Showing posts with label বিচিত্র বিশ্ব. Show all posts
Showing posts with label বিচিত্র বিশ্ব. Show all posts

Friday, October 5, 2018

ড্রাগনকাহিনী : যেভাবে মানবসভ্যতায় আগমন ঘটেছিলো আগুনমুখো ড্রাগনদের।

আমাদের শৈশবের স্মৃতিগুলোকে অল্প যে ক’টি জিনিস অতিরিক্ত মাত্রায় রাঙিয়ে তুলতে পেরেছিলো, রুপকথার গল্প সেগুলোর মাঝে অন্যতম। আমাদের এই উপমহাদেশীয় রুপকথার গল্প দিয়ে শুরু হয় সেই যাত্রা, যেখানে মিশে থাকে ভূত-প্রেত-দৈত্য-দানো-শাকচুন্নির মতো কাল্পনিক চরিত্রগুলোর সাথে রাজপুত্রের যুদ্ধজয়, থাকে সাধারণ কোনো মানুষের অসাধারণ বুদ্ধির জোরে সেসব প্রেতাত্মার হাত থেকে বেঁচে যাবার বুদ্ধিদীপ্ত কাহিনী প্রভৃতি।
টিভি সিরিয়ালে দেখা ড্রাগন।
একটু বড় হলে, এবং সেই সাথে আগ্রহ টিকে থাকলে, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের নানা রুপকথার বইও পড়া শুরু করে অনেকে। তখন চীনা, জাপানী, মিশরীয়, গ্রিক, রোমান, নর্স, রুশী, আফ্রিকান রুপকথার বইতে ভরে যেতে থাকে আমাদের বইয়ের তাক, ডানা মেলতে থাকে আমাদের কল্পনার প্রজাপতি, রঙিন থেকে রঙিনতর হয়ে উঠতে থাকে আমাদের শৈশব-কৈশোর।
ঠাকুমার ঝুলি রাঙিয়ে তুলেছিল আমাদের অনেকের শৈশবকেই।

বিদেশী রুপকথাগুলোর যেসব প্রাণী আমাদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে, ড্রাগন নিঃসন্দেহে এর মাঝে শীর্ষস্থানীয়। কী এক বিচিত্র রকমের শক্তিশালী প্রাণী। বিশাল তার দেহ, যা দেখলেই পিলে চমকে যায়, যার ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায় বিশাল একটি এলাকা। আছে বিশাল দুটি ডানা, যার ঝাপ্টায় ভেঙে পড়ে বাড়িঘর, মারা পড়ে অগণিত মানুষ। লেজে থাকে বড় বড় কাটা, যার একটি ধাক্কা নিমিষে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয় তার সাথে লড়াই করতে আসা মানুষগুলোকে। আছে সারা গায়ে পুরু চামড়া ও আঁশের আস্তরণ, যার সামনে অচল হয়ে পড়ে প্রচলিত প্রায় সব অস্ত্র, অসহায় হয়ে পড়ে শত শত দক্ষ যোদ্ধাও। নিঃশ্বাসে যার বের হয় কালো ধোঁয়া, যে ধোঁয়া মনকেও ভয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

আর আছে মুখ থেকে বের হওয়া লেলিহান আগুনের শিখা, চরম ক্রোধের মুহূর্তে যার নিঃসরণ পাল্টে দিতে পারে গোটা যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি, পুরো রণাঙ্গনকে পরিণত করতে পারে নরকেরই ছোটখাট একটি অগ্নিকুণ্ডে। ড্রাগন এমনই ভয়ানক এক প্রাণী। তবে মানবজাতির সৌভাগ্য, যে প্রাণীকে তারা এত ভয়াবহ রুপে সাজিয়েছে, সেই প্রাণী কেবল তাদের কল্পনাতেই থেকে গেছে। বাস্তবে সে আসলে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারতো, তা বোধহয় না বললেও চলে!
শিল্পীর কল্পনায় ফুটে ওঠা ড্রাগন।
একেক সংস্কৃতিতে এই ড্রাগন এসেছে একেক রুপ নিয়ে। কোথাও বেশ সদাশয়, কোথাও আবার বেশ ভয়াবহ এক প্রাণী হিসেবে। তবে উভয়ক্ষেত্রেই তাকে হত্যা করা ছিলো বেশ দুরূহ একটি ব্যাপার। এটা সেই এলাকার ভৌগলিক অবস্থানের উপরও নির্ভর করতো। প্রাচ্যের সংস্কৃতিতে ড্রাগনদেরকে দেখা যায় বেশ জ্ঞানী এক সত্ত্বা হিসেবে, সমুদ্র ও পানির উপর যাদের রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। এর পাশাপাশি ড্রাগনকে সাধারণ মানুষের প্রতি বেশ দয়ালু হিসেবে দেখার রীতিও দেখা যায় এখানে, যাদের প্রভাবে দূর হয়ে যায় যাবতীয় অপপ্রভাব।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে আবার ড্রাগন এসেছে পুরোপুরি বিপরীত রুপে। এখানে সে বিশালদেহী, ভয়ানক এক প্রাণী, যে কি না হত্যা, ধ্বংসেই মত্ত থাকে সারাদিন। তার বাস এমন দুর্গম, অন্ধকারাচ্ছন্ন, বিপজ্জনক স্থানে, যেখানে যেতে মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। তবে এই ড্রাগনরা একটি কাজ করতো। তারা ছিলো বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির পাহারাদার।
শিংওয়ালা ড্রাগন।
প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য, যে সংস্কৃতির কথাই বলা হোক না কেন, উভয়ক্ষেত্রেই মধ্যযুগের আগপর্যন্ত ড্রাগনের কোনো ডানা গজায়নি! অর্থাৎ, তখন পর্যন্ত গল্পকারেরা ড্রাগনের ডানা জুড়ে দেননি। এই সময়কাল থেকে পাশ্চাত্যের ড্রাগনগুলোকে ডানাওয়ালা হতে দেখা যায়, অন্যদিকে প্রাচ্যের ড্রাগনগুলো আগের মতোই থেকে যায়, অর্থাৎ ডানাবিহীন।
ড্রাগন নিয়ে উপকথারও কমতি নেই। বিশালাকায় এই প্রাণীটির রক্তের কথাই ধরা যাক না। বিভিন্ন উপকথায় এসেছে, কেউ যদি ড্রাগনের রক্তে ডুবানো ছুরি বা তলোয়ার দিয়ে কাউকে আঘাত করে, তবে আহত ব্যক্তির ক্ষত কখনোই সারবে না। এটা তো গেলো ড্রাগনের রক্তের খারাপ দিক। আবার এর ভালো দিকও আছে। এই রক্ত নাকি একজন মানুষকে ভবিষ্যতে দেখার ক্ষমতাও দিতে পারতো। প্রাচ্যের ড্রাগনগুলো আবার ইচ্ছেমতো তাদের আকার পরিবর্তন করতে পারতো, এমনকি চাইলে ধারণ করতে পারতো মানুষের আকৃতিও!
গেম অফ থ্রোন্স টিভি সিরিজের একটি পর্বে ড্রাগনের আক্রমণে পুড়ে ছারখার শত্রুশিবির।
কালে কালে গল্পকারদের হাতে পড়ে ড্রাগন যে কোথা থেকে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, উপরের লেখা পড়ে তার কিছুটা হয়তো অনুমান করা যায়। এই সিরিজের পরবর্তী পর্বগুলোতে এই সম্পর্কে আরো আলোকপাত করা হবে। কিন্তু, একেবারেই কাল্পনিক একটি প্রাণী বিশ্বব্যাপী মানুষের মনে জায়গা করে নিলো কীভাবে- কখনো কি এই প্রশ্নটি আপনার মনে উঁকি দিয়েছে? ড্রাগনের নানা কাহিনী গল্পের বইয়ে পড়ে, কিংবা হাল আমলে অত্যন্ত জনপ্রিয় গেম অফ থ্রোন্স টিভি সিরিজে ডেনেরিস টার্গারিয়েন ‘ড্রাকারিস’ বলামাত্র আগুনের লেলিহান শিখায় সবকিছু ছারখার করে দেয়া ড্রাগন প্রকৃতপক্ষে কোথা থেকে আসলো, সেই প্রশ্ন কি আপনাদের মনের জানালায় কখনো টোকা দিয়ে যায়নি?
দেরি না করে চলুন তাহলে ড্রাগন নিয়ে শুরু হওয়া আমাদের এই উপকথাভিত্তিক সিরিজের প্রথম পর্বে সেই ইতিহাসেরই অনুসন্ধান করে আসা যাক।

কীভাবে মানবসমাজে আগমন ঘটলো ড্রাগনদের?

