Showing posts with label সা‌হিত্য. Show all posts
Showing posts with label সা‌হিত্য. Show all posts

Monday, January 8, 2018

হাজারো কল্পনার আটলান্টিস শহর: রহস্যের শুরু কখন থেকে?

এই বিশ্বের মানুষের কাছে আজও এক রহস্যময় নগরীর নাম আটলান্টিস। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এখনো শহরটির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। শহরটির অস্তিত্ব ছিল, নাকি তা শুধুই কবির কল্পনা- তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর। এই নগরকে নিয়ে লেখা হয়েছে কত গল্প-কবিতা-উপন্যাস! বিজ্ঞানী ও গবেষকদের দল এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই অজানা শহরটিকে। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত সমাধান না হওয়া যত রহস্য আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো এই আটলান্টিস।

কীভাবে জন্ম নিলো আটলান্টিস উপাখ্যানঃ

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর লেখা থেকেই প্রথম জানা যায় আটলান্টিস শহরের কথা। 'টিমেউস''ক্রিটিয়াস' নামে প্লেটোর দুটি ‘ডায়ালগ এ আটলান্টিসের উল্লেখ পাওয়া যায়। ৩৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ দার্শনিক প্লেটো তার শিষ্যদের নিখুঁতভাবে এই নগরটির কথা বলে গেছেন।
গ্রিক দার্শনিক প্লেটো।
প্লেটো তার লেখায় জানিয়েছেন যে, আটলান্টিসের কথা প্রথম জানতে পারেন গ্রিক মহাজ্ঞানী সোলোন। মহাজ্ঞানী সোলোন তথ্যটি আবার মিশরীয় এক ধর্মযাজকের কাছ থেকে পান। মিশর থেকে ফিরে এসে সোলোন তার এক আত্মীয় ড্রপাইডসের কাছে আটলান্টিসের গল্পটি বলেন। পরম্পরায় গল্পটি ড্রপাইডস তার সন্তান, তার প্রপৌত্র ক্রিটিয়াস গল্পটি প্লেটোর কাছে ব্যক্ত করেন।

আটলান্টিস নামকরণের কারণঃ

সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন।
অনেকে মনে করে থাকেন, আটলান্টিক মহাসাগরের কাছে অবস্থিত হওয়ায় নগরটির নামকরণ হয়েছিল আটলান্টিস। প্লেটোর বর্ণনা অনুযায়ী, সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন ছিলেন আটলান্টিসের রাজা। তার স্ত্রী ক্লিওটার ছিলেন খুব সুন্দরী। দ্বীপের ঠিক মাঝখানে পাহাড়ের মাথায় স্ত্রীর জন্য এক অপরূপ প্রাসাদ তৈরি করেন পোসাইডন। তাদের ছিল পাঁচ জোড়া যমজ সন্তান। সমুদ্র দেবতা তার দশ সন্তানকে দ্বীপের বিভিন্ন অংশ শাসনের ভার দিলেন। তার বড় যমজ সন্তানের একজন এটলাসকে দ্বীপের একটি অংশের শাসনের ভার দিলেন। তার নামানুসারে দ্বীপের সেই অংশের নাম হয় আটলান্টিস। পরে এটলাস পুরো দ্বীপ এবং সমুদ্রের চারপাশের অঞ্চল নিজের অধিকারে নিয়ে নেন। এরপরেই পুরো দ্বীপের নাম তার নামে হয়ে যায় আটলান্টিস।

প্লেটোর বর্ণনায় কেমন ছিল আটলান্টিস?

