের সৃষ্টি বা অবাস্তব প্রাণ নিয়ে অনেক বিশ্বাস ও উপকথা আছে। যেমন- প্রেত, পিশাচ, অপদেবতা, মৃত আত্মা, ভূত ইত্যাদি। কিন্তু এসবের কোনোটিই বহির্জাগতিক কোনো গ্রহের প্রাণ নয়। উপকথা ও বিশ্বাস অনুসারে এরা আমাদের আশেপাশেই ঘুরে বেড়ানো সত্তা। কিন্তু এই লেখার প্রসঙ্গ সেগুলো থেকে ভিন্ন।


আদিম মানুষ বা বিচ্ছিন্ন আদিবাসীদের মধ্যে বহির্বিশ্বের প্রাণ নিয়ে কোনো উপকথা নেই। তবে উপকথা তো কোনো না কোনো কালের মানুষেরাই বানায়। আমাদের আজকের যুগের কোনো অন্ধবিশ্বাসও তো হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হাস্যকর উপকথা। এলিয়েন বা ইউএফও সম্বন্ধে মানুষ যখন জানলো, তখন তাদেরকে ব্যাখ্যা করতে নানা কাহিনীর জন্ম দিয়ে দিল। যারা এসব কাহিনীর জন্ম দিয়েছে, তারা শিক্ষিত ও শহুরে নাগরিক। (বহির্বিশ্বের বুদ্ধিমান প্রাণকে ‘এলিয়েন’ বলা হয় এবং এসব এলিয়েন যেসব মহাকাশযানে করে ঘুরে বেড়ায় তাদেরক পৃথিবীবাসী ‘ইউএফও’ বলে থাকে।) মনগড়া ব্যাখ্যার পাশাপাশি তাদেরকে ঘিরে নানা ধরনের কাহিনীরও জন্ম দিয়ে দেয় পৃথিবীবাসীরা। এসব অবৈজ্ঞানিক নাটকীয় কাহিনীকে আমরা বলতে পারি ‘আধুনিক উপকথা’। আধুনিক উপকথা বা আধুনিক পুরাণগুলো একটি দিক থেকে আগ্রহোদ্দীপক। প্রাচীনকালের উপকথাগুলো কোন প্রেক্ষিতে কীভাবে জন্ম লাভ করেছিল তা আমরা জনতে পারি না। কিন্তু আধুনিক উপকথাগুলো সম্বন্ধে অনেক তথ্যই আমরা জানতে পারি। কারণ এসব ঘটনা ঘটেছে আমাদের চোখের সামনে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিত, কারণ, পূর্বে এরকম ধারণার রূপ কেমন ছিল তার সবই আমাদের জানা আছে।


এমনকি এসব গল্পের জন্ম দিয়েছে যেসব লোকেরা আমরা চাইলে তাদের সাথে কথাও বলতে পারি। তারা এখনো জীবিত আছে। তারা তখন ঘোরের মধ্যে এসব করেছিল, নাকি কোনো বিশ্বাস থেকে করেছিল, নাকি নিজের অজান্তেই করেছিল তা-ও আমরা জানতে পারি তাদেরকে জিজ্ঞেস করে। এমনকি তারা তখন যে অবস্থায় ছিল তার চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন মেডিকেল রিপোর্টও জানতে পারি।

১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ঘটনা। ‘হেভেন্স গেইট’ নামে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ৩৯ জন সদস্য স্বেচ্ছায় বিষ খেয়ে বসলো । তারা বিশ্বাস করেছিল বহির্বিশ্বের কোনো এক UFO তাদের সকলের আত্মা অন্য একটি গ্রহে নিয়ে যাবে। তাই তারা আত্মহত্যা করে পৃথিবীর জীবন সাঙ্গ করে ঐ গ্রহে রওনা দেয়। ঐ সময়ে পৃথিবী থেকে একটি ধূমকেতুকে দেখা যাচ্ছিল এবং এটি বেশ প্রকট ও উজ্জ্বল ছিল। ধর্মীয় ঐ গোষ্ঠীটি মনে করেছিল এর পাশে কোনো UFO আছে বলে এমন উজ্জ্বল দেখাচ্ছে একে। এমন ধারণায় তারা সকলে বিশ্বাস করেছিল, কারণ তাদের আধ্যাত্মিক নেতা এমন কথা বলেছিল।
আত্ম হন্তারকদের দুটি দেহ।