প্রশ্নটি রাখা হয়েছে একেবারে সরাসরি, তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এর সরাসরি কোনো উত্তর নেই। শত-সহস্র বছর আগে থেকে বিভিন্ন উপকথায় ড্রাগনদের উপস্থিতির কথা জানা যায়। আর কীভাবে সেগুলোতে এই প্রাণীগুলো স্থান করে নিলো, এর পেছনে গবেষকগণ দিয়েছেন নানা রকম যুক্তি। এখন একে একে আমরা সেগুলোই জানার চেষ্টা করবো

(১) কুমিরঃ

কুমিরের কথা বলতে গেলে এখানে দু’প্রজাতির কুমির নিয়ে আলাপ করতে হবে।
ফ্লোরিডার সেইন্ট অগাস্টিন ক্রোকোডাইল ফার্মের একটি নোনাপানির কুমির।
প্রথমেই আসবে সল্টওয়াটার ক্রোকোডাইল, তথা নোনাপানির কুমিরের নাম, যা একইসাথে এস্টুয়ারাইন ক্রোকোডাইল, ইন্দো-প্যাসিফিক ক্রোকোডাইল, মেরিন ক্রোকোডাইল, সী ক্রোকোডাইল প্রভৃতি নামে পরিচিত। বর্তমান বিশ্বের বুকে বিচরণ করে বেড়ানো সরিসৃপদের মাঝে এই নোনাপানির কুমিরই সর্ববৃহৎ। এরপরেই আসবে নাইল ক্রোকোডাইল, তথা নীলনদের কুমিরদের নাম। এই কুমিরগুলো আফ্রিকার সর্ববৃহৎ মিঠাপানীর শিকারী প্রাণী। এছাড়া দৈর্ঘ্যের দিক থেকে নোনাপানির কুমিরের ঠিক পরেই রয়েছে এর অবস্থান।
দক্ষিণ আফ্রিকার লা বনহুর ক্রোকোডাইল ফার্মের কিছু নীলনদের কুমির।
নোনাপানির কুমিরগুলো ভারতের পূর্ব উপকূল থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলে দেখা যায়। নীলনদের কুমিরগুলোকে সাব-সাহারান আফ্রিকার নদী, হ্রদ ও অন্যান্য জলাভূমিগুলোতে দেখা যায় এখন। তবে আগেকার দিনে তাদের বিস্তার আরো অনেক জায়গা জুড়েই ছিলো। ইতিহাস বলে, নীলনদের এই কুমিরগুলোকে এককালে ভূমধ্যসাগরের উত্তরাঞ্চলেও দেখা যেত। অর্থাৎ দক্ষিণ ইতালি, গ্রিস ও স্পেনের অধিবাসীদের মাঝে মাঝেই মুখোমুখি হতে হতো জলের এই দানবদের সাথে।
কুমিরের সাথে মিল রেখে চিত্রিত কাল্পনিক ড্রাগন।
২০ ফুট পর্যন্ত লম্বা এই নীলনদের কুমিরেরা তাদের শরীরের মধ্যভাগ একেবারে ভূমি থেকে তুলে দাঁড়াতে সক্ষম, যা সাধারণত হাই ওয়াক (High Walk) নামে পরিচিত। নোনাপানির কুমিররা তো আরো এককাঠি সরেস। লম্বায় মাঝে মাঝে ২৩ ফুট ছুঁয়ে ফেলা এই প্রাণীগুলো শিকারকে ধরতে কখনো কখনো তো পানি থেকেই উপরের দিকে লাফিয়ে ওঠে। এখান থেকেই ধারণা করা হয়, নীলনদের কুমিরদের এই আচরণই হয়তো আস্তে আস্তে গল্পকারদের এমন ড্রাগন চরিত্র তৈরিতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, যা তার পেছনের পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে শত্রুকে খতম করে দেয়।

(২) ডায়নোসরঃ

এবার আসা যাক ডায়নোসরদের কাছে। ড্রাগনদের অস্তিত্ব না থাকুক, বিশালাকায় ডায়নোসররা যে এককালে সত্যি সত্যিই এই ধরনীর বুকে বিচরণ করে বেড়িয়েছে, তা তো আজ সবাই জানে। অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদই মনে করেন, প্রাচীনকালে মানুষজন যখন ডায়নোসরদের বিশাল বিশাল সব ফসিল খুঁজে পেত, তখন থেকেই মানুষের মনে ধীরে ধীরে ড্রাগনের উপকথা জন্ম নিতে থাকে।
শিল্পীর কল্পনায় যখন পৃথিবীর বুকে বিচরণ করতো ডায়নোসররা।
উদাহরণস্বরুপ, ক্বিজিয়াংলং ডায়নোসরের কথা বলা যায়। ৪৯ ফুট, অর্থাৎ প্রায় পাঁচতলা ভবনের সমান উঁচু এই ডায়নোসরটির প্রজাতি আজ থেকে প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াতো। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে চীনের হেবা গ্রামের কৃষক চাই চ্যাংমিং সর্বপ্রথম এর একটি কশেরুকা খুঁজে পান। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে নিকটবর্তী ক্বিজিয়াং জেলার একটি কনস্ট্রাকশন সাইটে ডায়নোসরটির ফসিলের বেশ বড় একটি সংগ্রহ আবিষ্কৃত হয়।
আজকের দিনে জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবার বদৌলতে আমরা হয়তো দেখেই বলে দিতে পারছি, এটা অমুক প্রজাতির ডায়নোসরের ফসিল। কিন্তু একটু শত-হাজার বছর আগেকার মানুষগুলোর কথা ভাবুন। তাদের কাছে তো আর আজকের দিনের মতো জ্ঞান, প্রযুক্তির কিছুই ছিলো না। ফলে অতিকায় সেসব ফসিলের সন্ধান তারা যখন পেতো, তখন তারা ড্রাগনের মতো অতিকায় কোনো প্রাণীর কথা যে কল্পনা করবে, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কারণ ইতিহাস বলে, খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক থেকেই চীনে ডায়নোসরের ফসিল নিয়ে গবেষণা চলছে।

(৩) তিমিঃ

নীল তিমি।
বৃহদাকার প্রাণীদের কথা আসবে, আর সেখানে তিমি অনুপস্থিত থাকবে, সেটা কী করে সম্ভব? কেউ কেউ তাই মনে করেন, তিমির মতো বৃহদাকার প্রাণীদের সন্ধান পাওয়াটাও হয়তো ডায়নোসরের উপকথা গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। প্রাচীনকালে মানুষজন যখন তিমির অস্থির সন্ধান পেতো, তখন এই প্রাণীটি সম্বন্ধে তাদের জানার সুযোগ ছিলো খুবই সীমিত। ফলে একদিকে সীমিত জ্ঞান, অপরদিকে বিশালাকার অস্থি- এই দুইয়ে মিলে মানুষের মনে তিমি সম্পর্কে ভয়ঙ্কর এক শিকারী প্রাণীর প্রতিচ্ছবি গড়ে তুলেছিল, যা থেকেও ড্রাগনের উৎপত্তি হতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।


(৪) গোয়ানাঃ


অস্ট্রেলিয়ান প্রাণী গোয়ানা।
অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে প্রায় ২৫ প্রজাতির গোয়ানার বসবাস, যেগুলো মনিটর লিজার্ড নামেও পরিচিত। বড়সড় শিকারী এই প্রাণীগুলোর রয়েছে ধারালো দাঁত ও থাবা। সেই সাথে স্থানীয় উপকথাগুলোতেও এদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। শুধু তা-ই নয়, বছরখানেক আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, তাদের দেহে বিষও উৎপন্ন হয়, যা আক্রান্ত প্রাণীর দেহে পরবর্তী সময়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। এসব থেকে ধারণা করা হয়, অন্তত অস্ট্রেলিয়ায় ড্রাগনের উপকথা জন্মের পেছনে প্রত্যক্ষ প্রভাব রেখেছে এই গোয়ানা।


(৫) মানবমনঃ


মানুষের বহুমাত্রিক কল্পনা।
দিনশেষে অবশ্য সন্দেহের তীর যদি মানুষের দিকেই তাক করা হয়, সেটাও বোধহয় খুব বেশি অযৌক্তিক হবে না, অন্তত ‘An Instinct for Dragons’ বইয়ের লেখক, নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড ই. জোন্স সেটাই মনে করেন। তার মতে, বিবর্তন মানুষের মনে শিকারী প্রাণী সম্পর্কে একটি সহজাত ভয়ের প্রবৃত্তি সৃষ্টি করে রেখেছে। তার হাইপোথিসিস অনুসারে, অজগর, শিকারী পাখিসহ বড় বড় শিকারী প্রাণীদের সম্পর্কে ভীতি দেখা যায় হোমিনিডদের বেলায়। সেই ভীতি মানুষের মন থেকে সঞ্চারিত হয়েছে বিভিন্ন উপকথায়, আর এর মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে আজকের ড্রাগনেরা।
ড্রাগনের আগমন নিয়ে আপনার অভিমত কী? উপরে বর্ণিত ৫টি কারণের মাঝে কোনটিকে আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়, এবং কেন? একটু সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করবেন কি?

ড্রাগনদের নিয়ে সিরিজের পরবর্তী পর্বে আবারও দেখা হবে আপনাদের সাথে। ততদিন পর্যন্ত… ড্রাকারিস…

Tuesday, July 18, 2017

যে গান মৃত্যু ডেকে আনে!

মন ভালো হোক কিংবা খারাপ, আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যেকোনো সময়ে গান ছাড়া যাদের চলেই না। জ্যামে বসে অলস সময় কাটাতেই হোক কিংবা জিমে গিয়ে প্রচণ্ড শারীরিক কসরত করার মুহূর্তেই হোক, গান আমাদের চিরসঙ্গী। মানুষের অনুভূতির সাথে মিশে গিয়ে একমাত্র গানই পারে চোখের পলকে মনের যত ক্লান্তি সব দূর করে দিতে। কিন্তু সেই গানই যদি হয় মৃত্যুর কারণ তবে কেমন হবে একবার ভাবুন তো!
ইউটিউবে গ্লুমি সানডে গানের কভার চিত্র।
বলছিলাম ‘গ্লুমি সানডে‘ গানটির কথা। প্রায় শতাধিক জীবন কেড়ে নেয়া এই গানটি বেশ সাড়া জাগানো ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে। এমনকি গানটির রচয়িতা স্বয়ং শিকার হয়েছেন রহস্যজনক মৃত্যুর। তাই তো গ্লুমি সানডের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হাঙ্গেরির সুইসাইড সং’
গ্লুমি সানডের অপর নাম হাঙ্গেরির সুইসাইড সং।
গানটি নিয়ে আর কিছু বলার আগে দেখে আসা যাক কি ছিল সেই গানের কথায়
"Sunday is gloomy, my hours are slumberless
Dearest the shadows I live with are numberless
Little white flowers will never awaken you
Not where the black coach of sorrow has taken you
Angels have no thought of ever returning you
Would they be angry if I thought of joining you?

