Showing posts with label সংস্কৃ‌তি. Show all posts
Showing posts with label সংস্কৃ‌তি. Show all posts

Thursday, August 24, 2017

কাবিল ও হাবিলের করুণ কাহিনী!

কাবিল ও হাবিল নামে দুই ভাইয়ের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের ইতিহাস অনুসারে কাবিল ও হাবিলের মাধ্যমেই প্রথম কুরবানি শুরু হয়।[1] তাদের মধ্য থেকেই পৃথিবীতে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে এবং তাদের মাধ্যমেই মৃতদেহ কবর দেবার নিয়ম চালু হয়।[2] জুমার নামাজের আগে কিংবা কুরবানির ঈদের নামাজের আগে বিশেষ আলোচনায় কুরবানির ইতিহাস সম্বন্ধে আলোকপাত করতে গিয়ে ইমাম সাহেবরা প্রায় সময়ই কাবিল ও হাবিলের ঘটনার উল্লেখ করেন। খ্রিস্টধর্মে তাদেরকে কেইন ও এবেল নামে ডাকা হয়।[3] কাবিল ও হাবিলের ঘটনা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে উল্লেখ করতে হবে তাদের পিতা হযরত আদম (আ:) ও মাতা বিবি হাওয়া (আ:) এর কথা।

হযরত আদম (আ:) ও বিবি হাওয়া (আ:) উভয়ে জান্নাতের সুসজ্জিত বাগানে বসবাস করছিলেন। কিন্তু তাদের পিছু লাগলো ‘ইবলিস’ নামে এক পাপিষ্ঠ শয়তান। ইবলিস চাইলো তারা যেন সুখের জান্নাতে থাকতে না পারে। যতটা না সুখের জান্নাত থেকে বিতাড়িত করার ইচ্ছে ছিল ইবলিসের, তারচেয়েও বেশি ইচ্ছে ছিল তারা যেন আল্লাহর দেয়া আদেশ অমান্য করে তাঁকে নাখোশ করে। আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:)-কে আল্লাহ একটি বিশেষ গাছের ফল খাওয়ার ব্যাপারে নিষেধ করেছিলেন। ইবলিস বেছে বেছে ঐ বিশেষ ফলটিকেই টার্গেট করলো। দুজনকে প্ররোচিত করে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ঐ গাছের ফল খাইয়ে দিলো। আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:) দৃশ্যত পাপ করে বসলেন। জান্নাতে পাপের স্থান নেই, তাই শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিলেন। বলা হলো, পৃথিবীতে ভালো কাজ করে নিজেদের মার্জনা করতে পারলে তারা আবারো জান্নাতে ফিরে যেতে পারবেন।

কিন্তু অশান্তি তারপরও রয়ে গেল, কারণ পৃথিবীতেও অস্তিত্ব বিরাজমান সেই পাপিষ্ঠ শয়তান ইবলিসের। ইবলিস শয়তান তার শেষ চাওয়া হিসেবে আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষ কয়েকটি ক্ষমতা চেয়ে নিয়েছিল। অভিশপ্ত হবার আগে ইবলিস আল্লাহর অনেক ইবাদত করেছিল। এই ইবাদতের প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তাকে তার চাহিদা অনুসারে এই ক্ষমতাগুলো প্রদান করেছিলেন। প্রাপ্ত ক্ষমতাগুলোর মধ্যে একটি হলো, যেকোনো সময় বিশ্বের যেকোনো স্থানে সে অবস্থান করতে পারবে।[4] সে হিসেবে আদম-হাওয়ার পৃথিবীতে চলে আসা তার জন্য তেমন কঠিন কিছু নয়।

যা-ই হোক, পৃথিবীতে আগমনের পর হযরত আদম (আ:) ও বিবি হাওয়া (আ:) এর সন্তান জন্ম হতে লাগলো। ধীরে ধীরে মানুষ বাড়তে লাগলো পৃথিবীতে। কিন্তু এখানে দৃশ্যত একটি সীমাবদ্ধতা থেকে গেল। আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:) যেহেতু পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবী, তাই তাদের পরের প্রজন্মে যত সন্তানের জন্ম হবে তারা সকলেই হবে ভাই-বোন। ইসলামী নিয়ম অনুসারে, ভাই বোনের মাঝে কখনো বিয়ে হয় না। সে হিসেবে এটিই হতো পৃথিবীর শেষ মানব প্রজন্ম। এরপর মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতো। কিন্তু এখানে তো পুরো মানবজাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন, তাই বিশেষ একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে এর সমাধান করা হলো। বিবি হাওয়ার গর্ভে তখন সন্তান জন্ম নিতো জোড়ায় জোড়ায়। প্রতি জোড়ায় একজন ছেলে আর একজন মেয়ে জন্ম হতো। একই জোড়ার ছেলে ও মেয়েরা পরস্পর বিয়ে করতে পারবে না। বিয়ে করতে হলে ভিন্ন জোড়ার কাউকে করতে হবে। কাবিল ও হাবিল ছিল ভিন্ন জোড়ার, তাই তাদের ব্যাপারটি স্বাভাবিক নিয়মেই সমাধান হয়ে যায়। একজন আরেকজনের জোড়ার মেয়েকে বিয়ে করবে।

কিন্তু এখানে একটি সমস্যা দেখা দেয়। হাবিলের জোড়ার মেয়েটি তেমন সুন্দরী ছিল না। সেই তুলনায় কাবিলের জোড়ার মেয়েটি ছিল অনেক বেশি সুন্দরী। নিয়ম অনুসারে হাবিল অধিক সুন্দরী মেয়েটিকে পায় আর কাবিল পায় কম সুন্দরী মেয়েটিকে। কিন্তু কাবিল বেঁকে বসে, সে হাবিলের জোড়ার মেয়েটিকে বিয়ে করবে না। যেভাবেই হোক, নিজের জোড়ার সুন্দরী মেয়েটিকেই বিয়ে করবে।
শিল্পীর তুলিতে আকা একটি কাক অপর একটি কাককে হত্যা করছে।
এমতাবস্থায় পিতা হযরত আদম (আ:) একটি মীমাংসা করলেন। তাদের দুজনকে আল্লাহর নামে কুরবানি দিতে বললেন। যার কুরবানি আল্লাহ গ্রহণ করবেন, তার ইচ্ছাই জয়ী হবে। কার কুরবানি গৃহীত হলো আর কার কুরবানি গৃহীত হলো না, তা কীভাবে বোঝা যায়? তখনকার কুরবানি এখনকার কুরবানির মতো ছিল না। সে সময়ে কোনো জিনিস কুরবানি দিলে আসমান থেকে আগুন এসে ঐ জিনিসকে পুড়িয়ে দিতো। কুরবানির বস্তুকে ভূমি থেকে উপরে কোনো স্থানে উপস্থাপন করা হতো। আকাশ থেকে আগুন এসে যদি বস্তুকে পুড়িয়ে দিতো, তাহলে বোঝা যেতো আল্লাহ কর্তৃক কুরবানী গৃহীত হয়েছে।

পিতা আদম (আ:) এর দেওয়া মীমাংসা অনুসারে তারা উভয়েই কুরবানির বস্তু উপস্থাপন করলো আল্লাহর কাছে। হাবিল একটি সুস্থ ও মোটাতাজা দুম্বা উৎসর্গ করলো আর কাবিল তার কিছু সবজি ও শস্য উৎসর্গ করলো। তখন সবজি ও শস্যও কুরবানির জন্য উৎসর্গ করা যেতো। কোনো কোনো উৎস থেকে জানা যায়, হাবিল উৎসর্গ করেছিল উৎকৃষ্ট মানের দুম্বা আর কাবিলের শস্য ছিল নিকৃষ্ট মানের।[5][6] আল্লাহ হাবিলের কুরবানিকেই কবুল করলেন। উপর থেকে আগুন দিয়ে দুম্বাটিকে পুড়িয়ে নিলেন, কিন্তু কাবিলের শস্যকে কিছুই করলেন না। সে হিসেবে বিয়ের নিয়ম আগের মতোই রইলো, হাবিল বিয়ে করবে কাবিলের জোড়ায় জন্ম নেয়া মেয়েটিকে।

কিন্তু কাবিল এই অপমান সহ্য করতে পারলো না। সে ভাবলো, হাবিলের জন্য তার কুরবানি আল্লাহ গ্রহণ করেননি। কুরবানিতে প্রত্যাখ্যাত হওয়াতে এবং স্ত্রী হিসেবে কাঙ্ক্ষিত মেয়েকে না পাওয়াতে সে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে গেল। ক্রোধের বশে হাবিলকে সে বললো, তোর ইচ্ছা কোনোভাবেই আমি পূরণ হতে দেবো না। প্রয়োজনে তোকে হত্যা করবো, যেন তুই আমার জোড়ার মেয়েটিকে বিয়ে করতে না পারিস।[7] কোনো কোনো উৎস থেকে জানা যায়, তাকে এমন সর্বনাশা ভাবনার উস্কানি দিয়েছিল সেই পাপিষ্ঠ ইবলিস শয়তান।[8]

কাবিলের এমন আচরণে হাবিল অনেক সুন্দর উত্তর দিয়েছিল। সে বলেছিল, আল্লাহ তাদের কুরবানিই কবুল করেন যার উদ্দেশ্য সৎ।[9] আর তুমি আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আমার গায়ে আঘাত করলেও, আমি তোমাকে কিছু করবো না। কারণ আমি আমার প্রতিপালককে ভয় করি।[10] কিন্তু এই কথায় কাবিলের উদ্দেশ্যের কোনো পরিবর্তন হলো না। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে সে হত্যা করলো তার আপন ভাইকে।[11] এরপরই কাবিলের মন গলে যায় এবং অনুভব করে- আহারে, কত বড় ভুল করে ফেললো সে! নিজের ভাইকে নিজ হাতে মেরে ফেললো, এর চেয়ে বড় ধৃষ্টতা আর কী হতে পারে! ভেতরে ভেতরে সে অনেক অনুতপ্ত হলো এবং নিজের অপকর্ম কীভাবে ঢাকবে, তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লো। তখনো মৃতদেহ সৎকারের ব্যাপারে কোনো নিয়ম তৈরি হয়নি, কারণ এর আগে কোনো মানুষের মৃত্যু ঘটেনি।