প্লেটোর লেখা থেকে জানা যায়, আটলান্টিস ছিল এক স্বর্গোদ্যান। তা ছিল এক ‘সব পেয়েছি’র দেশ। অত্যন্ত উর্বর ছিল সেখানকার মাটি, সেখানে রকমারি ফসল ফলাতো কৃষকরা। আর তাতে ফলতো নানা ফলমূল, শাকসবজি। প্রচুর পরিমাণে ফসল ফলতো বলে নগরীতে কোনো অভাব ছিল না। মনমাতানো গন্ধে ভরা রং-বেরঙের সুন্দর ফুলে ভরে থাকতো সবুজ এই রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। পাহাড়, সমুদ্র আর অরণ্যে ঘেরা অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই রাজ্যে সোনা, রূপো, তামা  ইত্যাদি খনিজ সম্পদেরও কোনো অভাব ছিল না। সেচ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত উন্নত। দিগন্ত ‍বিস্তৃত ফসলের মাঠ পেরিয়ে নীলচে পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল কৃষকদের বাড়ি।
কবির কল্পনায় আটলান্টিস শহর।
আটলান্টিস নগর ঘিরে ছিল সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ, বন্দর, মন্দির। সোনা ও রূপার কারুকার্যে ভরা সুন্দর সুন্দর অট্টালিকা। আর ছিল এক সমুদ্র দেবতার মূর্তি। রাজধানীটি ছিল এক সবুজে ঘেরা পাহাড়ের চূড়ায়। সেই পাহাড়ের চারিদিক ঘিরে ছিল বেশ কয়েকটি পরিখা। পরিখাগুলো আবার পরস্পরের সাথে খাল দিয়ে যুক্ত ছিল। বাইরের পরিখাটি খাল দিয়ে যুক্ত ছিল সমুদ্রের সাথে। সমুদ্রপথে বিভিন্ন দেশ ও রাজ্যের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য এ খালগুলো ব্যবহার করা হতো।
নগরীর বাড়িগুলোতে ছিল আধুনিক সব ব্যবস্থা। দামি ধাতুর কাজ করা পাথরের দেওয়াল, বিশাল বিশাল সব সোনার মূর্তি, গরম আর ঠাণ্ডা জলের ঝরণা, আরো সব নানা মজার জিনিস। এই উন্নত রাজ্যে ছিল এক সুগঠিত বিশাল সেনাবাহিনী। প্লেটোর অনবদ্য বর্ণনায় শহরটি আশ্চর্যভাবে যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। এ থেকে অনুমান করা যায়, আটলান্টিসের লোকজনের মধ্যে কেউ কেউ দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, স্থপতিও ছিলেন।
কল্পনার মানচিত্রে আটলান্টিস নগর।
কিন্তু অনেক গবেষকই এ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, প্লেটো যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার সময়েরও নয় হাজার বছর আগে প্রস্তর যুগের শুরুর দিকে এরকম উন্নত বুদ্ধিদীপ্ত নৌশক্তিসম্পন্ন সভ্যতা পৃথিবীর বুকে গড়ে ওঠা সত্যিই অকল্পনীয়।

কীভাবে বিলুপ্ত হলো এই নগরী?

প্লেটোর বর্ণনানুযায়ী, যিশু খ্রিস্টের জন্মের ১,৫০০ বছর আগে এই নগরীর বিলুপ্তি ঘটে। এ নগরের ধ্বংস হওয়া নিয়ে প্লেটো বলেছেন, পোসাইডন তার দশ ছেলেকে দেশটির একেক অংশ শাসনের ভার দেন। এমনিতে বেশ শান্তিই ছিল। কিন্তু ক্রমশই দশজনের মধ্যে বিরোধ বাড়তে লাগল। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের রাজ্যের সীমা বাড়াতে চাইল। আটলান্টিসের নির্মল আকাশে লোভ আর হিংসার ছায়া পড়ল। স্বর্গের জিউস তখন ঠিক করলেন, এদের শিক্ষা দিতে হবে। সেজন্যই দেবতাদের ডেকে তড়িঘড়ি করে এক সভার আয়োজন করলেন তিনি। প্লেটো ঠিক এখানটায় তার গল্প শেষ করে দিলেন। তারপর আর কী হলো তা আর জানা গেল না। কিন্তু অনেকে এই গল্পের পরিসমাপ্তি টানেন এই বলে যে, স্বর্গের দেবতা জিউসের রোষানলে পড়ে এই নগরী ধ্বংস হয়ে যায়।
স্বর্গের দেবতা জিউস।
কিন্তু পরবর্তীতে অনেক গবেষকই আটলান্টিসের ধ্বংস হওয়া নিয়ে নানা মত রেখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রিক পুরাতাত্ত্বিক অ্যাঞ্জেলোস গ্যালানোপুলোসের অভিমত। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষে তার তত্ত্বটি প্রকাশ পেলে চমকে গিয়েছিলেন সবাই। তিনি বললেন, ১,৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ এক ভয়ানক আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছিল ভূমধ্যসাগরের সান্তোরিনি দ্বীপে। আগ্নেয়গিরির হঠাৎ জেগে ওঠা ও তার দরুণ এক ভয়াবহ ভূমিকম্প ও প্রবল জলোচ্ছাসের সৃষ্টি হয় পুরো নগর জুড়ে। ফলে এক রাতের মধ্যে আটলান্টিক মহাসাগরের নীচে তলিয়ে যায় এই শহর। আর সেই সাথে মুছে যায় এক উন্নত সভ্যতার যত চিহ্ন।
আটলান্টিসের ধ্বংসের পিছনে প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রধান কারণ বলে অনেকে মনে করেন।
টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া সমুদ্র গবেষক রবার্ট বালার্ডের মতে, আটলান্টিসের এই ধ্বংসের তথ্যটি সঠিক হতে পারে। কারণ, ইতিহাসের এই সময়টায় বড় ধরনের বন্যা এবং আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের তথ্য পাওয়া গেছে।

কোথায় ছিল আটলান্টিস?

