Showing posts with label রহস্যময় পৃ‌থিবী. Show all posts
Showing posts with label রহস্যময় পৃ‌থিবী. Show all posts

Monday, January 8, 2018

হাজারো কল্পনার আটলান্টিস শহর: রহস্যের শুরু কখন থেকে?

এই বিশ্বের মানুষের কাছে আজও এক রহস্যময় নগরীর নাম আটলান্টিস। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এখনো শহরটির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। শহরটির অস্তিত্ব ছিল, নাকি তা শুধুই কবির কল্পনা- তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর। এই নগরকে নিয়ে লেখা হয়েছে কত গল্প-কবিতা-উপন্যাস! বিজ্ঞানী ও গবেষকদের দল এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই অজানা শহরটিকে। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত সমাধান না হওয়া যত রহস্য আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো এই আটলান্টিস।

কীভাবে জন্ম নিলো আটলান্টিস উপাখ্যানঃ

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর লেখা থেকেই প্রথম জানা যায় আটলান্টিস শহরের কথা। 'টিমেউস''ক্রিটিয়াস' নামে প্লেটোর দুটি ‘ডায়ালগ এ আটলান্টিসের উল্লেখ পাওয়া যায়। ৩৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ দার্শনিক প্লেটো তার শিষ্যদের নিখুঁতভাবে এই নগরটির কথা বলে গেছেন।
গ্রিক দার্শনিক প্লেটো।
প্লেটো তার লেখায় জানিয়েছেন যে, আটলান্টিসের কথা প্রথম জানতে পারেন গ্রিক মহাজ্ঞানী সোলোন। মহাজ্ঞানী সোলোন তথ্যটি আবার মিশরীয় এক ধর্মযাজকের কাছ থেকে পান। মিশর থেকে ফিরে এসে সোলোন তার এক আত্মীয় ড্রপাইডসের কাছে আটলান্টিসের গল্পটি বলেন। পরম্পরায় গল্পটি ড্রপাইডস তার সন্তান, তার প্রপৌত্র ক্রিটিয়াস গল্পটি প্লেটোর কাছে ব্যক্ত করেন।

আটলান্টিস নামকরণের কারণঃ

সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন।
অনেকে মনে করে থাকেন, আটলান্টিক মহাসাগরের কাছে অবস্থিত হওয়ায় নগরটির নামকরণ হয়েছিল আটলান্টিস। প্লেটোর বর্ণনা অনুযায়ী, সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন ছিলেন আটলান্টিসের রাজা। তার স্ত্রী ক্লিওটার ছিলেন খুব সুন্দরী। দ্বীপের ঠিক মাঝখানে পাহাড়ের মাথায় স্ত্রীর জন্য এক অপরূপ প্রাসাদ তৈরি করেন পোসাইডন। তাদের ছিল পাঁচ জোড়া যমজ সন্তান। সমুদ্র দেবতা তার দশ সন্তানকে দ্বীপের বিভিন্ন অংশ শাসনের ভার দিলেন। তার বড় যমজ সন্তানের একজন এটলাসকে দ্বীপের একটি অংশের শাসনের ভার দিলেন। তার নামানুসারে দ্বীপের সেই অংশের নাম হয় আটলান্টিস। পরে এটলাস পুরো দ্বীপ এবং সমুদ্রের চারপাশের অঞ্চল নিজের অধিকারে নিয়ে নেন। এরপরেই পুরো দ্বীপের নাম তার নামে হয়ে যায় আটলান্টিস।

প্লেটোর বর্ণনায় কেমন ছিল আটলান্টিস?

প্লেটোর লেখা থেকে জানা যায়, আটলান্টিস ছিল এক স্বর্গোদ্যান। তা ছিল এক ‘সব পেয়েছি’র দেশ। অত্যন্ত উর্বর ছিল সেখানকার মাটি, সেখানে রকমারি ফসল ফলাতো কৃষকরা। আর তাতে ফলতো নানা ফলমূল, শাকসবজি। প্রচুর পরিমাণে ফসল ফলতো বলে নগরীতে কোনো অভাব ছিল না। মনমাতানো গন্ধে ভরা রং-বেরঙের সুন্দর ফুলে ভরে থাকতো সবুজ এই রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। পাহাড়, সমুদ্র আর অরণ্যে ঘেরা অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই রাজ্যে সোনা, রূপো, তামা  ইত্যাদি খনিজ সম্পদেরও কোনো অভাব ছিল না। সেচ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত উন্নত। দিগন্ত ‍বিস্তৃত ফসলের মাঠ পেরিয়ে নীলচে পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল কৃষকদের বাড়ি।
কবির কল্পনায় আটলান্টিস শহর।
আটলান্টিস নগর ঘিরে ছিল সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ, বন্দর, মন্দির। সোনা ও রূপার কারুকার্যে ভরা সুন্দর সুন্দর অট্টালিকা। আর ছিল এক সমুদ্র দেবতার মূর্তি। রাজধানীটি ছিল এক সবুজে ঘেরা পাহাড়ের চূড়ায়। সেই পাহাড়ের চারিদিক ঘিরে ছিল বেশ কয়েকটি পরিখা। পরিখাগুলো আবার পরস্পরের সাথে খাল দিয়ে যুক্ত ছিল। বাইরের পরিখাটি খাল দিয়ে যুক্ত ছিল সমুদ্রের সাথে। সমুদ্রপথে বিভিন্ন দেশ ও রাজ্যের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য এ খালগুলো ব্যবহার করা হতো।
নগরীর বাড়িগুলোতে ছিল আধুনিক সব ব্যবস্থা। দামি ধাতুর কাজ করা পাথরের দেওয়াল, বিশাল বিশাল সব সোনার মূর্তি, গরম আর ঠাণ্ডা জলের ঝরণা, আরো সব নানা মজার জিনিস। এই উন্নত রাজ্যে ছিল এক সুগঠিত বিশাল সেনাবাহিনী। প্লেটোর অনবদ্য বর্ণনায় শহরটি আশ্চর্যভাবে যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। এ থেকে অনুমান করা যায়, আটলান্টিসের লোকজনের মধ্যে কেউ কেউ দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, স্থপতিও ছিলেন।
কল্পনার মানচিত্রে আটলান্টিস নগর।
কিন্তু অনেক গবেষকই এ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, প্লেটো যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার সময়েরও নয় হাজার বছর আগে প্রস্তর যুগের শুরুর দিকে এরকম উন্নত বুদ্ধিদীপ্ত নৌশক্তিসম্পন্ন সভ্যতা পৃথিবীর বুকে গড়ে ওঠা সত্যিই অকল্পনীয়।

কীভাবে বিলুপ্ত হলো এই নগরী?

প্লেটোর বর্ণনানুযায়ী, যিশু খ্রিস্টের জন্মের ১,৫০০ বছর আগে এই নগরীর বিলুপ্তি ঘটে। এ নগরের ধ্বংস হওয়া নিয়ে প্লেটো বলেছেন, পোসাইডন তার দশ ছেলেকে দেশটির একেক অংশ শাসনের ভার দেন। এমনিতে বেশ শান্তিই ছিল। কিন্তু ক্রমশই দশজনের মধ্যে বিরোধ বাড়তে লাগল। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের রাজ্যের সীমা বাড়াতে চাইল। আটলান্টিসের নির্মল আকাশে লোভ আর হিংসার ছায়া পড়ল। স্বর্গের জিউস তখন ঠিক করলেন, এদের শিক্ষা দিতে হবে। সেজন্যই দেবতাদের ডেকে তড়িঘড়ি করে এক সভার আয়োজন করলেন তিনি। প্লেটো ঠিক এখানটায় তার গল্প শেষ করে দিলেন। তারপর আর কী হলো তা আর জানা গেল না। কিন্তু অনেকে এই গল্পের পরিসমাপ্তি টানেন এই বলে যে, স্বর্গের দেবতা জিউসের রোষানলে পড়ে এই নগরী ধ্বংস হয়ে যায়।
স্বর্গের দেবতা জিউস।
কিন্তু পরবর্তীতে অনেক গবেষকই আটলান্টিসের ধ্বংস হওয়া নিয়ে নানা মত রেখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রিক পুরাতাত্ত্বিক অ্যাঞ্জেলোস গ্যালানোপুলোসের অভিমত। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষে তার তত্ত্বটি প্রকাশ পেলে চমকে গিয়েছিলেন সবাই। তিনি বললেন, ১,৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ এক ভয়ানক আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছিল ভূমধ্যসাগরের সান্তোরিনি দ্বীপে। আগ্নেয়গিরির হঠাৎ জেগে ওঠা ও তার দরুণ এক ভয়াবহ ভূমিকম্প ও প্রবল জলোচ্ছাসের সৃষ্টি হয় পুরো নগর জুড়ে। ফলে এক রাতের মধ্যে আটলান্টিক মহাসাগরের নীচে তলিয়ে যায় এই শহর। আর সেই সাথে মুছে যায় এক উন্নত সভ্যতার যত চিহ্ন।
আটলান্টিসের ধ্বংসের পিছনে প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রধান কারণ বলে অনেকে মনে করেন।
টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া সমুদ্র গবেষক রবার্ট বালার্ডের মতে, আটলান্টিসের এই ধ্বংসের তথ্যটি সঠিক হতে পারে। কারণ, ইতিহাসের এই সময়টায় বড় ধরনের বন্যা এবং আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের তথ্য পাওয়া গেছে।

কোথায় ছিল আটলান্টিস?

আটলান্টিস নগরটি কোথায় ছিল তা নিয়ে জল্পনার কোনো শেষ নেই। আটলান্টিসের খোঁজে অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর অনুসন্ধান চলেছে এবং এখনো চলছে। তবে এখনো এর প্রকৃত অবস্থান কোথায় ছিল তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানকে হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু তার পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ তারা তুলে ধরতে পারেননি। অনেকের বিশ্বাস, গ্রিক দ্বীপ ক্রিটের কাছাকাছি ছিল আটলান্টিস।
অনেকের ধারণা, সমুদ্রের নিচে কোথাও এখনো রয়েছে সেই কল্পনার নগরী।
তবে কোনো কোনো গবেষকের মতে, গ্রিসের সান্তোরিনি শহরটিই হচ্ছে অ্যাটলান্টিস। আবার কারো মতে, বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার কাছে, কারো ভাবনায় আফ্রিকায়ও নাকি থাকতে পারে আটলান্টিস। কারো কারো মতে, আটলান্টিস গ্রিক পুরাণের শহর টান্টালিসও হতে পারে। কারণ হিসাবে শোনা যায়, জিউস রেগে গিয়ে বজ্রপাত করেন টান্টালিসের উপরেও। আবার ফ্লোরিডার উপকূলে বিমিনি দ্বীপের পাশে দিয়ে হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিসের একটি পথের অস্তিত্ব রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
আটলান্টিক মহাসাগরের নীচে হারিয়ে গেছে সেই স্বপ্নের নগর।
তবে প্লেটোর দেয়া তথ্যমতে, আটলান্টিক মহাসাগর থেকে উৎপত্তি হওয়া একটি দ্বীপই হচ্ছে আটলান্টিস। বলা হয়ে থাকে, হারকিউলিস পিলার নামে এক ছোট দ্বীপের অস্তিত্ব ছিল তার পাশে। বর্তমানে তা জিব্রাল্টার প্রণালী হিসেবে পরিচিত। তাই অনেকে মনে করে থাকেন, জিব্রাল্টার প্রণালীর কাছাকাছি কোথাও ছিল আটলান্টিস শহরটি।
১৯৬৮ সালে এগার ক্যাচি তার বই ‘On Atlantis’ এ উল্লেখ করেন, মিশরের নীলনদ এবং স্ফিংস এর মূর্তির মাঝে হল অব রেকর্ডস যেখানে আবিষ্কৃত হয়েছে, সেখানেই পাওয়া যেতে পারে আটলান্টিসের ধ্বংসাবশেষ।
স্পেনের ডোনা ন্যাশনাল পার্কের সোয়াম ফরেস্টের নীচে আটলান্টিসের খোঁজ পাওয়া যাবে বলে ধারণা করছেন প্রত্নতত্ত্ববিদ রিচার্ড ফ্রেউন্ড ও তার দল।
২০১১ সালে হাটফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ রিচার্ড ফ্রেউন্ড ও তার দল কয়েকটি শহরের সন্ধান পান যেখানে আটলান্টিস নগরটি ছিল বলে মনে করা হয়। স্পেনের এক শহর কাদিজের উত্তরে ডোনা ন্যাশনাল পার্কের সোয়াম্প ফরেস্টের নীচে এই শহরগুলো খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে আটলান্টিসের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে কোনো গবেষকই এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি।

আটলান্টিস কল্পনা নাকি সত্যি?