মৃত দেহটিকে নিয়ে কী করবে এ নিয়ে যখন সে চিন্তায় মগ্ন তখন দেখলো, একটি কাক তার ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে একটি গর্ত করলো। তারপর সেই গর্তে একটি মৃত কাককে টেনে এনে কবর দিয়ে দিলো।[12] এটি দেখে কাবিল ভাবলো, তাকেও হয়তো এভাবে কবর দিতে বলা হচ্ছে। তাই একটি গর্ত করে সে তার ভাইকে কবর দিয়ে দিলো। ইসলামের ইতিহাস অনুসারে এটিই ছিল মানবজাতির প্রথম কবর। কোনো কোনো উৎস থেকে জানা যায়, কাক দুটি ছিল ফেরেশতা এবং এদেরকে আল্লাহই পাঠিয়েছিলেন, যেন এদের দেখে কাবিল শিখতে পারে।[13]
ইসলামি চিত্রশিল্পীর তুলিতে কাকের কবর দেবার ঘটনা।
অনেকে দাবি করে থাকেন, হাবিলের কবর এখনো দেখা যায় এবং এটি সিরিয়ার দামেস্কে অবস্থিত।[14] দামেস্কের উত্তরে একটি স্থান আছে, যা মাকতালে হাবিল বা হাবিলের হত্যাস্থল নামে পরিচিত। এ প্রসঙ্গে হাফিজ ইবনে আসাকির একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন তার একটি বইয়ে। তিনি উল্লেখ করেন,
আহমদ ইবনে কাসির একবার রাসুল (সা:)-কে স্বপ্নে দেখেছিলেন। রাসুলের (সা:) পাশে হাবিলও ছিল। এক প্রশ্নের জবাবে হাবিল তখন কসম করে বললো, এটিই আমার হত্যাস্থল। তখন রাসুল (সা:) হাবিলের দাবিকে সত্য বলে সমর্থন করলেন।[15]
তবে এটি শুধুই স্বপ্ন বলে ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে একে গ্রহণযোগ্য বলে ধরা হয় না।
অনেকে বিশ্বাস করেন এটি আদমপুত্র হাবিলের কবর।
কুরআন শরীফে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত বলা নেই। এমনকি তাদের দুজনের নামও উল্লেখ নেই। শুধু ‘আদমের দুই পুত্র’ নামে তাদের কথা উল্লেখ আছে। তবে তৌরাত গ্রন্থ ও কিছু হাদিসে তাদের ঘটনার বিস্তারিত বলা আছে।[16] ইবনে কাসিরের লেখা ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’তে এই ঘটনার সুন্দর বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে।

ইসলামের দৃষ্টিকোণে কাবিল ও হাবিলের ঘটনার তাৎপর্য অনেক। কাবিল ও হাবিলের ঘটনা উল্লেখের পরপরই কুরআনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়াত আছে। সেখানে উল্লেখ আছে,
কেউ কাউকে হত্যা করলে, সে যেন সমস্ত মানবজাতিকেই হত্যা করলো। আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে, সে যেন সমস্ত মানবজাতিকেই রক্ষা করলো।[17]
এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস আছে। রাসুল (সা:) বলেছেন,
পৃথিবীতে যখনই অন্যায়ভাবে কোনো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, তখন পাপের একটি অংশ অবশ্যই আদমের প্রথম পুত্র কাবিলের উপর পড়ে। কেননা সে-ই প্রথম ব্যক্তি, যে অন্যায় হত্যাকাণ্ডের সূচনা করে।[18]


তথ্যসূত্র ও নোটঃ
  • [1] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ২৭। সংস্কৃতি হিসেবে কোরবানির প্রচলন শুরু হয় হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর সময় থেকে, কিন্তু প্রথম কোরবানির ঘটনা ঘটে হযরত আদম (আ:) এর সময়কালে কাবিল ও হাবিলের মাধ্যমে।
  • [2] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩১
  • [3] Holy Bible, Genesis 4
  • [4] আল কুরআন, সূরা হিজর, আয়াত ৩৬-৩৮।
  • [5] আল-কোরআনে বর্ণিত পঁচিশজন নবী ও রাসুলের জীবনী, মুফতী মুহাম্মদ শফী, সোলেমানিয়া বুক হাউস, ২০১২, পৃষ্ঠা ৬৫
  • [6] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড (বাংলা অনুবাদ), হাফিজ ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা ২১৭
  • [7] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ২৭
  • [8] কোরআনের গল্প, বন্দে আলী মিয়া, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ২০১৪, পৃষ্ঠা ১৫
  • [9] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ২৭
  • [10] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ২৮।
  • [11] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩০।
  • [12] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড (বাংলা অনুবাদ), হাফিজ ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জুন ২০০৭
  • [13] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩১।
  • [14] islamiclandmarks.com/syria/tomb-of-habil
  • [15] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড (বাংলা অনুবাদ), হাফিজ ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা ২১৯
  • [16] আল-কোরআনে বর্ণিত পঁচিশজন নবী ও রাসুলের জীবনী, মুফতী মুহাম্মদ শফী, সোলেমানিয়া বুক হাউস, ২০১২, পৃষ্ঠা ৬৬
  • [17] আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩২।
  • [18] আল বিদায়া ওয়ান নিয়াহা সূত্রে মুসনাদে আহমদ।

Tuesday, July 25, 2017

লিলিথ: ইহুদী পুরাণের এক ‘ভয়ংকর সৌন্দর্য’ !!

‘লিলিথ’ নামটির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় এক ধরণের সারল্য, অসাধারণ মাধুর্য। শুনলেই কোনো স্নিগ্ধ ষোড়শীর মুখ ফুটে ওঠে মনে। কিন্তু এই নামটি যে চরিত্রের সাথে জড়িত, সে কি আসলেই পরিচিত তার সারল্যের জন্য? নাকি চরিত্রটিতে আছে সম্পূর্ণ বিপরীত কোনো বৈশিষ্ট্য?

লিলিথের কথাঃ

লিলিথকে পাওয়া যায় ইহুদী মিথলজিতে। ইহুদী মিথলজির বিখ্যাত চরিত্র এই লিলিথ। বিখ্যাত না বলে সম্ভবত ‘কুখ্যাত’ বললেই বেশি মানায়। লিলিথ চরিত্রটি অঙ্কুরিত হয় মূলত ৩য় থেকে ৫ম শতাব্দীর মাঝামাঝিতে, ব্যবিলনীয় তালমুদ বা পুরাণে। শব্দটির প্রচলিত অর্থ রাত্রি হলেও পুরাণের লিলিথ চরিত্রকে দেখানো হয় অন্ধকারের পিশাচ রূপে, যার বিচরণ ছিল রাতের অন্ধকারে। সে ছিল অসচ্চরিত্রের অধিকারিণী, যার কাজ নবজাতক শিশু চুরি করে নিয়ে যাওয়া।
শিল্পীর তুলিতে ফুটিয়ে তোলা লিলিথ, যার হাত থেকে এক শিশুকে রক্ষা করছে এডাম।
ব্যবিলনীয় গ্রন্থে এমনও বলা আছে যে-
"কোনো পুরুষ যদি একা রাতে ঘুমায়, তাহলে সে লিলিথের ফাঁদে পড়তে পারে!"
বলা হতো পুরুষের সাথে মিলিত হবার মাধ্যমে লিলিথ আরো শয়তানের জন্ম দেয়, কেননা লিলিথকে কল্পনা করা হয় অনিয়ন্ত্রিত যৌনতার প্রতীক হিসেবে। সিরিয়ায় একটি প্রস্তর খন্ড পাওয়া যায় যাতে লেখা ছিল-
O flyer in a dark chamber, go away at once, O Lili!
অর্থাৎ লিলিথকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে,
হে লিলি, হে অন্ধকারের উড়ন্ত প্রতীক, চিরদিনের জন্যে চলে যাও!
এতেই বোঝা যায় কতটা ভয়ানক চরিত্র হিসেবে কল্পনা করা হত লিলিথকে। এমনকি নবজাত শিশুদের গলায় বেধে দেওয়া হত তাবিজ যাতে তারা মুক্ত থাকতে পারে লিলিথের কবল থেকে।
ব্যবিলনীয় সভ্যতায় কল্পিত লিলিথ।
কিন্তু এটিই কি লিলিথের প্রকৃত পরিচয়'জেনেসিস রাব্বাহ' যাতে বুক অফ জেনেসিসের  অনেক জটিল তত্ত্বের বোধগম্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তাতে এই লিলিথকে দেখানো হয়েছে এডামের প্রথম স্ত্রী রূপে! শুনতে অদ্ভুত লাগে, তাই না? বরাবর ইভকে আমরা এডামের সাথে কল্পনা করে এসেছি, সেখানে এডামের ‘প্রথম স্ত্রী’ ব্যাপারটা ধাক্কা দেয়ার মতোই! তত্ত্বের সূত্রপাত ইহুদী ধর্মের প্রথম ধর্মগ্রন্থ যাতে বর্ণিত হয়েছে মানবজাতি ও পৃথিবীর সৃষ্টি উপাখ্যান, সেই বুক অফ জেনেসিসের একটি লাইন থেকে। বুক অফ জেনেসিসে ইংগিত দেয়া হয় পুরুষ ও নারীর একই সময়ে সৃষ্টিকে। যাতে বলা হয় (1:27)
So God created man in his own image,  in the image of God created he him, male and female created he them.
অর্থাৎ নর ও নারীর একইসাথে সৃষ্টির বিষয়টি ইহুদী ধর্মে স্বীকৃত। আবার ২:২২ এ এসে দেয়া হচ্ছে এডামের পাঁজরের হাড় থেকে ইভের সৃষ্টির বর্ণনা।

তাহলে সহজেই ধরে নেয়া যায় কোনো কারণে সেই প্রথম সঙ্গিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এডাম। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে গেলে জেনেসিস রাব্বাহতে পাওয়া যায় অসাধারণ এক ঘটনা। জেনেসিস রাব্বাহতে বর্ণিত একটি মিদ্রাশে পাওয়া যায় এডাম-লিলিথের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও পরিণতির উপাখ্যান। পরবর্তীতে ৯ম-১০ম শতাব্দীর দিকে ‘এলফাবেট অফ বেন সিরা’-তে মূলত লেখা হয় লিলিথের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হবার করুণ উপাখ্যান।
কার্ল পোয়েলাথ এর কল্পনায় লিলিথ।
এডামকে সৃষ্টির পর ঈশ্বর তার একাকীত্ব দূর করার কথা ভাবলেন। সঙ্গিনী হিসেবে সৃষ্টি করলেন লিলিথকে। লিলিথ বুদ্ধিদীপ্ত, আত্মসম্মানবোধে পরিপূর্ণ এক নারী, সৃষ্টির প্রথম নারী। তার জন্ম সেই মাটি থেকেই, যা থেকে এডামের জন্ম। যার কারণে পরবর্তীতে লিলিথ মেনে নিতে চায় নি এডামের আধিপত্য। নিজেকে সে দাবী করেছে এডামের সমকক্ষ, যা তৈরী করে এডামের মনে লিলিথের প্রতি বিরুদ্ধ চিন্তা।