Gloomy Sunday

Gloomy is Sunday, with shadows I spend it all
My heart and I have decided to end it all
Soon there’ll be candles and prayers that are sad I know
Let them not weep let them know that I’m glad to go
Death is no dream for in death I’m caressing you
With the last breath of my soul I’ll be blessing you

Gloomy Sunday

Dreaming, I was only dreaming
I wake and I find you asleep in the deep of my heart, here
Darling, I hope that my dream never haunted you
My heart is telling you how much I wanted you

Gloomy Sunday"

গ্লুমি সানডের রচয়িতা 'রেজসো সেরেস'।
১৯৩২ সালে প্যারিসে বসে গ্লুমি সানডে গানটি লিখেছিলেন হাঙ্গেরিয়ান পিয়ানোবাদক এবং সঙ্গীত রচয়িতা রেজসো সেরেস। কারো কারো মতে জায়গাটি প্যারিস নয়, বুদাপেস্টও হতে পারে। ৩৪ বছর বয়সী সেরেস তখন একটুখানি সাফল্যের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন। গান নয়, মূলত কবিতা হিসেবেই প্রথম রচিত হয় গ্লুমি সানডে। পিয়ানোর সি-মাইনর মেলোডির সাথে কম্পোজিশন করা হয় কবিতাটির।

গানটি কে এবং কেন লিখেছিলেন তা নিয়ে আজ অবধি জল কম ঘোলা হয়নি। রেজসো সেরেসকে যদিও গানটির রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তা সত্ত্বেও গানটির পেছনের কাহিনী হিসেবে একাধিক মতভেদ রয়েছে। সবচেয়ে প্রচলিত মত অনুযায়ী জানা যায়, মামলা-মোকদ্দমার ফেরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন সেরেস। তাকে স্বান্তনা দিতে একটি কবিতা লিখে পাঠান ছোটবেলার বন্ধু লাজলো জেভার। সেই কবিতাটি সেরেসের অন্তর ছুঁয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে পিয়ানোর সাহায্যে সুর দিয়ে এটিকে গানে রুপান্তরিত করেন সেরেস। অন্য একটি মত অনুযায়ী, সেরেসের হাত দিয়েই রচিত হয় গ্লুমি সানডে।

অপর একটি ব্যাখ্যা মতে, প্রেমিকা সেরেসকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তিনি এতটাই বিষণ্ণ হয়ে পড়েন যে সুর করে ফেলেন গ্লুমি সানডের মতো মন খারাপ করা গান। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীর বর্ণনা এবং তার অন্তিম পরিণতি কি হতে পারে সেই চিন্তা-ভাবনারই প্রতিফলন এই গানটি। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। হাঙ্গেরিতেও চলছিল চরম অর্থনৈতিক মন্দা আর ফ্যাসিবাদ। সব মিলিয়ে দুর্বিষহ দিন কাটছিল সেরেসের। সেরেস তার অন্তরের সমস্ত বেদনা একত্রিত করে ঢেলে দিয়েছিলেন এই গানটির প্রতিটি সুরে। আর সে কারণেই অচিরেই তার বিষণ্ণতা ছুঁয়ে গিয়েছিল গীতিকার লাজলো জাভোরকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা।
গানটিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে বেশ কিছু মিথও । বলা হয়, সুন্দরী এক নারী গানটি প্লেয়ারে চালিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। আবার এক ব্যবসায়ীর পকেট থেকে সুইসাইড নোট হিসেবেও পাওয়া যায় গ্লুমি সানডে। হাঙ্গেরির দুই কিশোরী এই গান গাইতে গাইতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নদীতে এমন কথাও শোনা যায়। কেউ দেখেনি, কেউ শোনেনি অথচ এই মিথগুলো দিব্যি প্রচলিত রয়েছে মানুষের মুখে মুখে।
আরেকটি একটি উল্লেখযোগ্য মত হলো গ্লুমি সানডে গানটি শুনে আত্মহত্যা করা ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন স্বয়ং জাভোরের প্রেমিকাও। মতান্তরে জাভোরের প্রেমিকা তার সুইসাইড নোটে মাত্র দুইটি শব্দ লিখে গিয়েছিলেন- ‘গ্লুমি সানডে’। কাজেই সেরেসের মতো জাভোরও ছিলেন একাকী। সুতরাং দুজন দুজনের মনের কথা বুঝে ফেলেছিলেন এক নিমিষেই। এবার তাদের প্রয়োজন ছিল একটি সুরেলা কণ্ঠের। সেই অভাব পূরণ করতে ১৯৩৫ সালে এগিয়ে আসেন পল কালমার। গানটির কথার সারমর্ম ছিল অনেকটা এমন- গায়ক তার প্রেমিকার মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল হয়ে আত্মহত্যা করতে চান যাতে অন্তত মৃত্যুর পরে হলেও তাদের দুজনের আত্মা একত্রিত হতে পারে। বর্তমানে গানটির যে সংস্করণ সর্বত্র শোনা যায় তা ১৯৪১ সালে বিলি হলিডে রেকর্ড করেন।
বিলি হলিডে।
১৯৩৬ সালে হাঙ্গেরিয়ান এই গানটিকে ইংলিশে রেকর্ড করেন হল ক্যাম্প যেখানে কথাগুলো অনুবাদ করতে সহায়তা করেন স্যাম এম লিউইস। লিউইসের লেখা গানটি এবার সরাসরি প্ররোচিত করে আত্মহত্যার পথে। ধীরে ধীরে গানটির নামই হয়ে গেল হাঙ্গেরিয়ার আত্মঘাতী গান। যথাযথ প্রমাণসহ অসংখ্য ব্যক্তির আত্মহত্যার খবরে নড়েচড়ে বসেন সবাই।

‘৩০ এর দশকে পাওয়া খবর অনুযায়ী এই গানটির জের ধরে আমেরিকা ও হাঙ্গেরিতে আত্মহত্যা করেন ১৯ জন, মতান্তরে সংখ্যাটি ২০০ বলেও শোনা যায়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো আত্মহত্যাকারীদের সবার সুইসাইড নোটেই পাওয়া গেছে গ্লুমি সানডের লিরিক্স। জনমত প্রচলিত আছে, এই গানটি বারবার শুনতে শুনতে শ্রোতাদের মধ্যে জীবনের প্রতি এক ধরণের বিতৃষ্ণা চলে আসে এবং সেখান থেকেই তারা বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। ২ জন তো গানটি শুনতে শুনতে গুলি করে নিজেদের মাথার খুলিই উড়িয়ে দিয়েছেন! এরপরও কি গানটি যে অভিশপ্ত তা মানতে কারো কোনো আপত্তি থাকতে পারে?

শ্রোতাদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় হাঙ্গেরিতে গানটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অথচ হাঙ্গেরি কিন্তু এমনিতেও আত্মহত্যার হারের দিক থেকে বিশ্বের প্রথম সারির একটি দেশ। প্রতি বছর লাখে প্রায় ৪৬ জন মানুষ সেখানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তারপরও অভিশপ্ত গান হিসেবে স্বীকৃতি পায় গ্লুমি সানডে। পরবর্তীতে ৪০ এর দশকে বিবিসি ও গানটির লিরিক শোনানো বন্ধ করে শুধুমাত্র ইন্সট্রুমেন্টাল বাজানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ভাষ্যমতে, আত্মহত্যার প্ররোচনা না থাকলেও এই গানটি কাউকে যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। কাজেই বিলি হলিডের গ্লুমি সানডে সংস্করণটি সব জায়গা থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়। ২০০২ সালে এসে গানটির উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে রেডিও চ্যানেলগুলো।

পত্রিকায় সেরেসের আত্মহত্যার খবর।
গানটির প্রভাবেই কিনা কে জানে, গ্লুমি সানডে রচনার ৩৫ বছর পরে গানটি গাইতে গাইতে সেরেস তার চার তলা অ্যাপার্টমেন্টের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন ১৯৬৮ সালে। কেন একটি মাত্র গান এত বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ালো তা আজও এক রহস্য। তবুও গানটিকে ঘিরে সবার কৌতূহলের যেন কোনো শেষ নেই। এলভিস কোস্টেলো, সারাহ ম্যাকল্যাচলান, হেথার নোভা প্রমুখ সংগীত শিল্পী সাম্প্রতিক সময়ে গ্লুমি সানডের নতুন নতুন সংস্করণ রেকর্ড করেছেন।
রলফ সুবলের চলচ্চিত্র ‘গ্লুমি সানডে’।
গ্লুমি সানডে গানটিকে ভিত্তি করে ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচার এবং একটি ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী নিয়ে একই নামে ১৯৯৯ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন পরিচালক রলফ সুবল। এখানে তিনি ইতিহাস এবং ফিকশনের মধ্যে একটি সমন্বয় ঘটিয়েছেন।

তবে গান শুনুন আর চলচ্চিত্রই দেখুন, আত্মহত্যার পথে না হাঁটার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। কারণ আত্মহত্যা কখনোই কোনো পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে না। বেঁচে থেকে কঠিন সব সমস্যার মোকাবেলা করে দিন শেষে বিজয়ীর হাসি হাসতে পারাই তো প্রকৃত বীরের কাজ।

Monday, July 17, 2017

এলিয়েনের আধুনিক উপকথা!