আটলান্টিস নিয়ে প্লেটোর এই কাহিনী কোনো পৌরাণিক কল্পকাহিনী অনুপ্রাণিত কিনা তার ব্যাপারে ইতিহাসবিদরা এখনো একমত হতে পারেননি। তবে ক্রিটিয়াস দাবি করেছিলেন যে, মহাজ্ঞানী সোলোনের কাছ থেকে তিনি এই গল্পটি জানতে পারেন। সোলোন ছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের এথেন্সের বিখ্যাত নীতিনির্ধারক। অনেক পণ্ডিত মনে করেন, তিনি যখন মিশরে যান, সেখানে প্রাচীন কিছু পুঁথি থেকে এথেন্স এবং আটলান্টিস সম্পর্কে জানতে পারেন।
শিল্পীর তুলিতে আঁকা আটলান্টিস নগরী।
তবে আরেক পক্ষ মনে করেন, প্লেটো প্রাচীন কিছু যুদ্ধের কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আটলান্টিসের এই কাহিনীটি রচনা করেন। অনেকেই মনে করেন, আটলান্টিস প্লেটোর কল্পনায় বোনা এক নগর সভ্যতা, যা তিনিই সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তার ধ্বংস করেছেন। তবে, পৃথিবীর অধিকাংশ সংস্কৃতিতেই ‘হারানো সভ্যতার’ উপকথা প্রচলিত রয়েছে। তাই অনেক পণ্ডিতই এসব উপকথার ভিত্তি রয়েছে বলে মনে করেন। তাই কিছু গবেষক আটলান্টিসের বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। আর তাই আটলান্টিস নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

Tuesday, July 18, 2017

যে গান মৃত্যু ডেকে আনে!

মন ভালো হোক কিংবা খারাপ, আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যেকোনো সময়ে গান ছাড়া যাদের চলেই না। জ্যামে বসে অলস সময় কাটাতেই হোক কিংবা জিমে গিয়ে প্রচণ্ড শারীরিক কসরত করার মুহূর্তেই হোক, গান আমাদের চিরসঙ্গী। মানুষের অনুভূতির সাথে মিশে গিয়ে একমাত্র গানই পারে চোখের পলকে মনের যত ক্লান্তি সব দূর করে দিতে। কিন্তু সেই গানই যদি হয় মৃত্যুর কারণ তবে কেমন হবে একবার ভাবুন তো!
ইউটিউবে গ্লুমি সানডে গানের কভার চিত্র।
বলছিলাম ‘গ্লুমি সানডে‘ গানটির কথা। প্রায় শতাধিক জীবন কেড়ে নেয়া এই গানটি বেশ সাড়া জাগানো ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে। এমনকি গানটির রচয়িতা স্বয়ং শিকার হয়েছেন রহস্যজনক মৃত্যুর। তাই তো গ্লুমি সানডের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হাঙ্গেরির সুইসাইড সং’
গ্লুমি সানডের অপর নাম হাঙ্গেরির সুইসাইড সং।
গানটি নিয়ে আর কিছু বলার আগে দেখে আসা যাক কি ছিল সেই গানের কথায়
"Sunday is gloomy, my hours are slumberless
Dearest the shadows I live with are numberless
Little white flowers will never awaken you
Not where the black coach of sorrow has taken you
Angels have no thought of ever returning you
Would they be angry if I thought of joining you?

Gloomy Sunday

Gloomy is Sunday, with shadows I spend it all
My heart and I have decided to end it all
Soon there’ll be candles and prayers that are sad I know
Let them not weep let them know that I’m glad to go
Death is no dream for in death I’m caressing you
With the last breath of my soul I’ll be blessing you

Gloomy Sunday

Dreaming, I was only dreaming
I wake and I find you asleep in the deep of my heart, here
Darling, I hope that my dream never haunted you
My heart is telling you how much I wanted you

Gloomy Sunday"

গ্লুমি সানডের রচয়িতা 'রেজসো সেরেস'।
১৯৩২ সালে প্যারিসে বসে গ্লুমি সানডে গানটি লিখেছিলেন হাঙ্গেরিয়ান পিয়ানোবাদক এবং সঙ্গীত রচয়িতা রেজসো সেরেস। কারো কারো মতে জায়গাটি প্যারিস নয়, বুদাপেস্টও হতে পারে। ৩৪ বছর বয়সী সেরেস তখন একটুখানি সাফল্যের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন। গান নয়, মূলত কবিতা হিসেবেই প্রথম রচিত হয় গ্লুমি সানডে। পিয়ানোর সি-মাইনর মেলোডির সাথে কম্পোজিশন করা হয় কবিতাটির।

গানটি কে এবং কেন লিখেছিলেন তা নিয়ে আজ অবধি জল কম ঘোলা হয়নি। রেজসো সেরেসকে যদিও গানটির রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তা সত্ত্বেও গানটির পেছনের কাহিনী হিসেবে একাধিক মতভেদ রয়েছে। সবচেয়ে প্রচলিত মত অনুযায়ী জানা যায়, মামলা-মোকদ্দমার ফেরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন সেরেস। তাকে স্বান্তনা দিতে একটি কবিতা লিখে পাঠান ছোটবেলার বন্ধু লাজলো জেভার। সেই কবিতাটি সেরেসের অন্তর ছুঁয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে পিয়ানোর সাহায্যে সুর দিয়ে এটিকে গানে রুপান্তরিত করেন সেরেস। অন্য একটি মত অনুযায়ী, সেরেসের হাত দিয়েই রচিত হয় গ্লুমি সানডে।

অপর একটি ব্যাখ্যা মতে, প্রেমিকা সেরেসকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তিনি এতটাই বিষণ্ণ হয়ে পড়েন যে সুর করে ফেলেন গ্লুমি সানডের মতো মন খারাপ করা গান। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীর বর্ণনা এবং তার অন্তিম পরিণতি কি হতে পারে সেই চিন্তা-ভাবনারই প্রতিফলন এই গানটি। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। হাঙ্গেরিতেও চলছিল চরম অর্থনৈতিক মন্দা আর ফ্যাসিবাদ। সব মিলিয়ে দুর্বিষহ দিন কাটছিল সেরেসের। সেরেস তার অন্তরের সমস্ত বেদনা একত্রিত করে ঢেলে দিয়েছিলেন এই গানটির প্রতিটি সুরে। আর সে কারণেই অচিরেই তার বিষণ্ণতা ছুঁয়ে গিয়েছিল গীতিকার লাজলো জাভোরকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা।
গানটিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে বেশ কিছু মিথও । বলা হয়, সুন্দরী এক নারী গানটি প্লেয়ারে চালিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। আবার এক ব্যবসায়ীর পকেট থেকে সুইসাইড নোট হিসেবেও পাওয়া যায় গ্লুমি সানডে। হাঙ্গেরির দুই কিশোরী এই গান গাইতে গাইতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নদীতে এমন কথাও শোনা যায়। কেউ দেখেনি, কেউ শোনেনি অথচ এই মিথগুলো দিব্যি প্রচলিত রয়েছে মানুষের মুখে মুখে।
আরেকটি একটি উল্লেখযোগ্য মত হলো গ্লুমি সানডে গানটি শুনে আত্মহত্যা করা ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন স্বয়ং জাভোরের প্রেমিকাও। মতান্তরে জাভোরের প্রেমিকা তার সুইসাইড নোটে মাত্র দুইটি শব্দ লিখে গিয়েছিলেন- ‘গ্লুমি সানডে’। কাজেই সেরেসের মতো জাভোরও ছিলেন একাকী। সুতরাং দুজন দুজনের মনের কথা বুঝে ফেলেছিলেন এক নিমিষেই। এবার তাদের প্রয়োজন ছিল একটি সুরেলা কণ্ঠের। সেই অভাব পূরণ করতে ১৯৩৫ সালে এগিয়ে আসেন পল কালমার। গানটির কথার সারমর্ম ছিল অনেকটা এমন- গায়ক তার প্রেমিকার মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল হয়ে আত্মহত্যা করতে চান যাতে অন্তত মৃত্যুর পরে হলেও তাদের দুজনের আত্মা একত্রিত হতে পারে। বর্তমানে গানটির যে সংস্করণ সর্বত্র শোনা যায় তা ১৯৪১ সালে বিলি হলিডে রেকর্ড করেন।
বিলি হলিডে।
১৯৩৬ সালে হাঙ্গেরিয়ান এই গানটিকে ইংলিশে রেকর্ড করেন হল ক্যাম্প যেখানে কথাগুলো অনুবাদ করতে সহায়তা করেন স্যাম এম লিউইস। লিউইসের লেখা গানটি এবার সরাসরি প্ররোচিত করে আত্মহত্যার পথে। ধীরে ধীরে গানটির নামই হয়ে গেল হাঙ্গেরিয়ার আত্মঘাতী গান। যথাযথ প্রমাণসহ অসংখ্য ব্যক্তির আত্মহত্যার খবরে নড়েচড়ে বসেন সবাই।

‘৩০ এর দশকে পাওয়া খবর অনুযায়ী এই গানটির জের ধরে আমেরিকা ও হাঙ্গেরিতে আত্মহত্যা করেন ১৯ জন, মতান্তরে সংখ্যাটি ২০০ বলেও শোনা যায়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো আত্মহত্যাকারীদের সবার সুইসাইড নোটেই পাওয়া গেছে গ্লুমি সানডের লিরিক্স। জনমত প্রচলিত আছে, এই গানটি বারবার শুনতে শুনতে শ্রোতাদের মধ্যে জীবনের প্রতি এক ধরণের বিতৃষ্ণা চলে আসে এবং সেখান থেকেই তারা বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। ২ জন তো গানটি শুনতে শুনতে গুলি করে নিজেদের মাথার খুলিই উড়িয়ে দিয়েছেন! এরপরও কি গানটি যে অভিশপ্ত তা মানতে কারো কোনো আপত্তি থাকতে পারে?