মিদ্রাশ অনুযায়ী, সৃষ্টির পরপরই লিলিথের সাথে এডামের দ্বন্দ্ব শুরু হয় মূলত সঙ্গমের সময়। নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবী করা এডাম লিলিথকে বোঝাতে চায় তার জায়গা উপরে নয়, নীচে। লিলিথ তা মানতে অস্বীকার করে। যে শ্রেষ্ঠতার দাবী এডাম করে আসছে, তা সে উড়িয়ে দেয় এক নিমেষে। তার পক্ষে সে যুক্তিও স্থাপন করে। যেহেতু একই মাটি থেকে একই উপায়ে তাদের তৈরী করা হয়েছে, সেহেতু এডাম নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবী করতে পারে না। পারে না তার উপর কর্তৃত্ব করতে। এতসব মতভেদ দেখে স্বর্গে থাকার ইচ্ছা চলে যায় লিলিথের। স্বেচ্ছায় স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নামে লিলিথ!
মর্ত্যের পথে লিলিথ।
লিলিথের ব্যবহারে নাখোশ এডাম যায় স্রষ্টার কাছে, অভিযোগ করে লিলিথের বিরুদ্ধে। এমন সঙ্গিনী তাকে কেন দেওয়া হলো যে তার কথা শোনে না? যে পালিয়ে গেল তাকে ছেড়ে? লিলিথের উপর বিরক্ত স্রষ্টা তার তিন ফেরেশতা পাঠায় লিলিথকে খুঁজে বের করতে। এই তিন ফেরেশতা হলো ‘সেনয়’‘সেনসেনয়’ এবং ‘সেমানগেলফ’। [যাদের নাম পরবর্তীতে তাবিজে লিখে বাঁধা হত নবজাত শিশুদের গলায়, কল্পিত লিলিথের কবল থেকে তাদের রক্ষা করতে।] ফেরেশতারা স্রষ্টার বার্তা নিয়ে যায় লিলিথের জন্য। যদি সে ফিরে আসে এবং মেনে নেয় এডামের কর্তৃত্ব, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যদি সে প্রত্যাখ্যান করে, তাকে সম্মুখীন হতে হবে শাস্তির। প্রতিদিন তাকে প্রত্যক্ষ করতে হবে তার ১০০ সন্তানের মৃত্যু!
লিলিথ এর সিম্বল বা চিহ্ন যাতে যাদুশক্তি আছে বলে মনে করা হয়।
ফেরেশতারা লিলিথকে মিশরের এক সমুদ্র তীরে খুঁজে পায়। তাদের সাথে ফিরে যেতে বলে তাকে। কিন্তু লিলিথ বলে সে আর ফিরে যাবে না। এরপর তাকে শোনানো হয় ফিরে না যাওয়ার শাস্তি। লিলিথ বলে,
My friends, I know God only created me to weaken infants when they are eight days old. From the day a child is born until the eighth day, I have dominion over the child, and from the eighth day onward I have no dominion over him if he is a boy, but if a girl, I rule over her twelve days.”
(আমি জানি ঈশ্বর আমাকে তৈরী করেছেন কেবলই নবজাতকের প্রতি দূর্বল করার জন্য। তাও আমার অধিকার বজায় থাকবে কেবল আটদিন যদি শিশুপুত্র হয় আর কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে তা বারোদিন।)

লিলিথের বিশ্বাস ছিল ঈশ্বর এডামের পক্ষ নেবেন, যেহেতু লিলিথকে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন এডামকে সঙ্গ দেয়ার জন্য। শাস্তি মাথা পেতে নিয়ে স্বর্গ ত্যাগ করে লিলিথ, হয়ে যায় অভিশপ্ত!

সাহিত্যে লিলিথঃ

ইহুদী মিথলজিতে লিলিথকে যেভাবেই প্রকাশ করা হোক না কেন, সাহিত্যিকদের চোখে লিলিথ বরাবরই এক আকর্ষণীয়া নারী চরিত্রেই প্রতীয়মান হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শিল্পীর কল্পনা থেকে আঁকা লিলিথ দেখলেই তা বোঝা যায়। এমনকি লিলিথের উপাখ্যান নিয়ে রচিত হয়েছে সনেট! দান্তে গ্যাব্রিয়েল রোসেতি নামক এক ব্রিটিশ কবি ও চিত্রশিল্পী নিজের কল্পনা থেকে এঁকেছেন লিলিথকে, সেই সাথে ‘লিলিথ’ নামে এক সনেটে বর্ণনা করেছেন তার কল্পনার লিলিথকে-
Of Adam’s first wife, Lilith, it is told
(The witch he loved before the gift of Eve.)
That, ere the snake’s, her sweet tongue could deceive, And her enchanted hair was the first gold.
দান্তে গ্যাব্রিয়েল রোসেতির লেডি লিলিথ।
ইহুদী মিথলজিতে লিলিথকে একদিক থেকে যেমন দেখানো হয়েছে অন্ধকারের প্রতিরূপ হিসাবে, আরেক দিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তার এক বিদ্রোহী রূপ। স্বর্গের সুখ ছেড়ে আসা এক নির্বোধ নারী, কিংবা নিজের অধিকারের জন্যে একাকী লড়ে যাওয়া এক দৃঢ়চেতা চরিত্র। সবই নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির উপর। ইহুদী সাহিত্যিক রুথ ফেল্ডম্যানের ‘Lilith’ সবচেয়ে সুন্দর করে নিজের রূপটি প্রকাশ করেছে-
“Half of me is beautiful, But you were never sure which half.”

Tuesday, July 18, 2017

যে গান মৃত্যু ডেকে আনে!

মন ভালো হোক কিংবা খারাপ, আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যেকোনো সময়ে গান ছাড়া যাদের চলেই না। জ্যামে বসে অলস সময় কাটাতেই হোক কিংবা জিমে গিয়ে প্রচণ্ড শারীরিক কসরত করার মুহূর্তেই হোক, গান আমাদের চিরসঙ্গী। মানুষের অনুভূতির সাথে মিশে গিয়ে একমাত্র গানই পারে চোখের পলকে মনের যত ক্লান্তি সব দূর করে দিতে। কিন্তু সেই গানই যদি হয় মৃত্যুর কারণ তবে কেমন হবে একবার ভাবুন তো!
ইউটিউবে গ্লুমি সানডে গানের কভার চিত্র।
বলছিলাম ‘গ্লুমি সানডে‘ গানটির কথা। প্রায় শতাধিক জীবন কেড়ে নেয়া এই গানটি বেশ সাড়া জাগানো ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে। এমনকি গানটির রচয়িতা স্বয়ং শিকার হয়েছেন রহস্যজনক মৃত্যুর। তাই তো গ্লুমি সানডের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হাঙ্গেরির সুইসাইড সং’
গ্লুমি সানডের অপর নাম হাঙ্গেরির সুইসাইড সং।
গানটি নিয়ে আর কিছু বলার আগে দেখে আসা যাক কি ছিল সেই গানের কথায়
"Sunday is gloomy, my hours are slumberless
Dearest the shadows I live with are numberless
Little white flowers will never awaken you
Not where the black coach of sorrow has taken you
Angels have no thought of ever returning you
Would they be angry if I thought of joining you?

Gloomy Sunday

Gloomy is Sunday, with shadows I spend it all
My heart and I have decided to end it all
Soon there’ll be candles and prayers that are sad I know
Let them not weep let them know that I’m glad to go
Death is no dream for in death I’m caressing you
With the last breath of my soul I’ll be blessing you

Gloomy Sunday

Dreaming, I was only dreaming
I wake and I find you asleep in the deep of my heart, here
Darling, I hope that my dream never haunted you
My heart is telling you how much I wanted you

Gloomy Sunday"

গ্লুমি সানডের রচয়িতা 'রেজসো সেরেস'।
১৯৩২ সালে প্যারিসে বসে গ্লুমি সানডে গানটি লিখেছিলেন হাঙ্গেরিয়ান পিয়ানোবাদক এবং সঙ্গীত রচয়িতা রেজসো সেরেস। কারো কারো মতে জায়গাটি প্যারিস নয়, বুদাপেস্টও হতে পারে। ৩৪ বছর বয়সী সেরেস তখন একটুখানি সাফল্যের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন। গান নয়, মূলত কবিতা হিসেবেই প্রথম রচিত হয় গ্লুমি সানডে। পিয়ানোর সি-মাইনর মেলোডির সাথে কম্পোজিশন করা হয় কবিতাটির।

গানটি কে এবং কেন লিখেছিলেন তা নিয়ে আজ অবধি জল কম ঘোলা হয়নি। রেজসো সেরেসকে যদিও গানটির রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তা সত্ত্বেও গানটির পেছনের কাহিনী হিসেবে একাধিক মতভেদ রয়েছে। সবচেয়ে প্রচলিত মত অনুযায়ী জানা যায়, মামলা-মোকদ্দমার ফেরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন সেরেস। তাকে স্বান্তনা দিতে একটি কবিতা লিখে পাঠান ছোটবেলার বন্ধু লাজলো জেভার। সেই কবিতাটি সেরেসের অন্তর ছুঁয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে পিয়ানোর সাহায্যে সুর দিয়ে এটিকে গানে রুপান্তরিত করেন সেরেস। অন্য একটি মত অনুযায়ী, সেরেসের হাত দিয়েই রচিত হয় গ্লুমি সানডে।