পৃথিবীর গণ্ডি পেরিয়ে মহাবিশ্বের কোনো গ্রহে কি আমাদের মতো প্রাণের অস্তিত্ব আছে? এই প্রশ্নটি বেশ আধুনিক। প্রাচীনকালের মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি পৃথিবীর বাইরে প্রাণ থাকতে পারে। তখন বিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটেনি তেমন। কিন্তু আশেপাশে রহস্যময় ঘটনা ঠিকই ঘটতো। সেসব ঘটনাকে তারা নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যাও দিতো। সেই ব্যাখ্যাগুলো পরবর্তীতে ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে উপকথা বা পৌরাণিক কাহিনী হিসেবে স্থান করে নিয়েছিল মানুষের মাঝে। যতদূর জানা যায়, বহির্বিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে কোনো প্রাচীন উপকথা বা পুরাণ নেই। না থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ পৃথিবীর বাইরেও যে পৃথিবীর চেয়ে কোটি কোটি গুণ বেশি বড় একটি জগত আছে এটি সম্বন্ধে জানতোই না মানুষ। ভাবনাতেই আসেনি পৃথিবীর সমান বা তার চেয়ে বড় কোনো গ্রহের অস্তিত্ব আছে আকাশে।

আকাশকে তারা শুধুমাত্র তারা দিয়ে আঁকা বর্ণীল চাদর বলেই মনে করেছে। যেহেতু তাদের কল্পনা কিংবা বাস্তবতায় পৃথিবী ব্যতীত কোনো গ্রহের অস্তিত্ব ছিল না, তাই সেসব গ্রহে বিদ্যমান প্রাণ নিয়ে কোনো উপকথা বা পৌরাণিক গল্পও তৈরি হয়নি।
পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে এমনটা কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না একসময়।
১৫০০ সালের পরে মানুষ অনুধাবন করতে পেরেছিল পৃথিবীকে আমরা যেভাবে দেখি এটি আসলে তা না। আমরা হয়তো চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি সূর্য পৃথিবীর পূর্ব দিক থেকে উঠছে আর পশ্চিম দিকে অস্ত যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিকার বাস্তবতা হচ্ছে পৃথিবী নিজে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। যার অর্থ হচ্ছে পৃথিবীর চেয়েও বড় জিনিসের অস্তিত্ব আছে। বড় ও ভারী জিনিসকে কেন্দ্র করেই ছোট ও হালকা জিনিসগুলো আবর্তন করে। সূর্য যেহেতু তার শক্তি দিয়ে পৃথিবীকে ঘোরাচ্ছে, তার মানে অবশ্যই সূর্যের ভর পৃথিবীর চেয়ে বড়। সীমাহীন এলাকাব্যাপী একটি গ্রহের চেয়েও বড় কিছুর অস্তিত্ব আছে এমনটা ভাবা তখনকার সময়ের জন্য আসলেই বৈপ্লবিক ছিল।


তখন পর্যন্ত সূর্য ও সূর্যের পরিবারের কিছু গ্রহ সম্বন্ধে জানা গিয়েছিল। কিন্তু সৌরজগতের বাইরেও যে অনেক অনেক নক্ষত্র আছে এবং কল্পনাতীত বিশাল গ্যালাক্সি আছে তা জানতে জানতে মানবজাতিকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। খুব বেশি দিন হয়নি, মানুষ তখনো বিশ্বাস করতো উপরের দিক সবসময়ই উপরে। পরবর্তীতে আবিষ্কার হলো পৃথিবী গোল। পৃথিবীর যে অংশটা আমাদের জন্য উপরে, একই অংশ হতে পারে অন্য কারো জন্য নীচে। আমরা বাংলাদেশীরা যদি নীচের দিক থেকে কোনো কিছু নির্দেশ করি সেটা হয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপরের দিক। মানুষ মনে করতো উপরের আকাশলোকে দেবতারা বসবাস করে, কিন্তু আদতে উপর বলতে কিছু নেই। আকাশ বলতে যে গম্বুজের মতো তারায় শোভিত দেয়াল দেখি, সেটাও আসলে কোনো দেয়াল নয়। দেখে মনে হয় তারাগুলো খুবই কাছাকাছি ঘেঁষে ঘেঁষে লেগে আছে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে এক তারা থেকে আরেক তারার মাঝে বিলিয়ন বিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্ব বিদ্যমান।

গম্বুজসদৃশ তারকাখচিত আকাশটি আসলে কোনো ‘আকাশ’ নয়।
পৃথিবীর স্বাভাবিক প্রাণের বাইরে বায়ুতে বা শূন্যে ভেসে বেড়ানো অদ্ভুত ধরনের সৃষ্টি বা অবাস্তব প্রাণ নিয়ে অনেক বিশ্বাস ও উপকথা আছে। যেমন- প্রেত, পিশাচ, অপদেবতা, মৃত আত্মা, ভূত ইত্যাদি। কিন্তু এসবের কোনোটিই বহির্জাগতিক কোনো গ্রহের প্রাণ নয়। উপকথা ও বিশ্বাস অনুসারে এরা আমাদের আশেপাশেই ঘুরে বেড়ানো সত্তা। কিন্তু এই লেখার প্রসঙ্গ সেগুলো থেকে ভিন্ন।


আদিম মানুষ বা বিচ্ছিন্ন আদিবাসীদের মধ্যে বহির্বিশ্বের প্রাণ নিয়ে কোনো উপকথা নেই। তবে উপকথা তো কোনো না কোনো কালের মানুষেরাই বানায়। আমাদের আজকের যুগের কোনো অন্ধবিশ্বাসও তো হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হাস্যকর উপকথা। এলিয়েন বা ইউএফও সম্বন্ধে মানুষ যখন জানলো, তখন তাদেরকে ব্যাখ্যা করতে নানা কাহিনীর জন্ম দিয়ে দিল। যারা এসব কাহিনীর জন্ম দিয়েছে, তারা শিক্ষিত ও শহুরে নাগরিক। (বহির্বিশ্বের বুদ্ধিমান প্রাণকে ‘এলিয়েন’ বলা হয় এবং এসব এলিয়েন যেসব মহাকাশযানে করে ঘুরে বেড়ায় তাদেরক পৃথিবীবাসী ‘ইউএফও’ বলে থাকে।) মনগড়া ব্যাখ্যার পাশাপাশি তাদেরকে ঘিরে নানা ধরনের কাহিনীরও জন্ম দিয়ে দেয় পৃথিবীবাসীরা। এসব অবৈজ্ঞানিক নাটকীয় কাহিনীকে আমরা বলতে পারি ‘আধুনিক উপকথা’। আধুনিক উপকথা বা আধুনিক পুরাণগুলো একটি দিক থেকে আগ্রহোদ্দীপক। প্রাচীনকালের উপকথাগুলো কোন প্রেক্ষিতে কীভাবে জন্ম লাভ করেছিল তা আমরা জনতে পারি না। কিন্তু আধুনিক উপকথাগুলো সম্বন্ধে অনেক তথ্যই আমরা জানতে পারি। কারণ এসব ঘটনা ঘটেছে আমাদের চোখের সামনে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিত, কারণ, পূর্বে এরকম ধারণার রূপ কেমন ছিল তার সবই আমাদের জানা আছে।


এমনকি এসব গল্পের জন্ম দিয়েছে যেসব লোকেরা আমরা চাইলে তাদের সাথে কথাও বলতে পারি। তারা এখনো জীবিত আছে। তারা তখন ঘোরের মধ্যে এসব করেছিল, নাকি কোনো বিশ্বাস থেকে করেছিল, নাকি নিজের অজান্তেই করেছিল তা-ও আমরা জানতে পারি তাদেরকে জিজ্ঞেস করে। এমনকি তারা তখন যে অবস্থায় ছিল তার চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন মেডিকেল রিপোর্টও জানতে পারি।

১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ঘটনা। ‘হেভেন্স গেইট’ নামে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ৩৯ জন সদস্য স্বেচ্ছায় বিষ খেয়ে বসলো । তারা বিশ্বাস করেছিল বহির্বিশ্বের কোনো এক UFO তাদের সকলের আত্মা অন্য একটি গ্রহে নিয়ে যাবে। তাই তারা আত্মহত্যা করে পৃথিবীর জীবন সাঙ্গ করে ঐ গ্রহে রওনা দেয়। ঐ সময়ে পৃথিবী থেকে একটি ধূমকেতুকে দেখা যাচ্ছিল এবং এটি বেশ প্রকট ও উজ্জ্বল ছিল। ধর্মীয় ঐ গোষ্ঠীটি মনে করেছিল এর পাশে কোনো UFO আছে বলে এমন উজ্জ্বল দেখাচ্ছে একে। এমন ধারণায় তারা সকলে বিশ্বাস করেছিল, কারণ তাদের আধ্যাত্মিক নেতা এমন কথা বলেছিল।
আত্ম হন্তারকদের দুটি দেহ।

হ্যাভেনস গেটের গণ আত্মহত্যা (গাড়ির ভেতর সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশগুলো দ্রষ্টব্য)।
ধূমকেতুটিকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি টেলিস্কোপও কিনে এনেছিল তারা। কিন্তু পরবর্তীতে তা দোকানে ফেরত দিয়ে দেয়। ফেরত দিতে গিয়ে অভিযোগ দেয় টেলিস্কোপটি ভালো না, ঠিকমতো কাজ করে না। তারা কীভাবে জানলো যে টেলিস্কোপটি নষ্ট? তারা এর মধ্য দিয়ে কোনো UFO’র দেখা পায়নি। যেহেতু তারা এলিয়েনদের মহাকাশযান UFO দেখতে পায়নি, তাই গায়ের জোরে ধরে নিয়েছিল যে টেলিস্কোপটি নষ্ট!