শ্রোতাদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় হাঙ্গেরিতে গানটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অথচ হাঙ্গেরি কিন্তু এমনিতেও আত্মহত্যার হারের দিক থেকে বিশ্বের প্রথম সারির একটি দেশ। প্রতি বছর লাখে প্রায় ৪৬ জন মানুষ সেখানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তারপরও অভিশপ্ত গান হিসেবে স্বীকৃতি পায় গ্লুমি সানডে। পরবর্তীতে ৪০ এর দশকে বিবিসি ও গানটির লিরিক শোনানো বন্ধ করে শুধুমাত্র ইন্সট্রুমেন্টাল বাজানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ভাষ্যমতে, আত্মহত্যার প্ররোচনা না থাকলেও এই গানটি কাউকে যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। কাজেই বিলি হলিডের গ্লুমি সানডে সংস্করণটি সব জায়গা থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়। ২০০২ সালে এসে গানটির উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে রেডিও চ্যানেলগুলো।

পত্রিকায় সেরেসের আত্মহত্যার খবর।
গানটির প্রভাবেই কিনা কে জানে, গ্লুমি সানডে রচনার ৩৫ বছর পরে গানটি গাইতে গাইতে সেরেস তার চার তলা অ্যাপার্টমেন্টের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন ১৯৬৮ সালে। কেন একটি মাত্র গান এত বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ালো তা আজও এক রহস্য। তবুও গানটিকে ঘিরে সবার কৌতূহলের যেন কোনো শেষ নেই। এলভিস কোস্টেলো, সারাহ ম্যাকল্যাচলান, হেথার নোভা প্রমুখ সংগীত শিল্পী সাম্প্রতিক সময়ে গ্লুমি সানডের নতুন নতুন সংস্করণ রেকর্ড করেছেন।
রলফ সুবলের চলচ্চিত্র ‘গ্লুমি সানডে’।
গ্লুমি সানডে গানটিকে ভিত্তি করে ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচার এবং একটি ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী নিয়ে একই নামে ১৯৯৯ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন পরিচালক রলফ সুবল। এখানে তিনি ইতিহাস এবং ফিকশনের মধ্যে একটি সমন্বয় ঘটিয়েছেন।

তবে গান শুনুন আর চলচ্চিত্রই দেখুন, আত্মহত্যার পথে না হাঁটার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। কারণ আত্মহত্যা কখনোই কোনো পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে না। বেঁচে থেকে কঠিন সব সমস্যার মোকাবেলা করে দিন শেষে বিজয়ীর হাসি হাসতে পারাই তো প্রকৃত বীরের কাজ।

Monday, July 17, 2017

এলিয়েনের আধুনিক উপকথা!

পৃথিবীর গণ্ডি পেরিয়ে মহাবিশ্বের কোনো গ্রহে কি আমাদের মতো প্রাণের অস্তিত্ব আছে? এই প্রশ্নটি বেশ আধুনিক। প্রাচীনকালের মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি পৃথিবীর বাইরে প্রাণ থাকতে পারে। তখন বিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটেনি তেমন। কিন্তু আশেপাশে রহস্যময় ঘটনা ঠিকই ঘটতো। সেসব ঘটনাকে তারা নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যাও দিতো। সেই ব্যাখ্যাগুলো পরবর্তীতে ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে উপকথা বা পৌরাণিক কাহিনী হিসেবে স্থান করে নিয়েছিল মানুষের মাঝে। যতদূর জানা যায়, বহির্বিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে কোনো প্রাচীন উপকথা বা পুরাণ নেই। না থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ পৃথিবীর বাইরেও যে পৃথিবীর চেয়ে কোটি কোটি গুণ বেশি বড় একটি জগত আছে এটি সম্বন্ধে জানতোই না মানুষ। ভাবনাতেই আসেনি পৃথিবীর সমান বা তার চেয়ে বড় কোনো গ্রহের অস্তিত্ব আছে আকাশে।

আকাশকে তারা শুধুমাত্র তারা দিয়ে আঁকা বর্ণীল চাদর বলেই মনে করেছে। যেহেতু তাদের কল্পনা কিংবা বাস্তবতায় পৃথিবী ব্যতীত কোনো গ্রহের অস্তিত্ব ছিল না, তাই সেসব গ্রহে বিদ্যমান প্রাণ নিয়ে কোনো উপকথা বা পৌরাণিক গল্পও তৈরি হয়নি।
পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে এমনটা কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না একসময়।
১৫০০ সালের পরে মানুষ অনুধাবন করতে পেরেছিল পৃথিবীকে আমরা যেভাবে দেখি এটি আসলে তা না। আমরা হয়তো চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি সূর্য পৃথিবীর পূর্ব দিক থেকে উঠছে আর পশ্চিম দিকে অস্ত যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিকার বাস্তবতা হচ্ছে পৃথিবী নিজে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। যার অর্থ হচ্ছে পৃথিবীর চেয়েও বড় জিনিসের অস্তিত্ব আছে। বড় ও ভারী জিনিসকে কেন্দ্র করেই ছোট ও হালকা জিনিসগুলো আবর্তন করে। সূর্য যেহেতু তার শক্তি দিয়ে পৃথিবীকে ঘোরাচ্ছে, তার মানে অবশ্যই সূর্যের ভর পৃথিবীর চেয়ে বড়। সীমাহীন এলাকাব্যাপী একটি গ্রহের চেয়েও বড় কিছুর অস্তিত্ব আছে এমনটা ভাবা তখনকার সময়ের জন্য আসলেই বৈপ্লবিক ছিল।


তখন পর্যন্ত সূর্য ও সূর্যের পরিবারের কিছু গ্রহ সম্বন্ধে জানা গিয়েছিল। কিন্তু সৌরজগতের বাইরেও যে অনেক অনেক নক্ষত্র আছে এবং কল্পনাতীত বিশাল গ্যালাক্সি আছে তা জানতে জানতে মানবজাতিকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। খুব বেশি দিন হয়নি, মানুষ তখনো বিশ্বাস করতো উপরের দিক সবসময়ই উপরে। পরবর্তীতে আবিষ্কার হলো পৃথিবী গোল। পৃথিবীর যে অংশটা আমাদের জন্য উপরে, একই অংশ হতে পারে অন্য কারো জন্য নীচে। আমরা বাংলাদেশীরা যদি নীচের দিক থেকে কোনো কিছু নির্দেশ করি সেটা হয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপরের দিক। মানুষ মনে করতো উপরের আকাশলোকে দেবতারা বসবাস করে, কিন্তু আদতে উপর বলতে কিছু নেই। আকাশ বলতে যে গম্বুজের মতো তারায় শোভিত দেয়াল দেখি, সেটাও আসলে কোনো দেয়াল নয়। দেখে মনে হয় তারাগুলো খুবই কাছাকাছি ঘেঁষে ঘেঁষে লেগে আছে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে এক তারা থেকে আরেক তারার মাঝে বিলিয়ন বিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্ব বিদ্যমান।

গম্বুজসদৃশ তারকাখচিত আকাশটি আসলে কোনো ‘আকাশ’ নয়।
পৃথিবীর স্বাভাবিক প্রাণের বাইরে বায়ুতে বা শূন্যে ভেসে বেড়ানো অদ্ভুত ধরনের সৃষ্টি বা অবাস্তব প্রাণ নিয়ে অনেক বিশ্বাস ও উপকথা আছে। যেমন- প্রেত, পিশাচ, অপদেবতা, মৃত আত্মা, ভূত ইত্যাদি। কিন্তু এসবের কোনোটিই বহির্জাগতিক কোনো গ্রহের প্রাণ নয়। উপকথা ও বিশ্বাস অনুসারে এরা আমাদের আশেপাশেই ঘুরে বেড়ানো সত্তা। কিন্তু এই লেখার প্রসঙ্গ সেগুলো থেকে ভিন্ন।


আদিম মানুষ বা বিচ্ছিন্ন আদিবাসীদের মধ্যে বহির্বিশ্বের প্রাণ নিয়ে কোনো উপকথা নেই। তবে উপকথা তো কোনো না কোনো কালের মানুষেরাই বানায়। আমাদের আজকের যুগের কোনো অন্ধবিশ্বাসও তো হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হাস্যকর উপকথা। এলিয়েন বা ইউএফও সম্বন্ধে মানুষ যখন জানলো, তখন তাদেরকে ব্যাখ্যা করতে নানা কাহিনীর জন্ম দিয়ে দিল। যারা এসব কাহিনীর জন্ম দিয়েছে, তারা শিক্ষিত ও শহুরে নাগরিক। (বহির্বিশ্বের বুদ্ধিমান প্রাণকে ‘এলিয়েন’ বলা হয় এবং এসব এলিয়েন যেসব মহাকাশযানে করে ঘুরে বেড়ায় তাদেরক পৃথিবীবাসী ‘ইউএফও’ বলে থাকে।) মনগড়া ব্যাখ্যার পাশাপাশি তাদেরকে ঘিরে নানা ধরনের কাহিনীরও জন্ম দিয়ে দেয় পৃথিবীবাসীরা। এসব অবৈজ্ঞানিক নাটকীয় কাহিনীকে আমরা বলতে পারি ‘আধুনিক উপকথা’। আধুনিক উপকথা বা আধুনিক পুরাণগুলো একটি দিক থেকে আগ্রহোদ্দীপক। প্রাচীনকালের উপকথাগুলো কোন প্রেক্ষিতে কীভাবে জন্ম লাভ করেছিল তা আমরা জনতে পারি না। কিন্তু আধুনিক উপকথাগুলো সম্বন্ধে অনেক তথ্যই আমরা জানতে পারি। কারণ এসব ঘটনা ঘটেছে আমাদের চোখের সামনে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিত, কারণ, পূর্বে এরকম ধারণার রূপ কেমন ছিল তার সবই আমাদের জানা আছে।


এমনকি এসব গল্পের জন্ম দিয়েছে যেসব লোকেরা আমরা চাইলে তাদের সাথে কথাও বলতে পারি। তারা এখনো জীবিত আছে। তারা তখন ঘোরের মধ্যে এসব করেছিল, নাকি কোনো বিশ্বাস থেকে করেছিল, নাকি নিজের অজান্তেই করেছিল তা-ও আমরা জানতে পারি তাদেরকে জিজ্ঞেস করে। এমনকি তারা তখন যে অবস্থায় ছিল তার চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন মেডিকেল রিপোর্টও জানতে পারি।

১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ঘটনা। ‘হেভেন্স গেইট’ নামে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ৩৯ জন সদস্য স্বেচ্ছায় বিষ খেয়ে বসলো । তারা বিশ্বাস করেছিল বহির্বিশ্বের কোনো এক UFO তাদের সকলের আত্মা অন্য একটি গ্রহে নিয়ে যাবে। তাই তারা আত্মহত্যা করে পৃথিবীর জীবন সাঙ্গ করে ঐ গ্রহে রওনা দেয়। ঐ সময়ে পৃথিবী থেকে একটি ধূমকেতুকে দেখা যাচ্ছিল এবং এটি বেশ প্রকট ও উজ্জ্বল ছিল। ধর্মীয় ঐ গোষ্ঠীটি মনে করেছিল এর পাশে কোনো UFO আছে বলে এমন উজ্জ্বল দেখাচ্ছে একে। এমন ধারণায় তারা সকলে বিশ্বাস করেছিল, কারণ তাদের আধ্যাত্মিক নেতা এমন কথা বলেছিল।
আত্ম হন্তারকদের দুটি দেহ।

হ্যাভেনস গেটের গণ আত্মহত্যা (গাড়ির ভেতর সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশগুলো দ্রষ্টব্য)।
ধূমকেতুটিকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি টেলিস্কোপও কিনে এনেছিল তারা। কিন্তু পরবর্তীতে তা দোকানে ফেরত দিয়ে দেয়। ফেরত দিতে গিয়ে অভিযোগ দেয় টেলিস্কোপটি ভালো না, ঠিকমতো কাজ করে না। তারা কীভাবে জানলো যে টেলিস্কোপটি নষ্ট? তারা এর মধ্য দিয়ে কোনো UFO’র দেখা পায়নি। যেহেতু তারা এলিয়েনদের মহাকাশযান UFO দেখতে পায়নি, তাই গায়ের জোরে ধরে নিয়েছিল যে টেলিস্কোপটি নষ্ট!