অপর একটি ব্যাখ্যা মতে, প্রেমিকা সেরেসকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তিনি এতটাই বিষণ্ণ হয়ে পড়েন যে সুর করে ফেলেন গ্লুমি সানডের মতো মন খারাপ করা গান। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীর বর্ণনা এবং তার অন্তিম পরিণতি কি হতে পারে সেই চিন্তা-ভাবনারই প্রতিফলন এই গানটি। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। হাঙ্গেরিতেও চলছিল চরম অর্থনৈতিক মন্দা আর ফ্যাসিবাদ। সব মিলিয়ে দুর্বিষহ দিন কাটছিল সেরেসের। সেরেস তার অন্তরের সমস্ত বেদনা একত্রিত করে ঢেলে দিয়েছিলেন এই গানটির প্রতিটি সুরে। আর সে কারণেই অচিরেই তার বিষণ্ণতা ছুঁয়ে গিয়েছিল গীতিকার লাজলো জাভোরকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা।
গানটিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে বেশ কিছু মিথও । বলা হয়, সুন্দরী এক নারী গানটি প্লেয়ারে চালিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। আবার এক ব্যবসায়ীর পকেট থেকে সুইসাইড নোট হিসেবেও পাওয়া যায় গ্লুমি সানডে। হাঙ্গেরির দুই কিশোরী এই গান গাইতে গাইতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নদীতে এমন কথাও শোনা যায়। কেউ দেখেনি, কেউ শোনেনি অথচ এই মিথগুলো দিব্যি প্রচলিত রয়েছে মানুষের মুখে মুখে।
আরেকটি একটি উল্লেখযোগ্য মত হলো গ্লুমি সানডে গানটি শুনে আত্মহত্যা করা ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন স্বয়ং জাভোরের প্রেমিকাও। মতান্তরে জাভোরের প্রেমিকা তার সুইসাইড নোটে মাত্র দুইটি শব্দ লিখে গিয়েছিলেন- ‘গ্লুমি সানডে’। কাজেই সেরেসের মতো জাভোরও ছিলেন একাকী। সুতরাং দুজন দুজনের মনের কথা বুঝে ফেলেছিলেন এক নিমিষেই। এবার তাদের প্রয়োজন ছিল একটি সুরেলা কণ্ঠের। সেই অভাব পূরণ করতে ১৯৩৫ সালে এগিয়ে আসেন পল কালমার। গানটির কথার সারমর্ম ছিল অনেকটা এমন- গায়ক তার প্রেমিকার মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল হয়ে আত্মহত্যা করতে চান যাতে অন্তত মৃত্যুর পরে হলেও তাদের দুজনের আত্মা একত্রিত হতে পারে। বর্তমানে গানটির যে সংস্করণ সর্বত্র শোনা যায় তা ১৯৪১ সালে বিলি হলিডে রেকর্ড করেন।
বিলি হলিডে।
১৯৩৬ সালে হাঙ্গেরিয়ান এই গানটিকে ইংলিশে রেকর্ড করেন হল ক্যাম্প যেখানে কথাগুলো অনুবাদ করতে সহায়তা করেন স্যাম এম লিউইস। লিউইসের লেখা গানটি এবার সরাসরি প্ররোচিত করে আত্মহত্যার পথে। ধীরে ধীরে গানটির নামই হয়ে গেল হাঙ্গেরিয়ার আত্মঘাতী গান। যথাযথ প্রমাণসহ অসংখ্য ব্যক্তির আত্মহত্যার খবরে নড়েচড়ে বসেন সবাই।

‘৩০ এর দশকে পাওয়া খবর অনুযায়ী এই গানটির জের ধরে আমেরিকা ও হাঙ্গেরিতে আত্মহত্যা করেন ১৯ জন, মতান্তরে সংখ্যাটি ২০০ বলেও শোনা যায়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো আত্মহত্যাকারীদের সবার সুইসাইড নোটেই পাওয়া গেছে গ্লুমি সানডের লিরিক্স। জনমত প্রচলিত আছে, এই গানটি বারবার শুনতে শুনতে শ্রোতাদের মধ্যে জীবনের প্রতি এক ধরণের বিতৃষ্ণা চলে আসে এবং সেখান থেকেই তারা বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। ২ জন তো গানটি শুনতে শুনতে গুলি করে নিজেদের মাথার খুলিই উড়িয়ে দিয়েছেন! এরপরও কি গানটি যে অভিশপ্ত তা মানতে কারো কোনো আপত্তি থাকতে পারে?

শ্রোতাদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় হাঙ্গেরিতে গানটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অথচ হাঙ্গেরি কিন্তু এমনিতেও আত্মহত্যার হারের দিক থেকে বিশ্বের প্রথম সারির একটি দেশ। প্রতি বছর লাখে প্রায় ৪৬ জন মানুষ সেখানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তারপরও অভিশপ্ত গান হিসেবে স্বীকৃতি পায় গ্লুমি সানডে। পরবর্তীতে ৪০ এর দশকে বিবিসি ও গানটির লিরিক শোনানো বন্ধ করে শুধুমাত্র ইন্সট্রুমেন্টাল বাজানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ভাষ্যমতে, আত্মহত্যার প্ররোচনা না থাকলেও এই গানটি কাউকে যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। কাজেই বিলি হলিডের গ্লুমি সানডে সংস্করণটি সব জায়গা থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়। ২০০২ সালে এসে গানটির উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে রেডিও চ্যানেলগুলো।

পত্রিকায় সেরেসের আত্মহত্যার খবর।
গানটির প্রভাবেই কিনা কে জানে, গ্লুমি সানডে রচনার ৩৫ বছর পরে গানটি গাইতে গাইতে সেরেস তার চার তলা অ্যাপার্টমেন্টের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন ১৯৬৮ সালে। কেন একটি মাত্র গান এত বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ালো তা আজও এক রহস্য। তবুও গানটিকে ঘিরে সবার কৌতূহলের যেন কোনো শেষ নেই। এলভিস কোস্টেলো, সারাহ ম্যাকল্যাচলান, হেথার নোভা প্রমুখ সংগীত শিল্পী সাম্প্রতিক সময়ে গ্লুমি সানডের নতুন নতুন সংস্করণ রেকর্ড করেছেন।
রলফ সুবলের চলচ্চিত্র ‘গ্লুমি সানডে’।
গ্লুমি সানডে গানটিকে ভিত্তি করে ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচার এবং একটি ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী নিয়ে একই নামে ১৯৯৯ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন পরিচালক রলফ সুবল। এখানে তিনি ইতিহাস এবং ফিকশনের মধ্যে একটি সমন্বয় ঘটিয়েছেন।

তবে গান শুনুন আর চলচ্চিত্রই দেখুন, আত্মহত্যার পথে না হাঁটার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। কারণ আত্মহত্যা কখনোই কোনো পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে না। বেঁচে থেকে কঠিন সব সমস্যার মোকাবেলা করে দিন শেষে বিজয়ীর হাসি হাসতে পারাই তো প্রকৃত বীরের কাজ।

Friday, July 14, 2017

খনা ও খনার বচন: লোকসংস্কৃতির আকর্ষণীয় উপাদান।

কখনও কখনও আধুনিক যুগে এসেও প্রাচীন সময়ের কিছু মানুষকে বর্তমানের চাইতেও বেশি আধুনিক বলে মনে হয়, তেমনই একজন- 'খনা'। কী খুব পরিচিত লাগছে তো নামটা? প্রাচীন ভারতের এই নারীর নাম ভারতীয় উপমহাদেশের কারোরই অজানা নয়। আজ সেই খনারই জানা-অজানা কিছু গল্পে ডুবে যাওয়া যাক!

খনার পদধূলি পেয়েছে জ্যোতির্বিদ্যা, বিজ্ঞান, দর্শন ও কৃষিশাস্ত্র। এ সকল বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ কিংবা গবেষণালব্ধ জ্ঞান তিনি তুলে ধরতেন তার বিভিন্ন বচনের মধ্য দিয়ে, যেগুলো বহুকাল ধরে লোকের মুখে মুখে খ্যাতি লাভ করেছে ‘খনার বচন’ নামে। খনার বচনগুলো খনাকে করে তুলেছিল একজন কবিও। ‘খনার বচন’-কে কেউ কেউ আবার ভবিষ্যদ্ববাণী বলতেও ভালোবাসেন, কারণ তার দ্বারা নির্ধারিত আবহাওয়ার পূর্বাভাসগুলো কৃষি ও রাষ্ট্রকার্যে অনেক সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। খনা তাই ছিলেন প্রাচীন ভারতের একজন আবহাওয়াবিদ- এ কথা বললেও ভুল হবে না।
শিল্পীর তুলিতে আকা সেই বিখ্যাত খনা।
খনার কর্ম যতটা নিশ্চিত, ততটা নিশ্চিত নয় তার জীবন ও জন্ম। এ নিয়ে চালু রয়েছে কিছু মতভেদ। বাংলা ও উড়িয়া ভাষায় এই মতভেদের আলোকে কিছু গল্পও কালক্রমে তাই আবির্ভূত হয়েছে।

খনার জীবন নিয়ে প্রচলিত ধারণাঃ
তার আবির্ভাবকাল ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অনুমান করা হয়। তিনি এ সময়কার তথা মধ্যযুগের কবি ছিলেন (এখানে খনার বচনকে কবিতা হিসেবে ধরে খনাকে মধ্যযুগের কবি বলা হচ্ছে)। একটি ধারণা অনুযায়ী খনার বাসস্থান ছিল পশ্চিমবঙ্গের চবিবশ পরগনা জেলার বারাসাতের দেউলি গ্রামে এবং তার পিতার নাম অনাচার্য। এই ধারণা অনুযায়ী তিনি চন্দ্রকেতু রাজার আশ্রম চন্দ্রপুরেও বহুকাল বাস করেন।

বিক্রমাদিত্যের সভার দশম রত্নঃ
রাজা বিক্রমাদিত্য।
বরাহ ও মিহির রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাসদ ছিলেন। একবার জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি জটিল সমস্যা সমাধান করার জন্য দেওয়া হয় এই পিতা-পুত্রকে। কিন্তু তারা কোনোভাবেই কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না, আকাশের তারা গোণায় বারবার ভুল করছিলেন। এই গভীর সমস্যায় এগিয়ে আসেন খনা। তিনিই একটি আবহাওয়া পূর্বাভাস তৈরি করেন এবং এ থেকে কৃষকেরা অত্যন্ত লাভবান হন। খনার এই আচমকা সাফল্য চোখ কাড়ে রাজা বিক্রমাদিত্যের এবং এ ঘটনার পর থেকেই তিনি খনাকে তার সভার ‘দশম রত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

বাংলা ও উড়িয়া ভাষায় খনা নিয়ে প্রচলিত গল্পে মিল ও অমিলঃ
রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার নবরত্নের একজন ছিলেন বরাহ। তার পুত্র মিহিরের জন্মের পর গণনার মাধ্যমে জানলেন তার আয়ুষ্কাল মাত্র এক বছর। এরপর তিনি তাকে একটি তাম্রপাত্রে করে ভাসিয়ে দেন নদীর স্রোতে এই বিশ্বাসে যে নবজাতক শিশুটি হয়তো বেঁচে যাবে! খনা ছিলেন মতান্তরে সিদ্ধলরাজের কন্যা (বাংলা মতানুসারে) কিংবা লঙ্কাদ্বীপের রাজকুমারী (উড়িয়া মতানুসারে)। নদীর সেই স্রোতের সাথে মিহির গিয়ে পৌঁছালো খনার পিতার কাছে। তিনি খনা ও মিহিরকে একত্রে লালন-পালন করতে লাগলেন। তারা একই সাথে জ্যোতিষশাস্ত্রে সিদ্ধিলাভ করলেন।