আধ্যাত্মিক নেতাও কি এরকম ধারণায় বিশ্বাস করেছিল? এ ধরনের ধর্মীয় ঘটনাগুলোয় নেতারা সবসময় অক্ষত থাকে। ভোগান্তিগুলো ভোগে অনুসারীগুলো। কিন্তু এখানে সম্ববত আধ্যাত্মিক নেতাটি বহির্জাগতিক স্বর্গীয় প্রাণের ধারণায় বিশ্বাস করেছিল। কারণ তিনি নিজেও আত্মহত্যার জন্য বিষ গ্রহণ করেছিলেন। আধ্যাত্মিক নেতা 'মার্শাল অ্যাপলহোয়াইট' অন্য কয়েকজন অনুসারীর সাথে নিজের পুরুষাঙ্গ কেটে খোজা হয়ে গিয়েছিল। পুরুষাঙ্গ কেটে ফেললে নারীর সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া রোধ হয়ে যায় এবং তারও অপর নারীর প্রতি কোনো যৌন আকর্ষণ থাকে না। ফলে মন কলুষিত হয় না। মন যত পরিষ্কার থাকবে তাদের অর্চনা করা স্রষ্টার সান্নিধ্য তত বেশি পাবে! এ থেকে বোঝা যায় তার ও তার কিছু অনুসারীর চিন্তাভাবনা কতটা অন্ধ ছিল। এমন অন্ধ বিশ্বাসের উপস্থিতিতে তারা যে সবাই একত্রে বিষ নিয়ে অন্য কোনো স্বর্গীয় গ্রহে চলে যেতে চাইবে, তা আর অবাক করার মতো কী?

মার্শাল আপলহোয়াইট, যার প্রেরণায় আত্মহত্যা করেছিল ৩৯ জন। এমন কর্মের জন্য তিনি টাইম, নিউজউইক সহ অন্যান্য ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে স্থান করে নিয়েছিলেন।
যারা এলিয়েন সংক্রান্ত কোনো দাবী বা অদ্ভুত কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে, তাদের সবার মধ্যে একটি জিনিসে মিল পাওয়া যায়। এলিয়েন সংক্রান্ত উদ্ভট দাবী যারা করে, তাদের প্রায় সকলেই সায়েন্স ফিকশনের ভক্ত। হয় সেটি কোনো সায়েন্স ফিকশন বই, নাহয় সেটি কোনো সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র। হেভেন্স গেইট নামের ধর্মীয় গোষ্ঠীটির সদস্যরা ‘স্টার ট্রেক’ সিরিজের প্রতি আচ্ছন্ন ছিল।


হ্যাঁ, এটা সত্য যে, ভিন গ্রহের প্রাণী নিয়ে এই পৃথিবীতে সায়েন্স ফিকশনের কোনো অভাব নেই। মূল কথা হচ্ছে অনেক অনেক সায়েন্স ফিকশনের অস্তিত্ব থাকলেই যে এ সংক্রান্ত দাবী সত্য হয়ে যাবে এমন কোনো কথা নেই। সকল ধরনের সায়েন্স ফিকশনই কাল্পনিক। যারা এগুলো পড়ে, তারাও জানে এবং যারা এগুলো লেখে, তারাও জানে। সবগুলোই মানুষের মস্তিষ্কের ভেতর তৈরি করা গল্পের প্লটের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এদের কোনোটিই বাস্তবে ঘটেনি। তারা শুধুই গল্প। অনেকটা আমাদের বাংলা ছড়ার হাট্টিমাটিম টিমের মতো কাল্পনিক প্রাণী।

এলিয়েনে আচ্ছন্ন ব্যক্তিরা স্টার ট্রেক জাতীয় সায়েন্স ফিকশনের ভক্ত।
এরপরেও অনেকে ধারণা করে এবং মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে যে, এলিয়েনদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে তাদের দেখা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ দাবী করে এলিয়েনরা তাদেরকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। অনেকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেও তাদের বিশ্বাসে তারা একদম অনড় থাকে। তাদের দাবীকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যুক্তিহীন তথ্য বা সাক্ষ্য উপস্থাপন করে।


একজন লোকের নাক দিয়ে রক্ত ঝরতো। লোকটি দাবী করেছিল তার এই সমস্যার জন্য দায়ী কোনো এলিয়েন প্রাণী। এর সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য মনগড়ামতো ব্যাখ্যাও দিয়েছিল। তার দেয়া ব্যাখ্যা অনুসারে এলিয়েনরা তার নাকের ভেতর একটি রেডিও ট্রান্সমিটার বসিয়ে দিয়েছে, যার কারণে রক্ত ঝরছে। রেডিও ট্রান্সমিটার বসানোর কারণ, এর সাহায্যে এলিয়েনরা তার উপর গোয়েন্দাগিরি তথা বৈজ্ঞানিক নজরদারি করতে পারবে। উল্লেখ্য রেডিও ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে তার ছাড়াই তথ্য আদান প্রদান করা যায়। মোবাইল এরকমই একটি যন্ত্র।


লোকটির এমন ধারণাও ছিল, সে নিজেও একজন এলিয়েন! কীভাবে জানলো এই কথা? তার বাবা-মা ছিল ফর্সা, কিন্তু সে কিছুটা কালো। বাবা-মা ফর্সা হলে তো সে নিজেও ফর্সা হবার কথা ছিল। যেহেতু লোকটি তার বাবা-মায়ের মতো না, সেহেতু সে একজন এলিয়েন বা এলিয়েনের বংশধর! উদ্ভট যুক্তি।
আমেরিকায় এমন ঘটনার দিকে তাকালে অনেকটা অবাকই হতে হবে। আমেরিকানদের অনেকেই বিশ্বাস করে উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী এলিয়েনরা তাদেরকে ধরে UFO-তে নিয়ে গিয়েছিল এবং সেখানে তার উপর ভয়ানক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছিল। অর্থাৎ তারা এলিয়েনদের পৈশাচিক সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্টের ভুক্তভোগী বা ভিক্টিম। যে এলিয়েনরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তারা দেখতে কেমন ছিল তার বর্ণনাও পাওয়া যায় তাদের কাছে। বেশিরভাগ মানুষই দাবী করে অপহরণকারী এলিয়েনদের গায়ের রঙ নীল, মস্তিষ্ক (মাথা) বেশ বড়, চোখগুলো বেশ বিস্তৃত। এলিয়েন নিয়ে এ ধরনের কাহিনীগুলো যদি একত্র করা হয়, তাহলে তা অনেক রংচঙে ও রসালো আকার ধারণ করবে। এই কাহিনীগুলো এমনকি সকল গ্রিক পুরাণ, মিশরীয় পুরাণ, নর্স পুরাণকেও হারিয়ে দেবে।
তাদের দাবী, এলিয়েনরা ধরে নিয়ে তাদের উপর এক্সপেরিমেন্ট করেছিল।
তবে আশার কথা হচ্ছে এলিয়েনের উপকথাগুলো সাম্প্রতিক। কেউ এই ব্যাপারে আগ্রহী হলে তাদেরকে নিয়ে গবেষণা করতে পারে এবং অনুসন্ধান করে দেখতে পারে আসলেই এর পেছনের কারণ কী ছিল। কেউ চাইলে এসব ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে তাদের অপহরণ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জেনেও নিতে পারবে।


কেউ যদি এই কাজটি করতে যায় তাহলে দেখতে পাবে, একদমই সুস্থ ও সস্বাভাবিক মস্তিষ্কের মানুষ এরকম দাবীগুলো করছে। তারা নিখুঁতভাবে বর্ণনা দেবে UFO-র ভেতরে কীভাবে তাদেরকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছিল, কীভাবে তাদের শরীর কেটে-ছিড়ে ফেলা হয়েছিল, কীভাবে এলিয়েনরা নিজেদের মধ্যে কথা বার্তা বলছিল তার সবই। তাদের সকল মানুষের বেলাতেই এলিয়েনরা ইংরেজিতে কথা বলে! যেহেতু আমেরিকানরা ইংরেজিভাষী, তাই এরা ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বুঝতে পারবে না। অন্য কোনো ভাষাতেও যে এলিয়েনরা কথা বলতে পারে কিংবা এলিয়েনদের নিজস্ব ভাষাতেও যে কথা বলতে পারে এই ধারণা তাদের কল্পনায় তখন ছিল না।