আটলান্টিস নগরটি কোথায় ছিল তা নিয়ে জল্পনার কোনো শেষ নেই। আটলান্টিসের খোঁজে অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর অনুসন্ধান চলেছে এবং এখনো চলছে। তবে এখনো এর প্রকৃত অবস্থান কোথায় ছিল তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানকে হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু তার পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ তারা তুলে ধরতে পারেননি। অনেকের বিশ্বাস, গ্রিক দ্বীপ ক্রিটের কাছাকাছি ছিল আটলান্টিস।
অনেকের ধারণা, সমুদ্রের নিচে কোথাও এখনো রয়েছে সেই কল্পনার নগরী।
তবে কোনো কোনো গবেষকের মতে, গ্রিসের সান্তোরিনি শহরটিই হচ্ছে অ্যাটলান্টিস। আবার কারো মতে, বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার কাছে, কারো ভাবনায় আফ্রিকায়ও নাকি থাকতে পারে আটলান্টিস। কারো কারো মতে, আটলান্টিস গ্রিক পুরাণের শহর টান্টালিসও হতে পারে। কারণ হিসাবে শোনা যায়, জিউস রেগে গিয়ে বজ্রপাত করেন টান্টালিসের উপরেও। আবার ফ্লোরিডার উপকূলে বিমিনি দ্বীপের পাশে দিয়ে হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিসের একটি পথের অস্তিত্ব রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
আটলান্টিক মহাসাগরের নীচে হারিয়ে গেছে সেই স্বপ্নের নগর।
তবে প্লেটোর দেয়া তথ্যমতে, আটলান্টিক মহাসাগর থেকে উৎপত্তি হওয়া একটি দ্বীপই হচ্ছে আটলান্টিস। বলা হয়ে থাকে, হারকিউলিস পিলার নামে এক ছোট দ্বীপের অস্তিত্ব ছিল তার পাশে। বর্তমানে তা জিব্রাল্টার প্রণালী হিসেবে পরিচিত। তাই অনেকে মনে করে থাকেন, জিব্রাল্টার প্রণালীর কাছাকাছি কোথাও ছিল আটলান্টিস শহরটি।
১৯৬৮ সালে এগার ক্যাচি তার বই ‘On Atlantis’ এ উল্লেখ করেন, মিশরের নীলনদ এবং স্ফিংস এর মূর্তির মাঝে হল অব রেকর্ডস যেখানে আবিষ্কৃত হয়েছে, সেখানেই পাওয়া যেতে পারে আটলান্টিসের ধ্বংসাবশেষ।
স্পেনের ডোনা ন্যাশনাল পার্কের সোয়াম ফরেস্টের নীচে আটলান্টিসের খোঁজ পাওয়া যাবে বলে ধারণা করছেন প্রত্নতত্ত্ববিদ রিচার্ড ফ্রেউন্ড ও তার দল।
২০১১ সালে হাটফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ রিচার্ড ফ্রেউন্ড ও তার দল কয়েকটি শহরের সন্ধান পান যেখানে আটলান্টিস নগরটি ছিল বলে মনে করা হয়। স্পেনের এক শহর কাদিজের উত্তরে ডোনা ন্যাশনাল পার্কের সোয়াম্প ফরেস্টের নীচে এই শহরগুলো খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে আটলান্টিসের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে কোনো গবেষকই এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি।

আটলান্টিস কল্পনা নাকি সত্যি?

আটলান্টিস নিয়ে প্লেটোর এই কাহিনী কোনো পৌরাণিক কল্পকাহিনী অনুপ্রাণিত কিনা তার ব্যাপারে ইতিহাসবিদরা এখনো একমত হতে পারেননি। তবে ক্রিটিয়াস দাবি করেছিলেন যে, মহাজ্ঞানী সোলোনের কাছ থেকে তিনি এই গল্পটি জানতে পারেন। সোলোন ছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের এথেন্সের বিখ্যাত নীতিনির্ধারক। অনেক পণ্ডিত মনে করেন, তিনি যখন মিশরে যান, সেখানে প্রাচীন কিছু পুঁথি থেকে এথেন্স এবং আটলান্টিস সম্পর্কে জানতে পারেন।
শিল্পীর তুলিতে আঁকা আটলান্টিস নগরী।
তবে আরেক পক্ষ মনে করেন, প্লেটো প্রাচীন কিছু যুদ্ধের কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আটলান্টিসের এই কাহিনীটি রচনা করেন। অনেকেই মনে করেন, আটলান্টিস প্লেটোর কল্পনায় বোনা এক নগর সভ্যতা, যা তিনিই সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তার ধ্বংস করেছেন। তবে, পৃথিবীর অধিকাংশ সংস্কৃতিতেই ‘হারানো সভ্যতার’ উপকথা প্রচলিত রয়েছে। তাই অনেক পণ্ডিতই এসব উপকথার ভিত্তি রয়েছে বলে মনে করেন। তাই কিছু গবেষক আটলান্টিসের বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। আর তাই আটলান্টিস নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

Tuesday, July 18, 2017

যে গান মৃত্যু ডেকে আনে!