আধ্যাত্মিক নেতাও কি এরকম ধারণায় বিশ্বাস করেছিল? এ ধরনের ধর্মীয় ঘটনাগুলোয় নেতারা সবসময় অক্ষত থাকে। ভোগান্তিগুলো ভোগে অনুসারীগুলো। কিন্তু এখানে সম্ববত আধ্যাত্মিক নেতাটি বহির্জাগতিক স্বর্গীয় প্রাণের ধারণায় বিশ্বাস করেছিল। কারণ তিনি নিজেও আত্মহত্যার জন্য বিষ গ্রহণ করেছিলেন। আধ্যাত্মিক নেতা 'মার্শাল অ্যাপলহোয়াইট' অন্য কয়েকজন অনুসারীর সাথে নিজের পুরুষাঙ্গ কেটে খোজা হয়ে গিয়েছিল। পুরুষাঙ্গ কেটে ফেললে নারীর সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া রোধ হয়ে যায় এবং তারও অপর নারীর প্রতি কোনো যৌন আকর্ষণ থাকে না। ফলে মন কলুষিত হয় না। মন যত পরিষ্কার থাকবে তাদের অর্চনা করা স্রষ্টার সান্নিধ্য তত বেশি পাবে! এ থেকে বোঝা যায় তার ও তার কিছু অনুসারীর চিন্তাভাবনা কতটা অন্ধ ছিল। এমন অন্ধ বিশ্বাসের উপস্থিতিতে তারা যে সবাই একত্রে বিষ নিয়ে অন্য কোনো স্বর্গীয় গ্রহে চলে যেতে চাইবে, তা আর অবাক করার মতো কী?

মার্শাল আপলহোয়াইট, যার প্রেরণায় আত্মহত্যা করেছিল ৩৯ জন। এমন কর্মের জন্য তিনি টাইম, নিউজউইক সহ অন্যান্য ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে স্থান করে নিয়েছিলেন।
যারা এলিয়েন সংক্রান্ত কোনো দাবী বা অদ্ভুত কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে, তাদের সবার মধ্যে একটি জিনিসে মিল পাওয়া যায়। এলিয়েন সংক্রান্ত উদ্ভট দাবী যারা করে, তাদের প্রায় সকলেই সায়েন্স ফিকশনের ভক্ত। হয় সেটি কোনো সায়েন্স ফিকশন বই, নাহয় সেটি কোনো সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র। হেভেন্স গেইট নামের ধর্মীয় গোষ্ঠীটির সদস্যরা ‘স্টার ট্রেক’ সিরিজের প্রতি আচ্ছন্ন ছিল।


হ্যাঁ, এটা সত্য যে, ভিন গ্রহের প্রাণী নিয়ে এই পৃথিবীতে সায়েন্স ফিকশনের কোনো অভাব নেই। মূল কথা হচ্ছে অনেক অনেক সায়েন্স ফিকশনের অস্তিত্ব থাকলেই যে এ সংক্রান্ত দাবী সত্য হয়ে যাবে এমন কোনো কথা নেই। সকল ধরনের সায়েন্স ফিকশনই কাল্পনিক। যারা এগুলো পড়ে, তারাও জানে এবং যারা এগুলো লেখে, তারাও জানে। সবগুলোই মানুষের মস্তিষ্কের ভেতর তৈরি করা গল্পের প্লটের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এদের কোনোটিই বাস্তবে ঘটেনি। তারা শুধুই গল্প। অনেকটা আমাদের বাংলা ছড়ার হাট্টিমাটিম টিমের মতো কাল্পনিক প্রাণী।

এলিয়েনে আচ্ছন্ন ব্যক্তিরা স্টার ট্রেক জাতীয় সায়েন্স ফিকশনের ভক্ত।
এরপরেও অনেকে ধারণা করে এবং মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে যে, এলিয়েনদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে তাদের দেখা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ দাবী করে এলিয়েনরা তাদেরকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। অনেকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেও তাদের বিশ্বাসে তারা একদম অনড় থাকে। তাদের দাবীকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যুক্তিহীন তথ্য বা সাক্ষ্য উপস্থাপন করে।


একজন লোকের নাক দিয়ে রক্ত ঝরতো। লোকটি দাবী করেছিল তার এই সমস্যার জন্য দায়ী কোনো এলিয়েন প্রাণী। এর সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য মনগড়ামতো ব্যাখ্যাও দিয়েছিল। তার দেয়া ব্যাখ্যা অনুসারে এলিয়েনরা তার নাকের ভেতর একটি রেডিও ট্রান্সমিটার বসিয়ে দিয়েছে, যার কারণে রক্ত ঝরছে। রেডিও ট্রান্সমিটার বসানোর কারণ, এর সাহায্যে এলিয়েনরা তার উপর গোয়েন্দাগিরি তথা বৈজ্ঞানিক নজরদারি করতে পারবে। উল্লেখ্য রেডিও ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে তার ছাড়াই তথ্য আদান প্রদান করা যায়। মোবাইল এরকমই একটি যন্ত্র।


লোকটির এমন ধারণাও ছিল, সে নিজেও একজন এলিয়েন! কীভাবে জানলো এই কথা? তার বাবা-মা ছিল ফর্সা, কিন্তু সে কিছুটা কালো। বাবা-মা ফর্সা হলে তো সে নিজেও ফর্সা হবার কথা ছিল। যেহেতু লোকটি তার বাবা-মায়ের মতো না, সেহেতু সে একজন এলিয়েন বা এলিয়েনের বংশধর! উদ্ভট যুক্তি।
আমেরিকায় এমন ঘটনার দিকে তাকালে অনেকটা অবাকই হতে হবে। আমেরিকানদের অনেকেই বিশ্বাস করে উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী এলিয়েনরা তাদেরকে ধরে UFO-তে নিয়ে গিয়েছিল এবং সেখানে তার উপর ভয়ানক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছিল। অর্থাৎ তারা এলিয়েনদের পৈশাচিক সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্টের ভুক্তভোগী বা ভিক্টিম। যে এলিয়েনরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তারা দেখতে কেমন ছিল তার বর্ণনাও পাওয়া যায় তাদের কাছে। বেশিরভাগ মানুষই দাবী করে অপহরণকারী এলিয়েনদের গায়ের রঙ নীল, মস্তিষ্ক (মাথা) বেশ বড়, চোখগুলো বেশ বিস্তৃত। এলিয়েন নিয়ে এ ধরনের কাহিনীগুলো যদি একত্র করা হয়, তাহলে তা অনেক রংচঙে ও রসালো আকার ধারণ করবে। এই কাহিনীগুলো এমনকি সকল গ্রিক পুরাণ, মিশরীয় পুরাণ, নর্স পুরাণকেও হারিয়ে দেবে।
তাদের দাবী, এলিয়েনরা ধরে নিয়ে তাদের উপর এক্সপেরিমেন্ট করেছিল।
তবে আশার কথা হচ্ছে এলিয়েনের উপকথাগুলো সাম্প্রতিক। কেউ এই ব্যাপারে আগ্রহী হলে তাদেরকে নিয়ে গবেষণা করতে পারে এবং অনুসন্ধান করে দেখতে পারে আসলেই এর পেছনের কারণ কী ছিল। কেউ চাইলে এসব ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে তাদের অপহরণ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জেনেও নিতে পারবে।


কেউ যদি এই কাজটি করতে যায় তাহলে দেখতে পাবে, একদমই সুস্থ ও সস্বাভাবিক মস্তিষ্কের মানুষ এরকম দাবীগুলো করছে। তারা নিখুঁতভাবে বর্ণনা দেবে UFO-র ভেতরে কীভাবে তাদেরকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছিল, কীভাবে তাদের শরীর কেটে-ছিড়ে ফেলা হয়েছিল, কীভাবে এলিয়েনরা নিজেদের মধ্যে কথা বার্তা বলছিল তার সবই। তাদের সকল মানুষের বেলাতেই এলিয়েনরা ইংরেজিতে কথা বলে! যেহেতু আমেরিকানরা ইংরেজিভাষী, তাই এরা ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বুঝতে পারবে না। অন্য কোনো ভাষাতেও যে এলিয়েনরা কথা বলতে পারে কিংবা এলিয়েনদের নিজস্ব ভাষাতেও যে কথা বলতে পারে এই ধারণা তাদের কল্পনায় তখন ছিল না।


সুসান ক্ল্যানসি নামে একজন মনোবিজ্ঞানী এরকম মানুষদের নিয়ে অনেক গবেষণা করেছিলেন। এলিয়েন তাদেরকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, এরকম দাবীদার মানুষের অনেকেরই ধরে নিয়ে যাবার ঘটনা সম্পর্কে পরিষ্কার স্মৃতি মনে নেই। কারো কারো বেলায় অল্প স্বল্প আছে, আর কারো কারো বেলায় একদমই নেই। সুসান ক্ল্যানসি দেখেছেন এলিয়েন কর্তৃক অপহরণের স্মৃতি যাদের তেমন মনে নেই তারা প্রায় সকলেই দাবী করছে, এলিয়েনরা তাদের কোনো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার দেহে করা এক্সপেরিমেন্ট সংক্রান্ত সকল স্মৃতি মুছে দিয়েছে। মাঝে মাঝে এরকম রোগীদের সম্মোহনবিদ বা সাইকোথেরাপিস্টের কাছেও যেতে দেখা যায়। তাদের ধারণা উপযুক্ত থেরাপি বা সম্মোহনের মাধ্যমে তারা তাদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারবে।
The 3 Sins of Memory শিরোনামে টেড টকে বক্তব্যরত মনোবিজ্ঞানী সুসান ক্ল্যানসি।
হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি পুনরুদ্ধার করার ব্যাপারটি একদমই ভিন্ন তল্লাটের গল্প। স্নায়ুবিজ্ঞানের এই প্রক্রিয়াটি বেশ চমকপ্রদ। তবে চমকপ্রদ হলেও এলিয়েনদের দ্বারা স্মৃতি হারিয়ে ফেলা ও উদ্ধার করার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কেউ যদি কোনো একটি কাল্পনিক বিষয় নিয়ে খুব বেশি মগ্ন থাকে, তাহলে মাঝে মাঝে মনে হতে পারে কাল্পনিক কোনো কিছু বুঝি আসলেই তার জীবনে হয়েছিল। তেমনই সায়েন্স ফিকশন নিয়ে কেউ যদি রাত-দিন মত্ত থাকে, তাহলে ক্ষেত্রবিশেষে মনে হতে পারে সায়েন্স ফিকশনের কোনো কোনো ঘটনা তার জীবনেও ঘটেছে। এক্ষেত্রে এগুলোকে বলা যায় মিথ্যা স্মৃতি বা False Memories।