সুসান ক্ল্যানসি নামে একজন মনোবিজ্ঞানী এরকম মানুষদের নিয়ে অনেক গবেষণা করেছিলেন। এলিয়েন তাদেরকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, এরকম দাবীদার মানুষের অনেকেরই ধরে নিয়ে যাবার ঘটনা সম্পর্কে পরিষ্কার স্মৃতি মনে নেই। কারো কারো বেলায় অল্প স্বল্প আছে, আর কারো কারো বেলায় একদমই নেই। সুসান ক্ল্যানসি দেখেছেন এলিয়েন কর্তৃক অপহরণের স্মৃতি যাদের তেমন মনে নেই তারা প্রায় সকলেই দাবী করছে, এলিয়েনরা তাদের কোনো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার দেহে করা এক্সপেরিমেন্ট সংক্রান্ত সকল স্মৃতি মুছে দিয়েছে। মাঝে মাঝে এরকম রোগীদের সম্মোহনবিদ বা সাইকোথেরাপিস্টের কাছেও যেতে দেখা যায়। তাদের ধারণা উপযুক্ত থেরাপি বা সম্মোহনের মাধ্যমে তারা তাদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারবে।
The 3 Sins of Memory শিরোনামে টেড টকে বক্তব্যরত মনোবিজ্ঞানী সুসান ক্ল্যানসি।
হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি পুনরুদ্ধার করার ব্যাপারটি একদমই ভিন্ন তল্লাটের গল্প। স্নায়ুবিজ্ঞানের এই প্রক্রিয়াটি বেশ চমকপ্রদ। তবে চমকপ্রদ হলেও এলিয়েনদের দ্বারা স্মৃতি হারিয়ে ফেলা ও উদ্ধার করার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কেউ যদি কোনো একটি কাল্পনিক বিষয় নিয়ে খুব বেশি মগ্ন থাকে, তাহলে মাঝে মাঝে মনে হতে পারে কাল্পনিক কোনো কিছু বুঝি আসলেই তার জীবনে হয়েছিল। তেমনই সায়েন্স ফিকশন নিয়ে কেউ যদি রাত-দিন মত্ত থাকে, তাহলে ক্ষেত্রবিশেষে মনে হতে পারে সায়েন্স ফিকশনের কোনো কোনো ঘটনা তার জীবনেও ঘটেছে। এক্ষেত্রে এগুলোকে বলা যায় মিথ্যা স্মৃতি বা False Memories।


এখনকার চিকিৎসা প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাইরে থেকে এ ধরনের মিথ্যা স্মৃতি মানুষের মস্তিষ্কে প্রবেশ করানো সম্ভব । জীবনে সত্যি সত্যি ঘটে যাওয়া স্মৃতি থেকে এটি একদমই ভিন্ন। তাই কেউ যদি সম্মোহনবিদ বা সাইকোথেরাপিস্টের কাছে যায় স্মৃতি উদ্ধারের জন্য, তাহলে তারা বড়জোর মিথ্যা স্মৃতি দিতে পারবে, সত্যিকার ঘটে যাওয়া স্মৃতি উদ্ধার করতে পারবে না।

কিছু কিছু মানুষ কেন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে তাদেরকে এলিয়েন অপহরণ করেছিল, তা মিথ্যা স্মৃতি সিনড্রোমের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এ ধরনের ব্যক্তিরা স্টার ট্রেক বা স্টার ওয়ার্স ধাঁচের সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্রে অনেক বেশি মত্ত থাকে। তাদের সমসাময়িক সায়েন্স ফিকশনে যে যে ঘটনা ঘটে, তারাও সেরকম অভিজ্ঞতাই পায় এলিয়েনদের কাছ থেকে। তারা যে যে ঘটনার দাবী করে, সেগুলোর অধিকাংশই টেলিভিশনে প্রচারিত কোনো নাটক বা চলচ্চিত্রের সাথে মিলে যায়।
কাল্পনিক ব্যাপারকে বাস্তব স্মৃতি বলে বিশ্বাস করে কেউ কেউ।
ঘুম জড়তা বা 'Sleep Paralysis' নামে আরো একটি ব্যাপার আছে। কেউ ঘুম জড়তায় পড়লে দেহের কোনো অঙ্গ নড়াচড়া করতে পারে না। কেউ যখন স্বপ্ন দেখে বা ঘুমায় তখন ক্ষণস্থায়ীভাবে তার দেহ স্থবির হয়ে যায়। স্বপ্নে বা ঘুমে প্রয়োজন পড়লে অনেক কষ্ট করেও হাত-পা নাড়ানো যায় না কিংবা চিৎকারও দেয়া যায় না।


অনেকেরই এমন হয়। ঘুম যখন ভাঙে, তখন জড়তা চলে যায় এবং দেহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেহ স্বাভাবিক হতে সামান্য সময় লাগে। এমতাবস্থায় সে জাগ্রত আছে এবং আশেপাশের সকল কিছু দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু তার কোনো অঙ্গ নাড়াতে পারছে না। ব্যাপারটা এক দিক থেকে ভয়ানক, কারণ এই সময়টাতে অনেকে কাল্পনিক ভ্রান্তি বা হ্যালুসিনেশনে ভোগে। সায়েন্স ফিকশনে আচ্ছন্ন কোনো লোক যদি এই পরিস্থিতিতে পড়ে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সায়েন্স ফিকশন সংক্রান্ত কোনো হ্যালুসিনেশনে সে পড়ে যাবে। ভাববে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী তাকে হাতে পায়ে বেঁধে রেখেছে যেন নড়াচড়া করতে না পারে। এবং আরো ভাববে তাকে নিয়ে বুঝি ভয়ঙ্কর সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে।


এটা বেশ খারাপ ভ্রান্তি। কল্পনা বা স্বপ্ন হলেও তা কোনো কারণে মনে গেঁথে যায়। এক পর্যায়ে তারা এটাকে বাস্তব বলে ধরে নেয় এবং এর স্মৃতিকে সত্যিকার স্মৃতি বলে মনে করে।
ঘুম জড়তায় পড়লে নড়াচড়া করা যায় না। চিত্রকর: Henry Fuseli (দ্য নাইটমেয়ার)।
একটা ব্যাপার এখানে উল্লেখযোগ্য, সায়েন্স ফিকশনের গল্পগুলো জনপ্রিয় হবার আগেও এ ধরনের সমস্যা বিদ্যমান ছিল। তখনকার সময়ে যারা এরকম সমস্যায় পড়তো তারাও মিথ্যা স্মৃতিকে সত্য বলে মনে করতো। তবে সেগুলো এলিয়েনকে নিয়ে নয়, ভূত-প্রেত-পিশাচ বা অশুভ মৃত আত্মাকে নিয়ে। আজকালকার যুগের হরর সিনেমাগুলো যেমন হয় অনেকটা তেমন। তারা মানুষের কাছে বর্ণনা করতো, একটি মায়া নেকড়ে বা একজন রক্তচোষা মানুষ এসে তাদের ঘাড়ে কামড় দিয়ে রক্ত চুষে খেয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার দাবী করতো ডানাওয়ালা অত্যন্ত সুন্দর পরী এসে তাদেরকে সঙ্গ দিয়ে গেছে। কেউ যদি ভ্যাম্পায়ার বা মায়া নেকড়ের গল্পকাহিনীতে বুদ হয়ে থাকে এবং তার যদি ঘুম জড়তা বা স্লিপ প্যারালাইসিস হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সে ঘুম থেকে উঠে মনে করবে রাতে কোনো রক্তচোষা মনে হয় তাকে আক্রমণ করেছিল। কেউ যদি এলিয়েন, স্পেস শিপ, নাক্ষত্রিক ভ্রমণ নিয়ে মগ্ন থাকে, তাহলে সে সেই সংক্রান্ত বিষয় দেখতে পাবে এবং তা-ই সত্য বলে বিশ্বাস করবে।

এক্ষেত্রে আরো একটি ক্ষতিকর ব্যাপার হচ্ছে ভুক্তভোগীর পরিবার ও বন্ধুবান্ধব। কেউ যখন ভাসাভাসা স্মৃতি নিয়ে এলিয়েনদের কথা উপস্থাপন করে, তখন পরিবারের সদস্য বা বন্ধু-বান্ধবরা একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে। এলিয়েনের উচ্চতা কেমন ছিল, গায়ের রঙ কেমন ছিল, চোখ কয়টা ছিল, নাক আছে কিনা, মাথায় চুল আছে কিনা, এরা কি দেখতে মুভি-সিনেমার এলিয়েনের মতো ইত্যাদি ইত্যাদি। কৌতূহলের কোনো শেষ নেই। এমন প্রশ্নের বানে পড়ে তারা তাদের বিশ্বাসের সাথে কল্পনা মিশিয়ে ব্যাপারটাকে আরো ঘোলাটে করে ফেলে। এরকম উল্টাপাল্টা প্রশ্নের কারণেও ব্যক্তির মস্তিষ্কে মিথ্যা স্মৃতি প্রবেশ করতে পারে এবং তা স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
চোখ কয়টা, নাক কেমন, মাথায় চুল আছে কিনা, পেছনে লেজ আছে কিনা!
এই প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে এটা জানলে মনে হয় খুব বেশি অবাক লাগবে না যে, ১৯৯২ সালে আমেরিকার এক জরিপ থেকে দেখা যায়, আমেরিকার প্রায় চার মিলিয়ন মানুষ মনে করে বহির্জাগতিক কোনো বুদ্ধিমান এলিয়েন তাদেরকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশে এরকম হাইটেক-ফ্যান্টাসিগুলো খুব একটা জনপ্রিয় নয় বলে আমেরিকার মতো এরকম ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না। তারপরেও খোঁজ করলে অল্প বিস্তর ঠিকই পাওয়া যায়। ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ তার কোনো একটি স্মৃতিকথায় এরকম একটি ঘটনার কথা বলেছিলেন। হুমায়ুন আহমেদের লেখা কোনো একটি সায়েন্স ফিকশন পড়ে এক মেয়ে দাবী করছে সে একই সাথে দুই জগতে বসবাস করছে।