হ্যাভেনস গেটের গণ আত্মহত্যা (গাড়ির ভেতর সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশগুলো দ্রষ্টব্য)।
ধূমকেতুটিকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি টেলিস্কোপও কিনে এনেছিল তারা। কিন্তু পরবর্তীতে তা দোকানে ফেরত দিয়ে দেয়। ফেরত দিতে গিয়ে অভিযোগ দেয় টেলিস্কোপটি ভালো না, ঠিকমতো কাজ করে না। তারা কীভাবে জানলো যে টেলিস্কোপটি নষ্ট? তারা এর মধ্য দিয়ে কোনো UFO’র দেখা পায়নি। যেহেতু তারা এলিয়েনদের মহাকাশযান UFO দেখতে পায়নি, তাই গায়ের জোরে ধরে নিয়েছিল যে টেলিস্কোপটি নষ্ট!


আধ্যাত্মিক নেতাও কি এরকম ধারণায় বিশ্বাস করেছিল? এ ধরনের ধর্মীয় ঘটনাগুলোয় নেতারা সবসময় অক্ষত থাকে। ভোগান্তিগুলো ভোগে অনুসারীগুলো। কিন্তু এখানে সম্ববত আধ্যাত্মিক নেতাটি বহির্জাগতিক স্বর্গীয় প্রাণের ধারণায় বিশ্বাস করেছিল। কারণ তিনি নিজেও আত্মহত্যার জন্য বিষ গ্রহণ করেছিলেন। আধ্যাত্মিক নেতা 'মার্শাল অ্যাপলহোয়াইট' অন্য কয়েকজন অনুসারীর সাথে নিজের পুরুষাঙ্গ কেটে খোজা হয়ে গিয়েছিল। পুরুষাঙ্গ কেটে ফেললে নারীর সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া রোধ হয়ে যায় এবং তারও অপর নারীর প্রতি কোনো যৌন আকর্ষণ থাকে না। ফলে মন কলুষিত হয় না। মন যত পরিষ্কার থাকবে তাদের অর্চনা করা স্রষ্টার সান্নিধ্য তত বেশি পাবে! এ থেকে বোঝা যায় তার ও তার কিছু অনুসারীর চিন্তাভাবনা কতটা অন্ধ ছিল। এমন অন্ধ বিশ্বাসের উপস্থিতিতে তারা যে সবাই একত্রে বিষ নিয়ে অন্য কোনো স্বর্গীয় গ্রহে চলে যেতে চাইবে, তা আর অবাক করার মতো কী?

মার্শাল আপলহোয়াইট, যার প্রেরণায় আত্মহত্যা করেছিল ৩৯ জন। এমন কর্মের জন্য তিনি টাইম, নিউজউইক সহ অন্যান্য ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে স্থান করে নিয়েছিলেন।
যারা এলিয়েন সংক্রান্ত কোনো দাবী বা অদ্ভুত কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে, তাদের সবার মধ্যে একটি জিনিসে মিল পাওয়া যায়। এলিয়েন সংক্রান্ত উদ্ভট দাবী যারা করে, তাদের প্রায় সকলেই সায়েন্স ফিকশনের ভক্ত। হয় সেটি কোনো সায়েন্স ফিকশন বই, নাহয় সেটি কোনো সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র। হেভেন্স গেইট নামের ধর্মীয় গোষ্ঠীটির সদস্যরা ‘স্টার ট্রেক’ সিরিজের প্রতি আচ্ছন্ন ছিল।