এখনকার চিকিৎসা প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাইরে থেকে এ ধরনের মিথ্যা স্মৃতি মানুষের মস্তিষ্কে প্রবেশ করানো সম্ভব । জীবনে সত্যি সত্যি ঘটে যাওয়া স্মৃতি থেকে এটি একদমই ভিন্ন। তাই কেউ যদি সম্মোহনবিদ বা সাইকোথেরাপিস্টের কাছে যায় স্মৃতি উদ্ধারের জন্য, তাহলে তারা বড়জোর মিথ্যা স্মৃতি দিতে পারবে, সত্যিকার ঘটে যাওয়া স্মৃতি উদ্ধার করতে পারবে না।

কিছু কিছু মানুষ কেন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে তাদেরকে এলিয়েন অপহরণ করেছিল, তা মিথ্যা স্মৃতি সিনড্রোমের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এ ধরনের ব্যক্তিরা স্টার ট্রেক বা স্টার ওয়ার্স ধাঁচের সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্রে অনেক বেশি মত্ত থাকে। তাদের সমসাময়িক সায়েন্স ফিকশনে যে যে ঘটনা ঘটে, তারাও সেরকম অভিজ্ঞতাই পায় এলিয়েনদের কাছ থেকে। তারা যে যে ঘটনার দাবী করে, সেগুলোর অধিকাংশই টেলিভিশনে প্রচারিত কোনো নাটক বা চলচ্চিত্রের সাথে মিলে যায়।
কাল্পনিক ব্যাপারকে বাস্তব স্মৃতি বলে বিশ্বাস করে কেউ কেউ।
ঘুম জড়তা বা 'Sleep Paralysis' নামে আরো একটি ব্যাপার আছে। কেউ ঘুম জড়তায় পড়লে দেহের কোনো অঙ্গ নড়াচড়া করতে পারে না। কেউ যখন স্বপ্ন দেখে বা ঘুমায় তখন ক্ষণস্থায়ীভাবে তার দেহ স্থবির হয়ে যায়। স্বপ্নে বা ঘুমে প্রয়োজন পড়লে অনেক কষ্ট করেও হাত-পা নাড়ানো যায় না কিংবা চিৎকারও দেয়া যায় না।


অনেকেরই এমন হয়। ঘুম যখন ভাঙে, তখন জড়তা চলে যায় এবং দেহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেহ স্বাভাবিক হতে সামান্য সময় লাগে। এমতাবস্থায় সে জাগ্রত আছে এবং আশেপাশের সকল কিছু দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু তার কোনো অঙ্গ নাড়াতে পারছে না। ব্যাপারটা এক দিক থেকে ভয়ানক, কারণ এই সময়টাতে অনেকে কাল্পনিক ভ্রান্তি বা হ্যালুসিনেশনে ভোগে। সায়েন্স ফিকশনে আচ্ছন্ন কোনো লোক যদি এই পরিস্থিতিতে পড়ে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সায়েন্স ফিকশন সংক্রান্ত কোনো হ্যালুসিনেশনে সে পড়ে যাবে। ভাববে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী তাকে হাতে পায়ে বেঁধে রেখেছে যেন নড়াচড়া করতে না পারে। এবং আরো ভাববে তাকে নিয়ে বুঝি ভয়ঙ্কর সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে।


এটা বেশ খারাপ ভ্রান্তি। কল্পনা বা স্বপ্ন হলেও তা কোনো কারণে মনে গেঁথে যায়। এক পর্যায়ে তারা এটাকে বাস্তব বলে ধরে নেয় এবং এর স্মৃতিকে সত্যিকার স্মৃতি বলে মনে করে।
ঘুম জড়তায় পড়লে নড়াচড়া করা যায় না। চিত্রকর: Henry Fuseli (দ্য নাইটমেয়ার)।
একটা ব্যাপার এখানে উল্লেখযোগ্য, সায়েন্স ফিকশনের গল্পগুলো জনপ্রিয় হবার আগেও এ ধরনের সমস্যা বিদ্যমান ছিল। তখনকার সময়ে যারা এরকম সমস্যায় পড়তো তারাও মিথ্যা স্মৃতিকে সত্য বলে মনে করতো। তবে সেগুলো এলিয়েনকে নিয়ে নয়, ভূত-প্রেত-পিশাচ বা অশুভ মৃত আত্মাকে নিয়ে। আজকালকার যুগের হরর সিনেমাগুলো যেমন হয় অনেকটা তেমন। তারা মানুষের কাছে বর্ণনা করতো, একটি মায়া নেকড়ে বা একজন রক্তচোষা মানুষ এসে তাদের ঘাড়ে কামড় দিয়ে রক্ত চুষে খেয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার দাবী করতো ডানাওয়ালা অত্যন্ত সুন্দর পরী এসে তাদেরকে সঙ্গ দিয়ে গেছে। কেউ যদি ভ্যাম্পায়ার বা মায়া নেকড়ের গল্পকাহিনীতে বুদ হয়ে থাকে এবং তার যদি ঘুম জড়তা বা স্লিপ প্যারালাইসিস হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সে ঘুম থেকে উঠে মনে করবে রাতে কোনো রক্তচোষা মনে হয় তাকে আক্রমণ করেছিল। কেউ যদি এলিয়েন, স্পেস শিপ, নাক্ষত্রিক ভ্রমণ নিয়ে মগ্ন থাকে, তাহলে সে সেই সংক্রান্ত বিষয় দেখতে পাবে এবং তা-ই সত্য বলে বিশ্বাস করবে।

এক্ষেত্রে আরো একটি ক্ষতিকর ব্যাপার হচ্ছে ভুক্তভোগীর পরিবার ও বন্ধুবান্ধব। কেউ যখন ভাসাভাসা স্মৃতি নিয়ে এলিয়েনদের কথা উপস্থাপন করে, তখন পরিবারের সদস্য বা বন্ধু-বান্ধবরা একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে। এলিয়েনের উচ্চতা কেমন ছিল, গায়ের রঙ কেমন ছিল, চোখ কয়টা ছিল, নাক আছে কিনা, মাথায় চুল আছে কিনা, এরা কি দেখতে মুভি-সিনেমার এলিয়েনের মতো ইত্যাদি ইত্যাদি। কৌতূহলের কোনো শেষ নেই। এমন প্রশ্নের বানে পড়ে তারা তাদের বিশ্বাসের সাথে কল্পনা মিশিয়ে ব্যাপারটাকে আরো ঘোলাটে করে ফেলে। এরকম উল্টাপাল্টা প্রশ্নের কারণেও ব্যক্তির মস্তিষ্কে মিথ্যা স্মৃতি প্রবেশ করতে পারে এবং তা স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
চোখ কয়টা, নাক কেমন, মাথায় চুল আছে কিনা, পেছনে লেজ আছে কিনা!
এই প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে এটা জানলে মনে হয় খুব বেশি অবাক লাগবে না যে, ১৯৯২ সালে আমেরিকার এক জরিপ থেকে দেখা যায়, আমেরিকার প্রায় চার মিলিয়ন মানুষ মনে করে বহির্জাগতিক কোনো বুদ্ধিমান এলিয়েন তাদেরকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশে এরকম হাইটেক-ফ্যান্টাসিগুলো খুব একটা জনপ্রিয় নয় বলে আমেরিকার মতো এরকম ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না। তারপরেও খোঁজ করলে অল্প বিস্তর ঠিকই পাওয়া যায়। ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ তার কোনো একটি স্মৃতিকথায় এরকম একটি ঘটনার কথা বলেছিলেন। হুমায়ুন আহমেদের লেখা কোনো একটি সায়েন্স ফিকশন পড়ে এক মেয়ে দাবী করছে সে একই সাথে দুই জগতে বসবাস করছে।


মনোবিজ্ঞানী 'সু ব্ল্যাকমোরের' মতে ঘুম জড়তায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মূলত মস্তিষ্কে কোনোকিছু নিয়ে পূর্ব থেকে স্থায়ী হয়ে থাকা ভয় বা শংকা থেকে হয়। এলিয়েনদের ধারণা জনপ্রিয় হবার আগে মধ্যযুগে এই ভয়গুলো ছিল ভ্যাম্পায়ার বা অশুভ আত্মা কেন্দ্রীক। মধ্যযুগে অনেক নারী অভিযোগ করেছিল একজন পুরুষ পিশাচ রাতের বেলা ঘুমের মধ্যে তাদের সাথে যৌনকর্ম করেছে। আবার অনেক পুরুষও অভিযোগ করেছে রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় একজন নারী পিশাচ তাদের সাথে যৌনকর্ম করেছে। এরকম মুহূর্তে মনে হয় কোনো এক অশুভ পিশাচ বুকের উপরে এমনভাবে চেপে বসেছে যে কোনোভাবেই নড়াচড়া করা সম্ভব হয় না।


নিউফাউন্ডল্যান্ডের উপকথায় আছে ‘ওল্ড হ্যাগ’ নামে একটি সত্তা রাতের বেলায় মানুষের ঘরে আসে এবং তাদের বুকের উপর ভর করে বসে থাকে, ফলে নড়াচড়া করা সম্ভব হয় না। ইন্দোচীন এলাকার উপকথায় ‘ধূসর ভূত’ নামে একটি সত্তা আছে। এটি রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত মানুষের উপর চেপে বসে থাকে এবং তাদেরকে নড়াচড়ায় অক্ষম করে দেয়। বাংলাদেশেও এরকম সত্তা আছে। বাংলাদেশীরা একে ‘বোবায় ধরা’ নামে ডাকে। এখানের সবগুলোই ঘুমের জড়তার কারণে হয়। কোনোটিতেই কেউ বুকের উপর এসে শ্বাস চেপে বসে থাকে না।
বোবায় ধরা’তে কেউ বুকের উপর চেপে বসে না।
আশা করি আলোচনা থেকে আমরা পরিষ্কার হতে পেরেছি, কেন মানুষ ভুলভাবে মনে করে তাদেরকে এলিয়েনরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল কিংবা কেন মানুষ মনে করতো ভ্যাম্পায়াররা তাদের ঘাড় থেকে রক্ত চুষে খেয়ে নিয়েছে। এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য বা প্রমাণ নেই যে পৃথিবীতে এলিয়েন এসেছিল কিংবা পৃথিবীর বাইরে এলিয়েনের অস্তিত্ব আছে। এলিয়েনের পাশাপাশি ভূত বা অশুভ আত্মার অস্তিত্ব সম্পর্কেও কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই।


কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়। পৃথিবীর বাইরে অন্যান্য নক্ষত্র বা গ্যালাক্সিতে অনেক অনেক বাসযোগ্য গ্রহ রয়েছে এবং এগুলোর মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা একদমই উড়িয়ে দেয়া যায় না। তারা এখনো পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি কিংবা তাদেরকে আমরা এখনো দেখিনি বলে তার মানে এই নয় যে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনও হতে পারে যে, তারা ঠিকই আছে, কিন্তু আমাদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা তাদেরকে দেখতে বা শনাক্ত করতে পারছি না।


তবে তাদেরকে শনাক্ত করতে পারছি না বলে ইচ্ছে মতো কাল্পনিক গল্প ফেঁদেও বসা উচিৎ নয়। কোনোকিছু প্রমাণিত হলে তবেই তাকে নিয়ে খবর প্রচার করা উচিৎ এবং সত্যতার পক্ষে দাবী করা যায়। ঘুমের মধ্যে ধরে নিয়ে গেছে, বেহুশ করে নিয়ে গেছে, সুন্দর পিতামাতার কালো সন্তান প্রভৃতি অনুমান দিয়ে এলিয়েনের প্রমাণ হয় না। এখন বিজ্ঞানের যুগ, এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানই জ্ঞানের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পন্থা। এলিয়েন সম্পর্কে যা করার বিজ্ঞানের সাহায্যেই করতে হবে, যা সিদ্ধান্ত নেবার বিজ্ঞানের সাহায্যেই নিতে হবে। মিথ্যা ও উদ্ভট গল্প ফেঁদে বসার কোনো সুযোগই নেই এখন আর।

Friday, July 7, 2017

মানুষের কঙ্কাল দিয়ে সাজানো হয়েছিল যে চার্চগুলো।

কঙ্কাল দিয়ে বানানো ঝাড়বাতি দেখেছেন কখনো? মানুষের খুলি দিয়ে বানানো নান্দনিক স্থাপত্য কাঠামো কিংবা রক্ত-মাংসের মানুষের হাড়ের তৈরি জানালা, দরজা, পিলার চোখে পড়েছে কখনো?

নিশ্চয়ই ভাবছেন কোনো হরর গল্প বা সিনেমার কথা লিখতে বসেছি, মোটেই না। এমনটা ঘটেছে এই বাস্তব জগতে। আপনার-আমার মতো সাধারণ মানুষের অস্থি দিয়ে ঘেরা এই স্থাপত্য কীর্তিগুলো কিন্তু কোনো সাধারণ ঘর-বাড়ি নয়, বরং ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে বিভিন্ন দেশের চার্চে মানুষের হাড়কে রীতিমতো ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং এর একটি অংশে পরিণত করে ফেলা হয় । কী ছিল এর পিছনের গল্প? জানতে হলে ঘুরে আসতে হবে সেই সময়কার চার্চগুলো থেকে।



আওয়ার লেডি অফ দ্য কনসেপশন অফ দ্য ক্যাপুচিনসঃ
রোমের ‘আওয়ার লেডি অফ দ্য কনসেপশন অফ দ্য ক্যাপুচিনস’ চার্চটি সাজানো হয়েছে প্রায় ৪০০০ খ্রিস্টান ভিক্ষুর হাড় দিয়ে, যারা ১৫০০ থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। মারকিউস ডি সেডের বর্ণনা অনুযায়ী হাড়গুলো সাজানো হয়েছে ‘বারোক’ এবং ‘রোকোকো’ স্টাইলে যা সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের বিভিন্ন শিল্পকলায় প্রচলিত ছিল। তিনজন ভিক্ষুর কঙ্কাল এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা দেখলে মনে হবে খোদ ম্যাকাব্রি (ভৌতিক একটি চরিত্র) চার্চে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে।
আওয়ার লেডি অফ দ্য কনসেপশন অফ দ্য ক্যাপুচিনস।
চার্চটি যে সময়ে তৈরি, তখন চারদিকে প্লেগের দৌরাত্ম্য চলছিল। এই মহামারীর প্রকোপে প্রাণ হারান লাখ লাখ মানুষ। গণকবর দিয়েও যখন সব মৃতদেহের সৎকার করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখনই আওয়ার লেডি অফ দ্য কনসেপশন অফ দ্য ক্যাপুচিনসের মতো গির্জা নির্মাণ করে পুরনো অস্থিগুলোর একটি ব্যবস্থা করা হয়। পোপ অষ্টম আরবানের আমলে, ১৬২৬ সালে, রোমের এই চার্চটির নিচের সমাধিক্ষেত্র থেকে হাড় উত্তোলনের অনুমতি দেয়া হয়। চার্চটির গায়ে মেমেন্টো হিসেবে তিনটি ভাষায় একটি বাণী লেখা রয়েছে যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘তোমরা এখন যা, আমরাও তাই ছিলাম। আমরা এখন যা, তোমরাও তাই হবে ’। এই গভীর আধ্যাত্মিক বাণী নিয়ে এটি যুগে যুগে অজস্র পর্যটককে আকৃষ্ট করে চলেছে এক মায়ার টানে।


সেডলেক ওসুয়ারীঃ
‘আওয়ার লেডি অফ দ্য কনসেপশন অফ দ্য ক্যাপুচিনস’ চার্চ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চেক প্রজাতন্ত্র উপশহরে একটি চ্যাপেল নির্মাণ করা হয় যার নাম ‘সেডলেক ওসুয়ারী’‘ওসুয়ারী’ শব্দের অর্থ ‘অস্থির আধার’। নামকরণের সার্থকতা প্রমাণ করতেই যেন সুদৃশ্য ঝাড়বাতি, তোরণ আর পিরামিড আকৃতির ডিজাইনগুলো বানাতে মানুষের মাথার খুলিসহ সব মিলিয়ে প্রায় ৪০-৭০ হাজার হাড় ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। আর দশটি চার্চ থেকে আলাদা এই চার্চটির ইতিহাসও যে ব্যতিক্রমধর্মী হবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। পুরো ঘটনাটির সূত্রপাত ঘটে যখন হেনরি চেক প্রজাতন্ত্রের সন্ন্যাসী দলের মঠাধ্যক্ষ, পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনে প্রবেশ করেন তখন। জেরুজালেমের ‘হলি সেপালকার’ বা 'পবিত্র সমাধিক্ষেত্র', গোলগোথার যে জায়গাটিতে যিশু খ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে বলে মনে করা হয়, সেখানকার এক কৌটা মাটি সাথে করে নিয়ে আসেন তিনি।
সেডলেক ওসুয়ারী।
চেক প্রজাতন্ত্রে ফিরে এসে সেডলেক সংলগ্ন একটি সমাধিক্ষেত্রের উপরে ঐ মাটি ছড়িয়ে দেন হেনরি। খুব দ্রুত গুজব রটে যায় এই পবিত্র মাটির স্পর্শ পেলে পুণ্য হবে। ক্রমে ক্রমে গোটা ইউরোপজুড়ে সেডলেক হয়ে ওঠে একটি কাঙ্ক্ষিত গোরস্থান । এর খুব অল্প দিনের মধ্যেই ইউরোপের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে প্লেগ। দ্রুতই অগণিত মৃতের সৎকার করা হয় সেডলেকে। কিন্তু তাও এত মানুষের স্থান সংকুলান করা কষ্টকর হয়ে উঠছিল কর্তৃপক্ষের জন্য। সবদিক ভেবে-চিন্তে তখন ওসুয়ারী নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ওসুয়ারী নির্মাণের পুরো দায়িত্ব দেয়া হয় এক অর্ধ-অন্ধ সন্ন্যাসীর উপর যিনি কোনোমতে হাড়গুলো সাজিয়ে একটি কাঠামো দাঁড় করান। ৩০০ বছরের মধ্যে একটি শৈল্পিক কাঠামো নির্মাণ করা হয় যা আমরা এখনো দেখতে পাই। ১৮৭০ সালে ফ্রান্টিসেক রিন্ড নামের একজন কাঠ ভাস্কর চ্যাপেলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগুলো হাড় দিয়ে সাজানোর দায়িত্ব পান। তৎকালীন সময় প্রায় ৪০,০০০ হাড় দিয়ে পুরো কাজটি শেষ করেন তিনি। দিন দিন সংখ্যাটি বেড়েই চলেছে। আর তার সাথে সাথে চার্চটির নাম হয়ে গেছে ‘চার্চ অফ বোনস’ বা ‘অস্থির চার্চ’


মনেস্ট্রি অফ সান ফ্রান্সিস্কোঃ
পেরুর রাজধানী লিমার ‘মনেস্ট্রি অফ সান ফ্রান্সিস্কো’ ইউনেস্কো ঘোষিত একটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বা বিশ্বের সেরা ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর একটি। এটি নির্মিত হয়েছে লিমাবাসীদের অস্থি-কঙ্কাল দিয়ে। ভূগর্ভস্থ সমাধিক্ষেত্রটি চার্চের ঠিক নিচে অবস্থিত যা কয়েকটি গুপ্ত সুড়ঙ্গের সাহায্যে সোজা ট্রাইব্যুনালের বিচারকের চ্যাপেলে গিয়ে শেষ হয়েছে। মাটির নিচে স্কাল এবং ফিমার দিয়ে সাজানো বেশ বড় বৃত্তাকার ও অন্যান্য জ্যামিতিক নকশার নানা শিল্পকর্ম পাওয়া গেছে।
মনেস্ট্রি অফ সান ফ্রান্সিস্কো।
১৯৪৩ সালে মনেস্ট্রির নিচের মাটি খুঁড়ে হাজারো মাথার খুলি এবং হাড়গোড় উদ্ধার করা হয় । ধারণা করা হয় এই জায়গাটি ১৮০৮ সাল পর্যন্ত সমাধিক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হত। কেন্দ্রীয় গোরস্থানটি লিমার বাইরে অবস্থিত হওয়ায় এই সমাধিক্ষেত্রটির উপর চাপ খুব বেশি পড়ত। প্রায় ২৫ হাজার মৃতদেহ এখানে সমাহিত করা হয়েছে বলে জানা যায়। সমাধিক্ষেত্রটি ইট এবং মর্টারের তৈরি বলে তা এতোই শক্ত যে ভূমিকম্পও তাকে এক চুল নড়াতে পারেনি।


সান বার্নারদিনো আল ওসাঃ
বাইরে থেকে দেখলে দক্ষিণ ইটালির মিলান শহরের ‘সান বার্নারদিনো আল ওসা’ চার্চটিকে আর দশটি সাধারণ চার্চের চেয়ে আলাদা কিছু বলে মনে হবে না। তবে ভারী কাঠের তৈরি ডাবল ডোরের গেটটি খুললেই চ্যাপেলের পাশের সুসজ্জিত ওসুয়ারীর দিকে চোখ আটকে যাবে। ক্রুশবিদ্ধ আকৃতিতে সাজানো স্তূপীকৃত হাড়ের দেয়াল যে কারো নজর কাড়তে বাধ্য।
সান বার্নারদিনো আল ওসা।
১২১০ সালে মিলানের একটি সমাধিক্ষেত্রে জায়গা ফুরিয়ে গিয়েছিল। একটি নতুন ঘর বানিয়ে সেখানে পুরনো হাড়গুলো সংরক্ষণ করা হয়। এবার ১২৬৯ সালে তার পাশে একটি চার্চ নির্মাণ করা হয়। ১৬৭৯ সালে চার্চটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। সে বছর গিয়োভানি আন্দ্রে বিফিকে বলা হয় প্রায় ৪০০ বছর আগের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর চ্যাপেলটিকে একদম নতুন করে ঢেলে সাজাতে। তিনি তখন পুরনো হাড়গুলো নান্দনিক উপায়ে সাজিয়ে দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করেন। ১৭১২ সালে আগের চার্চটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবার আরেকটি বড় নতুন চার্চ সেখানে নির্মাণ করা হয় এবং সাধু বার্নারদিনোর স্মৃতির উদ্দেশ্যে তা উৎসর্গ করা হয়।