মনোবিজ্ঞানী 'সু ব্ল্যাকমোরের' মতে ঘুম জড়তায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মূলত মস্তিষ্কে কোনোকিছু নিয়ে পূর্ব থেকে স্থায়ী হয়ে থাকা ভয় বা শংকা থেকে হয়। এলিয়েনদের ধারণা জনপ্রিয় হবার আগে মধ্যযুগে এই ভয়গুলো ছিল ভ্যাম্পায়ার বা অশুভ আত্মা কেন্দ্রীক। মধ্যযুগে অনেক নারী অভিযোগ করেছিল একজন পুরুষ পিশাচ রাতের বেলা ঘুমের মধ্যে তাদের সাথে যৌনকর্ম করেছে। আবার অনেক পুরুষও অভিযোগ করেছে রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় একজন নারী পিশাচ তাদের সাথে যৌনকর্ম করেছে। এরকম মুহূর্তে মনে হয় কোনো এক অশুভ পিশাচ বুকের উপরে এমনভাবে চেপে বসেছে যে কোনোভাবেই নড়াচড়া করা সম্ভব হয় না।


নিউফাউন্ডল্যান্ডের উপকথায় আছে ‘ওল্ড হ্যাগ’ নামে একটি সত্তা রাতের বেলায় মানুষের ঘরে আসে এবং তাদের বুকের উপর ভর করে বসে থাকে, ফলে নড়াচড়া করা সম্ভব হয় না। ইন্দোচীন এলাকার উপকথায় ‘ধূসর ভূত’ নামে একটি সত্তা আছে। এটি রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত মানুষের উপর চেপে বসে থাকে এবং তাদেরকে নড়াচড়ায় অক্ষম করে দেয়। বাংলাদেশেও এরকম সত্তা আছে। বাংলাদেশীরা একে ‘বোবায় ধরা’ নামে ডাকে। এখানের সবগুলোই ঘুমের জড়তার কারণে হয়। কোনোটিতেই কেউ বুকের উপর এসে শ্বাস চেপে বসে থাকে না।
বোবায় ধরা’তে কেউ বুকের উপর চেপে বসে না।
আশা করি আলোচনা থেকে আমরা পরিষ্কার হতে পেরেছি, কেন মানুষ ভুলভাবে মনে করে তাদেরকে এলিয়েনরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল কিংবা কেন মানুষ মনে করতো ভ্যাম্পায়াররা তাদের ঘাড় থেকে রক্ত চুষে খেয়ে নিয়েছে। এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য বা প্রমাণ নেই যে পৃথিবীতে এলিয়েন এসেছিল কিংবা পৃথিবীর বাইরে এলিয়েনের অস্তিত্ব আছে। এলিয়েনের পাশাপাশি ভূত বা অশুভ আত্মার অস্তিত্ব সম্পর্কেও কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই।


কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়। পৃথিবীর বাইরে অন্যান্য নক্ষত্র বা গ্যালাক্সিতে অনেক অনেক বাসযোগ্য গ্রহ রয়েছে এবং এগুলোর মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা একদমই উড়িয়ে দেয়া যায় না। তারা এখনো পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি কিংবা তাদেরকে আমরা এখনো দেখিনি বলে তার মানে এই নয় যে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনও হতে পারে যে, তারা ঠিকই আছে, কিন্তু আমাদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা তাদেরকে দেখতে বা শনাক্ত করতে পারছি না।


তবে তাদেরকে শনাক্ত করতে পারছি না বলে ইচ্ছে মতো কাল্পনিক গল্প ফেঁদেও বসা উচিৎ নয়। কোনোকিছু প্রমাণিত হলে তবেই তাকে নিয়ে খবর প্রচার করা উচিৎ এবং সত্যতার পক্ষে দাবী করা যায়। ঘুমের মধ্যে ধরে নিয়ে গেছে, বেহুশ করে নিয়ে গেছে, সুন্দর পিতামাতার কালো সন্তান প্রভৃতি অনুমান দিয়ে এলিয়েনের প্রমাণ হয় না। এখন বিজ্ঞানের যুগ, এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানই জ্ঞানের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পন্থা। এলিয়েন সম্পর্কে যা করার বিজ্ঞানের সাহায্যেই করতে হবে, যা সিদ্ধান্ত নেবার বিজ্ঞানের সাহায্যেই নিতে হবে। মিথ্যা ও উদ্ভট গল্প ফেঁদে বসার কোনো সুযোগই নেই এখন আর।

Saturday, December 10, 2016

হিটলারের জন্য অবৈধ সন্তান জন্ম দিয়েছিলো যে নারীরা।

গত শতকের ত্রিশের দশকের ঘটনা। হিটলারের নাৎসি বাহিনী তখন ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া শুরু করেছে। এ সময় দেশে তাদের অগণিত সমর্থকের মাঝে একজন ছিলেন হিল্ডেজার্ড ট্রুট্জ। হিটলার এবং তার নাৎসি বাহিনীর এক অন্ধ সমর্থক ছিলেন তিনি। অন্ধ সমর্থন যে কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকতে পারে তার নমুনা তুলে ধরতেই আজকের এ লেখা
হিটলার ইয়ুথের পতাকা।
তরুণ-তরুণীদের মাঝে নাৎসি বাহিনীর মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে যে সংগঠনটি কাজ করতো, তার নাম ‘হিটলার ইয়ুথ’। এই হিটলার ইয়ুথেরই নারী শাখার নাম ছিলো Bund Deutscher Mädel (BDM), বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘জার্মান নারীদের সংগঠন’। নাৎসি বাহিনীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই ১৯৩৩ সালে সংগঠনটিতে যোগ দেন ট্রুট্জ। নিয়মিতই এর সাপ্তাহিক মিটিংগুলোতে অংশ নিতেন তিনি, স্বপ্ন দেখতেন নতুন এক জার্মানির। তার ভাষ্যমতে, “হিটলার এবং আরো উন্নত জার্মানির জন্য আমি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা তরুণ-তরুণীরা জার্মানির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি আমি বুঝতে পেরেছিলাম।”
হিটলার ইয়ুথের সদস্যরা।
অল্প কিছুদিনের ভেতরেই ট্রুট্জ তাদের এলাকার বিডিএম-এর এক পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন। জার্মান বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তার সোনালী চুল এবং আকাশের বিশালতা মাখানো নীল চোখও যেন এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো। অনেকেই তাকে নর্ডিক নারীদের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতো। এর পেছনে শারীরিক উচ্চতার পাশাপাশি প্রশস্ত হিপ ও পেলভিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো বলে মনে করেন তিনি।

১৯৩৬ সালের কথা, ট্রুট্জ সেই বছর আঠারোতে পা রাখলেন। মনে তার হাজারো রঙের প্রজাপতি ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। একই বছর তার স্কুল জীবনও শেষ হলো। এরপর তিনি যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী করবেন। তার মনের প্রজাপতিগুলো যেন ঠিক ফুলের সন্ধান করে উঠতে পারছিলো না। এমন বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে তাই তিনি ছুটে গেলেন বিডিএম-এর এক নেতার কাছে, জানালেন তার মনের বিস্তারিত খবরাখবর। সেই নেতা সেদিন তাকে এমন কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন যা ট্রুট্জের সারা জীবনের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিলো। তিনি তাকে সেসব পরামর্শ না দিলে সম্ভবত আজকে ট্রুট্জকে নিয়ে আমিও লিখতে বসতাম না!
বিডিএম এর সদস্যারা।
তিনি তাকে বললেন, “তুমি যদি ঠিক করতে না-ই পার যে এখন কী করবে, তাহলে ফুয়েরারকে (অ্যাডলফ হিটলার) একটা বাচ্চা দিচ্ছ না কেন? এখন জার্মানির জন্য অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে দরকার হলো জাতিগতভাবে বিশুদ্ধ শিশু।”

নেতার কাছ থেকে এই কথা শোনার পরই ট্রুট্জ প্রথমবারের মতো নাৎসি বাহিনীর ‘লেবেন্সবর্ন’ প্রোগ্রামের কথা জানতে পারেন। ‘বিশুদ্ধ’ জার্মানদের নিজেদের মাঝে মিলনের মাধ্যমে সোনালী রঙের চুল ও নীল চোখ সম্পন্ন ‘আর্য’ শিশুদের জন্মহার বাড়ানোই ছিলো সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য। এজন্য বাছাইকৃত ‘বিশুদ্ধ’ জার্মান নারীরা শয্যাসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতেন কোনো শ্যুত্জস্টাফেল অফিসারকে (যিনি নিজেও তথাকথিত ‘বিশুদ্ধ’)। এরপর সেই নারীর গর্ভে আসা সন্তানকেও তাই ‘বিশুদ্ধ’ বলেই মনে করা হতো। উল্লেখ্য, নাৎসি জার্মানিতে কালো ইউনিফর্ম পরিহিত শ্যুত্জস্টাফেল কিংবা সংক্ষেপে ‘এসএস’ ছিলো হিটলার বাহিনীর সবচেয়ে বড় প্যারামিলিটারি সংগঠন।
শ্যুত্জস্টাফেল বা এসএস বাহিনী।
মূল আলাপে ফিরে আসা যাক। সেই বিডিএম নেতা এরপর ট্রুট্জকে পুরো প্রক্রিয়া খুলে বললেন। লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে সিলেক্ট হতে প্রথমেই তাকে একগাদা মেডিকেল টেস্টের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। সেই সাথে তার জীবনের অতীত ইতিহাস সম্পর্কেও বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানো হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো প্রার্থীর শরীরে কোনোভাবেই ইহুদীদের রক্ত থাকা চলবে না। এতসব অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার গন্ডি পার হতে পারলে তখনই কেবল সেই নারী প্রার্থী একদল এসএস অফিসার থেকে তার পছন্দের শয্যাসঙ্গী বেছে নিতে পারবে।