হ্যাঁ, এটা সত্য যে, ভিন গ্রহের প্রাণী নিয়ে এই পৃথিবীতে সায়েন্স ফিকশনের কোনো অভাব নেই। মূল কথা হচ্ছে অনেক অনেক সায়েন্স ফিকশনের অস্তিত্ব থাকলেই যে এ সংক্রান্ত দাবী সত্য হয়ে যাবে এমন কোনো কথা নেই। সকল ধরনের সায়েন্স ফিকশনই কাল্পনিক। যারা এগুলো পড়ে, তারাও জানে এবং যারা এগুলো লেখে, তারাও জানে। সবগুলোই মানুষের মস্তিষ্কের ভেতর তৈরি করা গল্পের প্লটের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এদের কোনোটিই বাস্তবে ঘটেনি। তারা শুধুই গল্প। অনেকটা আমাদের বাংলা ছড়ার হাট্টিমাটিম টিমের মতো কাল্পনিক প্রাণী।

এলিয়েনে আচ্ছন্ন ব্যক্তিরা স্টার ট্রেক জাতীয় সায়েন্স ফিকশনের ভক্ত।
এরপরেও অনেকে ধারণা করে এবং মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে যে, এলিয়েনদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে তাদের দেখা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ দাবী করে এলিয়েনরা তাদেরকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। অনেকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেও তাদের বিশ্বাসে তারা একদম অনড় থাকে। তাদের দাবীকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যুক্তিহীন তথ্য বা সাক্ষ্য উপস্থাপন করে।


একজন লোকের নাক দিয়ে রক্ত ঝরতো। লোকটি দাবী করেছিল তার এই সমস্যার জন্য দায়ী কোনো এলিয়েন প্রাণী। এর সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য মনগড়ামতো ব্যাখ্যাও দিয়েছিল। তার দেয়া ব্যাখ্যা অনুসারে এলিয়েনরা তার নাকের ভেতর একটি রেডিও ট্রান্সমিটার বসিয়ে দিয়েছে, যার কারণে রক্ত ঝরছে। রেডিও ট্রান্সমিটার বসানোর কারণ, এর সাহায্যে এলিয়েনরা তার উপর গোয়েন্দাগিরি তথা বৈজ্ঞানিক নজরদারি করতে পারবে। উল্লেখ্য রেডিও ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে তার ছাড়াই তথ্য আদান প্রদান করা যায়। মোবাইল এরকমই একটি যন্ত্র।


লোকটির এমন ধারণাও ছিল, সে নিজেও একজন এলিয়েন! কীভাবে জানলো এই কথা? তার বাবা-মা ছিল ফর্সা, কিন্তু সে কিছুটা কালো। বাবা-মা ফর্সা হলে তো সে নিজেও ফর্সা হবার কথা ছিল। যেহেতু লোকটি তার বাবা-মায়ের মতো না, সেহেতু সে একজন এলিয়েন বা এলিয়েনের বংশধর! উদ্ভট যুক্তি।
আমেরিকায় এমন ঘটনার দিকে তাকালে অনেকটা অবাকই হতে হবে। আমেরিকানদের অনেকেই বিশ্বাস করে উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী এলিয়েনরা তাদেরকে ধরে UFO-তে নিয়ে গিয়েছিল এবং সেখানে তার উপর ভয়ানক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছিল। অর্থাৎ তারা এলিয়েনদের পৈশাচিক সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্টের ভুক্তভোগী বা ভিক্টিম। যে এলিয়েনরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তারা দেখতে কেমন ছিল তার বর্ণনাও পাওয়া যায় তাদের কাছে। বেশিরভাগ মানুষই দাবী করে অপহরণকারী এলিয়েনদের গায়ের রঙ নীল, মস্তিষ্ক (মাথা) বেশ বড়, চোখগুলো বেশ বিস্তৃত। এলিয়েন নিয়ে এ ধরনের কাহিনীগুলো যদি একত্র করা হয়, তাহলে তা অনেক রংচঙে ও রসালো আকার ধারণ করবে। এই কাহিনীগুলো এমনকি সকল গ্রিক পুরাণ, মিশরীয় পুরাণ, নর্স পুরাণকেও হারিয়ে দেবে।
তাদের দাবী, এলিয়েনরা ধরে নিয়ে তাদের উপর এক্সপেরিমেন্ট করেছিল।
তবে আশার কথা হচ্ছে এলিয়েনের উপকথাগুলো সাম্প্রতিক। কেউ এই ব্যাপারে আগ্রহী হলে তাদেরকে নিয়ে গবেষণা করতে পারে এবং অনুসন্ধান করে দেখতে পারে আসলেই এর পেছনের কারণ কী ছিল। কেউ চাইলে এসব ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে তাদের অপহরণ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জেনেও নিতে পারবে।