চারম্না চ্যাপেলঃ
পোল্যান্ডের ‘থার্টি ইয়ার্স’ এবং ‘সিলেসিয়ান’ এই দুটি যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের মৃতদেহের সৎকার এবং অস্থি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে চারম্না চ্যাপেল। ১১৭৬ সালে স্থানীয় একজন ধর্মযাজক ভাক্লাও তোমাশেফ এই চার্চের দেয়ালগুলো তৈরি করেন মানুষের হাড়গোড় দিয়ে। সিলিং জুড়ে মাথার খুলি দিয়ে ক্রসবোন প্যাটার্নের ডিজাইন করা হয়েছে।
চারম্না চ্যাপেল।
বিভিন্ন মহামারী যেমন প্লেগ, কলেরা, সিফিলস এমনকি দুর্ভিক্ষে যারা মারা গেছেন, তাদের অস্থিও চার্চ সুসজ্জার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। চ্যাপেলের নির্মাতাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে চার্চের কাঠামোতে তাদেরও ঠাই দেয়া হয়েছে। তাদের মাথার খুলিগুলো পাওয়া যাবে চার্চের কেন্দ্রে।


কাপেলা দুজ ওসুসঃ
পর্তুগালের প্রাচীর ঘেরা মধ্যযুগীয় শহর এভোরায় অবস্থিত ‘কাপেলা দুজ ওসুস’ ষোড়শ শতকে নির্মিত একটি ফ্রান্সিসকান চ্যাপেল যার ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা হয়েছে মানুষের মাথার খুলি এবং হাড় দিয়ে। অন্যান্য চার্চ অফ বোনস থেকে এটি একটু আলাদা। এখানে শুধু ডিজাইনের জন্যই মানুষের অস্থি ব্যবহৃত হয়নি, বরং মাথার খুলি দিয়ে গ্র্যাফিটি বা মোটিফ নির্মাণের মাধ্যমে বিভিন্ন বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার একটি উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
কাপেলা দুজ ওসুস।
কাপেলা দুজ ওসিস চ্যাপেলে ঢুকতে গেলে আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে চেইনে ঝোলা নিঃসঙ্গ দুটি মৃতদেহ। একটি মৃতদেহ পূর্ণবয়স্ক একজন পুরুষের এবং অপরটি একটি শিশুর। তাদের পাশের সিলিং থেকে ঝুলছে বাইবেলের ল্যাটিন সংস্করণের একটি বার্তা, ‘জন্মদিন মৃত্যুদিন অপেক্ষা উত্তম’

Saturday, January 28, 2017

সূর্য যেভাবে পৃথিবীর সকল জীবকে বাঁচিয়ে রাখছে...

বেঁচে থাকতে এবং বেঁচে থাকার তাগিদে করা প্রত্যেকটি কাজের পেছনে আছে সূর্যের হাত। দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো এক দিক থেকে সূর্যের উপস্থিতি পাওয়া যাবেই।আমাদের জীবন ধারণ করতে সূর্য কেমন ভূমিকা পালন করছে সে সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করা হবে এখানে।

আমরা এখনো জানি না পৃথিবীর বাইরে মহাবিশ্বের কোনো স্থানে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা। তবে এটা জানি, যদি বহির্বিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব থেকে থাকে তাহলে তা অবশ্যই হবে কোনো নক্ষত্রের কাছাকাছি কোনো স্থানে। অন্তত এটা বলা যায়, পৃথিবীতে যে ধরনের প্রাণ আছে সে ধরনের প্রাণ যদি বাইরের বিশ্বে থাকে তাহলে তারা তাদের নক্ষত্রের কাছে থাকবে। কারণ এরকম প্রাণের টিকে থাকতে হলে নিকটবর্তী নক্ষত্র থেকে শক্তি সংগ্রহ করতে হবে। শক্তি ছাড়া কোনো প্রাণ টিকে থাকতে পারে না, শক্তি ছাড়া কোনো সভ্যতার বিকাশ হতে পারে না।

পৃথিবী যেমন সূর্যের কাছাকাছি অবস্থান করছে অনেকটা তেমনই কাছে অবস্থান করবে প্রাণ ধারণকারী সেই গ্রহটি। কাছাকাছি বলতে একদম নিকটে বোঝানো হয়নি, আপেক্ষিকভাবে কাছাকাছি থাকবে অর্থাৎ প্রাণবান্ধব এলাকার মাঝে অবস্থান করবে। খুব কাছেও নয়, যার কারণে অধিক উত্তাপে পানি বাষ্প হয়ে উবে যাবে, আবার খুব দূরেও নয় যার কারণে অধিক শীতলতায় পানি সর্বদা বরফ হয়ে থাকবে। এরকম এলাকাই হচ্ছে প্রাণ ধারণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ।

প্রাণবান্ধব অঞ্চলটি দূরবর্তী কক্ষপথেও থাকতে পারে, আবার কাছের কক্ষপথেও হতে পারে। যেমন R136a1 নামে একটি নক্ষত্র আছে, যা আকারে বেশ বড়। নক্ষত্রের প্রাণ ধারণকারী গ্রহটির অবস্থান হবে এর থেকে দূরে, কারণ বড় বলে তার উত্তাপ বেশি হবে, তাই এমন দূরত্বে থাকতে হবে যেন উত্তাপে প্রাণ কোনো হুমকির মুখে না পড়ে। আবার সূর্যের চেয়েও ছোট কোনো নক্ষত্রের বেলায় প্রাণ ধারণকারী গ্রহ থাকবে নক্ষত্রের একদম কাছে, কারণ এর চেয়ে বেশি দূরে চলে গেলে গ্রহের পরিবেশ হবে অত্যধিক শীতল।
নক্ষত্রের আকার অনুসারে প্রাণ বান্ধব অঞ্চলের অবস্থান (গাঢ় আকাশী রঙ)
এবার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নে প্রবেশ করা যাক। প্রাণ ধারণকারী গ্রহকে কেন নক্ষত্রের কাছাকাছি অবস্থান করতে হবে? কারণ প্রত্যেক প্রাণেরই টিকে থাকার জন্য শক্তি দরকার। আর শক্তির চমৎকার ও সহজলভ্য উৎস হচ্ছে নক্ষত্র। কোনো প্রকার কর্মযজ্ঞ ও অর্থ বিনিয়োগ না করেই নক্ষত্র বছরের পর বছর ধরে শক্তি সরবরাহ করে যায়। ফ্রি ফ্রি পাওয়া উন্নতমানের সুবিধা, এটার সদ্ব্যবহার করাই বেশি যৌক্তিক।

পৃথিবীর কথা বিবেচনা করি। পৃথিবীতে উদ্ভিদেরা সূর্যালোক থেকে শক্তি সংগ্রহ করে এবং তা সরবরাহ করে সমগ্র জীবজগতকে। উদ্ভিদ সূর্যালোক থেকে নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করে। খাদ্য তৈরির জন্য অবশ্য সূর্যের আলোর পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইডেরও প্রয়োজন হয়। এদের পাশাপাশি মাটির নিচ থেকে পানি ও খনিজেরও দরকার হয়। মূল শক্তিটুকু সূর্যের আলো থেকেই সংগ্রহ করে এবং এর সাহায্যেই স্যুগার বা চিনি তৈরি করে। চিনির শক্তিকে ভেঙেই সকল প্রাণী ও উদ্ভিদেরা চলাফেরা ও নড়াচড়া করে।

পাতার মধ্যে ঘটে যাওয়া প্রক্রিয়াগুলো হাজার হাজার সোলার প্যানেলের সমন্বয়ে তৈরি বিশাল এক ফ্যাক্টরির মতো। বাড়তি উপযোগ পাবার জন্য পাতাগুলো চ্যাপ্টা হয়ে থাকে। চ্যাপ্টা হলে এর ক্ষেত্রফলের পরিমাণ বাড়ে, ক্ষেত্রফল বাড়লে তাতে অধিক পরিমাণ সূর্যালোক আপতিত হয়। ফলে অধিক পরিমাণ খাদ্য উৎপন্ন হয়। বায়ু থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ে, ভূগর্ভ থেকে পানি ও খনিজ নিয়ে সূর্যের আলোকে ব্যবহার করে যে রেসিপির প্রক্রিয়া করা হয় তার চূড়ান্ত উৎপাদ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের চিনি। পাতায় উৎপন্ন হওয়া বিভিন্ন ধরনের চিনি বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চলে যায় উদ্ভিদের সমগ্র দেহে। দেহের বিভিন্ন অংশ আবার চিনি থেকে স্টার্চ বা শ্বেতসার তৈরি করে। শক্তি হিসেবে এটি আবার চিনি থেকেও বেশি সুবিধাজনক। উদ্ভিদের দেহের এই শ্বেতসার ও চিনি থেকে তৈরি হওয়া শক্তি ব্যবহার করেই বেঁচে থাকে দুনিয়ার সকল প্রাণী।
সূর্যালোকের শক্তির সাহায্যে বেঁচে থাকে উদ্ভিদ, আর উদ্ভিদের পাতায় উৎপন্ন হওয়া শক্তি ব্যবহার করে বেঁচে থাকে তাবৎ প্রাণিজগৎ।
তৃণভোজী (হার্বিভোরাস) কোনো প্রাণী, যেমন হরিণ বা খরগোশ, যখন কোনো উদ্ভিদকে খায় তখন উদ্ভিদের শক্তিগুলোও তাদের দেহে যায়। এসব প্রাণীরা তাদের দেহ ও পেশি গঠন করতে শক্তিগুলো কাজে লাগায়। দেহের ও পেশির মাঝে শক্তিগুলো দরকার হয় মূলত খাদ্য সংগ্রহ করা, সঙ্গীর সাথে মিলন করা, বিপদে দৌড় দেয়া, অন্যের সাথে যুদ্ধ করা ইত্যাদি কাজে। এই শক্তিগুলোর আদি বা মূল উৎস হচ্ছে সূর্য, যা উদ্ভিদকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে তাদের মাঝে এসেছে।