এতক্ষণ যেন তন্ময় হয়ে নেতার কথা শুনে যাচ্ছিলেন ট্রুট্জ। নিজের গর্ভে দশ মাস দশ দিন একটি সন্তানকে ধারণ করে তাকে নাৎসি বাহিনীর জন্য দিয়ে দেয়ার মতো দেশপ্রেম তার মনকে মারাত্মকভাবে আলোড়িত করে তুললো। অ্যাডলফ হিটলারের জন্য, তার নাৎসি বাহিনীর জন্য, সর্বোপরি দেশের জন্য এমন কিছু একটাই তো করতে চাচ্ছিলেন তিনি! তাই আর দেরি করলেন না ট্রুট্জ। শীঘ্রই লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামের টেস্টের জন্য নিজের নামটি রেজিস্ট্রেশন করালেন তিনি। তবে বাসায় বাবা-মাকে কিছুই জানান নি ট্রুট্জ, কারণ তারা তার সেই সিদ্ধান্তকে মেনে নেবে না। প্রোগ্রামের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। এজন্য তিনি বাসায় জানালেন ন্যাশনাল সোশ্যালিজম নিয়ে পড়াশোনা করতে একটি আবাসিক কোর্সে তিনি ভর্তি হয়েছেন।

এরপর এলো সেই নির্ধারিত দিনটি। ট্রুট্জকে নিয়ে যাওয়া হলো জার্মানির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বাভারিয়া প্রদেশের একটি পুরনো দুর্গে। এটি ছিলো টেগের্নসী লেকের কাছাকাছি একটি জায়গা, চমৎকার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। সেখানে গিয়ে নিজের মতো আরো চল্লিশ জন নারীকে দেখতে পেলেন ট্রুট্জ। সবার উদ্দেশ্যই এক, গর্ভে সন্তান ধারণ করে তাকে নাৎসি বাহিনীতে দিয়ে দেয়া। সেই নারীদের কেউ কারো আসল নাম জানতো না, সবাইকে দেয়া হয়েছিলো ছদ্মনাম। আর সেখানে আসতে কেবল একটি সার্টিফিকেটই লাগতো- ‘জাতিগত বিশুদ্ধতা’। এজন্য একজন নারীর প্রপিতামহ পর্যন্ত বংশ ইতিহাস অনুসন্ধান করা হতো।
লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে আসার আগে পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে এক তরুণী।
দুর্গ পুরনো হলে কী হবে! সেখানে ভোগ-বিলাসের উপকরণের কোনো কমতি ছিলো না। লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে নির্বাচিত সেই তরুণীদের জন্য সেখানে খেলাধুলা, লাইব্রেরি, মিউজিক রুম, এমনকি সিনেমা হল পর্যন্ত ছিলো। ট্রুট্জের মতে, “সেখানে আমি যে খাবার খেয়েছিলাম, তা আমার জীবনে খাওয়া সেরা খাবার। সেখানে আমাদের কোনো কাজ করতে হতো না, অনেক চাকরবাকরই ছিলো সেখানে।” এভাবে রাজকন্যার মতোই কাটছিলো তাদের দিনগুলো। অপেক্ষা শুধু একজন এসএস রাজপুত্রের!

পুরো প্রোগ্রামটি নিয়ন্ত্রণ করতেন একজন উচ্চপদস্থ এসএস ডাক্তার। মেয়েরা সেখানে আসার পরপরই তিনি তাদেরকে ভালোমতো পরীক্ষা করেছিলেন। তাদেরকে জানাতে হয়েছিলো বংশগতভাবে তারা কোনো রোগ পেয়েছে কিনা, তাদের পরিবারে কেউ মাত্রাতিরিক্ত পানাসক্ত কিনা এবং পরিবারে কখনো কোনো বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নিয়েছে কিনা। তিনি তাদেরকে এটা বলেও সতর্ক করে দেন যে, তাদের গর্ভে আসা সন্তানকে কোনোভাবেই নিজের কাছে রাখা যাবে না। কিছুদিন পরই সেই সন্তানকে তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হবে। তাকে বড় করা হবে আলাদা পরিচর্যা কেন্দ্রে। তাকে নাৎসি পরিবেশে, নাৎসি আদর্শ শিখিয়ে একজন নাৎসি সদস্য হিসেবেই গড়ে তোলা হবে।

এরপর আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অর্থাৎ সঙ্গী বাছাইয়ের বিষয়টি। প্রাথমিক বিষয়াদি জানানোর পর সেই নারীদের সামনে হাজির করা হলো একদল এসএস অফিসারকে। সুঠাম দেহের অধিকারী, লম্বা সেই অফিসাররা সহজেই নারীদের মন কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সম্পর্ক বিছানা পর্যন্ত গড়ানোর আগে একে অপরকে চিনে নেয়ার ব্যবস্থাও ছিলো। এজন্য তাদেরকে একসাথে খেলাধুলা করা, সিনেমা দেখা, সন্ধ্যায় মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে একসাথে গল্পগুজব করার মতো বিষয়ের মাঝে দিয়ে যেতে হয়েছিলো।

শয্যাসঙ্গী বেছে নেয়ার জন্য ট্রুট্জদের দেয়া হয়েছিলো সাতদিন সময়। তাদের বিশেষভাবে বলে দেয়া হয়েছিলো যেন তাদের চুল ও চোখের রঙের সাথে শয্যাসঙ্গীর চুল ও চোখের রঙ সর্বোচ্চ পরিমাণে মিলে যায়। বলাবাহুল্য, সেই অফিসারদের কারো নামই তাদেরকে জানানো হয় নি। সবই ছিলো কঠোর গোপনীয়তার অংশ।

একসময় সঙ্গী পছন্দ করা হয়ে গেলে আরো কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয় তাদের। তখন সেই নারীদের আরো কিছু মেডিকেল টেস্টের ভেতর দিয়ে যাওয়া লাগে। এরপরই একদিন জানিয়ে দেয়া হয় সেদিনই তাদেরকে শয্যাসঙ্গীর সাথে রাত কাটাতে হবে। ট্রুট্জের ভাষ্যমতে, সেদিন তিনি এতটাই উত্তেজিত ও আনন্দিত ছিলেন যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এতে একদিকে যেমন শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি ছিলো, তেমনি অ্যাডলফ হিটলারের জন্য কিছু করতে পারার গর্বও মিশে ছিলো! তাদের সেই সঙ্গমকে তারা দেশের জন্য, ভালোবাসার ফুয়েরারের জন্যই মনে করেছিলেন। এজন্য তাদের মাঝে কোনো লজ্জাবোধ কিংবা অনুশোচনাও কাজ করে নি। প্রথম সপ্তাহে সেই লোকটি তিন রাতে ট্রুট্জের শয্যাসঙ্গী হয়েছিলো। পরের সপ্তাহে তাকে অন্যান্য নারীদের সাথে ডিউটি পালন করতে হয়েছিলো!

মিলনের পর অল্প কিছুদিনের মাঝেই গর্ভধারণ করেন ট্রুট্জ। এরপরই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আলাদা এক মাতৃসেবা কেন্দ্রে। বাচ্চা জন্মানোর আগপর্যন্ত নয়টি মাস তিনি সেখানেই কাটান। এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন ট্রুট্জ। তবে মাত্র দু’সপ্তাহই জীবনের প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ উপভোগ করতে পেরেছিলেন তিনি। এরপরই বাচ্চাটিকে আলাদা আরেকটি এসএস হোমে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে তাকে পুরোপুরি নাৎসি পরিবেশে বড় করা হবে। এরপর আর কোনোদিনই নিজের গর্ভের সন্তান দেখতে পান নি তিনি, খোঁজ পান নি তার সেই শয্যাসঙ্গীরও।

পরবর্তী বছরগুলোতে আরো সন্তান নেয়ার জন্য বলা হয়েছিলো ট্রুট্জকে। কিন্তু ততদিনে তিনি আরেকজন অফিসারের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই আর ওদিকের কথা ভাবেন নি তিনি। একসময় তাদের বিয়েও হয়ে যায়। বিয়ের পরে একদিন আনন্দে গদগদ হয়ে ট্রুট্জ তার স্বামীকে লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে নিজের সংযুক্তি এবং বাচ্চা জন্মদানের কথাটি জানিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, হিটলারের প্রতি এমন ভালোবাসা ও আনুগত্য দেখে নাৎসি বাহিনীতে চাকরিরত তার স্বামী বোধহয় খুশি হবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটলো ঠিক তার উল্টোটা! অমন প্রোগ্রামে ট্রুট্জের জড়ানোর বিষয়টি একেবারেই স্বাভাবিকভাবে নেন নি তার স্বামী। তবে স্ত্রী কাজটি হিটলারের জন্য করেছে দেখে তিনি তাকে কিছু বলতেও পারছিলেন না!
লেবেন্সবর্ন থেকে জন্ম নেয়া শিশুদের একাংশ।
ট্রুট্জের কাহিনীর ইতি টানছি এখানেই। মানুষের মাঝে বর্ণপ্রথার বীজ ছড়িয়ে অশ্লীলতার প্রসার ঘটানো লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রাম থেকে আনুমানিক ২০,০০০ শিশুর জন্ম হয়েছিলো। বারো বছর ধরে চলা এ প্রোগ্রামের অধিকাংশ শিশুর জন্মই হয় জার্মানি আর নরওয়েতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের অনেককেই দত্তক নেয়া হয়েছিলো, ধ্বংস করে ফেলা হয় তাদের যাবতীয় জন্মপরিচয়।



পরবর্তী পর্বঃ লেবেন্সবর্ন – শ্রেষ্ঠ মানবজাতির সন্ধানে নাৎসি বাহিনীর গোপন প্রোগ্রাম।