কেউ যদি এই কাজটি করতে যায় তাহলে দেখতে পাবে, একদমই সুস্থ ও সস্বাভাবিক মস্তিষ্কের মানুষ এরকম দাবীগুলো করছে। তারা নিখুঁতভাবে বর্ণনা দেবে UFO-র ভেতরে কীভাবে তাদেরকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছিল, কীভাবে তাদের শরীর কেটে-ছিড়ে ফেলা হয়েছিল, কীভাবে এলিয়েনরা নিজেদের মধ্যে কথা বার্তা বলছিল তার সবই। তাদের সকল মানুষের বেলাতেই এলিয়েনরা ইংরেজিতে কথা বলে! যেহেতু আমেরিকানরা ইংরেজিভাষী, তাই এরা ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বুঝতে পারবে না। অন্য কোনো ভাষাতেও যে এলিয়েনরা কথা বলতে পারে কিংবা এলিয়েনদের নিজস্ব ভাষাতেও যে কথা বলতে পারে এই ধারণা তাদের কল্পনায় তখন ছিল না।


সুসান ক্ল্যানসি নামে একজন মনোবিজ্ঞানী এরকম মানুষদের নিয়ে অনেক গবেষণা করেছিলেন। এলিয়েন তাদেরকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, এরকম দাবীদার মানুষের অনেকেরই ধরে নিয়ে যাবার ঘটনা সম্পর্কে পরিষ্কার স্মৃতি মনে নেই। কারো কারো বেলায় অল্প স্বল্প আছে, আর কারো কারো বেলায় একদমই নেই। সুসান ক্ল্যানসি দেখেছেন এলিয়েন কর্তৃক অপহরণের স্মৃতি যাদের তেমন মনে নেই তারা প্রায় সকলেই দাবী করছে, এলিয়েনরা তাদের কোনো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার দেহে করা এক্সপেরিমেন্ট সংক্রান্ত সকল স্মৃতি মুছে দিয়েছে। মাঝে মাঝে এরকম রোগীদের সম্মোহনবিদ বা সাইকোথেরাপিস্টের কাছেও যেতে দেখা যায়। তাদের ধারণা উপযুক্ত থেরাপি বা সম্মোহনের মাধ্যমে তারা তাদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারবে।
The 3 Sins of Memory শিরোনামে টেড টকে বক্তব্যরত মনোবিজ্ঞানী সুসান ক্ল্যানসি।
হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি পুনরুদ্ধার করার ব্যাপারটি একদমই ভিন্ন তল্লাটের গল্প। স্নায়ুবিজ্ঞানের এই প্রক্রিয়াটি বেশ চমকপ্রদ। তবে চমকপ্রদ হলেও এলিয়েনদের দ্বারা স্মৃতি হারিয়ে ফেলা ও উদ্ধার করার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কেউ যদি কোনো একটি কাল্পনিক বিষয় নিয়ে খুব বেশি মগ্ন থাকে, তাহলে মাঝে মাঝে মনে হতে পারে কাল্পনিক কোনো কিছু বুঝি আসলেই তার জীবনে হয়েছিল। তেমনই সায়েন্স ফিকশন নিয়ে কেউ যদি রাত-দিন মত্ত থাকে, তাহলে ক্ষেত্রবিশেষে মনে হতে পারে সায়েন্স ফিকশনের কোনো কোনো ঘটনা তার জীবনেও ঘটেছে। এক্ষেত্রে এগুলোকে বলা যায় মিথ্যা স্মৃতি বা False Memories।