মন ভালো হোক কিংবা খারাপ, আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যেকোনো সময়ে গান ছাড়া যাদের চলেই না। জ্যামে বসে অলস সময় কাটাতেই হোক কিংবা জিমে গিয়ে প্রচণ্ড শারীরিক কসরত করার মুহূর্তেই হোক, গান আমাদের চিরসঙ্গী। মানুষের অনুভূতির সাথে মিশে গিয়ে একমাত্র গানই পারে চোখের পলকে মনের যত ক্লান্তি সব দূর করে দিতে। কিন্তু সেই গানই যদি হয় মৃত্যুর কারণ তবে কেমন হবে একবার ভাবুন তো!
ইউটিউবে গ্লুমি সানডে গানের কভার চিত্র।
বলছিলাম ‘গ্লুমি সানডে‘ গানটির কথা। প্রায় শতাধিক জীবন কেড়ে নেয়া এই গানটি বেশ সাড়া জাগানো ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে। এমনকি গানটির রচয়িতা স্বয়ং শিকার হয়েছেন রহস্যজনক মৃত্যুর। তাই তো গ্লুমি সানডের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হাঙ্গেরির সুইসাইড সং’
গ্লুমি সানডের অপর নাম হাঙ্গেরির সুইসাইড সং।
গানটি নিয়ে আর কিছু বলার আগে দেখে আসা যাক কি ছিল সেই গানের কথায়
"Sunday is gloomy, my hours are slumberless
Dearest the shadows I live with are numberless
Little white flowers will never awaken you
Not where the black coach of sorrow has taken you
Angels have no thought of ever returning you
Would they be angry if I thought of joining you?

Gloomy Sunday

Gloomy is Sunday, with shadows I spend it all
My heart and I have decided to end it all
Soon there’ll be candles and prayers that are sad I know
Let them not weep let them know that I’m glad to go
Death is no dream for in death I’m caressing you
With the last breath of my soul I’ll be blessing you

Gloomy Sunday

Dreaming, I was only dreaming
I wake and I find you asleep in the deep of my heart, here
Darling, I hope that my dream never haunted you
My heart is telling you how much I wanted you

Gloomy Sunday"

গ্লুমি সানডের রচয়িতা 'রেজসো সেরেস'।
১৯৩২ সালে প্যারিসে বসে গ্লুমি সানডে গানটি লিখেছিলেন হাঙ্গেরিয়ান পিয়ানোবাদক এবং সঙ্গীত রচয়িতা রেজসো সেরেস। কারো কারো মতে জায়গাটি প্যারিস নয়, বুদাপেস্টও হতে পারে। ৩৪ বছর বয়সী সেরেস তখন একটুখানি সাফল্যের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন। গান নয়, মূলত কবিতা হিসেবেই প্রথম রচিত হয় গ্লুমি সানডে। পিয়ানোর সি-মাইনর মেলোডির সাথে কম্পোজিশন করা হয় কবিতাটির।

গানটি কে এবং কেন লিখেছিলেন তা নিয়ে আজ অবধি জল কম ঘোলা হয়নি। রেজসো সেরেসকে যদিও গানটির রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তা সত্ত্বেও গানটির পেছনের কাহিনী হিসেবে একাধিক মতভেদ রয়েছে। সবচেয়ে প্রচলিত মত অনুযায়ী জানা যায়, মামলা-মোকদ্দমার ফেরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন সেরেস। তাকে স্বান্তনা দিতে একটি কবিতা লিখে পাঠান ছোটবেলার বন্ধু লাজলো জেভার। সেই কবিতাটি সেরেসের অন্তর ছুঁয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে পিয়ানোর সাহায্যে সুর দিয়ে এটিকে গানে রুপান্তরিত করেন সেরেস। অন্য একটি মত অনুযায়ী, সেরেসের হাত দিয়েই রচিত হয় গ্লুমি সানডে।