সতীর্থ বন্ধু হয়ে তারা একসময় বিবাহবন্ধনেও আবদ্ধ হলেন। একদিন নক্ষত্রগণনার মাধ্যমে খনা জানতে পারলেন যে বরাহ-ই হচ্ছেন মিহিরের পিতা এবং এ কথা জানার অব্যবহিত পরেই তারা দেখা করতে চাইলেন বরাহের সাথে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে। একজন অনুচরের সহায়তার ভারতবর্ষে যাত্রা করেন। উজ্জয়নীতে এসে খনা ও মিহির বরাহের নিকট আত্মপরিচয় দান করেন। কিন্তু প্রথমে বরাহ কিছুতেই মেনে নিতে চাইলেন না যে মিহির তারই পুত্র, কারণ এখনো তার মনে গেঁথে রয়েছে ভুল গণনার সেই ভবিষ্যদ্বাণীটি! খনা বরাহের ভুল শুধরালেন সঠিক গণনা দেখিয়ে এবং এতে ফলাফল বের হলো যে মিহিরের আয়ুষ্কাল ১০০ বছর! সেই প্রথম সাক্ষাৎকালে খনা বরাহকে যা বলেছিলেন তা ছিল-
“কীসের তিথি কীসের বার, জন্ম নক্ষত্র কর সার/
কী করো শ্বশুর মতিহীন? পলকে আয়ু বারো দিন!”
খনার শ্বশুর বরাহ।
খনার প্রজ্ঞা ও মেধা ক্রমেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকে এবং অনেকেই খনার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার দশম রত্ন হবার পর তো যেন স্বয়ং বরাহই যেন খনার শত্রু হয়ে উঠলেন! বরাহ নিজের প্রতিপত্তি হারাবার ভয়ে এবং খনার খ্যাতি আর বাড়তে না দেওয়ার উদ্দেশ্যে এক নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি খনার বচন উৎপন্ন হবার যে স্থান সেটাই শেষ করে দিলেন। তিনি খনার জিহ্বা কেটে নিতে বললেন মিহিরকে! আর পিতৃভক্ত মিহিরও তাই করলেন! এই ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই অনবরত রক্তপাতের ফলে খনার মৃত্যু হয়। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে লেখা হয় এক করুণ জীবনাবসান আর নিষ্ঠুরতার কাহিনী।
খনার দেওয়া উপদেশগুলোই খনার বচন।
উড়িয়া ধারণা অনুযায়ী খনার আসল নাম ছিল লীলাবতী এবং তার জিহ্বাকর্তনের ফলে তিনি বোবা হয়ে যান এবং ‘খনা’ নামের আরেক অর্থ বোবা। উড়িয়া ভাষার গল্পে এটাও বলা হয় যে জিহ্বা কেটে নেওয়ার আগে নাকি মিহির খনাকে কিছু কথা বলবার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পিতার এই নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তে সব মিলিয়ে মিহির কোন স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সে কথা কোনোখানেই বলা হয়নি। খনার জন্য আদৌ মিহিরের মনে কোনো প্রেম বা সহমর্মিতা ছিল কিনা তারও উল্লেখ নেই এই গল্পগুলোতে।

খনার মৃত্যু নিয়ে একটি ছোট মিথ চালু আছে- খনার সেই জিহ্বাটি নাকি তখনই খেয়ে ফেলেছিল এক টিকটিকি এবং তখন থেকেই ঠিক কোনো কথা শুনলে দেয়ালে থাকা যেকোনো টিকটিকিই বলে ওঠে- “ঠিক ঠিক!” এই মিথ এটিই নির্দেশ করে যে জিহ্বা কেটে ফেলার পরও, ভারতের মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন হবার পরও ঠিক-ভুলের জ্ঞান খনা রেখে গেছেন এর আবহাওয়ায়।

অর্থবহ খনার বচনঃ
খনার একটি বচন।
“থাকতে বলদ না করে চাষ/ তার দুঃখ বারোমাস”
এরকম ছন্দবদ্ধরীতিতে যে শুভাশুভ, বিধিবিধান, নীতি ও উপদেশবাচক প্রতিপাল্য প্রাজ্ঞোক্তি খনা করে গিয়েছেন তা-ই হচ্ছে ‘খনার বচন’। বাংলা, ওড়িয়া ও অসমিয়া ভাষায় খনার বচনের খ্যাতি দেখা যায়। খনার বেশিরভাগ বচনই এমন কৃষিকাজ সংক্রান্ত দিককে নির্দেশ করে থাকে। আধুনিকায়নের এই যুগে এসেও কৃষির বহু ক্ষেত্রে খনার বচন এখনও অচল হয়নি, তার আবেদন এখনও রয়েছে অমলিনই। খনার বচনে আবহাওয়া, জ্যোতিষ, ঋতুভেদে শস্যের ক্ষয়ক্ষতি ও ফলন সম্পর্কে যে ধারণা দেওয়া হয়েছে, তার অনেকগুলিই বৈজ্ঞানিক সত্যের খুব কাছাকাছি। আবহমান কাল ধরে বাংলার কৃষিক্ষেত্র ও কৃষকদের এক প্রকৃত দিকনির্দেশক হয়ে খনা পথ দেখিয়ে যাচ্ছেন তার কালজয়ী বচনের মধ্য দিয়ে। খনার বচনে বেশ কিছু দুর্বোধ্য গাণিতিক পরিভাষাও পাওয়া গিয়েছে যার অর্থোদ্ধার সম্ভব হয়নি।

খনা ব্যবহারিকভাবে উপদেশ দিয়ে গিয়েছেন কিছুটা এমনভাবে-
“মঙ্গলে উষা বুধে পা/ যথা ইচ্ছা তথা যা”

কোন মাটিতে কোন ফসল ভালো ফলবে-
“শুনরে বাপু চাষার বেটা, মাটির মধ্যে বেলে যেটা/ তাতে যদি বুনিস পটল, তাতে তোর আশার সফল”

অথবা কোন ঋতুতে কোন বীজ বপন করতে হবে-
“আখ আদা রুই, এই তিন চৈতে রুই”

তার উপায় খুব সহজেই মেলে খনার বচনে।
শীতকালের বৃষ্টির প্রতি খনা বন্দনা গেয়েছেন-
“যদি বর্ষে মাঘের শেষ/ ধন্যি রাজা পুণ্যি দেশ”

যদিওবা কৃষিকাজেই খনার বচনের পরিসর বেশি বিস্তৃত, তবু জীবনের অন্যান্য অংশ নিয়েও কম বচন রেখে যাননি এই অনন্য পর্যবেক্ষক। এই কথাটি তো আমরা সবাই প্রতিনিয়ত ব্যবহার করি কিন্তু হয়তো জানি না যে এটি খনার বচন। দেখুন তো চিনতে পারেন কিনা?
“সূর্যের চেয়ে বালি গরম! নদীর চেয়ে প্যাক ঠান্ডা!”
অথবা
“সমানে সমানে কুস্তি, সমানে সমানে দোস্তি”

কর্মফল নিয়ে তিনি যেন আজ এইখানে দাঁড়িয়েই উপদেশ দিচ্ছেন-
“যা-ই করিবে বান্দা তা-ই পাইবে/ সুঁই চুরি করিলে কুড়াল হারাইবে”

কি সহজ অথচ জীবনবোধে টইটুম্বুর খনার বচন, যেন ছন্দে ছন্দে গাঁথা জীবনের মানে! বাঙালি লোকসাহিত্যের একটি অন্যত্ম উপাদান হচ্ছে খনার বচন। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে রচনা করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর আবেদন আটকে থাকেনি শুধু সেই সময়টিতেই! আজও খনার বচন পড়লে আপনি আনমনে বলে উঠবেন- “ঠিকই তো!” আর সেই মিথ মেনে চলা টিকটিকিটিও খনার বচন শুনে আজ একবার বলে উঠতেই পারে- “ঠিক ঠিক!”
খনার বচন নিয়ে একটি বই।
"ষোল চাষে মূলা, তার অর্ধেক তুলা।
তার অর্ধেক ধান, বিনা চাষে পান।"

Sunday, June 25, 2017

দেশে দেশে ঈদ পালনের যত রীতিনীতি...

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। এই আনন্দ আর খুশি উদযাপনের ব্যাপারটা যেন একেবারেই নিজের পছন্দমতো হতে হয়। কেউ এক কাপ চা পেয়ে খুশি, তো কেউ খুশি গাড়ি-বাড়ি পেয়ে। কেউ খুশিতে কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে যায়, তো কেউ আবেগের আতিশায্যে একদম চুপ করে বসে থাকে। যে যেভাবেই আবেগ প্রকাশ করুক না কেন, খুশির ছটা লেগে থাকে সবার চোখে-মুখে। এই অনুভূতি কখনোই চেপে রাখা যায় না। আর খুশির উৎস যদি হয় ঈদের মতো কোনো মহিমান্বিত উৎসব, তবে আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের যেন কোনো কমতি থাকে না।

মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পরে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলো পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। পৃথিবীর সব মুসলিম কিংবা অমুসলিম দেশেও বেশ ঘটা করে পালন করা হয় ঈদের এ খুশির দিনটি। তবে যেকোনো উৎসবের সাথেই মিশে থাকে প্রতিটি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান। ঈদও তার ব্যতিক্রম নয়। সেমাই ছাড়া যেমন বাঙালির ঈদ জমেই না, ঠিক তেমনি সোমালিয়াতে হালভো ছাড়া ঈদের আমেজই যেন আসে না। চলুন তবে দেখে আসা যাক বিশ্ব মানচিত্রের কোথায় কিভাবে ঈদ উদযাপন করা হয়।


দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াঃ
দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে- বিশেষত ব্রুনেই, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে পালন করা হয় ঈদের দিনটি। মূলত যেকোনো অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ হলো মজাদার সব খাবার। কোন দেশের খাবারের মেন্যু কি তা জেনেই অনেক সময় সেখানকার উৎসব পালনের ঘটা টের পাওয়া যায়। আর এদিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বেশ খানিকটা এগিয়ে আছে। এখানকার খাবারের মেন্যুতে মাংসের উপস্থিতি বেশ লক্ষ্যণীয়। কয়েক ধরণের মাংসের তরকারি, ডামপ্লিং, কেটুপাত বা ডোডোল জাতীয় মিষ্টান্ন, বাঁশে রান্না করা ভাত লেমাং- এই সবকিছুর মধ্যেই মিশে আছে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর ঈদ।