এখনকার চিকিৎসা প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাইরে থেকে এ ধরনের মিথ্যা স্মৃতি মানুষের মস্তিষ্কে প্রবেশ করানো সম্ভব । জীবনে সত্যি সত্যি ঘটে যাওয়া স্মৃতি থেকে এটি একদমই ভিন্ন। তাই কেউ যদি সম্মোহনবিদ বা সাইকোথেরাপিস্টের কাছে যায় স্মৃতি উদ্ধারের জন্য, তাহলে তারা বড়জোর মিথ্যা স্মৃতি দিতে পারবে, সত্যিকার ঘটে যাওয়া স্মৃতি উদ্ধার করতে পারবে না।

কিছু কিছু মানুষ কেন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে তাদেরকে এলিয়েন অপহরণ করেছিল, তা মিথ্যা স্মৃতি সিনড্রোমের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এ ধরনের ব্যক্তিরা স্টার ট্রেক বা স্টার ওয়ার্স ধাঁচের সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্রে অনেক বেশি মত্ত থাকে। তাদের সমসাময়িক সায়েন্স ফিকশনে যে যে ঘটনা ঘটে, তারাও সেরকম অভিজ্ঞতাই পায় এলিয়েনদের কাছ থেকে। তারা যে যে ঘটনার দাবী করে, সেগুলোর অধিকাংশই টেলিভিশনে প্রচারিত কোনো নাটক বা চলচ্চিত্রের সাথে মিলে যায়।
কাল্পনিক ব্যাপারকে বাস্তব স্মৃতি বলে বিশ্বাস করে কেউ কেউ।
ঘুম জড়তা বা 'Sleep Paralysis' নামে আরো একটি ব্যাপার আছে। কেউ ঘুম জড়তায় পড়লে দেহের কোনো অঙ্গ নড়াচড়া করতে পারে না। কেউ যখন স্বপ্ন দেখে বা ঘুমায় তখন ক্ষণস্থায়ীভাবে তার দেহ স্থবির হয়ে যায়। স্বপ্নে বা ঘুমে প্রয়োজন পড়লে অনেক কষ্ট করেও হাত-পা নাড়ানো যায় না কিংবা চিৎকারও দেয়া যায় না।


অনেকেরই এমন হয়। ঘুম যখন ভাঙে, তখন জড়তা চলে যায় এবং দেহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেহ স্বাভাবিক হতে সামান্য সময় লাগে। এমতাবস্থায় সে জাগ্রত আছে এবং আশেপাশের সকল কিছু দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু তার কোনো অঙ্গ নাড়াতে পারছে না। ব্যাপারটা এক দিক থেকে ভয়ানক, কারণ এই সময়টাতে অনেকে কাল্পনিক ভ্রান্তি বা হ্যালুসিনেশনে ভোগে। সায়েন্স ফিকশনে আচ্ছন্ন কোনো লোক যদি এই পরিস্থিতিতে পড়ে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সায়েন্স ফিকশন সংক্রান্ত কোনো হ্যালুসিনেশনে সে পড়ে যাবে। ভাববে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী তাকে হাতে পায়ে বেঁধে রেখেছে যেন নড়াচড়া করতে না পারে। এবং আরো ভাববে তাকে নিয়ে বুঝি ভয়ঙ্কর সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে।