অপর একটি ব্যাখ্যা মতে, প্রেমিকা সেরেসকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তিনি এতটাই বিষণ্ণ হয়ে পড়েন যে সুর করে ফেলেন গ্লুমি সানডের মতো মন খারাপ করা গান। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীর বর্ণনা এবং তার অন্তিম পরিণতি কি হতে পারে সেই চিন্তা-ভাবনারই প্রতিফলন এই গানটি। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। হাঙ্গেরিতেও চলছিল চরম অর্থনৈতিক মন্দা আর ফ্যাসিবাদ। সব মিলিয়ে দুর্বিষহ দিন কাটছিল সেরেসের। সেরেস তার অন্তরের সমস্ত বেদনা একত্রিত করে ঢেলে দিয়েছিলেন এই গানটির প্রতিটি সুরে। আর সে কারণেই অচিরেই তার বিষণ্ণতা ছুঁয়ে গিয়েছিল গীতিকার লাজলো জাভোরকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা।
গানটিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে বেশ কিছু মিথও । বলা হয়, সুন্দরী এক নারী গানটি প্লেয়ারে চালিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। আবার এক ব্যবসায়ীর পকেট থেকে সুইসাইড নোট হিসেবেও পাওয়া যায় গ্লুমি সানডে। হাঙ্গেরির দুই কিশোরী এই গান গাইতে গাইতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নদীতে এমন কথাও শোনা যায়। কেউ দেখেনি, কেউ শোনেনি অথচ এই মিথগুলো দিব্যি প্রচলিত রয়েছে মানুষের মুখে মুখে।
আরেকটি একটি উল্লেখযোগ্য মত হলো গ্লুমি সানডে গানটি শুনে আত্মহত্যা করা ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন স্বয়ং জাভোরের প্রেমিকাও। মতান্তরে জাভোরের প্রেমিকা তার সুইসাইড নোটে মাত্র দুইটি শব্দ লিখে গিয়েছিলেন- ‘গ্লুমি সানডে’। কাজেই সেরেসের মতো জাভোরও ছিলেন একাকী। সুতরাং দুজন দুজনের মনের কথা বুঝে ফেলেছিলেন এক নিমিষেই। এবার তাদের প্রয়োজন ছিল একটি সুরেলা কণ্ঠের। সেই অভাব পূরণ করতে ১৯৩৫ সালে এগিয়ে আসেন পল কালমার। গানটির কথার সারমর্ম ছিল অনেকটা এমন- গায়ক তার প্রেমিকার মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল হয়ে আত্মহত্যা করতে চান যাতে অন্তত মৃত্যুর পরে হলেও তাদের দুজনের আত্মা একত্রিত হতে পারে। বর্তমানে গানটির যে সংস্করণ সর্বত্র শোনা যায় তা ১৯৪১ সালে বিলি হলিডে রেকর্ড করেন।
বিলি হলিডে।
১৯৩৬ সালে হাঙ্গেরিয়ান এই গানটিকে ইংলিশে রেকর্ড করেন হল ক্যাম্প যেখানে কথাগুলো অনুবাদ করতে সহায়তা করেন স্যাম এম লিউইস। লিউইসের লেখা গানটি এবার সরাসরি প্ররোচিত করে আত্মহত্যার পথে। ধীরে ধীরে গানটির নামই হয়ে গেল হাঙ্গেরিয়ার আত্মঘাতী গান। যথাযথ প্রমাণসহ অসংখ্য ব্যক্তির আত্মহত্যার খবরে নড়েচড়ে বসেন সবাই।

‘৩০ এর দশকে পাওয়া খবর অনুযায়ী এই গানটির জের ধরে আমেরিকা ও হাঙ্গেরিতে আত্মহত্যা করেন ১৯ জন, মতান্তরে সংখ্যাটি ২০০ বলেও শোনা যায়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো আত্মহত্যাকারীদের সবার সুইসাইড নোটেই পাওয়া গেছে গ্লুমি সানডের লিরিক্স। জনমত প্রচলিত আছে, এই গানটি বারবার শুনতে শুনতে শ্রোতাদের মধ্যে জীবনের প্রতি এক ধরণের বিতৃষ্ণা চলে আসে এবং সেখান থেকেই তারা বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। ২ জন তো গানটি শুনতে শুনতে গুলি করে নিজেদের মাথার খুলিই উড়িয়ে দিয়েছেন! এরপরও কি গানটি যে অভিশপ্ত তা মানতে কারো কোনো আপত্তি থাকতে পারে?

শ্রোতাদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় হাঙ্গেরিতে গানটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অথচ হাঙ্গেরি কিন্তু এমনিতেও আত্মহত্যার হারের দিক থেকে বিশ্বের প্রথম সারির একটি দেশ। প্রতি বছর লাখে প্রায় ৪৬ জন মানুষ সেখানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তারপরও অভিশপ্ত গান হিসেবে স্বীকৃতি পায় গ্লুমি সানডে। পরবর্তীতে ৪০ এর দশকে বিবিসি ও গানটির লিরিক শোনানো বন্ধ করে শুধুমাত্র ইন্সট্রুমেন্টাল বাজানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ভাষ্যমতে, আত্মহত্যার প্ররোচনা না থাকলেও এই গানটি কাউকে যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। কাজেই বিলি হলিডের গ্লুমি সানডে সংস্করণটি সব জায়গা থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়। ২০০২ সালে এসে গানটির উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে রেডিও চ্যানেলগুলো।