মিশরঃ
ঈদ উদযাপনে মিশর যেন অন্যদের চেয়ে এক কাঠি উপরে রয়েছে। এখানে ঈদ পালন করা হয় টানা চার দিন ব্যাপী। আর এই পুরো সময়টা জুড়ে উৎসবের প্রাণ হয়ে থাকে মজাদার সব মাছের আয়োজন।
মিশরীয়দের ঈদ প্রস্তুতি।
পিরামিডের শহর মিশরের অন্যতম একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হলো ফাতা যা ভাত, মাংস, পেঁয়াজ, ভিনেগার সবকিছুর মিশ্রণে রান্না করা হয়। ফাতার পাশাপাশি কাহক নামের আরেকটি দারুণ জনপ্রিয় কুকি বা বিস্কুট ছাড়াও মিশরীয়দের ঈদ একেবারেই জমে না।


ইরাকঃ
রমজান এবং ঈদের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি উৎসবে ইরাকিরা বেশি গুরুত্ব দেয় খেজুরের উপর। ক্লাইচা নামের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার ইরাকে খুব প্রচলিত যা না থাকলে ইরাকিদের যেকোনো অনুষ্ঠান অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। ক্লাইচা মূলত এক ধরণের কুকি যা বাদাম, খেজুর এবং গুলকন্দ দিয়ে বানানো হয়। যেহেতু এতে খেজুর রয়েছে, ঈদ-উল-ফিতরে ইরাকিদের কাছে এর মহিমা কতোটা বেশি হতে পারে তা বলাই বাহুল্য।



আফগানিস্তানঃ
আপনি জানেন কি, আফগানিস্তানে ঈদ উৎসব পালনের জন্য ডিম যুদ্ধের আয়োজন করা হয়? পুরুষদের জন্য খোলা কোনো ময়দানে তখম-জাঙ্গির আয়োজন করা হয় যেখানে তারা পরস্পরের দিকে সেদ্ধ করা ডিম ছুড়ে মারে।
আফগানিস্তানে ডিম যুদ্ধের প্রস্তুতি।
সিএনএনের খবর অনুযায়ী, আফগানিস্তানে যখন তালেবানরা ব্যাপক আক্রমণ শুরু করেছিল, তখনো আফগানিরা ঈদের দিন ঠিকই ডিম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নিজেদের ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।


বার্মা বা মায়ানমারঃ
যেমনটা বলছিলাম, উৎসবের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় দারুণ স্বাদের মজাদার সব খাবার দাবার। বার্মিজদের মধ্যে সুজি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ডেজার্টের চাহিদা ব্যাপক। ঈদের দিন তাই বার্মার প্রতি ঘরে ঘরে অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়ায় দুটি পদ। একটি তো অবশ্যই সুজির ডেজার্ট, অপরটি হলো বার্মার বিশেষ বিরিয়ানি যা ঈদ উপলক্ষে মাংসের সাথে বাদাম মিশিয়ে অন্যরকম করে রান্না করা হয়।



তুরস্কঃ
‘সেকের বায়রামি’, আমরা যাকে ঈদ বলি তুর্কিরা তাকে এই নামেই চেনে। দিনটিকে তারা উৎসর্গ করে বহুবিধ ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্নর নামে। বাচ্চারা প্রতিবেশি, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বেড়াতে যায় আর ভালোবাসা ও আশীর্বাদের নিদর্শন স্বরুপ তাদের পাতে তুলে দেয়া হয় টার্কিশ ডিলাইট এবং বাকলাভার মতো মজাদার সব খাবার।



ইন্দোনেশিয়াঃ
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো করেই ইন্দোনেশিয়ায় ঈদ উদযাপন করা হয়। এখানকার অধিবাসীরা বেশ জমজমাট আয়োজন করে ‘কুয়ে লাপিস লেগিত’ নামের একটি মিষ্টি জাতীয় খাবার তৈরি করে। এই খাবারটি হাজার লেয়ারের কেক নামে বেশি পরিচিত।
ইন্দোনেশিয়ার মসজিদ।
ধারণা করা হয়, ডাচদের কাছ থেকে এই রেসিপিটি ইন্দোনেশিয়ায় জনপ্রিয় হয়েছে। মাখন, মসলা ও ময়দার সমন্বয়ে তৈরি এই ডেজার্টটি ইন্দোনেশীয়দের ঈদের আনন্দ বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুণে।


সৌদি আরবঃ
শতভাগ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ সৌদি আরবে খুব আন্তরিক উপায়ে ঈদ-উল-ফিতর পালন করা হয়। বাড়ির সামনে কম্বল বিছিয়ে বসে সবাই তাদের রান্না করা খাবার প্রতিবেশি কিংবা পথচারীদের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়। শিশুদের বিনোদনের জন্য শহর জুড়ে আতশবাজির খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। খুব একটা খরচাপাতি না করেও যে একটি উৎসব সবার মন ছুঁয়ে যেতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ মেলে সৌদি আরবে।



সোমালিয়াঃ
সোমালিয়ানদের কাছে ঈদ মানেই লোভনীয় সব মনোহর খাবারের আয়োজন। শুরুতেই বলছিলাম সোমালিয়ার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি হালভোর কথা। হালভো বানানো হয় তেল, চিনি, কর্নস্টার্চ এবং হরেক রকমের মসলা মিশিয়ে। সোমালিয়ানরা ঈদের অনুষ্ঠানে আর যা-ই হোক হালভো বানাতে কখনো ভুল করে না।



আজারবাইজানঃ
মুসলিম অধ্যুষিত দেশ আজারবাইজানে মাহে রমজান এবং রমজান পরবর্তী ঈদ-উল-ফিতর খুবই সম্মান এবং শ্রদ্ধার সাথে পালিত হয়। পরিবারগুলো পরস্পর মিষ্টি এবং অন্যান্য উপহার সামগ্রী বিনিময় করে। এই দিনে সবাই কোলাকুলি করে ঈদের খুশি ভাগ করে নেয়।
আজারবাইজানে ঈদ উৎসব।
ঈদের নামাজের পর পরিবারের মৃত সদস্যদের কবর যিয়ারত করে তাদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে তারা। আজারবাইজানের দুই দিন ব্যাপী আয়োজিত ঈদ উৎসবের প্রায় পুরোটাকেই ঘিরে থাকে সেখানকার মসজিদগুলো।


সংযুক্ত আরব আমিরাতঃ
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ঈদ মানে হাজারো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চমৎকার সব নাটক বা শো এবং অভাবনীয় অফারের ছড়াছড়ি। রণ-পা, নৃত্যশিল্পী, ভাঁড়, জাদুকর, বেলুনওয়ালা দিয়ে ভরে যায় এখানকার রাস্তাগুলো। লোকে লোকারণ্য থিম পার্ক আর সার্কাস দেখে বোঝা যায় জাঁকজমকপূর্ণ ঈদ আয়োজন কাকে বলে! সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিটি রাস্তা তার সৌন্দর্যের পসরা খুলে বসে পরিবারে প্রতিটি সদস্যের জন্য।



চীনঃ
ঈদ উপলক্ষে চীনের মুসলিম এবং অমুসলিম উভয়ের জন্যই ২-৩ দিনের সরকারি ছুটির ব্যবস্থা করা হয়। সকালবেলা ঈদের নামাজ শেষে চাইনিজ মুসলিমরা পূর্বপুরুষদের স্মৃতি রোমন্থন করে দরিদ্রদের মধ্যে খাবার বিলি করে।
চায়নায় ঈদ উদযাপন।
তাছাড়া সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় নিহতদের জন্য বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থাও করা হয় এই দিনটিতে।


মালয়েশিয়াঃ
রাজনীতিবিদ, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন এবং পরিবারবর্গ- ঈদের দিন সবাই ঘরের দুয়ার খুলে অভ্যর্থনা জানায় মালয়েশিয়ার প্রতিটি মানুষকে। নামাজ শেষে কেটুপাত, লেমাং, রেন্ডাঙ্গের মতো মিষ্টান্ন খেয়ে ঘরের সামনে পেলিতা নামক মোম জ্বালিয়ে ঈদের শোভা বাড়িয়ে তোলে মালয়েশিয়ানরা। আতশবাজির মনোমুগ্ধকর খেলার সাথে প্রায় ২-৩ দিন ধরে ঈদ আয়োজন চলতে থাকে মালয়েশিয়ায়।



মরিশাসঃ
মরিশাসে ঈদ উদযাপিত হয় একেবারে সাদামাটাভাবে। দিনটির প্রধান আকর্ষণ থাকে বিরিয়ানি। নামাজ শেষে পরস্পর ‘ঈদ মোবারক’ বলে কোলাকুলি করে বাটিভর্তি বিরিয়ানি বিনিময় করে মরিশাসের মুসলিমরা । বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবাই একসাথে বসে দুপুরের খাবার খায়। একদিনের সরকারি ছুটিতে ঈদ উপলক্ষ্যে পারিবারিক বন্ধনের দৃঢ়তা বেড়ে যায় বহুগুণে।



যুক্তরাষ্ট্র/কানাডাঃ
এখানে ঈদের নামাজ আদায় করা হয় ইসলামি কেন্দ্র, খোলা মাঠ বা কনভেনশন হল অথবা মসজিদে। বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ মুসলিম তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী পোশাক পরিধান করে ঈদগাহে একত্রিত হয়। বাচ্চাদের মধ্যে উপহার বিতরণ করা হয় এবং শুধুমাত্র এই দিনটিকে মাথায় রেখে বেশ কিছু দারুণ স্পাইসি খাবার রান্না করা হয়। মুসলিমরা স্থানীয় দরিদ্র লোকজনদের মাঝে খাবার বা অর্থ বিলি করে ঈদের খুশিতে তাদেরও সামিল করে নেয়।



ভারতঃ
দূর-দূরান্ত ঘুরে এবার তাকানো যাক ঘরের পাশে, মানে আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতের দিকে। আমাদের মতোই ঈদের আগের রাতকে তারাও ‘চাঁদ রাত’ হিসেবে পালন করে। মেয়েরা দুই হাত ভরে মেহেদি লাগিয়ে বরণ করে নেয় ঈদের চাঁদকে। ঈদের নামাজের পর সালামি নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যায় বাচ্চাদের মধ্যে।
ভারতীয়দের ঈদ উদযাপন।
ভারতীয়দের কাছে ঈদ মানে যেন সেভিয়া খাওয়ার বাহানা। এই মিষ্টিটি ছাড়াও নানা পদের কাবাব, নেহারি, হালিম সহ হরেক রকমের মুখরোচক খাবারে সরগরম হয়ে থাকে ভারতের প্রতিটি ঘর। আরেকটি কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। নতুন সিনেমা মুক্তি না পেলে ভারতীয়দের কাছে ঈদই যেন পানসে মনে হয়। তাই তো প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকার বলিউড সিনেমা নির্মিত হয় শুধুমাত্র ঈদকে সামনে রেখে।


যে দেশে ঈদ যেভাবেই পালিত হোক না কেন, ঈদের খুশির কিন্তু তাতে মোটেই কমবেশি হয় না। সবাইকে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের শুভেচ্ছা

Sunday, April 17, 2016

প্রাচীন মিশরের দেব-দেবীদের ইতিকথা!