এটা বেশ খারাপ ভ্রান্তি। কল্পনা বা স্বপ্ন হলেও তা কোনো কারণে মনে গেঁথে যায়। এক পর্যায়ে তারা এটাকে বাস্তব বলে ধরে নেয় এবং এর স্মৃতিকে সত্যিকার স্মৃতি বলে মনে করে।
ঘুম জড়তায় পড়লে নড়াচড়া করা যায় না। চিত্রকর: Henry Fuseli (দ্য নাইটমেয়ার)।
একটা ব্যাপার এখানে উল্লেখযোগ্য, সায়েন্স ফিকশনের গল্পগুলো জনপ্রিয় হবার আগেও এ ধরনের সমস্যা বিদ্যমান ছিল। তখনকার সময়ে যারা এরকম সমস্যায় পড়তো তারাও মিথ্যা স্মৃতিকে সত্য বলে মনে করতো। তবে সেগুলো এলিয়েনকে নিয়ে নয়, ভূত-প্রেত-পিশাচ বা অশুভ মৃত আত্মাকে নিয়ে। আজকালকার যুগের হরর সিনেমাগুলো যেমন হয় অনেকটা তেমন। তারা মানুষের কাছে বর্ণনা করতো, একটি মায়া নেকড়ে বা একজন রক্তচোষা মানুষ এসে তাদের ঘাড়ে কামড় দিয়ে রক্ত চুষে খেয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার দাবী করতো ডানাওয়ালা অত্যন্ত সুন্দর পরী এসে তাদেরকে সঙ্গ দিয়ে গেছে। কেউ যদি ভ্যাম্পায়ার বা মায়া নেকড়ের গল্পকাহিনীতে বুদ হয়ে থাকে এবং তার যদি ঘুম জড়তা বা স্লিপ প্যারালাইসিস হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সে ঘুম থেকে উঠে মনে করবে রাতে কোনো রক্তচোষা মনে হয় তাকে আক্রমণ করেছিল। কেউ যদি এলিয়েন, স্পেস শিপ, নাক্ষত্রিক ভ্রমণ নিয়ে মগ্ন থাকে, তাহলে সে সেই সংক্রান্ত বিষয় দেখতে পাবে এবং তা-ই সত্য বলে বিশ্বাস করবে।

এক্ষেত্রে আরো একটি ক্ষতিকর ব্যাপার হচ্ছে ভুক্তভোগীর পরিবার ও বন্ধুবান্ধব। কেউ যখন ভাসাভাসা স্মৃতি নিয়ে এলিয়েনদের কথা উপস্থাপন করে, তখন পরিবারের সদস্য বা বন্ধু-বান্ধবরা একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে। এলিয়েনের উচ্চতা কেমন ছিল, গায়ের রঙ কেমন ছিল, চোখ কয়টা ছিল, নাক আছে কিনা, মাথায় চুল আছে কিনা, এরা কি দেখতে মুভি-সিনেমার এলিয়েনের মতো ইত্যাদি ইত্যাদি। কৌতূহলের কোনো শেষ নেই। এমন প্রশ্নের বানে পড়ে তারা তাদের বিশ্বাসের সাথে কল্পনা মিশিয়ে ব্যাপারটাকে আরো ঘোলাটে করে ফেলে। এরকম উল্টাপাল্টা প্রশ্নের কারণেও ব্যক্তির মস্তিষ্কে মিথ্যা স্মৃতি প্রবেশ করতে পারে এবং তা স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
চোখ কয়টা, নাক কেমন, মাথায় চুল আছে কিনা, পেছনে লেজ আছে কিনা!
এই প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে এটা জানলে মনে হয় খুব বেশি অবাক লাগবে না যে, ১৯৯২ সালে আমেরিকার এক জরিপ থেকে দেখা যায়, আমেরিকার প্রায় চার মিলিয়ন মানুষ মনে করে বহির্জাগতিক কোনো বুদ্ধিমান এলিয়েন তাদেরকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশে এরকম হাইটেক-ফ্যান্টাসিগুলো খুব একটা জনপ্রিয় নয় বলে আমেরিকার মতো এরকম ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না। তারপরেও খোঁজ করলে অল্প বিস্তর ঠিকই পাওয়া যায়। ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ তার কোনো একটি স্মৃতিকথায় এরকম একটি ঘটনার কথা বলেছিলেন। হুমায়ুন আহমেদের লেখা কোনো একটি সায়েন্স ফিকশন পড়ে এক মেয়ে দাবী করছে সে একই সাথে দুই জগতে বসবাস করছে।