পত্রিকায় সেরেসের আত্মহত্যার খবর।
গানটির প্রভাবেই কিনা কে জানে, গ্লুমি সানডে রচনার ৩৫ বছর পরে গানটি গাইতে গাইতে সেরেস তার চার তলা অ্যাপার্টমেন্টের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন ১৯৬৮ সালে। কেন একটি মাত্র গান এত বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ালো তা আজও এক রহস্য। তবুও গানটিকে ঘিরে সবার কৌতূহলের যেন কোনো শেষ নেই। এলভিস কোস্টেলো, সারাহ ম্যাকল্যাচলান, হেথার নোভা প্রমুখ সংগীত শিল্পী সাম্প্রতিক সময়ে গ্লুমি সানডের নতুন নতুন সংস্করণ রেকর্ড করেছেন।
রলফ সুবলের চলচ্চিত্র ‘গ্লুমি সানডে’।
গ্লুমি সানডে গানটিকে ভিত্তি করে ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচার এবং একটি ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী নিয়ে একই নামে ১৯৯৯ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন পরিচালক রলফ সুবল। এখানে তিনি ইতিহাস এবং ফিকশনের মধ্যে একটি সমন্বয় ঘটিয়েছেন।

তবে গান শুনুন আর চলচ্চিত্রই দেখুন, আত্মহত্যার পথে না হাঁটার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। কারণ আত্মহত্যা কখনোই কোনো পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে না। বেঁচে থেকে কঠিন সব সমস্যার মোকাবেলা করে দিন শেষে বিজয়ীর হাসি হাসতে পারাই তো প্রকৃত বীরের কাজ।

Friday, July 14, 2017

খনা ও খনার বচন: লোকসংস্কৃতির আকর্ষণীয় উপাদান।

কখনও কখনও আধুনিক যুগে এসেও প্রাচীন সময়ের কিছু মানুষকে বর্তমানের চাইতেও বেশি আধুনিক বলে মনে হয়, তেমনই একজন- 'খনা'। কী খুব পরিচিত লাগছে তো নামটা? প্রাচীন ভারতের এই নারীর নাম ভারতীয় উপমহাদেশের কারোরই অজানা নয়। আজ সেই খনারই জানা-অজানা কিছু গল্পে ডুবে যাওয়া যাক!

খনার পদধূলি পেয়েছে জ্যোতির্বিদ্যা, বিজ্ঞান, দর্শন ও কৃষিশাস্ত্র। এ সকল বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ কিংবা গবেষণালব্ধ জ্ঞান তিনি তুলে ধরতেন তার বিভিন্ন বচনের মধ্য দিয়ে, যেগুলো বহুকাল ধরে লোকের মুখে মুখে খ্যাতি লাভ করেছে ‘খনার বচন’ নামে। খনার বচনগুলো খনাকে করে তুলেছিল একজন কবিও। ‘খনার বচন’-কে কেউ কেউ আবার ভবিষ্যদ্ববাণী বলতেও ভালোবাসেন, কারণ তার দ্বারা নির্ধারিত আবহাওয়ার পূর্বাভাসগুলো কৃষি ও রাষ্ট্রকার্যে অনেক সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। খনা তাই ছিলেন প্রাচীন ভারতের একজন আবহাওয়াবিদ- এ কথা বললেও ভুল হবে না।
শিল্পীর তুলিতে আকা সেই বিখ্যাত খনা।
খনার কর্ম যতটা নিশ্চিত, ততটা নিশ্চিত নয় তার জীবন ও জন্ম। এ নিয়ে চালু রয়েছে কিছু মতভেদ। বাংলা ও উড়িয়া ভাষায় এই মতভেদের আলোকে কিছু গল্পও কালক্রমে তাই আবির্ভূত হয়েছে।

খনার জীবন নিয়ে প্রচলিত ধারণাঃ
তার আবির্ভাবকাল ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অনুমান করা হয়। তিনি এ সময়কার তথা মধ্যযুগের কবি ছিলেন (এখানে খনার বচনকে কবিতা হিসেবে ধরে খনাকে মধ্যযুগের কবি বলা হচ্ছে)। একটি ধারণা অনুযায়ী খনার বাসস্থান ছিল পশ্চিমবঙ্গের চবিবশ পরগনা জেলার বারাসাতের দেউলি গ্রামে এবং তার পিতার নাম অনাচার্য। এই ধারণা অনুযায়ী তিনি চন্দ্রকেতু রাজার আশ্রম চন্দ্রপুরেও বহুকাল বাস করেন।

বিক্রমাদিত্যের সভার দশম রত্নঃ
রাজা বিক্রমাদিত্য।
বরাহ ও মিহির রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাসদ ছিলেন। একবার জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি জটিল সমস্যা সমাধান করার জন্য দেওয়া হয় এই পিতা-পুত্রকে। কিন্তু তারা কোনোভাবেই কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না, আকাশের তারা গোণায় বারবার ভুল করছিলেন। এই গভীর সমস্যায় এগিয়ে আসেন খনা। তিনিই একটি আবহাওয়া পূর্বাভাস তৈরি করেন এবং এ থেকে কৃষকেরা অত্যন্ত লাভবান হন। খনার এই আচমকা সাফল্য চোখ কাড়ে রাজা বিক্রমাদিত্যের এবং এ ঘটনার পর থেকেই তিনি খনাকে তার সভার ‘দশম রত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