মাংসভোজী (কার্নিভোরাস) প্রাণীরা আবার তৃণভোজী প্রাণীদেরকে খায়। ফলে এখানেও তৃণভোজী প্রাণীর শক্তি স্থানান্তরিত হয়ে চলে আসছে মাংসভোজী প্রাণীর মাঝে। এই শক্তিও মাংসভোজী প্রাণীর দেহ ও পেশি গঠন করতে কাজে লাগে। তারাও বিবাদে, দৌড়ে, মিলনে, গাছের চরণে শক্তি ব্যয় করে। মাংসভূক প্রাণীটি যদি স্তন্যপায়ী হয়, তাহলে তার কিছুটা শক্তি শিশুর জন্য দুধ উৎপাদন করতেও চলে যায়। এখানেও শক্তির মূল উৎস হিসেবে থাকছে সূর্য। যদিও এই শক্তি বেশ কতগুলো ধাপ পার হয়ে এই অবস্থানে আসে।

অন্যান্য প্রাণী ও পরজীবীরা মাংসভোজী প্রাণীর দেহে বসবাস করে আরো পরোক্ষভাবে শক্তি সংগ্রহ করে। এখানেও পরজীবীর শক্তির মূল উৎস হচ্ছে সূর্য।
জীবন অতিক্রম করে যখন কোনোকিছু মারা যায়, হোক সেটা প্রাণী, উদ্ভিদ, মাংসভোজী, তৃণভোজী কিংবা কোনো পরজীবী- তারা মৃত্যুর পর মাটিতে বিয়োজিত হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো আবর্জনাভূক প্রাণীরা এদের দেহাবশেষ খেয়ে ফেলে। এমন ধরনের আবর্জনাভূক প্রাণীর উদাহরণ হচ্ছে গোবরে পোকা। ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকও মৃতদেহটিকে খেয়ে শেষ করে ফেলতে পারে। ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকও মূলত এক প্রকার আবর্জনাভূক। এখানেও সেই আগের কথা, শক্তির মূল উৎস হচ্ছে সূর্য। এ কারণেই কম্পোস্টের স্তুপগুলো গরম হয়ে থাকে। কম্পোস্ট মূলত এক ধরনের জৈব সার। গোবর, আবর্জনা, বর্জ্য ইত্যাদি একত্র করে কোনো গর্তে ফেলে ঢেকে রাখলে কয়েকদিন পর যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তা-ই কম্পোস্ট। বছরখানেক আগে যে শক্তি উদ্ভিদের পাতায় আটকা পড়েছিল, সেটি এখন টগবগ করছে পচা কম্পোস্টের স্তূপে।
আবর্জনাভুক গুবরে পোকা।
‘মেগাপড’ নামে অস্ট্রেলীয় অঞ্চলের একটি পাখি আছে, এরা এদের ডিমে তা দেয় কম্পোস্ট স্তূপের তাপকে ব্যবহার করে। অন্যসব পাখিদের থেকে এরা একটু ব্যতিক্রম। অন্যান্য পাখিরা ডিমের উপর বসে নিজের গায়ের তাপ ব্যবহার করে ডিমে তা দেয়, কিন্তু অস্ট্রেলীয় মেগাপড পাখি তা দেবার জন্য বিচিত্র কারণে কম্পোস্টের স্তূপকে বেছে নেয়। এর জন্য তারা প্রথমে কম্পোস্টের একটি ক্ষেত্র তৈরি করে নেয় এবং পরে তার উপর ডিম পাড়ে। প্রয়োজন অনুসারে তারা তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণও করে। যখন তাপমাত্রা বাড়ানো দরকার, তখন উপর থেকে আরো কম্পোস্ট এনে যোগ করে, যখন তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলা দরকার, তখন কিছু পরিমাণ কম্পোস্ট সরিয়ে নেয়। পাখিগুলো এখানেও কিন্তু আদতে সূর্যের শক্তিকেই ব্যবহার করছে।
অস্ট্রেলীয় মেগাপড।
আবর্জনার স্তূপ থেকে মেগাপডের ডিম সংগ্রহ করছেন একজন ব্যক্তি।
মাঝে মাঝে কিছু গাছ অনেকদিন ধরে টিকে থাকে। এই গাছগুলো বিয়োজিত হয় না বা কেউ এদের খেয়ে ফেলে না। তবে কারো খাদ্য না হলেও এরা স্তরীভূত অঙ্গারে পরিণত হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলমান এই প্রক্রিয়ায় স্তরের উপর স্তর জমা হয়ে বড় স্তর গঠন করে। পশ্চিম আয়ারল্যান্ড সহ অন্যান্য অঞ্চলের মানুষেরা বড় ইটের আকৃতিতে এসব অঙ্গার কেটে কেটে তুলে নিয়ে আসে। ইট আকৃতির অঙ্গারগুলো তারা শীতের দিনে ঘর গরম রাখতে ব্যবহার করে। বরফের দেশগুলোতে ঘর গরম রাখতে ঘরের ভেতরে কিছু না কিছু জ্বালাতে হয়, বাংলাদেশ বা উষ্ণ অঞ্চলীয় দেশগুলোতে এভাবে জ্বালাতে হয় না। ঘরের ভেতর ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচতে তাপের যে শক্তি ব্যবহার করা হয় তার মূল উৎসও সূর্য, যা হাজার হাজার বছর আগে গাছের পাতায় আটকা পড়েছিল।

এই অঙ্গারগুলো উপযুক্ত পরিবেশ ও প্রভাবকের মধ্যে যদি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে থাকে, তাহলে সেগুলো কয়লায় পরিণত হয়। কয়লা অঙ্গারের চেয়ে ভালো মানের জ্বালানী। কয়লা পুড়িয়ে অধিক পরিমাণ উত্তাপ পাওয়া যায়। কয়লার এমন তাপীয় উপযোগিতার কারণেই আঠারো ও ঊনিশ শতকে শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল।
তেল, গ্যাস ও কয়লার শক্তি আদতে সূর্যেরই শক্তি।
স্টিল মিলের উত্তপ্ত মেশিনের চালিকাশক্তি, স্টিম ইঞ্জিনের ধোঁয়া উড়ানো প্রবল বেগ, পানি কেটে জাহাজের ছুটে চলা এগুলোর সমস্ত শক্তিই আসলে আসছে সূর্য থেকে। হোক প্রত্যক্ষভাবে কিংবা হোক পরোক্ষভাবে। হতে পারে সেই শক্তি ১ হাজার বছর আগে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে কিংবা হতে পারে সেই শক্তির প্রক্রিয়াকাল ৩০০ মিলিয়ন বছর আগের।

শিল্প বিপ্লবের শুরুর দিকে কিছু কিছু ইন্ডাস্ট্রি চলতো স্টিম ইঞ্জিনে। বাদ বাকি অধিকাংশ কটন মিলই চলতো পানি চালিত এক ধরনের যন্ত্রের মাধ্যমে। এই যন্ত্রকে বলা হয় ‘ওয়াটার হুইল’। এই যন্ত্রে চালিত মিল-ফ্যাক্টরিগুলো স্থাপন করা হতো তীব্র স্রোত সম্পন্ন নদীর পাশে। স্রোতের পানির মধ্যে হুইলকে বসানো হতো, এই স্রোতে হুইল ঘুরতো। এই শক্তিকে ব্যবহার করেই চলতো পুরো ফ্যাক্টরি। এখানে ইঞ্জিনের শক্তি কোথা থেকে আসছে? দেখতে সূর্যের সাথে সম্পর্কহীন মনে হলেও আসলে এখানেও শক্তি আসছে মূলত সূর্য থেকেই। কীভাবে?

চাকা বা হুইল ঘুরে পানির স্রোতে, পানির স্রোত তৈরি হয় অভিকর্ষীয় শক্তির প্রভাবে- যার মানে হচ্ছে পানিকে নীচে থেকে উপরে উঠতে হয়। কারণ নীচের পানি উপরে না গেলে উপরে পানির যে সাপ্লাই আছে তা কয়েক দিনেই শেষ হয়ে যাবে। পানিগুলো উপরে উঠতে হলে অবশ্যই বাষ্পে রূপ নিয়ে বায়ুতে ভর করে উঠতে হবে। আর পানি থেকে বাষ্প তৈরি করার কাজটা করে সূর্যের তাপশক্তি। সুতরাং যে ইঞ্জিনই হোক, আর যে শক্তিই হোক- সকল শক্তির উৎসই হচ্ছে মূলত সূর্য।
ওয়াটার হুইলের শক্তিও ঘুরে ফিরে সূর্য থেকেই আসে।
কয়লার মাধ্যমে শিল্প বিপ্লব সাধিত হলে কটন মিলগুলো পানির পরিবর্তে কয়লা ব্যবহার করে ইঞ্জিন চালানো শুরু করেছিল। কয়লাও মূলত সূর্যেরই শক্তি। এখন এদের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে, এ প্রকার শক্তি তৈরি হয়েছিল মিলিয়ন বছর আগে, আর আরেক প্রকার শক্তি সঞ্চিত হয়েছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। পানি বাষ্প হয়ে উপরে উঠে কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বৃষ্টি আকারে ঝরে পড়ে কিংবা পর্বতের চূড়া থেকে বরফ হতে গলে পড়ে। এ ধরনের শক্তিকে বলা হয় ‘বিভব শক্তি’। নিচে থেকে উপরে উঠানোর ফলে এতে শক্তি জমা হয় বা বিভব জমা হয় বলে একে বিভব শক্তি বলে। বস্তু যত উপরে উঠবে, অভিকর্ষের প্রভাবে ভূমির সাপেক্ষে তার বিভব শক্তি ততই বাড়বে।

পুরো বিশ্ব কীভাবে সূর্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এর মাধ্যমে আমরা তা বুঝতে পারি। উদ্ভিদ যখন আলোর উপস্থিতিতে খাদ্য-চিনি উৎপন্ন করে, তখন সূর্য সাহায্য করছে। যখন কোনো তৃণভোজী বা মাংসভোজী প্রাণী খাদ্য হিসেবে অন্য প্রাণী বা উদ্ভিদকে খাচ্ছে, তখনও শক্তির উৎস হিসেবে থাকছে সূর্য।

আমরা যদি আমাদের আশেপাশে মাটি, পানি, পাতা, লতা, কাঠ, কয়লা, তেল কাগজ, কাপড়, ফার্নিচার, হিটার, ফ্যান ইত্যাদির দিকে তাকাই, তাহলে সবখানেই দেখতে পাবো সূর্যের অবদানের উপস্থিতি। প্রত্যেকটা মিনিটে মিনিটে আমরা সূর্যের অবদানের কাছে ঋণী। পৃথিবীর সকল প্রাণই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সূর্যের কাছে ঋণী। সূর্য যে এতকিছু উপহার দিচ্ছে মানুষকে তার অল্প স্বল্পও হয়তো মানুষ জানতো, তার কারণেই সূর্যকে পূজা করতো প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা। অ্যাজটেকরা সূর্যকে খুশি করার জন্য হাজার হাজার মানুষকে
ভয়াবহভাবে বলিদান করেছিল।
সূর্য কোনো দেবতা নয়, তবে দেবতা না হলেও পৃথিবীর মানুষকে যা উপকার করছে তা হাজার দেবতাকেও হার মানায়।
আমরা আজকের মানুষেরা সত্যিই ভাগ্যবান। সূর্যকে আমাদের পূজা করতে হচ্ছে না। বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ আমরা জানি সূর্য আসলে একটা মহাজাগতিক বস্তু মাত্র, যা পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম কানুন মেনে তৈরি হয়েছিল এবং পদার্থবিজ্ঞানেরই কিছু নিয়মের প্রভাবে এক সময় মরে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।