মনোবিজ্ঞানী 'সু ব্ল্যাকমোরের' মতে ঘুম জড়তায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মূলত মস্তিষ্কে কোনোকিছু নিয়ে পূর্ব থেকে স্থায়ী হয়ে থাকা ভয় বা শংকা থেকে হয়। এলিয়েনদের ধারণা জনপ্রিয় হবার আগে মধ্যযুগে এই ভয়গুলো ছিল ভ্যাম্পায়ার বা অশুভ আত্মা কেন্দ্রীক। মধ্যযুগে অনেক নারী অভিযোগ করেছিল একজন পুরুষ পিশাচ রাতের বেলা ঘুমের মধ্যে তাদের সাথে যৌনকর্ম করেছে। আবার অনেক পুরুষও অভিযোগ করেছে রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় একজন নারী পিশাচ তাদের সাথে যৌনকর্ম করেছে। এরকম মুহূর্তে মনে হয় কোনো এক অশুভ পিশাচ বুকের উপরে এমনভাবে চেপে বসেছে যে কোনোভাবেই নড়াচড়া করা সম্ভব হয় না।


নিউফাউন্ডল্যান্ডের উপকথায় আছে ‘ওল্ড হ্যাগ’ নামে একটি সত্তা রাতের বেলায় মানুষের ঘরে আসে এবং তাদের বুকের উপর ভর করে বসে থাকে, ফলে নড়াচড়া করা সম্ভব হয় না। ইন্দোচীন এলাকার উপকথায় ‘ধূসর ভূত’ নামে একটি সত্তা আছে। এটি রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত মানুষের উপর চেপে বসে থাকে এবং তাদেরকে নড়াচড়ায় অক্ষম করে দেয়। বাংলাদেশেও এরকম সত্তা আছে। বাংলাদেশীরা একে ‘বোবায় ধরা’ নামে ডাকে। এখানের সবগুলোই ঘুমের জড়তার কারণে হয়। কোনোটিতেই কেউ বুকের উপর এসে শ্বাস চেপে বসে থাকে না।
বোবায় ধরা’তে কেউ বুকের উপর চেপে বসে না।
আশা করি আলোচনা থেকে আমরা পরিষ্কার হতে পেরেছি, কেন মানুষ ভুলভাবে মনে করে তাদেরকে এলিয়েনরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল কিংবা কেন মানুষ মনে করতো ভ্যাম্পায়াররা তাদের ঘাড় থেকে রক্ত চুষে খেয়ে নিয়েছে। এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য বা প্রমাণ নেই যে পৃথিবীতে এলিয়েন এসেছিল কিংবা পৃথিবীর বাইরে এলিয়েনের অস্তিত্ব আছে। এলিয়েনের পাশাপাশি ভূত বা অশুভ আত্মার অস্তিত্ব সম্পর্কেও কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই।


কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়। পৃথিবীর বাইরে অন্যান্য নক্ষত্র বা গ্যালাক্সিতে অনেক অনেক বাসযোগ্য গ্রহ রয়েছে এবং এগুলোর মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা একদমই উড়িয়ে দেয়া যায় না। তারা এখনো পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি কিংবা তাদেরকে আমরা এখনো দেখিনি বলে তার মানে এই নয় যে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনও হতে পারে যে, তারা ঠিকই আছে, কিন্তু আমাদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা তাদেরকে দেখতে বা শনাক্ত করতে পারছি না।


তবে তাদেরকে শনাক্ত করতে পারছি না বলে ইচ্ছে মতো কাল্পনিক গল্প ফেঁদেও বসা উচিৎ নয়। কোনোকিছু প্রমাণিত হলে তবেই তাকে নিয়ে খবর প্রচার করা উচিৎ এবং সত্যতার পক্ষে দাবী করা যায়। ঘুমের মধ্যে ধরে নিয়ে গেছে, বেহুশ করে নিয়ে গেছে, সুন্দর পিতামাতার কালো সন্তান প্রভৃতি অনুমান দিয়ে এলিয়েনের প্রমাণ হয় না। এখন বিজ্ঞানের যুগ, এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানই জ্ঞানের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পন্থা। এলিয়েন সম্পর্কে যা করার বিজ্ঞানের সাহায্যেই করতে হবে, যা সিদ্ধান্ত নেবার বিজ্ঞানের সাহায্যেই নিতে হবে। মিথ্যা ও উদ্ভট গল্প ফেঁদে বসার কোনো সুযোগই নেই এখন আর।