বাংলা ও উড়িয়া ভাষায় খনা নিয়ে প্রচলিত গল্পে মিল ও অমিলঃ
রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার নবরত্নের একজন ছিলেন বরাহ। তার পুত্র মিহিরের জন্মের পর গণনার মাধ্যমে জানলেন তার আয়ুষ্কাল মাত্র এক বছর। এরপর তিনি তাকে একটি তাম্রপাত্রে করে ভাসিয়ে দেন নদীর স্রোতে এই বিশ্বাসে যে নবজাতক শিশুটি হয়তো বেঁচে যাবে! খনা ছিলেন মতান্তরে সিদ্ধলরাজের কন্যা (বাংলা মতানুসারে) কিংবা লঙ্কাদ্বীপের রাজকুমারী (উড়িয়া মতানুসারে)। নদীর সেই স্রোতের সাথে মিহির গিয়ে পৌঁছালো খনার পিতার কাছে। তিনি খনা ও মিহিরকে একত্রে লালন-পালন করতে লাগলেন। তারা একই সাথে জ্যোতিষশাস্ত্রে সিদ্ধিলাভ করলেন।

সতীর্থ বন্ধু হয়ে তারা একসময় বিবাহবন্ধনেও আবদ্ধ হলেন। একদিন নক্ষত্রগণনার মাধ্যমে খনা জানতে পারলেন যে বরাহ-ই হচ্ছেন মিহিরের পিতা এবং এ কথা জানার অব্যবহিত পরেই তারা দেখা করতে চাইলেন বরাহের সাথে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে। একজন অনুচরের সহায়তার ভারতবর্ষে যাত্রা করেন। উজ্জয়নীতে এসে খনা ও মিহির বরাহের নিকট আত্মপরিচয় দান করেন। কিন্তু প্রথমে বরাহ কিছুতেই মেনে নিতে চাইলেন না যে মিহির তারই পুত্র, কারণ এখনো তার মনে গেঁথে রয়েছে ভুল গণনার সেই ভবিষ্যদ্বাণীটি! খনা বরাহের ভুল শুধরালেন সঠিক গণনা দেখিয়ে এবং এতে ফলাফল বের হলো যে মিহিরের আয়ুষ্কাল ১০০ বছর! সেই প্রথম সাক্ষাৎকালে খনা বরাহকে যা বলেছিলেন তা ছিল-
“কীসের তিথি কীসের বার, জন্ম নক্ষত্র কর সার/
কী করো শ্বশুর মতিহীন? পলকে আয়ু বারো দিন!”
খনার শ্বশুর বরাহ।
খনার প্রজ্ঞা ও মেধা ক্রমেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকে এবং অনেকেই খনার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার দশম রত্ন হবার পর তো যেন স্বয়ং বরাহই যেন খনার শত্রু হয়ে উঠলেন! বরাহ নিজের প্রতিপত্তি হারাবার ভয়ে এবং খনার খ্যাতি আর বাড়তে না দেওয়ার উদ্দেশ্যে এক নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি খনার বচন উৎপন্ন হবার যে স্থান সেটাই শেষ করে দিলেন। তিনি খনার জিহ্বা কেটে নিতে বললেন মিহিরকে! আর পিতৃভক্ত মিহিরও তাই করলেন! এই ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই অনবরত রক্তপাতের ফলে খনার মৃত্যু হয়। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে লেখা হয় এক করুণ জীবনাবসান আর নিষ্ঠুরতার কাহিনী।
খনার দেওয়া উপদেশগুলোই খনার বচন।
উড়িয়া ধারণা অনুযায়ী খনার আসল নাম ছিল লীলাবতী এবং তার জিহ্বাকর্তনের ফলে তিনি বোবা হয়ে যান এবং ‘খনা’ নামের আরেক অর্থ বোবা। উড়িয়া ভাষার গল্পে এটাও বলা হয় যে জিহ্বা কেটে নেওয়ার আগে নাকি মিহির খনাকে কিছু কথা বলবার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পিতার এই নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তে সব মিলিয়ে মিহির কোন স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সে কথা কোনোখানেই বলা হয়নি। খনার জন্য আদৌ মিহিরের মনে কোনো প্রেম বা সহমর্মিতা ছিল কিনা তারও উল্লেখ নেই এই গল্পগুলোতে।