প্রাচীন পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের জানার আগ্রহের কোনো কমতি নেই। তারা কী করতো, কীভাবে চলাফেরা করতো, তাদের খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিলো, নানা রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি কেমন ছিলো ইত্যাদি নানান বিষয় প্রায় সময়ই আমাদের মাথায় ঘোরাফেরা করে।
পাথরের দেয়ালে খোদাইকৃত প্রাচীন মিশরের বিভিন্ন দেব দেবীর প্রতিকৃতি।
ইতোপূর্বে এ সম্পর্কিত লেখা বিভিন্ন লেখার ধারাবাহিকতায় আজ আমরা পরিচিত হবো প্রাচীন মিশরের নানা দেব-দেবী সম্পর্কে। আদি যুগের মানুষেরা কোন রূপে তাদের কল্পনা করতো, কোন কাজে কোন দেব-দেবীর আরাধনা করতো, আর সেই সাথে কেমনই বা ছিলো সেই দেব-দেবীর নিজেদের গল্প সেই বিষয়গুলোই তুলে ধরা হয়েছে আজকের পুরো লেখা জুড়ে।


ন্যুটঃ

ন্যুট ছিলেন আকাশ ও তারাদের দেবী। তার বিশাল দেহ ভূ-পৃষ্ঠের উপরে একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে মানবজাতিকে রক্ষা করে বলে বিশ্বাস করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। প্রতিদিন রাতে তিনি সৌর দেবতা রা-কে খেয়ে ফেলতেন এবং প্রতিদিন সকালে তাকে আবার নতুন করে তিনি জন্ম দিতেন!

শুঃ

শু ছিলেন শুষ্ক বাতাসের দেবতা। তাকে সাধারণত মাথায় পালক শোভিত একটি মুকুটসহ দেখা যায়। তার কাজ ছিলো মূলত ন্যুটের দেহকে উপরে তুলে রেখে আকাশ ও মাটিকে পৃথক রাখা!

ন্যুট, শু ও গেব।

গেবঃ

গেব ছিলেন পৃথিবীর দেবতা। তিনি ছিলেন একইসাথে আকাশের দেবী ন্যুটের ভাই ও স্বামী। প্রাচীনকালে মিশরীয়রা মনে করতো যে, পৃথিবীতে যতো ভূমিকম্প হয়, সেগুলো আসলে গেবের হাসির কারণে হয়ে থাকে!

আমুনঃ

আমুন
এককালে মিশরীয়দের কাছে বেশ ক্ষমতাশালী দেবতা বলে পরিচিত ছিলেন আমুন। এমনকি মিশরের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, এককালে তাকে ‘দেবতাদের রাজা’ বলেও মনে করা হতো। কখনো কখনো সূর্য দেবতা রা’র সাথে মিলিত হয়ে তিনি ‘আমুন-রা’ নাম ধারণ করতেন।

আনুবিসঃ

আনুবিস
মানুষের মতো দেহ ও শেয়ালের মতো মাথাবিশিষ্ট আনুবিসকে ভাবা হতো মৃত্যুর দেবতা। প্রাচীন মিশরে প্রায়ই শেয়ালদের দেখা যেত কবরস্থান থেকে মৃতদেহ তুলে খাচ্ছে। এখান থেকেই আনুবিসের শেয়ালের মতো মাথার ধারণাটি এসেছে বলে ধারণা করা হয়। প্রাচীন মিশরীয় রাজাদের দেহ মমিকরণের সাথে যুক্ত পুরোহিতরাও আনুবিসের অনুকরণে মুখোশ পরতেন।

বাস্টেটঃ

বাস্টেট
বাস্ট, বাস্টেট, উবাস্টি ও পাস্খ নামে পরিচিত ছিলেন এ দেবী। তাকে বিভিন্ন জিনিসের সংরক্ষক মনে করা হতো দেখে তার রুপও ছিলো বিভিন্ন। প্রথমদিকে বাস্টেটকে ভাবা হতো মিশরের নিচু এলাকাগুলোর রক্ষাকর্ত্রী দেবী। এজন্য তখন তাকে সিংহীর রুপে দেখা যেত। পরবর্তীতে তাকে নিরাপত্তা ও আশীর্বাদের দেবী এবং নারী-শিশু- বিড়ালের রক্ষাকর্ত্রী মনে করা হতো। সেই সাথে সূর্যোদয়, সঙ্গীত, নৃত্য, আনন্দ, পরিবার, উর্বরতা ও জন্মের দেবীও ধরা হতো তাকে। কখনো কখনো বাস্টেটকে বিড়াল রুপেও দেখা গিয়েছে।

বেসঃ

বেস
গর্ভবতী নারী, সদ্য জন্ম নেয়া শিশু ও পরিবারের রক্ষক হিসেবে দেখা হতো কিম্ভূতকিমাকার বামন এ দেবতাকে। তিনি গায়ে সিংহের চামড়া জড়িয়ে রাখতেন। কোনো শিশুর জন্মের সময় তিনি সারা রুমে ঝুমঝুমি বাজিয়ে নেচে নেচে অশুভ আত্মাকে দূরে রাখতেন বলে বিশ্বাস করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। আর যখন কোনো বাচ্চাকে কোনো কারণ ছাড়াই হাসতে দেখা যেতো, তখন তারা ভাবতো যে রুমের কোথাও বসে বেস হয়তো বাচ্চাটিকে ভেংচি কাটছে!

হাপিঃ

হাপি
নীলনদের সৃষ্ট বার্ষিক প্লাবনের দেবতা হিসেবে দেখা হতো হাপিকে। বিশালাকার পেট ও স্তনবিশিষ্ট এ দেবতার মাথায় থাকতো বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ।

হাথরঃ

হাথর
সৌরদেবতা রা’র কন্যা হাথরকে দেখা হতো নারী, সৌন্দর্য, ভালোবাসা, আনন্দ ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক দেবী হিসেবে। গরু, নারীদেহ কিন্তু কানটি গরুর কিংবা নারীদেহ কিন্তু গরুর শিং মাথায় জড়িয়ে রাখা- এ তিন রুপেই দেখা যেত হাথরকে।

হোরাসঃ

হোরাস
ওসাইরিস ও আইসিসের পুত্র হোরাসকে দেখা যেত বাজপাখি কিংবা মানুষের দেহ ও বাজপাখির মাথার সংমিশ্রিত এক রুপে। হোরাসকে আকাশের দেবতা ভাবতো প্রাচীন মিশরীয়রা।

আইসিসঃ
আইসিস
প্রাচীন মিশরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক দেবী ছিলেন আইসিস। তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাদুকর মনে করতো মিশরীয়রা। তাই জাদুর দেবী হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন সর্বত্র। জীবন দানকারী, আরোগ্য প্রদানকারী এবং রাজাদের প্রতিরক্ষক হিসেবে দেখা হতো আইসিসকে। কখনো নিজের মাথায় একটি সিংহাসন নিয়ে, আবার কখনো পুত্র হোরাসকে স্তন্যদানরত অবস্থায় দেখা যেতো আইসিসকে।

খেপ্রেঃ

খেপ্রে
খেপ্রে, খেপ্রি, খেপ্রা, খেপেরা ইত্যাদি নানা নামে পরিচিত এ দেবতাকে মিশরীয়রা গুবরে পোকাদের দেবতা বলে ভাবতো। গুবরে পোকাদের বিভিন্ন প্রাণীর মল গড়িয়ে নিয়ে যেতে দেখে প্রাচীন মিশরীয়রা ভাবতো যে, খেপ্রে হয়তো সূর্যকে তার কক্ষপথে স্থাপন করে এসেছেন!

খ্নুমঃ

খ্নুম
ভেড়ার মাথাওয়ালা খ্নুম বা খ্নেমু নামে পরিচিত এ দেবতাকে মিশরীয়রা নীল নদের উৎসের দেবতার মর্যাদা দিয়েছিলো। একই সাথে তাকে জলপ্রপাত, উর্বরতা ও সৃষ্টির দেবতা ভাবা হতো। তার কাছে থাকা কুমোরের চাকাতেই তিনি নীলনদের তীরের মাটি থেকে প্রথম মানুষ তৈরি করেছিলেন বলে এককালে বিশ্বাস করতো মিশরীয়রা।

খোন্সুঃ

খোন্সু
আমুন ও মুতের ছেলে খোন্সুকে খোন্স, খেন্সু, খুন্স ইত্যাদি বিভিন্ন নামেও ডাকা হতো। প্রাচীন মিশরে তাকে চাঁদ, চাঁদের আলো ও সময়ের দেবতা হিসেবে গণ্য করা হতো।

মা’আতঃ

মা’আত
আইন-কানুন, নীতি-নৈতিকতা ও বিচার ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির দেবী হিসেবে ভাবা হতো মা’আতকে। উটপাখির পালক মাথায় জড়ানো অবস্থাতেই তাকে চিত্রায়িত হতে দেখা গেছে।

ম্যুটঃ

ম্যুট
সৌরদেবতা রা’র কন্যা ম্যুটকে শকুনদের দেবী হিসেবে কল্পনা করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। দীর্ঘাকায় এ দেবীর পরনে থাকতো উজ্জ্বল রঙয়ের পোষাক, মুকুটে শোভা পেত শকুন।

নেফিথিসঃ

নেফিথিস
অনেক ক্ষমতার অধিকারী দেবীকে নেফিথিসকে প্রাচীন মিশরীয়রা ‘চমৎকার দেবী’ বলেও সম্বোধন করতো। তবে সময়ে সময়ে চমৎকার এ দেবী ভয়ংকরও হয়ে উঠতে পারতেন। রাজার শত্রুদেরকে তিনি তার নিঃশ্বাস দিয়ে শেষ করে দিতে পারেন বলে বিশ্বাস করতো মিশরীয়রা। তাই তাকে রাজাদের প্রতিরক্ষক বলা হতো। মৃত্যু, ক্ষয় ও অন্ধকারের এ দেবীর জাদুবিদ্যায় ছিলো অসাধারণ পারদর্শীতা ও অদ্ভুত আরোগ্য প্রদানের ক্ষমতা।

ওসাইরিসঃ
ওসাইরিস
প্রাচীন মিশরের দেবতাদের মাঝে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান দখল করে আছেন ওসাইরিস। মিশরের প্রথম রাজা হিসেবে চিত্রায়িত এ দেবতাকে তারা ভাবতো শস্যের দেবতা হিসেবে। ফারাওয়ের ক্ষমতা দখলের লড়াই নিয়ে নিজ ভাই সেথের কাছে খুন হন ওসাইরিস। পরে অবশ্য ওসাইরিসের ছেলে হোরাস সেথকে পরাজিত করে ফারাও হয়েছিলেন। মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো যে, স্ত্রী আইসিস তাকে পুনরায় জীবিত করেছিলেন। এরপর তিনি পাতালপুরিতে চলে যান শাসক হিসেবে এবং মৃতদের বিচার করতে!