খনার মৃত্যু নিয়ে একটি ছোট মিথ চালু আছে- খনার সেই জিহ্বাটি নাকি তখনই খেয়ে ফেলেছিল এক টিকটিকি এবং তখন থেকেই ঠিক কোনো কথা শুনলে দেয়ালে থাকা যেকোনো টিকটিকিই বলে ওঠে- “ঠিক ঠিক!” এই মিথ এটিই নির্দেশ করে যে জিহ্বা কেটে ফেলার পরও, ভারতের মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন হবার পরও ঠিক-ভুলের জ্ঞান খনা রেখে গেছেন এর আবহাওয়ায়।

অর্থবহ খনার বচনঃ
খনার একটি বচন।
“থাকতে বলদ না করে চাষ/ তার দুঃখ বারোমাস”
এরকম ছন্দবদ্ধরীতিতে যে শুভাশুভ, বিধিবিধান, নীতি ও উপদেশবাচক প্রতিপাল্য প্রাজ্ঞোক্তি খনা করে গিয়েছেন তা-ই হচ্ছে ‘খনার বচন’। বাংলা, ওড়িয়া ও অসমিয়া ভাষায় খনার বচনের খ্যাতি দেখা যায়। খনার বেশিরভাগ বচনই এমন কৃষিকাজ সংক্রান্ত দিককে নির্দেশ করে থাকে। আধুনিকায়নের এই যুগে এসেও কৃষির বহু ক্ষেত্রে খনার বচন এখনও অচল হয়নি, তার আবেদন এখনও রয়েছে অমলিনই। খনার বচনে আবহাওয়া, জ্যোতিষ, ঋতুভেদে শস্যের ক্ষয়ক্ষতি ও ফলন সম্পর্কে যে ধারণা দেওয়া হয়েছে, তার অনেকগুলিই বৈজ্ঞানিক সত্যের খুব কাছাকাছি। আবহমান কাল ধরে বাংলার কৃষিক্ষেত্র ও কৃষকদের এক প্রকৃত দিকনির্দেশক হয়ে খনা পথ দেখিয়ে যাচ্ছেন তার কালজয়ী বচনের মধ্য দিয়ে। খনার বচনে বেশ কিছু দুর্বোধ্য গাণিতিক পরিভাষাও পাওয়া গিয়েছে যার অর্থোদ্ধার সম্ভব হয়নি।

খনা ব্যবহারিকভাবে উপদেশ দিয়ে গিয়েছেন কিছুটা এমনভাবে-
“মঙ্গলে উষা বুধে পা/ যথা ইচ্ছা তথা যা”

কোন মাটিতে কোন ফসল ভালো ফলবে-
“শুনরে বাপু চাষার বেটা, মাটির মধ্যে বেলে যেটা/ তাতে যদি বুনিস পটল, তাতে তোর আশার সফল”

অথবা কোন ঋতুতে কোন বীজ বপন করতে হবে-
“আখ আদা রুই, এই তিন চৈতে রুই”

তার উপায় খুব সহজেই মেলে খনার বচনে।
শীতকালের বৃষ্টির প্রতি খনা বন্দনা গেয়েছেন-
“যদি বর্ষে মাঘের শেষ/ ধন্যি রাজা পুণ্যি দেশ”

যদিওবা কৃষিকাজেই খনার বচনের পরিসর বেশি বিস্তৃত, তবু জীবনের অন্যান্য অংশ নিয়েও কম বচন রেখে যাননি এই অনন্য পর্যবেক্ষক। এই কথাটি তো আমরা সবাই প্রতিনিয়ত ব্যবহার করি কিন্তু হয়তো জানি না যে এটি খনার বচন। দেখুন তো চিনতে পারেন কিনা?
“সূর্যের চেয়ে বালি গরম! নদীর চেয়ে প্যাক ঠান্ডা!”
অথবা
“সমানে সমানে কুস্তি, সমানে সমানে দোস্তি”

কর্মফল নিয়ে তিনি যেন আজ এইখানে দাঁড়িয়েই উপদেশ দিচ্ছেন-
“যা-ই করিবে বান্দা তা-ই পাইবে/ সুঁই চুরি করিলে কুড়াল হারাইবে”

কি সহজ অথচ জীবনবোধে টইটুম্বুর খনার বচন, যেন ছন্দে ছন্দে গাঁথা জীবনের মানে! বাঙালি লোকসাহিত্যের একটি অন্যত্ম উপাদান হচ্ছে খনার বচন। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে রচনা করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর আবেদন আটকে থাকেনি শুধু সেই সময়টিতেই! আজও খনার বচন পড়লে আপনি আনমনে বলে উঠবেন- “ঠিকই তো!” আর সেই মিথ মেনে চলা টিকটিকিটিও খনার বচন শুনে আজ একবার বলে উঠতেই পারে- “ঠিক ঠিক!”
খনার বচন নিয়ে একটি বই।
"ষোল চাষে মূলা, তার অর্ধেক তুলা।
তার অর্ধেক ধান, বিনা চাষে পান।"