প্তাহঃ

প্তাহ
প্তাহকে স্থাপত্যশিল্পের দেবতা হিসেবে কল্পনা করতো মিশরীয়রা। তারা ভাবতো যে, নিজের কল্পনা ও মুখ নিঃসৃত শব্দের সাহায্যেই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন প্তাহ! মমিবেশী এ দেবতার হাত দুটো বের হয়ে থাকতো ব্যান্ডেজের ভেতর থেকে। সেই হাত দিয়ে ধরা থাকতো একটি লাঠি।

রাঃ

রা, রে ইত্যাদি নানা নামে পরিচিত এ দেবতা ছিলেন মিশরীয় মিথলজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক দেবতা। মূলত সৌরদেবতা থাকলেও তার ক্ষমতা ছিলো অনেক। মানুষের মতো দেহ ও বাজপাখির মতো মাথাধারী রা’র মাথায় থাকতো সৌর চাকতি।

রা
প্রতিদিন সকালে পূর্বদিকে তার জন্ম হতো ও রাতে পশ্চিমে ঘটতো মৃত্যু। দিনের বেলায় সৌর নৌকায় চড়ে তিনি ঘুরে বেড়াতেন পুরো আকাশ জুড়ে। আর রাতের বেলায় পাতালপুরিতে গিয়ে শায়েস্তা করে আসতেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের। অন্যান্য দেবতাদের উপর তার ক্ষমতা এততাই বিস্তৃত ছিলো যে, তিনি মাঝে মাঝেই তাদের ক্ষমতা আত্মীকরণ করতে পারতেন। এভাবেই আমুন-রা (আমুন ও রা), মন্টু-রা (মন্টু ও রা), রা-হোরাখ্তি (রা ও হোরাস) নামগুলো এসেছিলো রা’র জন্য।

সবেকঃ

সবেক
কুমিরের মতো মাথা ও বাকিটুকু মানবদেহের অধিকারী সবেককে কুমিরদের দেবতা মনে করা হতো এককালে।

সেথঃ

সেথ
গেব ও ন্যুটের ছেলে সেথকে সেত, সেতেখ, সুতি ও সুতেখ নামেও ডাকতো প্রাচীন মিশরীয়রা। মরুভূমি, বজ্রপাত ও অকল্যাণের দেবতা হিসেবে ভাবা হতো সেথকে। তার মাথায় থাকা পশুটি আসলে কী সে সম্পর্কে জানা যায় নি। কখনো কখনো আবার জলহস্তী, শূকর কিংবা গাধার রুপেও দেখানো হয়েছে সেথকে।

টেফনাটঃ

টেফনাট
সিংহীর মাথা ও মানুষের শরীরধারী টেফনাট ছিলেন শু-এর স্ত্রী। তাকে পানি ও উর্বরতার দেবী হিসেবে ভাবা হতো।

ঠথঃ

ঠথ
লেখালেখি কিংবা গণনায় ব্যস্ত হিসেবে চিত্রায়িত ঠথ ছিলেন জ্ঞানের দেবতা। মানবদেহ ও আইবিস পাখির মাথাবিশিষ্ট ঠথের হাতে লেখালেখির জন্য সবসময় কলম ও বোর্ড থাকতোই!

ওয়াজ-ওয়েরঃ

আংশিক পুরুষ ও আংশিক নারী হিসেবে চিত্রায়িত এ দেবতাকে উর্বরতার দেবতা বলে ভাবতো মিশরীয়রা। কখনো কখনো তাকে গর্ভবতী হিসেবেও দেখানো হয়েছে!

তাওয়ারেতঃ

তাওয়ারেত
দেবী তাওয়ারেত ছিলেন জলহস্তীর মতো দেখতে। যেহেতু মা জলহস্তী তার বাচ্চাদের রক্ষা করতে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে (এটা তো দুনিয়ার যেকোনো মা-ই করবে!), তাই গর্ভবতী মায়েরা নিজেদের গর্ভের সন্তানকে রক্ষার জন্য তাওয়ারেতের মন্ত্রপূত কবচ পরতেন।

ওয়াজেতঃ

গোখরা সাপের মতো করে চিত্রায়িৎ এ দেবীকে মিশরের নিচু অঞ্চলের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বলে এককালে মনে করতো মিশরের অধিবাসীরা।

সপদুঃ

তিনি ছিলেন একজন যুদ্ধের দেবতা।

সেশাতঃ
সেশাত
কখনো ঠথের কন্যা আবার কখনো ঠথের স্ত্রী হিসেবে দেখানো হতো দেবী সেশাতকে! তাকে লেখালেখি, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও স্থাপত্যবিদ্যার দেবী মনে করা হতো।

ক্বেতেশঃ
ক্বেতেশ
সিরিয়া থেকে মিশরীয় মিথলজিতে ঢুকে পড়া দেবী ক্বেতেশকে দেখা হতো উর্বরতার প্রতীক হিসেবে।

সার্কেতঃ

সার্কেত
সার্কেতকে এককালে মিশরের অধিবাসীরা ভাবতো বিচ্ছুদের দেবী হিসেবে। তিনি যেমন খারাপ লোকদের গায়ে বিচ্ছুর হুল ফুটিয়ে দিতেন, তেমনি ভালো লোকেরা বিচ্ছু বা সাপের বিষে আক্রান্ত হলে তাদের রক্ষার ব্যবস্থাও করতেন!

রায়েত-তাওয়িঃ

তাকে বলা যেতে পারে সৌরদেবতা রা-এর সঙ্গিনী।

সেকারঃ

সেকারকে বলা হতো বাজপাখিদের দেবতা।

ক্বেবুইঃ

উত্তর দিক থেকে প্রবাহিত বাতাস নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা ছিলেন ক্বেবুই!

সেখমেতঃ

সেখমেত
আগুন ও যুদ্ধের দেবী বলে পরিচিত সেখমেতের মাথাটি ছিলো সিংহীর এবং দেহটি ছিলো একজন নারীর। তার নিঃশ্বাসের ফলেই মরুভূমি সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশ্বাস করতো মিশরের লোকজন!

পাখেতঃ

পাখেত নামে এ দেবীর মাঝে একই সাথে স্নেহ ও আক্রোশকে খুঁজে পেত মিশরের অধিবাসীরা। কারণ তিনি ছিলেন একইসাথে মায়ের মতো স্নেহময়ী ও যুদ্ধের মতো ধ্বংসাত্মক বিষয় দুটোর দেবী।

নেখবেতঃ


শকুনের মতো দেখতে এ দেবী ছিলেন মিশরের উঁচু এলাকা, শিশুর নিরাপদ জন্ম ও ফারাওদের রক্ষার কাজে নিয়োজিত।

মেন্হিতঃ

সিংহ ও যুদ্ধের দেবী ছিলেন মেন্হিত।

কুকঃ

নারী ও পুরুষ উভয়ের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কুককে দেখা হতো অন্ধকার জগতের সাথে সম্পৃক্ত এক সত্ত্বা হিসেবে। তাকে কেক, কেকু প্রভৃতি নামেও ডাকা হতো।

মাফদেতঃ
মাফদেত
মিশরীয় উপকথার একেবারে শুরুর দিকে খোঁজ মিলে মাফদেতের। বিড়াল বা বেজির ন্যায় চিত্রায়িত এ দেবী সাপ ও বিচ্ছুদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করবে বলে বিশ্বাস করতো মিশরীয়রা।

কেবেচেতঃ

দেবতা আনুবিসের কন্যা কেবেচেতকে প্রাচীন মিশরীয়রা ক্বেবেহেত, কেবহুত, কেবেহুত, ক্বেবেহুত ও কাবেচেত নামেও ডাকতো। তিনি ছিলেন সজীবতা ও বিশুদ্ধতার দেবী।

মাহেসঃ

সিংহের ন্যায় মস্তকধারী মাহেস ছিলেন প্তাহের ছেলে। তাকে যুদ্ধের দেবতা হিসেবে মান্য করতো লোকজন।

হেকেতঃ

ব্যাঙের আকৃতিধারী দেবী হেকেত ছিলেন জীবন ও উর্বরতার প্রতীক।

গেঞ্জেন ওয়েরঃ

রাজহাসের মতো দেখতে এ দেবতাকে আসলে কোন কাজ নিয়ন্ত্রণের ভার দিয়েছিলো তার অনুসারীরা তা জানা যায় নি! তবে প্রাচীন মিশরের বিভিন্ন চিত্রকর্মে প্রায়ই দেখা মেলে তার।

বাবিঃ

বাবা, বাবি প্রভৃতি নামে পরিচিত এ স্বত্ত্বা ছিলেন বেবুনদের দেবতা। বেবুনদের সাথে মানুষের চারিত্রিক কিছু বিষয়ের মিল দেখে তখন মানুষ ভাবতো যে, বেবুনেরা বুঝি তাদের মৃত পূর্বপুরুষ!

আপেপঃ
আপেপ
সাপের মতো দেখতে এ দেবতা আপেপ, আপেপি, অ্যাপোফিস ইত্যাদি নামে পরিচিত। তাকে অন্ধকার জগত ও বিশৃঙ্খলার সাথে সম্পৃক্ত বলে মনে করতো মিশরীয়রা।

আমুনেতঃ
আমুনেত
দেবতাদের রাজা হিসেবে খ্যাত আমুনের স্ত্রীর নাম ছিলো আমুনেত। অন্যান্য আরো দেবীর মতো তাকেও সৃষ্টির দেবী বলে বিশ্বাস করতো প্রাচীন মিশরীয়রা।

আন্হুরঃ
আনহুর
‘আন্হুর’ শব্দের অর্থ ‘আকাশ বহনকারী’। নাম শুনেই তার কাজের ধরণ সম্পর্কে অনুমান করা যায়। আন্হুর ছিলেন একইসাথে আকাশ ও যুদ্ধের দেবতা।